Main Menu

শিল্প ও সততা

১৯৬১ সালে ‘কানে’ চিত্র সাংবাদিকরা মিকেলেঞ্জেলো আন্তোনিওনিকে তার ছবি সম্বন্ধে কিছু বলতে বলেছিলেন। তাতে তিনি যে উক্তি করেছিলেন তার মর্মার্থ মোটামুটি দাঁড়ায় এই :- ছবি করার গোড়ার শর্ত হচ্ছে সততা। নিজের অনুভূতি এবং উপলব্ধির সৎপ্রকাশ। ক্যামেরায় যে মিথ্যা কথা বলার মারাত্মক ক্ষমতা আছে, তা রীতিমতো ভীতিকর। কারণ মিথ্যাকে সত্য বলে চালাতে ক্যামেরা যত পারে তত আর কিছুই পারে না।

আন্তোনিওনির কোনো ছবি এ দেশে আসেনি, কাজেই তার কথায় এবং কর্মের মিলের ব্যাপারটা যাচাই করে নেওয়া এদেশে আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু তার ঐ উপরোক্ত মন্তব্যগুলি শুনে আমাকে তাকে হঠাৎ পরমাত্মীয় বলে মনে হলো।

এই গভীরতম সত্যটি সচরাচর কেউ স্পষ্ট ভাষায় বলে না বলেই কথাগুলো আমার কাছে চমকপ্রদ বলে মনে হয়েছে।

কথাটা হচ্ছে সর্বশিল্পকর্মেরই সত্যকারের শিল্প পদবাচ্য হতে হলে, সর্বপ্রথমে হতে হবে সত্যবাদী। এই হচ্ছে শিল্প বিচারের দৃঢ়তম মানদণ্ড এবং যুগ যুগ ধরে স্বীকৃত।

যুগে যুগে সত্যের সংজ্ঞা পালটিয়েছে কিন্তু আপেক্ষিক ভাবে এই মানদণ্ড থেকেই গেছে।

মিথ্যা শিল্পাভিমানী যে সৃষ্টিকর্ম, তা যতই মনোহারী হোক, তাকে কঠোরভাবে বর্জনের অবকাশ আছে। বুজরুকি আর ধোঁকাবাজি, অথবা আপাত সত্যের প্রলেপে ঢাকা মিথ্যাচরণ, একে ক্ষমা করার কোনো প্রশ্নই উঠতে পারে না। তার মানে এই নয় যে সত্যবাদী হলেই মহৎ শিল্প হবে। তার মানে শুধু এই, মহৎ শিল্প হলে সে সত্যবাদী হবেই। অর্থাৎ সত্যের ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে নন্দন-তত্ত্বগত একটা উৎকর্ষে উত্তীর্ণ হতে পারলে তবেই মহৎ শিল্প জন্মায়।

এখন এই যে সত্য দৃষ্টি, সর্ব শিল্পের ক্ষেত্রেই সেটা হচ্ছে ব্যক্তিগত শিল্পীর নিজস্ব অর্জিত উপলব্ধির যোগফল। অর্থাৎ শিল্পী বাস্তবের কোনো একটা অংশের কোনো একটা কর্মকাণ্ডের অস্তিত্বের প্রতি নিজের সমগ্র ধীশক্তি পরিচালিত করে দিয়েছেন এবং সেখানে কোনো ঠিক বা ভুল, কোনো পাপ বা পুণ্য তার মনে প্রচণ্ড আবেগ সঞ্চারিত করে দিয়েছে। সেই আবেগসঞ্জাত প্রকাশবাসনা থেকেই জন্মগ্রহণ করে শিল্প। তার প্রকাশভঙ্গি শিল্পীর বিলম্বিত মেজাজ অনুসারে যে-কোনো পথ অনুসরণ করতে পারে। লোকে ছাপার অক্ষর কিছু দেখলে সঙ্গে সঙ্গে দ্বিধাহীন ভাবে বিশ্বাস করে নিত- যেমন খবরের কাগজে কোনো উল্লিখিত ঘটনা। ক্যামেরাতে তেমনি চারপাশের বাস্তবের মাঝখানে খানিকটা অবাস্তবকে খাটি মাল বলে চালিয়ে দেওয়া যায়।  

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় ডাঃ গোয়েবেলসের নির্দেশে জার্মানির শ্রেষ্ঠ কারিগররা নিউজ রীল তৈরি করত। তার মধ্যে সবচেয়ে বড়ো যেটা, সেটির একটি কপি যুদ্ধের পরে মিত্রশক্তির হাতে আসে। পরে যখন সেটা বিশ্লেষণ করে দেখা হয়, তখন দেখা যায় কী অসীম ধূর্ততার সঙ্গে সত্যি ঘটনা এবং ডাহা মিথ্যে মশলা একত্রে সাজিয়ে প্রচণ্ড শক্তিশালী এই ডকুমেন্টারিটি তৈরি করা হয়েছিল। যুদ্ধের মধ্যে সমগ্র জার্মান জাতির মনে যে অভাবনীয় উদ্দীপনা এবং ঘৃণার সৃষ্টি করেছিল এ ছবি, তার দাম দিতে হয়েছিল বোধ হয় সেই সর্বধ্বংসী যুদ্ধের পুরো একটি বছরের বাড়তি ধ্বংসলীলায়।

এটা একটা extreme। কিন্তু এই প্রকারের ঘটনা আকছার ঘটে চলেছে ছবির জগতে। চোখ যা দেখে, তাকেই বিশ্বাস করে নেওয়া হচ্ছে মানুষের একটা স্বাভাবিক প্রবণতা।

আর-একটা মারাত্মক ব্যাপার হচ্ছে চলচ্চিত্র নির্মাণের পদ্ধতিটা সাধারণের কাছে রহস্যময়। তাই বহু মেমকিকে না বাজিয়ে বাজারে চালিয়ে দেওয়া যায়।

যেমন ধরুন, বহু নেতিবাচক ব্যাপার। স্টুডিওতে ছবি তুলব না, সত্যিকারের মাঠে-ঘাটে গিয়ে তুলব। যেটুকু স্টুডিওতে তুলব, সেটা যেন সেট বলে মনে না হয়। আজকাল মেকআপ ব্যবহার না করা ফ্যাসন হয়েছে, কাজেই ওটা ব্যবহার করবো না। চিবিয়ে চিবিয়ে কথা বলিয়ে অভিনেতাদের শুধু behave করাবো, act করতে দেব না। emotion-এর প্রকাশ করতে গেলেই melodrama হয়ে যাবার ভয়, কাজেই সাধুজনের মতন cultured হব। ইত্যাদি ইত্যাদি।

এ-সবই জীবনকে সঠিকভাবে ধরতে গেলে প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু তাতে ইতিবাচক প্রধান ব্যাপারটিকেও লাগে। শুধু এই ধরনের সংস্কৃতিবানতা আদি এবং অন্তহীন ভাবে বুজরুকি মাত্র। জোচ্চুরি।

আমাদের দেশের কথা ভাবতে গেলে, বিশেষ করে এই সব কথাগুলিই মনে হয়, জীবনের কাছে যাওয়া, তাকে কঠিন ভাবে ভালোবাসা অথবা পবিত্রভাবে ঘৃণা করা, ছবির জন্য ছবি করা নয়- প্রাণের জন্য ছবি করা এ যেন এদেশে ন (Gnu)র মতোই দুষ্প্রাপ্য জন্তু।

প্রাথমিক চিন্তা, প্রাথমিক ভাবে জীবনে কোনো-একটা ফলবান খণ্ডের সঙ্গে আত্মিক যোগাযোগ সৎভাবে নিজের উপলব্ধির গণ্ডির মধ্যে বিচরণ, ছবি করার এই আদি শর্তগুলোই বড়ো দুষ্কর হয়ে পড়েছে এদেশে খুঁজে বের করা। নতুন যারা আসছেন তাদের মধ্যেও সেই স্ফুলিঙ্গ দেখছি না।

তাই আমার মনে হয় আমরা এখনও বহু দূরে আছি। এখনও বোধ হয় অনেকটা পথ যাবার আছে। মাঝে মাঝে মনটা অবসাদে আচ্ছন্ন হয়ে যায়।

সেই সব সময়, হঠাৎ মেঘের ঝিলিক দিয়ে আন্তোনিওনির মতো মহৎ শিল্পীদের উক্তিগুলো হাতের কাছে আসে।

তারা নতুন করে বল দেয়।

টিকা:

১. ঋত্বিককুমার ঘটক; চলচ্চিত্র মানুষ এবং আরও কিছু দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা;  পুনর্মুদ্রণ নভেম্বর ২০১৫; পৃষ্ঠা ৯১-৯৩।

আরো পড়ুন

ঋত্বিক ঘটক (জন্ম : ৪ নভেম্বর, ১৯২৫ – মৃত্যু : ৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৬) একজন বিখ্যাত বাঙালি চলচ্চিত্র পরিচালক। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তাঁর নাম বহুবার বহুভাবে উচ্চারিত। তিনি পরিচালনা করেছেন নাগরিক (১৯৫২, মুক্তি ১৯৭৭), অযান্ত্রিক (১৯৫৮), বাড়ী থেকে পালিয়ে (১৯৫৮), মেঘে ঢাকা তারা (১৯৬০), কোমল গান্ধার (১৯৬১), সুবর্ণরেখা (১৯৬২), তিতাস একটি নদীর নাম (১৯৭৩), যুক্তি তক্কো আর গপ্পো (১৯৭৭) প্রভৃতি চলচ্চিত্র।






Related News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *