You cannot copy content of this page
আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > শিল্প > চলচ্চিত্র > চলচ্চিত্রের স্বরূপ কী?

চলচ্চিত্রের স্বরূপ কী?

ফরাসি ভাষায় “engage” বলে একটা কথা আছে। আমার মনে হয়, সর্ব শিল্পে সেইটিকে গ্রহণ করা উচিত। নিরালম্ব, বায়ুভূত শিল্প কখনাে শিল্পের পর্যায়ে ওঠে না। মানুষটিকে কোথাও না-কোথাও আত্মীকরণ করতে হয়। ভালাে না বাসলে শিল্প জন্মায় না। এর প্রকাশভঙ্গি বিভিন্ন প্রকারের হতে পারে, শিল্পীর মেজাজের উপর নির্ভর করে। কিন্তু মূল সূত্রটি সেই ‘সত্যম শিবম সুন্দরম’। ভালাে করে তাকিয়ে দেখুন, প্রথমে সত্য। সত্য সিদ্ধ না হলে কোনাে শিল্পই শিল্পের পর্যায়ে ওঠে না। এটা প্রথম কথা। শিবম কথাটা বাংলায় খুব প্রচারিত নয়, কথাটার মানে হচ্ছে, যা কিছু শাশ্বত। এখানে প্রশ্ন আসে যে, কী শাশ্বত?

সেইটাই শাশ্বত, যেটা আপনি আপনার দুঃখ দিয়ে অর্জন করেছেন। শাশ্বত হচ্ছে সেই জিনিসগুলাে, যেগুলাে আপনি আপনার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে খুঁজে পেয়েছেন। রবীন্দ্রনাথের ‘দুঃখ’ বলে নিবন্ধটি আপনারা যদি পড়ে দেখেন তা হলে এ কথার মানে বােধ হয় খুঁজে পাবেন। ওই ভদ্রলােক এই ব্যাপারটার গভীরে অনুপ্রবিষ্ট হয়েছিলেন, এবং ব্যাপারটাকে বােধ হয় অনুধাবন করতে পেয়েছিলেন।

সুন্দর। এর কোনাে সংজ্ঞা নেই। এটা সম্পূর্ণ আপনার রুচির উপর নির্ভরশীল। সৌন্দর্যের কোনাে মান নেই। দেশে দেশে, কালে কালে, সৌন্দর্যের মান বিবর্তিত হয়েছে, কিন্তু সত্য এবং শিবকে অস্বীকার করে যে সুন্দর দাঁড়ায় তাকে ঘৃণা করা ছাড়া আর কিছু করার নেই।

এই কথাগুলাে মনে রাখলে ছবি সম্পর্কেও খানিকটা ভাবনা-চিন্তা করা চলে। কারণ, ছবিকেও আজকাল শিল্প বলে মানা হচ্ছে।

ছবিকে শিল্প বলা যায় কি না, সে বিষয়ে আমার ঘােরতর সন্দেহ আছে। তবে, যদি শিল্প বলে গ্রহণ করা হয়, তা হলে, এর প্রতি এই রূপ প্রয়ােগ করার একটা প্রশ্ন দেখা যায়। সেদিক থেকে, এ দেশের কথা আমি আর তুলব না, বিদেশেও খুব মাঝে মাঝে চমকপ্রদ কিছু দেখা যায়। যেমন ধরুন, ওজু-র ছবি। বা ধরুন বুনুএল-এর ছবি। এরকম দু-একজন ভদ্রলােকের কাজকর্ম দেখে আমাদের মনে হয়, আমরা এখনও মরে যাই নি, এখনও কিছু সত্যিকারের শিল্পী বেঁচে আছেন। এদের মধ্যে দিয়েই আমরা বাঁচছি।

আরো পড়ুন:  আর্ট ফিল্ম ও কমার্শিয়াল ফিল্ম প্রসঙ্গে--সন্দীপন চক্রবর্তী

কিছুদিন আগে Julia Ylintsova-র ‘Story of the Flaming Years’ দেখলাম। ইনি দভচেঙ্কো-র স্ত্রী। ধেড়িয়েছেন। সমস্ত ব্যাপারটাই ধরতে পারেন নি। ধেড়িয়েছেন। সেইখানে আন্দ্রেই তারকোভস্কি-র ‘Childhood of Ivan’ দেখা গেল, সমস্ত প্রাণ পরিতৃপ্ত হয়ে গেল। এই ছেলেটি দভচেঙ্কো-র সমস্ত Tradition-টাকে বহন করে নিয়ে চলেছে এবং ভগবান করুন এ যেন সত্যি দাঁড়াতে পারে। এইগুলাে মাঝে মাঝে চমক দেবার চেহারা করে আসে। এত ভালাে লাগে, এত ভালােবাসতে ইচ্ছে করে যে, আপনাকে বলে বােঝানাে হয়তাে সম্ভবপর নয়।

Lindsay Anderson-এর ছবি ‘A Sporting Life’ দেখা গেল, যে ছেলেটা Great Britain-এ বসেও কিছু কাজের কাজ করে ফেলেছে। Carol Reisz-এর ‘Lambeth Boys’ দেখা গেল, অনেক নাচানাচি সত্ত্বেও ব্যাপারটা কিন্তু জমে নি।

Mary Clerks-এর ‘The Connection’ দেখা গেল, ওটা হচ্ছে কতগুলাে Drug addicts-দের উপরে তােলা ছবি, নাকি সত্যিকারের ওই ধরনেব ব্যক্তিদের না জানিয়ে তাদের উপরে তােলা হয়েছিল। এরা নাকি প্রতিদিন Marizuna shot নিত, অর্থাৎ injection গ্রহণ করত। পুরাে ছবিটি হচ্ছে যে এই লােকগুলাে এই ধরনের গণ্ডগােলের মধ্যে বিনষ্ট হয়েছিল কিন্তু ছবিতে এর কোনােই বহিঃপ্রকাশ দেখা দেয় নি।

Lionel Rogosin, ভদ্রলােক কিছুদিন আগে কলকাতায় এসেছিলেন, ওঁর ছবি ‘Come Back, Africa’ — এটা নিয়ে অনেক নাচানাচি করা হয়েছে। মাল কিন্তু জমে নি। Congo-র lumumba-এর মৃত্যুর পরে Negro-দের সমস্যা এবং তার সঙ্গে USA এর Negro-দের মিলনের যে চেষ্টা করা হয়েছে সেটা শেষ অবধি একটা হাস্যকর পরিণতিতে পৌঁছেছে। ওভাবে Amerca-র Negro সমস্যার সমাধান হবার নয়।

Poland; আন্দ্রে ভাইদা কাজ করতে পারছেন না, তাঁকে কাজ করতে দেয়া হচ্ছে না। আন্দ্রে মুংক হঠাৎ একটা দুর্ঘটনায় মারা গেল। রােমান পােলানস্কি এই একটা Neo-Existentialism-এর মধ্যে ঢুকে বসে আছে। আমি মনে করি, এঁকে দিয়ে আর কোনাে মাল বেরুবে না। জাঁ পল সার্ত-এর অক্ষম একটা অনুকরণ করার চেষ্টা আজকের Poland-এর ছবিগুলাের চালিয়াতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওঁদের দ্বারা আর কোনাে কর্ম হবে বলে বর্তমানে মনে হয় না।

আরো পড়ুন:  মার্কসবাদ প্রলেতারিয়েতের শ্রেণিসংগ্রামের হাতিয়ার

ভারতবর্ষের কথা তুলে লাভ নেই। দু-একজন লােক যাঁরা কিছু করতে পারতেন, তাদের মধ্যে কেউ কেউ C.I.A.-এর কাছে বিক্রি হয়ে গিয়েছেন। আর বাকিরা হয় অকর্মণ্য আছেন আর নইলে উল্টোপাল্টা যা-তা সব করছেন। কাজেই তাদের সম্পর্কে আলােচনা যত কম করা যায় ততই ভালাে।

আমি দুঃখিত যে ভালাে কথা খুব বেশি বলতে পারলাম না, তবে ‘মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানাে পাপ’, রবিবাবুর এই কথাটা আমি মনপ্রাণ দিয়ে বিশ্বাস করি। ভদ্রলােক কিছু ঠিকঠাক কথাবার্তা বলে গিয়েছিলেন। এবং সে কথাকে তিনি নিজের জীবন-যন্ত্রণার মধ্য থেকে উৎসারিত করেছিলেন। সেইটেই আমাদেরকে এখানে খানিকটা পরিমাণে প্রেরণা দিচ্ছে।

মুখে বললে আমাদের মুখের ভাষাও হারিয়ে যাবে। 

বাংলা ভাষায়, যে ভাষায় আমরা এখন কথা বলি, সে ভাষার পথ দিয়েছেন তিনি। ওঁকে প্রণাম।

টিকা:
১. ঋত্বিক ঘটকের এই লেখাটি নেয়া হয়েছে ঋত্বিককুমার ঘটক; চলচ্চিত্র মানুষ এবং আরও কিছু দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা;  পুনর্মুদ্রণ নভেম্বর ২০১৫; পৃষ্ঠা ৮৭-৮৯ থেকে।

ঋত্বিক ঘটক
ঋত্বিক ঘটক (জন্ম : ৪ নভেম্বর, ১৯২৫ - মৃত্যু : ৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৬) একজন বিখ্যাত বাঙালি চলচ্চিত্র পরিচালক। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তাঁর নাম বহুবার বহুভাবে উচ্চারিত। তিনি পরিচালনা করেছেন নাগরিক (১৯৫২, মুক্তি ১৯৭৭), অযান্ত্রিক (১৯৫৮), বাড়ী থেকে পালিয়ে (১৯৫৮), মেঘে ঢাকা তারা (১৯৬০) কোমল গান্ধার (১৯৬১), সুবর্ণরেখা (১৯৬২), তিতাস একটি নদীর নাম (১৯৭৩), যুক্তি তক্কো আর গপ্পো (১৯৭৭) প্রভৃতি চলচ্চিত্র।

Leave a Reply

Top