You cannot copy content of this page
আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > বাংলাদেশ > ধ্রুপদী বাংলার ইতিহাস

ধ্রুপদী বাংলার ইতিহাস

প্রাচীন বাংলার সবচেয়ে শক্তিশালী ও প্রাচীন জাতি পুরা আর্যসভ্যতার বহুপূর্বেই এই অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছিলাে। পুণ্ড্রদের নামানুসারেই এই দেশের নাম হয় পুণ্ড্রদেশ। কোনাে কোনাে শাস্ত্রীয় যুগে পুণ্ড্রদের অসুর বলে চিহ্নিত করা হয়। কালের পরিক্রমায় পুরা আর্য-সংস্কৃতি গ্রহণ করতে থাকে। মৌর্য শাসন কালে পুণ্ড্রদেশ ঐশ্বর্যপূর্ণ স্থানে পরিণত হয়। মৌর্য শাসনের পূর্বেই দূর্গ নগরী পুণ্ড্রনগর প্রতিষ্ঠিত হলেও মৌর্য যুগেই পুণ্ড্রনগর বা পুণ্ড্রদেশের রাজধানী স্থাপিত হয়। প্রাচীন ভারতের মৌর্য সাম্রাজ্য যে উত্তরীয় দেশ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিলাে তার যথেষ্ট প্রমাণ ঐতিহাসিকরা খুঁজে পান। করতােয়া নদীর বিশাল জলপ্রবাহ পুণ্ড্রনগরকে সুজলাসুফলা করে তুলেছিলাে।

গুপ্ত শাসনামলেই প্রধান শাসনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছিলাে কোটিবর্ষ নগরী। ভারতীয় ইতিহাসে গুপ্তযুগকে সুর্বণযুগ বলা হয়। এই সময়েই ভারতীয় ধর্ম, দর্শন, শিল্প, চিকিৎসাবিদ্যা, বিজ্ঞান, গণিত, জ্যোতিষশাস্ত্র ও সাহিত্য অভূতপূর্ব প্রসার লাভ করেছিলাে। এই গুপ্তযুগেই আর্থিক কাঠামাের মূল বুনিয়াদ ছিলাে কৃষি, শিল্পবাণিজ্য এবং ব্রাহ্মণ্যধর্মের নবজাগরণ। সমাজে ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর এই ত্রি-মূর্তির পূজার প্রচলন শুরু হয়। এই সময়েই বৈষ্ণব, শৈব ও শাক্ত ধর্মের স্ফুরণ ও তান্ত্রিক সম্প্রদায়ের প্রাধান্য বেড়ে যায়। বুদ্ধদেবকে গুপ্তযুগে হিন্দুরা অন্যতম অবতার হিসেবে গ্রহণ করে এবং তার মূর্তি পূজার প্রচলন শুরু করে। এর ফলে দেখা যায় হিন্দুধর্ম হলাে পৌরাণিক ধর্ম; যার মধ্যে আর্য ও অনার্য ধর্মের সম্মেলন ঘটেছে।

গুপ্তশাসনের পতনের পর উত্তরবঙ্গ বিদেশি আক্রমণের লক্ষ্য হয়ে উঠে। এই সময় গুপ্তবংশের নামে একটা অংশ উপাধিধারী রাজার সাম্রাজ্যের একটা অংশ অধিকার করেন। খ্রিস্টীয় ৬ষ্ঠ শতকের শেষের দিকে বঙ্গদেশের এই অঞ্চল গৌড় নামেই প্রসিদ্ধ লাভ করে। গুপ্ত রাজাদের অধীনে গৌড় একটা গুরুত্বপূর্ণ জনপদ রূপে পরিচিত লাভ করে। কিছুদিনের ভেতরে পরাক্রান্ত রাজা ঈশান বর্মা গৌড়রাজ দখল করে উত্তরবঙ্গে মৌখরি বংশ প্রতিষ্ঠা করেন। তবে মৌখরি বংশের ক্ষমতা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। কারণ অল্প কিছুদিনের মধ্যে গুপ্তরাজ কুমারগুপ্ত ঈশান বর্মাকে যুদ্ধে পরাজিত করেন এবং কুমার গুপ্তের পুত্র দামােদর গুপ্ত মৌখরিদের সম্পূর্ণরূপে পরাজিত করে হারানাে সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধার করেন। তবে গুপ্ত রাজাদের শাসনও বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। কারণ প্রতিনিয়ত তাদেরকে কোথাও না কোথাও কারাের সাথে যুদ্ধে করতে হয়েছে। ফলে তাদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও অর্থনৈতিক অবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে।

চারদিক থেকে আক্রমণের ফলে গুপ্ত রাজারা ক্লান্ত ও দুর্বল হয়ে যায়। সেই সুযােগে ৬০৬ অব্দে গৌড় দেশে শশাঙ্ক নামের একজন পরাক্রমশালী রাজা আক্রমণ করে গুপ্ত রাজাদের পরাজিত করে একটা স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। মুর্শিদাবাদের কর্ণ-সুবর্ণে তিনি রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেন। আবার অনেকের ধারণা শশাঙ্কের দ্বিতীয় রাজধানী ছিলাে উত্তরবঙ্গের পুণ্ড্রবর্ধন। শশাঙ্কই ছিলেন প্রথম বাঙ্গালি; যিনি বঙ্গদেশের বাইরে সাম্রাজ্য বিস্তারের সক্ষম হয়েছিলেন। পূর্বে বাঙালির এতাে বড় রাজ্য ছিলে না। (১) সমতট (২) গৌড় (৩) পুণ্ডু (৪) তাম্রলিপ্তি ও (৫) বঙ্গ নামেই রাজ্যগুলো পরিচিত ছিলো। একমাত্র সমতট ব্যতিত রাজা শশাঙ্কের রাজ্যের সবকটি অন্তর্ভুক্ত ছিলাে। এ থেকে প্রমাণিত করা যায় যে ঠাকুরগাঁও অঞ্চলও রাজা শশাঙ্কর রাজ্যের অধীনে ছিলাে।

শশাঙ্কের মৃত্যুর পর কিছুদিন তার পুত্র রাজপুত্র মানব স্বাধীন রাজ্য শাসন করেছেন। রাজা শশাঙ্কই ব্রাহ্মণ্য ধর্ম ও ব্রাহ্মণ্য কৃষ্টি বাংলায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি ছিলেন মূলত শিবভক্ত। তাঁর সময়কালে শিল্প-সংস্কৃতি ও ধর্ম প্রসার ঘটেছিলাে। শশাঙ্কের পুত্র মানবের রাজত্বকালে বৃহৎ সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ে। মানবের পরে গৌড় বা বঙ্গদেশে কে বা কারা শাসন করেছিলাে তা ইতিহাসবিদরা বের করতে পারেননি। মানবের পরে প্রায় ১০০ বছরের ইতিহাস অন্ধকারাচ্ছন্ন। এই ১০০ বছরের ইতিহাসকে ঐতিহাসিকরা অন্ধকার যুগ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

এই অন্ধকারময় যুগে বঙ্গদেশ বহিঃশত্রুর আক্রমণে একেবারে বিধ্বস্ত হয়ে যায়। যার ফলে উত্তরবঙ্গের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিনষ্ট হয়ে পড়ে। দেশের ভেতর অরাজকতা তৈরি হয় অর্থাৎ যে যেভাবে পারে সেভাবেই রাজ্য দখল করে লুণ্ঠন করতে থাকে। উত্তরবঙ্গসহ সারা বঙ্গে মাৎস্যন্যায় নামক এক অরাজক অবস্থার সৃষ্টি হয়। প্রায় ১০০ বছরের অন্ধকার যুগের অবসান ঘটান রাজা গােপাল। তিনি ধর্মে বৌদ্ধ ছিলেন। তিনি রাজ্য লাভের পর একটা শক্তিশালী রাজ্য প্রতিষ্ঠা করলেন।

তথ্যসূত্র:

১. অজয় কুমার রায়, ঠাকুরগাঁও জেলার ইতিহাস, টাঙ্গন, দ্বিতীয় সংস্করণ আগস্ট ২০১৮, ঢাকা, পৃষ্ঠা ১৫-১৬।

আরো পড়ুন:  অনুশীলন সমিতি ছিল বাংলার বিপ্লববাদী উপনিবেশবাদবিরোধী রাজনৈতিক সংগঠন
Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই “পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি” প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১০টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর “সমাজতন্ত্র” ও “মার্কসবাদ” গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন “বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা” নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top