Main Menu

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা যুদ্ধ প্রসঙ্গে

আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা যুদ্ধ (১৭৭৬-১৭৮১) (ইংরেজি: American War of Independence) হচ্ছে আধুনিক ইউরোপের ইতিহাসে অষ্টাদশ শতাব্দীতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার একটি। অন্য ঘটনাটি হচ্ছে ফরাসি বিপ্লব যা ১৭৮৯ সালে ঘটে। আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধকে আমেরিকার বিপ্লব বলেও অভিহিত করা হয়।

আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ ইংল্যাণ্ডের অর্থনৈতিক বিকাশের একটি পর্যায়ের স্মারক। সপ্তদশ শতাব্দীতেই ইংল্যাণ্ডে শিল্প বিপ্লব সংঘটিত হয়। ইংল্যাণ্ডে পশম ও সুতার বস্ত্রশিল্প, কয়লা উত্তোলন এবং লৌহ তৈরির শিল্প দ্রুত বিকাশ লাভ করে। পশমশিল্পের বিস্তারের সঙ্গে ভূমি ও কৃষিক্ষেত্রে এক নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ভেড়ার পশম ছিল পশম শিল্পের মূল কাঁচামাল। কৃষিপণ্যের চেয়ে পশমের লাভ অধিক দেখে জমিদারগণ জমি থেকে ব্যাপকভাবে কৃষকদের উচ্ছেদ করে তাদের জমিদারিকে মেষপালনের খামারে পরিণত করতে শুরু করে। এর ফলে বিপুল সংখ্যক কৃষক ভূমিহীন নিঃস্ব মুজরে পরিণত হয়ে শহরে এবং শিল্পাঞ্চলে জমায়েত হতে থাকে। এই নিঃস্ব জমিহীন কৃষকরা শিল্পের সস্তা মজুর হিসাবে শিল্প বিকাশের গতিকে আরো ত্বরান্বিত করে। ইংল্যাণ্ডের এই বিকশিত শিল্পের জন্যে ক্রমান্বয়ে অধিক পরিমাণে বাজারের আবশ্যক হয়। এই বাজারের প্রয়োজনে শক্তিশালী নৌবহরের মালিক ইংল্যাণ্ড উপনিবেশের জন্যে বিভিন্ন যুদ্ধে লিপ্ত হয়। ১৭০১ থেকে ১৭১৪ পর্যন্ত স্পেনের সঙ্গে যুদ্ধ হয় এবং ১৭৫৬ থেকে ১৭৬৩ পর্যন্ত ফ্রান্সের সঙ্গে সাত বছরের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই সমস্ত যুদ্ধের ফলে ভারতে এবং উত্তর আমেরিকায় ইংল্যাণ্ডের শক্তি আরো বৃদ্ধি পায়। উত্তর আমেরিকাতে ফরাসিগণ কানাডাকে ইংল্যাণ্ডের হাতে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।

কিন্তু আমেরিকাতে এই বিজয় ইংল্যাণ্ডের শাসকদের জন্যে নতুন সংকটেরও সৃষ্টি করে। পঞ্চদশ শতকের শেষ দিকে (১৪৯২) কলাম্বাসের আমেরিকা সন্ধান লাভের পর থেকেই ইউরোপের বিভিন্ন রাষ্ট্রের নানা ধরনের অধিবাসী ধনরত্নের আশায় আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকাতে আগমন করতে থাকে। ইউরোপীয়দের এই আগমন ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে বিরাট স্রোতের আকার ধারণ করে। এই সমস্ত অভিযানকারীগণ আমেরিকার আদি অধিবাসীদের তুলনায় মারণাস্ত্র এবং অন্যান্য কলাকৌশল অধিকতর উন্নত ও শক্তিশালী ছিল। বিশাল আমেরিকার বিপুল অংশ তখনো অনাবাদী অবস্থাতে ছিল। ইউরোপীয় অভিযাত্রীগণ একদিকে আমেরিকার আদি অধিবাসীগণকে ধ্বংস করে, অপরদিকে অনধ্যুষিত অঞ্চলসমূহ দখল এবং আবাদ করে ইউরোপীয় উপনিবেশ বা বসতি স্থাপন করতে থাকে।

অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগেই আটলান্টিক উপকূলব্যাপী ইংরেজদের উপনিবেশ বিরাট আকার ধারণ করে। ফ্রান্সের সঙ্গে যুদ্ধের ফলে কানাডা লাভের ফলে এই উপনিবেশ আরো বৃদ্ধি পায়। এই সকল উপনিবেশের ইউরোপীয় অধিবাসীদের সংখ্যা এই সময়ের মধ্যে ত্রিশ লক্ষে পৌছে যায়। এই উপনিবেশের অধিবাসীগণ এখন আর ইউরোপ থেকে আগত কোনো অস্থায়ী বাসিন্দা নয়। এখন এরা নিজেদেরকে আমেরিকার অধিবাসী বলে গণ্য করে নিজেদেরকে ‘আমেরিকান’ বলে ঘোষণা করতে শুরু করে।

আমেরিকায় সমস্ত উপনিবেশবাসীদের সাধারণ স্বার্থের সঙ্গে তাদের মূলদেশ ইংল্যান্ডের শাসকদের শাসন ব্যবস্থা ও স্বার্থের বিরোধ ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে থাকে। ইংল্যাণ্ডের পার্লামেন্টে রচিত শাসনবিধি দ্বারা ইংল্যাণ্ডের রাজা আমেরিকার উপনিবেশগুলিকেও শাসন করত। পার্লামেন্টে আমেরিকার উপনিবেশের কোনো প্রতিনিধিত্ব ছিল না। উপনিবেশের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিগণ পূর্ব থেকেই ইংল্যাণ্ডের এই শাসনবিধির প্রতি সন্তুষ্ট ছিল না। কিন্তু ইংল্যাণ্ডের সরকারের বিরুদ্ধে কোনো বিদ্রোহাত্মক আন্দোলন ইংল্যাণ্ড ও ফ্রান্সের মধ্যকার সাত বছরের যুদ্ধের পূর্বে তেমন পরিচালিত হয় নি। তার একটা কারণ ছিল, ফ্রান্স সম্পর্কে উপনিবেশের অধিবাসীদের ভয়। ইংল্যাণ্ডের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে স্বাধীন হতে গেলে, কানাডা থেকে ফরাসিরা তাদের আক্রমণ করতে পারে। কিন্তু সাত বছরের যুদ্ধে ফ্রান্সের পরাজয় এবং কানাডা ইংরেজ উপনিবেশের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় আমেরিকার অধিবাসীদের সে ভয় এবার দূর হলো।

ইংল্যাণ্ড পার্লামেন্ট এবার যখন পুরোনো কায়দায় আমেরিকার উপনিবেশগুলির উপর ট্যাক্স ধার্যের আইন পাশ করতে লাগল, উপনিবেশের অধিবাসীদের নিজস্ব শিল্প ও বাণিজ্য প্রচেষ্টায় বিভিন্ন প্রকার বাধা নিষেধ আরোপ করে চলল তখন উত্তর আমেরিকার এই সমস্ত ইংরেজ উপনিবেশের অধিবাসীগণ বিদ্রোহাত্মক মনোভাব দেখাতে শুরু করল। এই সময়েই আমেরিকানগণ একটি উল্লেখযোগ্য সংগ্রাম ধ্বনি উচ্চারণ করে ‘নো ট্যাকসেশন উইদআউট রিপ্রেজেন্টেশন : প্রতিনিধি নাই, তো ট্যাক্স নাই’ (১৭৬৭)। তারা সরকারের কর দিতে অস্বীকার করতে শুরু করল। ইংরেজ সরকার এর পাল্টা দণ্ডমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করলে উপনিবেশবাসীরা ইংল্যাণ্ডের প্রেরিত চা এবং অন্যান্য দ্রব্য বর্জন করার আন্দোলন শুরু করে (১৭৭৪)। ইংরেজ সরকার তার প্রতিক্রিয়ায় আমেরিকার বাণিজ্য নৌযানগুলিকে সমুদ্রপথে অবরোধ করে। এর জবাবে আমেরিকার উপনিবেশগুলি বিদ্রোহ ঘোষণা করে।

১৭৭৪ সালে আমেরিকানগণ সশস্ত্রভাবে সরকারের সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে রত হয়। ১৭৭৫ সনে লেকসিংটনে এক যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধে সামান্য রাইফেলধারী কিছু আমেরিকানদের কাছে ব্রিটিশ সৈন্য ক্ষয়ক্ষতি ভোগ করে পশ্চাদপসরণ করতে বাধ্য হয়। ১৭৭৫-এর মে মাসে বিদ্রোহী উপনিবেশগুলির প্রতিনিধিদের এক সম্মেলন ফিলাডেলফিয়াতে আহূত হয়। এই সম্মেলনে ইংল্যাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করে জর্জ ওয়াশিংটনের (১৭৩২-১৭৯৯) অধিনায়কত্বে এক আমেরিকান বাহিনী গঠন করা হয়। ফিলাডেলফিয়ার সম্মেলন ১৭৭৬-এর জুলাই ৪ তারিখে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র গ্রহণ করে এবং আমেরিকার ইংরেজ উপনিবেশগুলি নিজেদের ‘দি আমেরিকান স্টেটস’ বা আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র (ইউ.এস.এ.) হিসাবে ঘোষণা করে। ইতিহাসে এই ঘোষণা স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেছে।

এই ঘোষণাপত্রের রচয়িতা ছিলেন টমাস জেফারসন (১৭৪৩-১৮২৬)। এই ঘোষণার পরে ইংল্যাণ্ডের সঙ্গে তীব্র যুদ্ধ শুরু হয়। গোড়ার দিকে ইংল্যাণ্ডের শক্তিশালী বাহিনীর বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের বাহিনী টিকে থাকতে অক্ষম হয়। ইংরেজ সৈন্য আমেরিকানদের হাত থেকে নিউইয়র্ক দখল করে।

স্বাধীনতার ঘোষণা ইংল্যাণ্ডের শাসনের বিরুদ্ধে আমেরিকার উপনিবেশসমূহ ১৭৭৬ সনে ৪ জুলাই তারিখে যে ঘোষণা দ্বারা স্বাধীনতার কথা উচ্চারণ করে তা ইতিহাসে স্বাধীনতার ঘোষণা তথা আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণা নামে খ্যাতি লাভ করেছে। ঘোষণাটির মধ্যে টমাস জেফারসন, বেনজামিন ফ্রাঙ্কলিন প্রভৃতি প্রখ্যাত চিন্তাবিদ ও রাজনীতিকগণ স্বাধীনতার যে যুক্তি উল্লেখ করেন সে যুক্তি মানুষের রাষ্ট্র ও শাসনব্যবস্থার মৌলিক অধিকার তত্ত্বের তাৎপর্যে পূর্ণ। এই ঘোষণার মধ্যে দার্শনিক লকের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘টু ট্রিটিজেস অন সিভিল গভর্নমেন্ট বা শাসনব্যবস্থার উপর দুটি নিবন্ধের গভীর প্রভাবের পরিচয় পাওয়া যায়। ‘আমেরিকার তেরটি যুক্তরাষ্ট্রের সর্বসম্মত ঘোষণা শিরোনামে উচ্চারিত ঘোষণার মুখবন্ধে বলা হয় : ইতিহাসের গতিপথে যখন একটি জনসমষ্টির জন্য অনিবার্যরূপে প্রয়োজন হয়ে পড়ে অপর একটি জনসমষ্টির সঙ্গে সম্পর্ক ছেদন করে প্রকৃতি এবং বিধির প্রদত্ত মানুষের সার্বভৌম এবং সমঅধিকারকে স্থাপন করার, তখন সেই সম্পর্ক ছেদনের যুক্তিকে প্রকাশিত করারও প্রয়োজন উপস্থিত হয়। সেই প্রয়োজনের বোধ থেকে আমরা ঘোষণা করছি পৃথিবীর সকল মানুষ জন্মগতভাবে সমান এবং বিধাতা কতিপয় অবিচ্ছেদ্য অধিকারে ভূষিত করে মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। এবং এই অধিকারের অন্তর্গত হচ্ছে জীবন, স্বাধীনতা এবং সুখের অর্জন। মানুষের জীবন, স্বাধীনতা এবং সুখের নিশ্চয়তা বিধানের জন্য গঠিত হয় সরকার। এবং এই সরকার তথা শাসকের ন্যায়সঙ্গত ক্ষমতার উৎস হচ্ছে রাষ্ট্রের শাসিত তথা জনসাধারণ। এবং সেই কারণেই যখন কোনো সরকার শাসিতের এই মৌলিক অধিকারসমূহের ধ্বংসকারী হয়ে দাঁড়ায় তখন জনসাধারণের অধিকার থাকে সেই সরকারকে বিলুপ্ত কিংবা পরিবর্তিত করে নতুন সরকার গঠিত করার ।

আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ফরাসি বিপ্লবের চিন্তাবিদদের বিপুলভাবে অনুপ্রাণিত। করেছিল। এখনও যুক্তরাষ্ট্রে ৪ জুলাইকে সাধারণ ছুটির মাধ্যমে স্বাধীনতা ঘোষণার দিবস হিসাবে পালন করা হয়।

ক্রমান্বয়ে আমেরিকার এই স্বাধীনতা যুদ্ধ আন্তর্জাতিক যুদ্ধের রূপ গ্রহণ করে। স্বাধীনতাকামী যুদ্ধরত আমেরিকানগণ ফ্রান্স ও স্পেনের সাহায্য কামনা করে। ফরাসি জনমত তো বটেই, ফরাসি সরকারও এই সুযোগে ইংরেজ সরকারের বিরোধিতা করে আমেরিকানদের অস্ত্র ও সৈন্য দিয়ে সাহায্য করতে অগ্রসর হয়। স্পেনও সাত সাগরের একচ্ছত্র অধিপতি ইংল্যাণ্ডকে আঘাত করার এই সুযোগ গ্রহণে পিছিয়ে থাকলো না। স্বাধীনতাকামী আমেরিকানদের পক্ষে ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে এবার একটি আন্তর্জাতিক জোট তৈরি হয়ে গেল। এই জোটের আঘাতের মুখে ইংরেজশক্তি আর টিকতে সক্ষম হলো।

তারা ইয়র্ক টাউনের যুদ্ধে ফরাসি ও আমেরিকানদের নিকট পরাজয় স্বীকার করে আমেরিকার উপনিবেশজোটের স্বাধীনতা মেনে নিতে বাধ্য হলো (১৭৮১)।

আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ ছিল স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে স্বাধীনতাকামী মানুষের যুদ্ধ। এই যুদ্ধ ইংল্যাণ্ড, ফ্রান্স ও ইউরোপের অন্যান্য দেশের প্রগতিশীল ও গণতন্ত্রমনা চিন্তাবিদদের মধ্যে বিপুল আলোড়নের সৃষ্টি করেছিল। আমেরিকার সৈন্যগণকে ইংল্যাণ্ডের সাধারণ মানুষ ‘স্বাধীনতার সন্তান’ বলে গণ্য করতে শুরু করে। ইংল্যাণ্ডের চিন্তাবিদ সেইন্ট সাইমন এবং পোলারে স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা যোসিসকোসহ অনেক প্রগতিশীল ব্যক্তি আমেরিকার স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য সমুদ্র পাড়ি দিয়ে আমেরিকাতে উপস্থিত হন। ১৭৮৯ সনের ঐতিহাসিক ফরাসি বিপ্লব সংঘটনের ক্ষেত্রে আমেরিকার স্বাধীনতাযুদ্ধ বিরাট অনুপ্রেরণার উৎস হিসাবে কাজ করেছিল।

তথ্যসূত্র:

১. সরদার ফজলুল করিম; দর্শনকোষ; প্যাপিরাস, ঢাকা; জুলাই, ২০০৬; পৃষ্ঠা ৪৭-৪৯।

আরো পড়ুন

জন্ম ৮ জানুয়ারি ১৯৮৯। বাংলাদেশের ময়মনসিংহে আনন্দমোহন কলেজ থেকে বিএ সম্মান ও এমএ পাশ করেছেন।

তাঁর প্রকাশিত প্রথম কবিতাগ্রন্থ স্বপ্নের পাখিরা ওড়ে যৌথ খামারে । বিভিন্ন সাময়িকীতে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া শিক্ষা জীবনের বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে রোদ্দুরে ডট কমের সম্পাদক।






Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *