You cannot copy content of this page
আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > বাংলাদেশ > বাংলার ইতিহাস প্রসঙ্গে

বাংলার ইতিহাস প্রসঙ্গে

প্রাচীন বাংলার সবচেয়ে শক্তিশালী ও প্রাচীন জাতি পুরা আর্যসভ্যতার বহুপূর্বেই এই অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছিলাে। পুণ্ড্রদের নামানুসারেই এই দেশের নাম হয় পুণ্ড্রদেশ। কোনাে কোনাে শাস্ত্রীয় যুগে পুণ্ড্রদের অসুর বলে চিহ্নিত করা হয়। কালের পরিক্রমায় পুরা আর্য-সংস্কৃতি গ্রহণ করতে থাকে। মৌর্য শাসন কালে পুণ্ড্রদেশ ঐশ্বর্যপূর্ণ স্থানে পরিণত হয়। মৌর্য শাসনের পূর্বেই দূর্গ নগরী পুণ্ড্রনগর প্রতিষ্ঠিত হলেও মৌর্য যুগেই পুণ্ড্রনগর বা পুণ্ড্রদেশের রাজধানী স্থাপিত হয়। প্রাচীন ভারতের মৌর্য সাম্রাজ্য যে উত্তরীয় দেশ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিলাে তার যথেষ্ট প্রমাণ ঐতিহাসিকরা খুঁজে পান। করতােয়া নদীর বিশাল জলপ্রবাহ পুণ্ড্রনগরকে সুজলাসুফলা করে তুলেছিলাে।

গুপ্ত শাসনামলেই প্রধান শাসনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছিলাে কোটিবর্ষ নগরী। ভারতীয় ইতিহাসে গুপ্তযুগকে সুর্বণযুগ বলা হয়। এই সময়েই ভারতীয় ধর্ম, দর্শন, শিল্প, চিকিৎসাবিদ্যা, বিজ্ঞান, গণিত, জ্যোতিষশাস্ত্র ও সাহিত্য অভূতপূর্ব প্রসার লাভ করেছিলাে। এই গুপ্তযুগেই আর্থিক কাঠামাের মূল বুনিয়াদ ছিলাে কৃষি, শিল্পবাণিজ্য এবং ব্রাহ্মণ্যধর্মের নবজাগরণ। সমাজে ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর এই ত্রি-মূর্তির পূজার প্রচলন শুরু হয়। এই সময়েই বৈষ্ণব, শৈব ও শাক্ত ধর্মের স্ফুরণ ও তান্ত্রিক সম্প্রদায়ের প্রাধান্য বেড়ে যায়। বুদ্ধদেবকে গুপ্তযুগে হিন্দুরা অন্যতম অবতার হিসেবে গ্রহণ করে এবং তার মূর্তি পূজার প্রচলন শুরু করে। এর ফলে দেখা যায় হিন্দুধর্ম হলাে পৌরাণিক ধর্ম; যার মধ্যে আর্য ও অনার্য ধর্মের সম্মেলন ঘটেছে।

গুপ্তশাসনের পতনের পর উত্তরবঙ্গ বিদেশি আক্রমণের লক্ষ্য হয়ে উঠে। এই সময় গুপ্তবংশের নামে একটা অংশ উপাধিধারী রাজার সাম্রাজ্যের একটা অংশ অধিকার করেন। খ্রিস্টীয় ৬ষ্ঠ শতকের শেষের দিকে বঙ্গদেশের এই অঞ্চল গৌড় নামেই প্রসিদ্ধ লাভ করে। গুপ্ত রাজাদের অধীনে গৌড় একটা গুরুত্বপূর্ণ জনপদ রূপে পরিচিত লাভ করে। কিছুদিনের ভেতরে পরাক্রান্ত রাজা ঈশান বর্মা গৌড়রাজ দখল করে উত্তরবঙ্গে মৌখরি বংশ প্রতিষ্ঠা করেন। তবে মৌখরি বংশের ক্ষমতা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। কারণ অল্প কিছুদিনের মধ্যে গুপ্তরাজ কুমারগুপ্ত ঈশান বর্মাকে যুদ্ধে পরাজিত করেন এবং কুমার গুপ্তের পুত্র দামােদর গুপ্ত মৌখরিদের সম্পূর্ণরূপে পরাজিত করে হারানাে সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধার করেন। তবে গুপ্ত রাজাদের শাসনও বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। কারণ প্রতিনিয়ত তাদেরকে কোথাও না কোথাও কারাের সাথে যুদ্ধে করতে হয়েছে। ফলে তাদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও অর্থনৈতিক অবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে।

চারদিক থেকে আক্রমণের ফলে গুপ্ত রাজারা ক্লান্ত ও দুর্বল হয়ে যায়। সেই সুযােগে ৬০৬ অব্দে গৌড় দেশে শশাঙ্ক নামের একজন পরাক্রমশালী রাজা আক্রমণ করে গুপ্ত রাজাদের পরাজিত করে একটা স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। মুর্শিদাবাদের কর্ণ-সুবর্ণে তিনি রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেন। আবার অনেকের ধারণা শশাঙ্কের দ্বিতীয় রাজধানী ছিলাে উত্তরবঙ্গের পুণ্ড্রবর্ধন। শশাঙ্কই ছিলেন প্রথম বাঙ্গালি; যিনি বঙ্গদেশের বাইরে সাম্রাজ্য বিস্তারের সক্ষম হয়েছিলেন। পূর্বে বাঙালির এতাে বড় রাজ্য ছিলে না। (১) সমতট (২) গৌড় (৩) পুণ্ডু (৪) তাম্রলিপ্তি ও (৫) বঙ্গ নামেই রাজ্যগুলো পরিচিত ছিলো। একমাত্র সমতট ব্যতিত রাজা শশাঙ্কের রাজ্যের সবকটি অন্তর্ভুক্ত ছিলাে। এ থেকে প্রমাণিত করা যায় যে ঠাকুরগাঁও অঞ্চলও রাজা শশাঙ্কর রাজ্যের অধীনে ছিলাে।

শশাঙ্কের মৃত্যুর পর কিছুদিন তার পুত্র রাজপুত্র মানব স্বাধীন রাজ্য শাসন করেছেন। রাজা শশাঙ্কই ব্রাহ্মণ্য ধর্ম ও ব্রাহ্মণ্য কৃষ্টি বাংলায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি ছিলেন মূলত শিবভক্ত। তাঁর সময়কালে শিল্প-সংস্কৃতি ও ধর্ম প্রসার ঘটেছিলাে। শশাঙ্কের পুত্র মানবের রাজত্বকালে বৃহৎ সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ে। মানবের পরে গৌড় বা বঙ্গদেশে কে বা কারা শাসন করেছিলাে তা ইতিহাসবিদরা বের করতে পারেননি। মানবের পরে প্রায় ১০০ বছরের ইতিহাস অন্ধকারাচ্ছন্ন। এই ১০০ বছরের ইতিহাসকে ঐতিহাসিকরা অন্ধকার যুগ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

এই অন্ধকারময় যুগে বঙ্গদেশ বহিঃশত্রুর আক্রমণে একেবারে বিধ্বস্ত হয়ে যায়। যার ফলে উত্তরবঙ্গের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিনষ্ট হয়ে পড়ে। দেশের ভেতর অরাজকতা তৈরি হয় অর্থাৎ যে যেভাবে পারে সেভাবেই রাজ্য দখল করে লুণ্ঠন করতে থাকে। উত্তরবঙ্গসহ সারা বঙ্গে মাৎস্যন্যায় নামক এক অরাজক অবস্থার সৃষ্টি হয়। প্রায় ১০০ বছরের অন্ধকার যুগের অবসান ঘটান রাজা গােপাল। তিনি ধর্মে বৌদ্ধ ছিলেন। তিনি রাজ্য লাভের পর একটা শক্তিশালী রাজ্য প্রতিষ্ঠা করলেন।

পাল আমলে বাংলা

উত্তবঙ্গের কোন অঞ্চলে গােপাল তাঁর রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তা এখনাে ঐতিহাসিকরা নিশ্চিত করে বলতে পারেননি। গােপালের উত্তর পুরুষদের তাম্রশাসন থেকে জানা যায় যে, তাঁর রাজ্য দক্ষিণে সমুদ্রতীর পর্যন্ত প্রসারিত ছিলাে। তবে উত্তর দিকে কতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিলাে তা কেউ বলতে পারেন না। সন্ধ্যাকর নন্দী তাঁর রামচরিত গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন- ‘বরেন্দ্রভূমি পাল রাজাদের আদিপুরুষদের ভূখণ্ড, সে কারণে বােঝা যায় বৃহত্তর দিনাজপুর জেলার কোনাে একটা অংশ রাজা গােপালের অধীনস্ত ছিলাে। তবে অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন রাজা গােপাল রাজধানী স্থাপন করেছিলেন দেবকোটে। যা বর্তমানে বানগড় নামে পরিচিত। পরবর্তী সময়ে পালরাজাদের একাধিক রাজধানী প্রতিষ্ঠিত হয়েছে পুণ্ড্রবর্ধন ও গৌড়ে। উপরােক্ত আলােচনা থেকেই বলা যায় পাল শাসনামলে ঠাকুরগাঁও অঞ্চল সামগ্রিক হােক কিংবা আংশিক হােক পাল রাজাদের অধীনে ছিলাে।

রাজা গােপালের মৃত্যুর পর তাঁর সতেরাে জন বংশধর বাংলাদেশে চারশত বছর রাজত্ব করেন। সুদীর্ঘ পাল শাসন এই বাংলার ইতিহাসের এক গৌরবময় যুগ। যাকে স্বর্ণযুগ বললেও ভুল হবে না। রাজা গােপালের পুত্র মহারাজাধিরাজ ধর্মপাল একজন দিগ্বিজয়ী নৃপতি ছিলেন। উত্তর ভারতের বিস্তৃত ভূখণ্ডে তিনি আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। গৌড় অধিপতি হিসেবে সমগ্র উত্তরবঙ্গ আপন রাজ্যধীন করেছিলেন। পাল নরপতি ধর্মপাল প্রায় চল্লিশ বছর রাজত্ব করেন। প্রজাকুল তাকে পরমসৌগত-মহারাজাধিরাজ উপাধি দিয়েছিলেন। ধর্মপালের পর তাঁর পুত্র দেবপাল শাসন ক্ষমতায় বসেন। দেবপাল ইতিহাস প্রসিদ্ধ। তিনি কলিঙ্গ ও কামরুপ রাজ্য জয়লাভ করেছিলেন। পিতার আদর্শে শাসন ক্ষমতা পরিচালনা করেন ৪০ বছর।

দেব পালের নামানুসারে তার রাজধানীর নাম হয় দেবকোট। দেবপালের সময়েও করতােয়া ও পুণ্ডভুক্তির সীমারেখা ছিল । দেবপালের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র মহেন্দ্রপাল রাজধানী স্থানান্তর করে টঙ্গিল নদীর তীরে। অর্থাৎ বর্তমানে টাঙ্গন নদের তীরে কুদ্দালখাতক নামক স্থানে। এই মহেন্দ্রপাল সাত বছর ক্ষমতা পরিচালনা করেন।

মহেন্দ্রপালের মৃত্যুর পর তাঁর সহােদর ভাই শূরপাল পাল সাম্রাজ্যের নরপতি হন। যিনি বিগ্রহ পাল নামেও পরিচিত। শূরপাল ছিলেন শান্তিপ্রিয় ও সংসার বিরাগী। বেশ কিছুদিন রাজত্ব করার পর তাঁর পুত্র নারায়ণ পালের উপর রাজ্যভার তুলে দেন। নারায়ণ পাল ৫৪ বছর রাজত্ব করেন। ধর্মপাল ও দেবপাল বাহুবলে যে বিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তা বিগ্রহ পাল ও নারায়ণ পালের ৫৪ বছরের রাজত্ব রক্ষা করতে পারেনি। নারায়ণ পালের রাজত্বকালেই পাল সাম্রাজ্য খণ্ড বিখণ্ড হয়ে পড়ে। এমনকি বিহার ও বাংলাদেশের কোনাে কোনাে অংশ যুদ্ধবিগ্রহের মাধমে বাইরের শত্রুরা দখল করে নেয়। ৯০৮ বঙ্গাব্দে নারায়ণ পালের মৃত্যু হলে তার পুত্র রাজ্যপাল ৯৪০ বঙ্গাব্দ পর্যন্ত শাসন করেন এবং রাজ্যপালের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র দ্বিতীয় গােপাল রাজ্য শাসন করতে থাকেন। দ্বিতীয় গােপাল ৯৬০ বঙ্গাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেন। এই সময়ের ভেতরে রাষ্ট্রকূট রাজ অমােঘবর্ষ, রাষ্ট্রকূট রাজ দ্বিতীয়, প্রতীহার রাজকৃষ্ণ, ইন্দ্র এইসব বহিঃশত্রুর আক্রমণে পাল সাম্রাজ্য নিদারুণ ধ্বংসের মুখে পড়ে।

পাল রাজা দ্বিতীয় গােপালের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র দ্বিতীয় বিগ্রহপাল ২৮ বছর রাজত্ব করেন। তাঁর রাজত্বকালে উত্তরবঙ্গের উত্তরাঞ্চল আক্রমণকারী কম্বােজান্বয়ের দ্বারা অধিকৃত হয়। ঐতিহাসিক রাজেন্দ্রপাল মিত্র ও রমাপ্রাসাদ চন্দ্রের মতে বানগড়ে ধবংসাবশেষে যে প্রস্তর স্তম্ভ পাওয়া যায় সেখানের বিবরণ ৮৮৮ শকাব্দ পাওয়া যায়। আক্রমণকারী কম্বােজরাজ কোটিবর্ষ নগরীতে রাজত্ব স্থাপন করে সেখানে গৌড়ের রাজারূপে নিজেকে ঘােষণা করেন। তবে কারাে কারাে ধারণা কম্বােজরাজ রাজা দ্বিতীয় বিগ্রহপালের কাছ থেকে বৃহত্তর দিনাজপুরের অধিকাংশ অঞ্চল কেড়ে নেন। ফলে কম্বােজরাজের কারণে পাল সাম্রাজ্যের ভিত্তিমূল শিথিল হয়ে পড়েছিলাে। এ থেকে অনুমান করা যায় যে ঠাকুরগাঁও অঞ্চলের কিছু অংশ বা সমগ্র অঞ্চল কিছু সময়ের জন্য হলেও কম্বােজরাজ শাসন করেছিলেন।

দ্বিতীয় বিগ্রহপালের পুত্র মহীপাল বিলুপ্ত পিতৃরাজ্য উদ্ধার করেন। তিনি কম্বােজরাজ ও কম্বােজশত্রুদের যুদ্ধে পরাজিত করে বিতাড়িত করেন এবং কোটিবর্ষ থেকে মহাস্থানগড় পর্যন্ত ও বৃহত্তর দিনাজপুরে আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পাল নরপতি মহীপাল ৯৮৮ শকাব্দে সিংহাসনের বসেন এবং বায়ান্ন বছর রাজত্ব করে পাল বংশের সৌভাগ্যকে পুনরায় আলােক উজ্জ্বল করে তুলেছিলেন। তার রাজত্বকালে বিদেশীয় আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে রাজ্য রক্ষার জন্য বারবার অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলেন। রাজা মহীপাল পরাক্রান্ত রাজা ছিলেন। দক্ষিণ ভারতের রাজ-রাজেন্দ্র চোল বঙ্গদেশ আক্রমণ করলে মহীপাল সেই আক্রমণ প্রতিহত করেন। রাজা মহীপাল উত্তরবঙ্গের তথা গােটা বাংলার মানুষের গৌরবের বিষয় ছিল। মহীপালের পরে তাঁর পুত্র নয়াপাল রাজ্য-ক্ষমতায় বসেন। তিনি ১৬ বছর রাজত্ব করেন। তবে কলচুরিবাজ গাঙ্গেয়দেবের পুত্র লক্ষী কর্ণের সঙ্গে তাঁর সুদীর্ঘকাল ধরে যুদ্ধ হয়েছিল । যদিও পরে উভয়পক্ষের মধ্যে সন্ধি হয় কিন্তু সন্ধি বেশিদিন স্থায়িত্ব পায়নি। নয়াপালের সময়েই বাঙালি বৌদ্ধপণ্ডিত দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান তিব্বতে ধর্মপ্রচারের জন্য গিয়েছিলেন।

নয়াপালের পর তাঁর পুত্র তৃতীয় বিগ্রহ পাল রাজ্য ক্ষমতার শাসনভার তুলে নিলেন। তৃতীয় বিগ্রহ পালের রাজত্বকালে আবার রাজা কর্ণ বঙ্গদেশে আক্রমণ করলেন। এই যুদ্ধে কর্ণ জয়লাভ করলেও বৈবাহিক সূত্রে উভয়পক্ষের মধ্যে সন্ধি সম্পাদিত হয়। সুদীর্ঘকাল যুদ্ধের ফলে পাল রাজশক্তি ক্রমশ দূর্বল হয়ে পড়ে। তৃতীয় বিগ্রহ পালের মৃত্যু সময়ে পাল সাম্রাজ্য বহিঃশত্রুর আক্রমণে ও অন্ত-বিপ্লবে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। তৃতীয় বিগ্রহপালের তিন পুত্র দ্বিতীয় মহীপাল, দ্বিতীয় শূরপাল ও রামপাল। পিতার মৃত্যুর পর দ্বিতীয় মহীপাল রাজ্য ক্ষমতার বসেন।

পাল বংশের শেষ আঘাত আসে দ্বিতীয় মহীপালের সময় দিব্বোক কর্তৃক। কারণ দ্বিতীয় মহীপাল ক্রমশ একজন অত্যাচারী শাসক হয়ে উঠেছিলেন। তার ফলে দেখা দিলাে প্রজা-বিদ্রোহ। বরেন্দ্রে প্রজা-বিদ্রোহ নেতৃত্ব দিয়েছিলেন কৈবর্ত্যরাজ দিব্বোক।

তাঁর নেতৃত্বে প্রজাদের বিদ্রোহ ছিলাে ইতিহাসে সুসংগঠিত ও ইতিহাস প্রসিদ্ধ। বরেন্দ্র ভূমির এই বিদ্রোহ পৃথিবীর প্রথম প্রজা-বিদ্রোহ। যা অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন। দিব্বোক ছিলেন রাজা দ্বিতীয় মহীপালের নৌসেনাপতি এবং উচ্চ রাজকোষের একজন সুপরামর্শদাতা। তা সত্ত্বেও রাজা দ্বিতীয় মহীপাল দিব্বোকের সুন্দরী বােন চন্দ্রিমতিকে হরণ করে তার নীতপুরের প্রমােদভবনে নিয়ে যান। ফলে দিব্বোক খুব কষ্ট পান এবং বিদ্রোহী হয়ে উঠেন। এদিকে রাজপ্রসাদের ভেতর চলছিলাে রাজ-ষড়যন্ত্র। দুষ্ট লােকের কু-পরামর্শে তার ভাই দ্বিতীয় শূরপাল ও রামপালকে বন্দি করলেন। দিব্বোকের বিদ্রোহী মনােভাবকে দমন করার জন্য যুদ্ধ ঘােষণা করলেন। আর শীঘ্রই বরেন্দ্রের সামন্তবর্গ দিব্বোকের নেতৃত্বে অত্যাচারী রাজা দ্বিতীয় মহীপালের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘােষণা করলাে। ফলে উভয়পক্ষে প্রচণ্ড যুদ্ধ শুরু হলাে। এই যুদ্ধে রাজা দ্বিতীয় মহীপাল পরাজিত ও নিহত হলেন।

ফলস্বরূপ দিব্বোক রাজ-ক্ষমতা দখল করে স্বাধীন সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করলেন। এতে সমগ্র উত্তরবঙ্গ অত্যাচারী রাজা থেকে মুক্তি পেল। দিব্বোক বরেন্দ্র ভূমির অধীশ্বর হয়ে তার রাজ্য পরিচালনা করতে লাগলেন। তাঁর নেতৃত্বে যে প্রজারা সংগঠিত হয়েছিলাে তা ছিলাে মূলত আর্থিক ও সাধারণ মানুষের প্রতি ভালােবাসা। তার এই মহৎ কাজের জন্য প্রজাগণ দিব্বোককে মহাপুরুষে উন্নীত করে এবং প্রতিবছর দিব্বোক স্মৃতি উৎসব পালন শুরু করে। কিন্তু কৈবর্ত রাজারা বেশিদিন রাজভােগ করতে পারেননি। দিব্বোকের মৃত্যুর পর তাঁর ভাই রুদ্ৰোক বরেন্দ্রের রাজা হন। রুদ্রোকের পর তাঁর পুত্র ভীম সিংহাসন বসেন। দ্বিতীয় মহীপালের পুত্র রামপাল পার্শ্ববর্তী রাজাদের সহযােগিতায় দিব্বোকের বরেন্দ্র জয়কে প্রতিহত করেন এবং ভীমকে পরাজিত করে পিতার সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধার করেন। রামপাল ও ভীমের যুদ্ধে-ভীম নিহত হন। তবে রামপাল ও ভীমের যুদ্ধের কাহিনী ঠাকুরগাঁও জেলার হরিপুর উপজেলার গেড়া গ্রামকে কেন্দ্র করে কিছু লােককথা প্রচলিত আছে। এই লােককথাটি হচ্ছে— ‘পালরাজা রামপাল বরেন্দ্র ভূমি পুনরুদ্ধারের জন্য কৈবর্ততরাজা ভীমের বিরুদ্ধে এই গেড়া গ্রামের আশপাশে থেকে প্রথম যুদ্ধ-যাত্রা সূচনা করেন। রামপালের সঙ্গে ভীমের যুদ্ধ যখন প্রবল রূপ ধারণ করেছে, সেই সময় ভুলবশত ভীম হাতির পিঠে চড়ে ছুটতে ছুটতে রামপালের সেনা ছাউনিতে চলে যান। যার ফলে অতি সহজে রামপালের সেনারা ভীমকে আটক করতে পারে। রাজা ভীমকে বন্দি হতে দেখে তার সেনারা পালাতে শুরু করে। ওই সময় ভীমের বন্ধু হরিবর্মণ পলায়ণরত সৈন্যদের সংগঠিত করার আপ্রাণ চেষ্টা করেন এবং সবাইকে নিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যান। যখন কোনােক্রমেই হরিবর্মণকে দমন করতে পারছে না রামপালের সৈন্যবাহিনী, তখন রামপাল কৌশল অবলম্বন করেন এবং তাঁর পুত্রকে দিয়ে প্রচুর অর্থ হরিবর্মণকে দিয়ে হাত করেন। যার ফলে ভীম বাহিনীর পরাজয় হয়। এই যুদ্ধে রামপালের সেনারা ভীমের চোখের সামনেই তার পরিবারবর্গকে নির্মমভাবে হত্যা করে এবং শেষে অসংখ্য তীরের আঘাতে তাকেও হত্যা করে।

রামপাল পিতৃরাজ্য পুনরুদ্ধারের পর নিজ নামেই রামাবতীতে রাজধানী স্থাপন করেন। রামপালের মৃত্যুর পর পুনরায় পাল সাম্রাজ্য পতন শুরু হয়। রামপালের পর তাঁর পুত্র কুমার পাল রাজ্য ক্ষমতার বসেন এবং সে সময় পর্যন্ত বৃহত্তর দিনাজপুর জেলার পালশাসন অব্যাহত ছিলাে।

কিন্তু কুমার পালের মৃত্যুর পর পালবংশের পরিণতি আরাে করুন হয়ে পড়ে। কুমার পালের পর তাঁর পুত্র তৃতীয় গােপাল রাজ-ক্ষমতা হাতে নেন। তিনি স্বল্পসময় রাজত্ব করে তাঁর পিতৃব্য মদন পালকে সিংহাসনে বসান। মদন পালই ছিলেন পালবংশের শেষ নরপতি।

পালরাজাদের চার’শ বছরের আধিপত্য বঙ্গদেশের ইতিহাসে নানান দিক থেকে গভীর ও ব্যাপক অর্থ বহন করে। বাংলায় পাল শাসন বার বার হাতছাড়া হলেও পুনরুদ্ধার করতে বেশি সময় লাগেনি। তাই নিঃসন্দেহে বলা যায় বাংলার ও বাঙালি জাতির গোড়াপত্তন হয় পাল যুগেই। এই যুগই ছিলাে প্রথম বৃহত্তর সামাজিক সমীকরণ ও সমন্বয়ের যুগ। বৃহত্তর দিনাজপুর জেলার ঠাকুরগাঁও অঞ্চল বারবার কামরুপ রাজ্যের আক্রমনে পরিণত হয়েছিল । কখনাে কখনাে কামরুপ রাজ তা দখল করে নিয়েছিলাে। কিন্তু পাল রাজাদের দৃঢ় সংবদ্ধে পুনরায় উদ্ধার করতে পেরেছিলাে। প্রকৃতপক্ষে ঠাকুরগাঁও অঞ্চল ছিলাে পাল রাজাদের ভিত্তি ভূমির অংশ। বাঙালির স্বদেশ ও সৌজন্যবােধের মূল যে সামগ্রিক ঐক্যবােধ পাল সাম্রাজ্যের সময়েই গড়ে ওঠে, এটাই বাঙালি জাতীয়ত্বের ভিত্তি এবং পাল সাম্রাজের সর্বশ্রেষ্ঠ দান।

সেন আমলে বাংলা

দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্য ভাগে অর্থাৎ মদন পালের রাজত্ব কালে উত্তরবঙ্গ আক্রমণ করেন সেন বংশের প্রতিষ্ঠাতা বিজয় সেন। পাল রাজাদের দুর্বলতার সুযােগে বিজয় সেন বঙ্গদেশ জয় করেন এবং সেনরাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন বৃহত্তর দিনাজপুরসহ সমগ্র উত্তরবঙ্গ। কর্ণাট দেশীয় নান্যদেব ছিলেন বিজয় সেন। উত্তরবঙ্গ রাজ্য প্রতিষ্ঠা করার পূর্বে কামরুপ রাজ দূরীভূত কলিঙ্গরাজকে পরাজিত ও গৌড়ের রাজকে দ্রুত পলায়নে বাধ্য করেছিলেন। তিনি মিথিলায় তাঁর রাজ্য প্রশাসনিক প্রশাসন স্থাপন করেন। বিজয় সেনের দ্বারা পরাজিত হন গৌড় রাজা মদন পাল। ফলে পাল রাজ্য বিনষ্ট হওয়ার সাথে সাথে ধর্মপাল, দেবপাল, মহীপাল ও রামপালের স্মৃতি বিজরিত শেষ চিহ্নগুলাে ধ্বংস ও বিলুপ্ত হয়ে যায়। বিজয় সেনের মৃত্যুর পর অর্থাৎ ১১৫৮ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর পুত্র বল্লাল সেন রাজ-ক্ষমতায় বসেন এবং পুরাে রাজ্যকে পাঁচটি ভাগে ভাগ করেন। (১) রাঢ় (২) বরেন্দ্র (৩) বাগড়ী (৪) বঙ্গ ও (৫) মিথিলা। বল্লাল সেনের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র লক্ষণ সেন ১১৭৯ খ্রিস্টাব্দে সিংহাসনে বসেন। এবং ১২০৫ খ্রি. পর্যন্ত শাসন করেন।

উপরােক্ত আলােচনা থেকে অনুমান করা কী যায় না, যে সেন শাসনের আমলে ঠাকুরগাঁও অঞ্চল সেন রাজ্যের অন্তর্ভুক্তি ছিল। কেননা বিজয় সেন কামরুপরাজকে একরকম পরাজিত করে উত্তর বঙ্গের সর্বউত্তরের ঠাকুরগাঁও অঞ্চল দিয়েই গৌড়, বরেন্দ্র ও বিভিন্ন রাজ্য জয়লাভ করেছিলেন। ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে (সম্ভবত) তুর্কি সেনাপতি বখতিয়ার খিলজি অতর্কিত আক্রমণে রাজা লক্ষণ সেনকে নদীয়া থেকে পালাতে বাধ্য করেন। বখতিয়ার খিলজি গৌড়রাজ জয় করে ১২০৫ খ্রিস্টাব্দে মুদ্রা জারি করেন। বখতিয়ার খিলজি দেবকোট দখল করে তার সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেন। আর সঙ্গে সঙ্গে উত্তরবঙ্গ ও ঠাকুরগাঁও অঞ্চলে সেন শাসনের অবসান ঘটে এবং মুসলিম শাসনের সূচনা হয়।

১২০৫ খ্রিস্টাব্দে তুর্কি বীর বখতিয়ার খিলজি যেদিন দেবকোটে আসেন সেদিন তাকে স্বাগত জানানাের লােকের অভাব ছিলাে না। কারণ দেবকোটে আসার পূর্বেই এখানাকার অনেকেই ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলিম ধর্ম গ্রহণ করেছিল। ওই দিন বখত-ই-আর খলজি বিনা রক্তপাতে গৌড়রাজ দখন করতে পারেননি। কারণ রাজা লক্ষণ সেনের সৈন্য-সামন্ত যেভাবে ওত পেতে থাকতাে তা সহজে লক্ষণ সেনের প্রাসাদে ঢুকা সহজ ছিল না বখত-ই-আর খলজির। তিনি কৌশল অবলম্বন করতে বাধ্য হয়েছেন। আর পূর্বেই যেভাবে বখত-ই-আর খলজির অনুসারীরা দস্যুর ন্যায় আক্রমণ করে লুঠ, ধর্ষন ও ডাকাতি করে পালিয়ে যেত, তা কথাসাহিত্যিক শওকত আলীর ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ উপন্যাসে সুন্দরভাবে বর্ণনা আছে। অর্থাৎ আচমকা উপস্থিত হয়ে তুর্কি দস্যুরা আক্রমন করে তরবারি আঘাতে হত্যা, লুঠ ও ঘরবাড়িতে আগুন জ্বালিয়ে পালিয়ে যেত। একদিকে যেমন রাজা লক্ষণ সেনের রাজ্যে সামন্ত প্রভুদের অত্যাচার ও নির্যাতন যেভাবে বেড়েছিল ঠিক অপরদিকে তুর্কি দস্যুদের উপদ্রব্য বেড়েছিল। কারণ সেন রাজা ও সামন্ত প্রভুদের সাথে এ-বঙ্গের বৌদ্ধদের সম্পর্কের চিত্র ছিলাে এক্কেবারে দা-কুড়াল। বৌদ্ধরা সামন্ত প্রভু ও সেন শাসকের হাত থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার আশায় তুর্কি দস্যুদের আহ্বান করেছিল এ-বঙ্গে আসার এবং সব রকমের সহযােগিতাও করে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গিয়েছিল বৌদ্ধ দেখলেই সেন রাজার সামন্ত প্রভুরা কঠোর নির্যাতন করতে কোন দ্বিধা করতাে না। হিন্দু ও বৌদ্ধদের অমীমাংসিক সম্পর্কের সুযােগে এ-বঙ্গে আগত সুফী সাধকরা নিম্ন বর্ণের হিন্দু সম্প্রদায়কে মুক্তির বাণী শুনিয়ে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিক করতে শুরু করে। এমন কি সেন রাজ মুসলমান সুফীদের আস্তানা গড়তে সাহায্য করে। ফলে এ-বঙ্গে মুসলমান সুফী সাধকদের আস্তানা প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকে। এ-সুযােগটা কাজে লাগান তুর্কি সেনাপতি বখত-ই-আর খলজি। আমার ধারণা মতে- তুর্কি দস্যুরা যখন এ-বঙ্গে এসে ডাকাতি, হত্যা ও লুঠ করতে থাকে তখন কিছুটা হলেও বুঝতে পেরেছিল এ-বঙ্গ দখল করার তাদের সময়ের ব্যাপার। কেননা সেন রাজের সামন্ত প্রভুরা যেভাবে নির্যাতন ও অত্যাচারে এ-বঙ্গের মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল এবং সুখ-বিলাসে মত্ত হয়ে পড়েছিল; আর এটা বুঝতে তাদের সহায়তা করেছিল বৌদ্ধ ভিক্ষুরা। ফলে সেন রাজ্য টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছিল। রাজ্য ও প্রাসাদ জুড়ে যখন অন্ধকারের ঘনচ্ছটা নেমে আসে তখন কার সাধ্য সে অন্ধকারটাকে সরিয়ে ফেলার।

যখন এ-বঙ্গের ক্ষমতায় বসার সম্ভাবনা খুব কাছে চলে এসেছে; ঠিক তখনি একটি কৌশল অবলম্বন করেছিলেন বখত-ই-আর খলজি। যে কৌশলে সেন সৈন্যরা বুঝতে এমনকি সেন রাজা লক্ষণ সেন বুঝতে পারেননি। যখন বুঝালেন তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। অর্থাৎ বখত-ই-আর খলজি তাঁর অনুসারীদের নিয়ে ব্যবসায়ীর বেশে লক্ষণ সেনের প্রাসাদে ঢুকেন ঠিক দুপুরবেলায় যখন সৈন্য ও তার দেহরক্ষীরা দুপুরের খাওয়া দাওয়া শেষ করে একটু বিশ্রামে চলে গেছে। প্রাসাদের অনেকেই বুঝে উঠে আগেই বখত-ই-আর খলজি ও অনুসারী উদ্যত তরবারী রক্তে ভেসে যেতে শুরু করেছে। রাজা লক্ষণ সেনের দেহরক্ষী ও সৈন্যরা প্রতিরােধ ব্যুহ তৈরি করলেও বখত-ই-আর খলজির তরবারীতে টিকতে পারেনি। ফলে লক্ষণ সেন গােপন পথে প্রাসাদ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন। আরও একটা বিষয় হতে পারে যে- তুর্কিরা এ-বঙ্গে এসেই হত্যা, লুণ্ঠন ও ধর্মান্তরিত করার পেছনে তাঁদের এ-বঙ্গের সংস্কৃতি, সভ্যতা ও ভাষা সম্পর্কে কোন ধারণা ছিল না। তাই এ-বঙ্গে এসেই তাদের দেওয়া অনেক কিছু তরবারির আঘাতে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। কেননা এ-বঙ্গে তারা এসেই প্রথমে বৌদ্ধ মঠগুলাে ধ্বংস করতে থাকে, মন্দিরগুলাে অপবিত্র করতে থাকে। যে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা তুর্কিদের আহ্বান করে এনেছিল তাদের উপরে বেশি আঘাতটা করে বসে বখত-ই-আর খলজির অনুসারীরা। যা অস্বীকার করা উপায় নেই।

রাজ্য ক্ষমতায় বসে বখতিয়ার এখানকার বৌদ্ধবিহার ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলাে ধ্বংস করলেন এবং কিছু কিছু জায়গায় মসজিদ, খানকা ও মাদ্রাসা স্থাপন করলেন। এই দেবকোটে সুফী সাধকদের আগমন ঘটে লক্ষন সেনের রাজত্বকালে।

বাংলার শেষ স্বাধীন নরপতি লক্ষণ সেন রাজ্য শাসনের ক্ষেত্রে তাঁর পিতার পথে না গিয়ে বৌদ্ধদের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েন এবং ইসলামপন্থি সুফী সাধকদের সঙ্গে আপস করে শাসন কাজ চালাতে লাগলেন। তিনি শেখ মখদুম শাহজালাল তাব্রিজীকে একটি মসজিদ নির্মাণের জন্য প্রয়ােজনীয় জমি, বাইশ হাজার খাজনা আদায়ের গ্রামসমূহ দান করেন। এই সময় বৃহত্তর দিনাজপুরের অনেকেই তাব্রিজীর অলৌকিক ক্রিয়াকলাপ ও কর্ম-দক্ষতার মুগ্ধ হয়ে ধর্মান্তরিক হয়েছিলেন। ফলে বখতিয়ার খিলজি আরাে অনেককে জোর করে হােক বা অন্য কোনাে উপায়েই হােক ধর্মান্তরিত করতে দ্বিধা করলেন না। এভাবেই ঠাকুরগাঁও অঞ্চলে মুসলিম আধিপত্য বাড়তে থাকে এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের গােড়াপত্তন শুরু হয়।

মধ্যযুগে বাংলা

মধ্যযুগীয় বাংলার যুগ সূচনাকারী ছিলেন বখতিয়ার খিলজি। ১২০৬ খ্রিস্টাব্দে দেবকোট শহর থেকে তিনি দশ হাজার সৈন্য নিয়ে তাঁর বিখ্যাত তিব্বত অভিযান শুরু করেন। তিব্বত অভিযানের পূর্বে বখতিয়ার খিলজী, শীরান খিলজী ও তাঁর ভ্রাতা আহম্মদ শীরান খিলজীকে সেনাবাহিনীর একাংশসহ জাজ নগরের (উড়িষ্যার দিকে) পাঠান। তাঁর তিব্বত অভিযান সম্পূর্ণ ব্যর্থতার পর্যবসিত হয় এবং দশ হাজার সমর নায়ক সৈন্যের মধ্যে মাত্র এক হাজার সৈন্য নিয়ে কোনাে রকমে দেবকোট ফিরে আসেন। ১২০৬ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাসে তিনি আলী মর্দান কর্তৃক দেবকোট শহরে নিহত হন।

বখতিয়ারের মৃত্যুর উত্তরকালে বাংলায় নবপ্রতিষ্ঠিত মুসলমান রাজ্যে খিলজী মালিকদের মধ্যে অন্তর্বিরােধের সৃষ্টি হয়। বখতিয়ারের মৃত্যুর খবর। পেয়ে খিলজী মালিকদের অন্যতম মােহাম্মদ শিরান খিলজী বীরভূম জেলার লখনৌর থেকে দ্রুত দেবকোটে ফিরে আসেন। অতঃপর তিনি নারকোটির নিকট আলী মর্দানকে পরাজিত ও বন্দী করেন এবং লখনৌতি রাজ্যের শাসন ভার গ্রহণ করেন। তিনি স্বীয় নামে খােতবা পাঠ ও মুদ্রার প্রচলন করেন। তাঁর লক্ষনৌতি রাজ্যের শাসনভার গ্রহণের পর আলী মর্দান কৌশলে কারাগার থেকে পালিয়ে যান এবং দিল্লীতে কুতুব উদ্দীন আইবেকের আশ্রয়প্রার্থী হন। বাংলায় নবপ্রতিষ্ঠিত মুসলমান রাজ্য দ্রুত পট পরিবর্তনের ফলে দিল্লীর শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য কুতুব উদ্দীন আইবেক অযােধ্যার শাসনকর্তা কায়েমাজ রুমীকে লখনৌতি আক্রমণ করে খিলজী আমীরদের বিরােধ মীমাংসা করতে এবং প্রত্যেক আমীরকে ইকতায় বহাল আদেশ দেন। ১২০৭ খ্রিস্টাব্দের মার্চ-এপ্রিল মাসে কায়েমাজ রুমী শিরান খিলজীকে মাকসিদাহ ও সন্তোষ অঞ্চলের যুদ্ধে পরাজিত ও নিহত করেন। কনকৌরীর জায়গীরদার হােসান উদ্দীন ইওজকে কায়েমাজ রুমী লখনৌতির রাজ্যের শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। এভাবে লখনৌতিতে দিল্লীর শাসন পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হয়। হােসান উদ্দীন ইওজ খিলজী দিল্লীর অধীনস্থ শাসকর্তা হিসাবে লখনৌতিতে দিল্লীর শাসন পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হন। হােসান উদ্দীন ইওজ খিলজী দিল্লীর অধীনস্থ শাসকর্তা হিসাবে লখনৌতি শাসন করতে থাকেন। ইওজ এ পদে দুই বা আড়াই বৎসর বহাল থাকেন। পক্ষান্তরে কুতুব উদ্দীন আলী মর্দানকে লখনৌতির শাসকর্তা নিয়ােগ করেন। ১২০৯ খ্রিস্টাব্দে আলী মর্দান বাংলায় আগমন করেন। ইওজ আলী মর্দানের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করেন ১২১০ খ্রিস্টাব্দে।

আলী মর্দান খিলজী অতি সহজেই এ জেলাসহ লখনৌতির শাসনকর্তা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হতে সমর্থ হন। ১২১০ খ্রিস্টাব্দে আইবেকের মৃত্যুর পর আলী মর্দান দিল্লীর সঙ্গে লখনৌতির সম্পর্ক ছিন্ন করে স্বাধীনতা ঘােষণা করেন এবং সুলতান আলাউদ্দীন আলী মর্দান খিলজী নাম ধারণ করেন। তিনি নিজ নামে খােতবা পাঠ ও মুদ্রার প্রচলন করেন। কিন্তু স্বাধীন নরপতি হিসাবে বেশিদিন শাসন করতে পারেন নাই। তার অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে খিলজী আমীরগণ হােসান উদ্দীন ইওজের নেতৃত্বে একতাবদ্ধ হন। ১২১২ খ্রিস্টাব্দে তাঁরা সুলতান আলাউদ্দীনকে হত্যা করেন এবং হােসান উদ্দীন ইওজ খিলজীকে নেতা নির্বাচন করেন। হােসান উদ্দীন ইওজ সুলতান গিয়াস উদ্দীন ইওজ খিলজী উপাধি ধারণ করে লখনৌতির সিংহাসন আরােহণ করেন। তিনি দেবকোট থেকে গৌড় বা লখনৌতির সিংহাসনে আরােহণ করেন। সামরিক কারণে ও প্রজাদের মঙ্গলের জন্য লক্ষনৌতির সঙ্গে দেবকোটের যােগাযােগের জন্য একটি রাস্তা নির্মাণ করেন। ১২২৭ খ্রিস্টাব্দ দিল্লীর সুলতান ইলতুৎমিশের পুত্র নাসিরউদ্দীনের কাছে পরাজিত ও নিহত হন। অতঃপর বাংলার মুসলমান রাজ্য দিল্লীর অধীনস্থ প্রদেশে পরিণত হয়। দিল্লীর সুলতান গিয়াসউদ্দীন বলবনের রাজত্বকালে বাংলার শাসনকর্তা মুগীস উদ্দীন তুঘরল বিদ্রোহ ঘােষণা করেন। ১২৮১ খ্রিস্টাব্দে সুলতান গিয়াস উদ্দীন বলবন তুঘরলকে পরাজিত ও হত্যা করে বাংলাকে তাঁর সাম্রাজ্যভুক্ত করেন। কিন্তু অল্পকালের জন্য বাংলা দিল্লীর অধীনস্ত প্রদেশ ছিল।

১২৮৭ খ্রিস্টাব্দে পিতার মৃত্যুর পর বােখরা খান নাসির উদ্দীন মাহমুদ উপাধি ধারণ করে নিজকে বাংলার স্বাধীন সুলতান ঘােষণা করেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র রুকুন উদ্দীন কায়কাউস বাংলার শাসনকর্তা হন। তাঁর রাজত্বকালে অবিভক্ত দিনাজপুর জেলার দেবকোটে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। তারপর শামসউদ্দীন ফিরােজ শাহ ১৩০১ খ্রিস্টাব্দে সিংহাসন অধিকার করেন। তাঁর শাসনামল ছিল এ দেশের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীন ও সার্বভৌম রাজ্য হিসাবে লক্ষনৌতির সমৃদ্ধি ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং তাঁর মৃত্যুর পরে ১৩২৪ খ্রিস্টাব্দে গিয়াস উদ্দীন তুঘলক লখনৌতি আক্রমণ করেন। তিনি বাংলা জয় করে দেশটিকে তিনটি প্রশাসনিক বিভাগে বিভক্ত করেন। তন্মধ্যে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম বাঙলার প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল লখনৌতি। তখন বাংলার এ অঞ্চলের প্রশাসক ছিলেন। আলাউদ্দিন আলী শাহ। ১৩৩৮ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে দিল্লীর কেন্দ্রীয় প্রশাসনের দুর্বলতার জন্য বাংলা স্বাধীন রাজ্যে পরিণত হয়েছিল।

১৩৪২ খ্রিস্টাব্দে সুলতান আলাউদ্দীন আলী শাহকে হত্যা করে বিহারের হাজী ইলিয়াস সুলতান শামসউদ্দিন ইলিয়াস শাহ উপাধি ধারণা করে সমগ্র উত্তর বাংলার এবং পরে সমগ্র বাংলার উপর স্বীয় প্রাধান্য স্থাপন করতে সমর্থ হন। তাঁর আবির্ভাবের ফলে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা হয়। তিনি লখনৌতিতে ক্ষমতা দখল করে ফিরুজাবাদে রাজধানী স্থানান্তরিত করেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত রাজবংশ ১৪১৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাংলাদেশ শাসন করে। সুলতান শামসউদ্দীন ইলিয়াস শাহের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র সিকান্দার শাহ বাংলার সিংহাসন আরােহণ করেন। ১৩৬০ খ্রিস্টাব্দে তিনি দিনাজপুর জেলার দেবকোটে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। ইলিয়াস শাহী রাজ দরবারের জনৈক আমীর রাজা গণেশ ক্ষমতা দখল করলে কয়েক বৎসরের জন্য এ রাজবংশের শাসনের অবসান ঘটে। তাঁর পুত্র যদু ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে জালালউদ্দিন মােহাম্মদ শাহ নাম ধারণ করে বাঙলার সিংহাসনে বসেন। রাজা গণেশ ও তার বংশধররা প্রায় ত্রিশ বছর বাংলায় রাজত্ব করেন।

জালালউদ্দীনের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র সুলতান শামসুদ্দীন আহমদ শাহ ১৪৩২ খ্রিস্টাব্দে সিংহাসনে বসেন। তাঁর দু’জন ক্রীতদাস—সাদী খান ও নাসির খান তাঁকে হত্যা করেন। ক্রীতদাসের আধিপত্য খর্ব করার জন্য অমাত্য ও সেনাধ্যক্ষরা নাসির উদ্দীন আবুল মুজাফফর মাহমুদ শাহকে। ১৪৩৬ খ্রিস্টাব্দে গৌড়ের সিংহাসনে বসান। তার প্রতিষ্ঠিত রাজবংশ মাহমুদ শাহী নামে বাংলার ইতিহাসে পরিচিত। এরপর ৪৫ বছর এই বংশের সুলতানরা এই জেলাসহ বাংলা শাসন করেন। এ দেশের ইতিহাসে ইলিয়াস শাহী যুগ একটি স্মরণীয় যুগ। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এ বংশ স্বাধীন সুলতানী শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিল। দিল্লীর সংগে সম্পর্কচ্ছেদের ফলে বাংলার ইলিয়াস শাহী বংশে স্বাভাবিক কারণেই দেশীয় জনগণের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এ বংশের সুলতানরা বাংলাকে নিজেদের দেশ বলে মনে করতেন এবং জনসাধারণও তাদেরকে নিজেদের শাসক বলে স্বাগত জানিয়েছিলাে। উচচ রাজপদে হিন্দুদের নিয়ােগ, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সমাদর এবং দেশীয় পণ্ডিত ও পৃষ্ঠপােষকতা ইলিয়াস শাহী শাসনের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল । সামরিক বিজয়ের চেয়ে সাংস্কৃতিক বিজয় সুসম্পন্ন করাতেই এই বংশের কৃতিত্ব ছিল সমাধিক। এদেশের সামাজিক জীবনের এক নতুন ধারার সৃষ্টি হয়েছিল ইলিয়াস শাহী যুগে।

১৪৮৭ থেকে ১৪৯৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ছয় বছর ছিল গােলযােগপূর্ণ। নাসিরউদ্দীন মাহমুদ শাহের পুত্র রুকুন উদ্দীন বরবক শাহ প্রায় আট হাজার হাবশী ক্রীতদাস বাংলায় আমদানি করে প্রায় সকল উচচ রাজপদে তাঁদেরকে নিয়ােগ করেন। হঠাৎ অত্যধিক ক্ষমতার অধিকারী হওয়ার দরুণ তাঁরা উদ্ধত হয়ে উঠে। ফলে ক্ষমতা দখলের জন্য বিভিন্ন ষড়যন্ত্রে তাঁরা লিপ্ত হয়। তাঁরা মাহমুদ শাহী বংশের শেষ সুলতান জালাল উদ্দীন ফতেহ শাহকে ১৪৮৭ খ্রিস্টাব্দে হত্যা করে এবং হত্যাকারী হাবশী ক্রীতদাস সুলতান বরবক শাহ উপাধি ধারণ করে বাংলার সিংহাসন আরােহণ করেন। প্রায় ছয় বছর বাংলাদেশে হাবশী শাসন বজায় ছিল। এ ছয় বছরে অন্তত চারজন হাবশী সুলতান বাংলার সিংহাসন অধিকার করেন এবং প্রত্যেক সুলতানই নিহত হয়েছেন। ষড়যন্ত্র, বিদ্রোহ, হত্যা ও স্থায়িত্বহীন শাসন বাংলাদেশকে বিপর্যস্ত করেছিল।

প্রাক-মুগল আমলে হুসেন শাহী আমল ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বর্ণযুগ । বাংলাদেশে হাবশী শাসন অবসান ঘটে সুলতান আলাউদ্দীন হুসেন শাহের আবির্ভাবের ফলে। এ বংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন সুলতান আলাউদ্দীন হুসেন শাহ। তাঁর আমলে রাজ্যের সীমানা চতুর্দিকে বিস্তৃত হয়, তাঁর আমলের অনেক ঐতিহাসিক পুরাকীর্তি আবিষ্কৃত হয়েছে এবং অনেক মুদ্রা ও শিলালিপির সন্ধান পাওয়া যায়। তাঁর প্রশাসনে তিনি অনেক হিন্দুকে উচচ রাজপদে নিযুক্ত করেছিলেন এবং হিন্দু ধর্মের প্রতি উদার ছিলেন। তিনি ও তাঁর আমীর বাংলা ভাষার পৃষ্ঠপােষক ছিলেন। তাঁর বংশের মােট চারজন সুলতান বাংলা শাসন করেন। হুসেন শাহী বংশের শাসনামলে এ জেলাসহ সমগ্র বাংলা তাঁদের শাসনাধীন ছিল।

পাঠান আমলে বাংলা

১৫৩৮ থেকে ১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দে আকবরের বাংলা জয় পর্যন্ত আটত্রিশ বৎসর বাংলা শাসনের ইতিহাসে আফগান বা পাঠান শাসনামল বলে পরিচিত। বাংলায় আফগান শাসনের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন শের খান সূর। আফগান শক্তির পুনরুত্থানের চাপে বাংলায় হােসেন শাহী শাসনের এবং দীর্ঘ ২০০ বছরের স্বাধীন সুলতানী শাসনের অবসান ঘটে। হােসেন শাহী বংশের শেষ সুলতান মাহমুদ শাহকে ১৫৩৮ খ্রিস্টাব্দে শের খান সুর চূড়ান্ত পরাজিত করে গৌড় অধিকার করেন। শের খান সূরকে গৌড় থেকে বিতাড়িত করার নিমিত্ত দিল্লীর মুঘল সম্রাট হুমায়ুনের সঙ্গে মাহমুদ শাহ সাময়িক জোট সৃষ্টি করার চেষ্টা করেন। কিন্তু তাঁর এ কূটনৈতিক তৎপরতা সচল হয় নাই। বাংলায় আফগান শক্তি পুনরুত্থানের ফলে দিল্লীর মুঘল সম্রাট হুমায়ুন আতঙ্কিত হন। এর ফলে, আফগান-মুঘলদের মধ্যে পুনরায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয়। এ দ্বন্দ্বে আফগানরা বিজয়ী হয়ে ভারতের সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী হন। শের শাহ্ বাংলাকে কয়েকটি প্রশাসনিক এলাকায় বিভক্ত করেন। তাঁর আমলের বাংলার আর একটি উল্লেখযােগ্য ঘটনা হচ্ছে বরবক শাহ নামধারী একজন সুলতান স্বাধীন মুদ্রার প্রচলন করেন। ১৫৪২ থেকে ১৫৪৩ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশে বরবক শাহ নামক একজন সুলতান রাজত্ব করেন শেরশাহের রাজত্বের মধ্যভাগে । তিনি বিদ্রোহী হন এবং স্বাধীনতা ঘােষণা করেন। শেরশাহের পুত্র ও উত্তরাধিকারী ইসলাম শাহের রাজত্বকালে এই জেলা ১৫৪৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৫৫৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দিল্লীর অধীনে ছিল। তিনি শামসউদ্দীন মােহাম্মদ সূরকে বাংলার প্রশাসক এবং সােলায়মান কররানীকে বিহারের প্রশাসক নিযুক্ত করেন।

১৫৫৩ খ্রিস্টাব্দে সামসউদ্দীন দিল্লীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে সামসউদ্দীন শাহ গাজী উপাধি ধারণ করেন। সূর সেনাপতি হিমুর কাছে ১৫৫৫ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে শামসউদ্দীন কালপী নামক স্থানে পরাজিত ও নিহত হন। ভাটির জমিদার ঈসা খান ও সােলায়মান কররাণী বিদ্রোহ ঘােষণা করেন। ইসলাম শাহ সূর ১৫৫৩ খ্রিস্টাব্দের ৩০ অক্টোবর পরলােক গমন করেন। তাঁর মৃত্যুর পর সূর সাম্রাজেরও পতন শুরু হয়।

হুমায়ুনের বিরুদ্ধে কনৌজের যুদ্ধে শের শাহের অধীনস্থ সেনাধ্যক্ষ হিসাবে কররাণী আফগান বংশীয় তাজখান ও সােলায়মান খান কৃতিত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সে জন্য পুরস্কারস্বরূপ শের শাহ তাদেরকে বিহারের খােয়াসপুর এবং গঙ্গা নদীর তীরের কয়েকটি গ্রামের জায়গীর দান করেন। অভ্যুদয়-বন্ধুর পন্থায় অগ্রসর হয়ে তাজ খান ১৫৬৪ খ্রিস্টাব্দে বাংলায় কররাণী বংশের প্রতিষ্ঠা করেন। ১৫৬৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি পরলােক গমন করেন। তাজ খানের মৃত্যুর পর তাঁর ভাই সােলায়মান কররানী বাংলার সিংহাসনে বসেন। তিনিও একজন সুদক্ষ শাসক ছিলেন। পররাষ্ট্র নীতিতে তিনি দিল্লীর মুঘল সম্রাটের সঙ্গে সৌহার্দ্যমূলক কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখেন। তাঁর বৈদেশিক নীতির ফলে মুঘল সম্রাট ১৫৭২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাংলা আক্রমণ করেননি। এ বংশের সুলতানরা এ জেলাসহ সমগ্র বাংলাদেশ শাসন করেন। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তাঁর সাফল্যের মূলে যাঁর অবদান অসামান্য ছিল, তিনি ছিলেন তাঁর মন্ত্রী লােদী খান। সমর ক্ষেত্রেও তিনি তৎকালীন সময়ে একজন বিখ্যাত সমর নায়ককে তাঁর সেনাবাহিনীর অধিনায়ক হিসাবে পেতে সক্ষম হয়েছিলেন, যার মাধ্যমে তিনি এক বিরাট রাষ্ট্রের প্রসিদ্ধ লাভ করেন। উক্ত সেনানায়কের নাম কালাপাহাড়। তিনি একজন বিচক্ষণ ও বুদ্ধিমান নরপতি ছিলেন। ১৫৭২ খ্রিস্টাব্দে পিতার মৃত্যুর পর দাউদ কররাণী বাংলার সিংহাসনে বসেন। তাঁর দূরদর্শিতার অভাবের জন্য দিল্লী-বাংলার সম্পর্ক খুব খারাপ হয়। এর ফলে ১৫৭২ থেকে ১৫৭৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তীকালে মুঘল সেনাধ্যক্ষ মুনিম খান এবং দাউদ খান কররাণীর মধ্যে ভয়াবহ যুদ্ধ সংগঠিত হয়। দাউদ খান কররানী পরাজিত হন। তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধে সাফল্যের জন্য মুনিম খান ১৫৭৪ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট আকবরের নিকট থেকে ‘খান-ই-খানান’ উপাধি অর্জন করেন।

মুঘল সেনাধ্যক্ষ মুনিম খান তানডা থেকে কিছু মুঘল সৈন্য আফগানদের দমনের জন্য ঘােড়াঘাটে পাঠান। ঘােড়াঘাটে অবস্থানরত আফগান সৈন্যরা পরাজিত হয়ে কোচবিহারের দিকে পলায়ন করে। কোচবিহারের রাজা নারায়ণ দাউদ খান কররাণীর বিরুদ্ধে আকবরের মুঘল অভিযানের সময় সহায়তা করেন। অন্যান্য এলাকায়ও আফগানরা পরাজিত হয়, কিন্তু দাউদকে পরাজিত করা মুঘলদের পক্ষে তাড়াতাড়ি সম্ভব হয়নি। আফগান জায়গীরদার ও হিন্দু রাজারা মুঘলদের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিরােধ সৃষ্টি করে। সােলায়মান কররাণীর ভ্রাতুস্পুত্র জোনায়েদ কররাণীর অভ্যুদয়ের ফলে মুঘলদের অবস্থা আরও খারাপ হয়। দাউদ যখন উড়িষ্যায় আশ্রয় গ্রহণ করেন, তখন জোনায়েদ একদল আফগান সৈন্য নিয়ে বিহারের ঝাড়খণ্ডে আগমন করেন। মুঘল সেনাধ্যক্ষ মুনিম খান ও তােডরমল তানডা ত্যাগ করে উড়িষ্যার দিকে অগ্রসর হন। ১৫৭৫ খ্রিস্টাব্দে মার্চের তিন তারিখে আফগান ও মুঘলদের মধ্যে তুকারায়ের বা মুঘলমারীতে এক ভয়াবহ যুদ্ধ হয়। এ যুদ্ধের ফলে আফগানরা খুবই দুর্বল হয়ে পড়ে। তুকারায়ের যুদ্ধের পর মুনিম খান পুনরায় ঘােড়াঘাট দখলের জন্য সামরিক তৎপরতা পরিচালনা করেন। কারণ, আফগান সেনাধ্যক্ষ কালাপাহাড়, বাবু মানকলি ও অন্যান্য আফগান প্রধানরা কোচবিহার থেকে ঘােড়াঘাটে সমবেত হয়ে মুঘল সেনানিবাস দখল করেন। উক্ত স্থান থেকে তাদেরকে বিতাড়িত করে ১৫৭৫ খ্রিস্টাব্দে মুনিম। খান তানডা প্রত্যাবর্তন করেন। ১৫৭৫ খ্রিস্টাব্দের ১২ এপ্রিল দাউদ কররাণী মুঘল সম্রাট আকবরকে বাংলা ও বিহারের সম্রাট হিসাবে স্বীকার করেন এবং মুঘলদের অধীনস্থ সামন্তে পরিণত হন। মুনিম খান তানডা ফিরে আসেন এবং ১৫৭৫ খ্রিস্টাব্দের ২ অক্টোবর পরলােক গমন করেন। মুনিম খানের মৃত্যুর ফলে মুঘল সেনাবাহিনীতে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। ইতিমধ্যে দাউদ কররাণী কটকের সন্ধি ভঙ্গ করে এ জেলাসহ উত্তর ও পশ্চিম বাংলা পুনরুদ্ধার করেন এবং তানডায় অনুপ্রবেশ করেন। ভাটির জমিদার ঈশ্বর খান পূর্ব বাংলা থেকে মুঘল নৌ-বাহিনীকে বিতাড়িত করেন। মুঘল সৈন্যরা বাংলাদেশ ত্যাগ করে বিহারে আশ্রয় গ্রহণ করে।

মুঘল সম্রাট আকবর মুনিম খানের মৃত্যুর খবর পেয়ে বৈরাম খানের ভাগ্নে খান জাহান হােসেন কুলি খানকে বাংলার প্রশাসক ও সেনাপতি নিযুক্ত করেন। সম্রাট আকবর রাজা তােডরমলকে হােসেন কুলী খানের অধীনস্থ সেনাধ্যক্ষ নিয়ােগ করেন। তাঁদের নিয়ােগের ফলে বাংলায় দ্রুত পট পরিবর্তন হয়। ১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দের ১২ জুলাই রাজ-মহলের নিকটে মুঘল ও আফগানদের মধ্যে ভয়াবহ যুদ্ধ হয়। এ যুদ্ধে মুঘল বাহিনীর কাছে দাউদ পরাজিত ও বন্দি হন। মুঘল সেনাপতিরা দাউদ কররাণীকে হত্যা করে। রাজমহলের যুদ্ধের ফলে বাংলায় মুঘল শাসন শুরু হয়। খান জাহান তানডায় রাজধানী স্থাপন করেন। তিনি এই জেলাসহ উত্তর বাংলা ও অন্যান্য স্থান দখল করেন। মুঘল সেনাধ্যক্ষের নিকট কিছু জমিদার পরাজিত হন এবং অনেকে আত্মসমর্পণ করেন। অল্প কিছুদিন পর জমিদাররা আবার স্বাধীন হন। এর ফলে, মুঘল শাসনাধীনে শুধুমাত্র বাংলার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলই অবশিষ্ট থাকে।

১৫৭৪ থেকে ১৭২৭ পর্যন্ত মােট ৪০ জন মুঘল শাসনকর্তা বাংলাদেশ শাসন করেন। তাঁদের মধ্যে মানসিংহ (১৫৯৪-১৬০৬ খ্রিস্টাব্দ), ইসলাম খান (১৬০৮-১৬১৩ খ্রিস্টাব্দ), শাহজাদা মুহাম্মদ শুজা (১৬৩৯-৬০ খ্রি.), মীর জুমলা (১৬৬০-৬৩ খ্রিস্টাব্দ), শায়েস্তা খান (১৬৬৪-৬৮, ১৬৭৯-৮৮ খ্রিস্টাব্দ) এবং মুর্শিদকুলী খান (১৭১৭-২৭ খ্রিস্টাব্দ) ছিলেন সমধিক প্রসিদ্ধ। দিল্লীর দুর্বলতার দরুন মুঘল সম্রাটের নিযুক্ত সুবে বাংলার শেষ শাসনকর্তা মুর্শিদকুলী খান প্রকৃতপক্ষে স্বাধীন নরপতির মতাে এ দেশের শাসনকর্তা। মুর্শিদকুলী খান (১৭১৭-২৭ খ্রিস্টাব্দ) ছিলেন সমধিক প্রসিদ্ধ। তাঁর চার উত্তরাধিকারী সুজাউদ্দীন খান (১৭২৭-৩৯ খ্রিস্টাব্দ), সরফরাজ খান (১৭৩৯-৪০ খ্রিস্টাব্দ), আলীবর্দী খান (১৭৪০-৫৬ খ্রিস্টাব্দ) এবং সিরাজউদ্দৌলা (১৭৫৬-৫৭ খ্রিস্টাব্দ) স্বাধীন নবাব ছিলেন। স্যার যদুনাথ সরকার বলেন ‘মুঘলরা বাংলাদেশের জন্য শান্তি ও প্রগতির এক নব যুগের সূচনা করে। এর ফলে, উত্তর-ভারত এবং উত্তর ভারতের স্থলপথের মধ্য দিয়ে যথা এশিয়ার দেশসমূহের সঙ্গে বাংলাদেশের যােগসূত্র পুনঃ প্রতিষ্ঠিত হয়। বৌদ্ধ ধর্মের আবির্ভাবকালে এই যােগসূত্র এক বার ছিন্ন হয়। বাংলার শাসনকর্তারা দিলীর অধীনতা অস্বীকার করায় এ যােগসূত্র আবারও ছিন্ন হয়েছিল। এর ফলে মুঘল সাম্রাজ্যের কেন্দ্রস্থল থেকে উক্ত সাম্রাজ্যের অন্যতম সুশাসিত প্রদেশ সুবে বাংলায় অসংখ্য রাজ-কর্মচারী, পণ্ডিত, ধর্মপ্রচারক, বণিক, শিল্পী ও সৈন্যদের দলে দলে আগমন ঘটতে থাকে । ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে ইংরেজ শাসন আমলে যে নবজাগরণ দেখা দেয় আড়াইশত বছর আগেই নিঃসন্দেহে তার ক্ষীণ সূচনা দেখা দিয়েছিল । এ সবই ছিল মুঘল যুগের শান্তির ফলে, যে ফল সত্যিকারভাবেই গৌরবজনক।’

তথ্যসূত্র:

১. অজয় কুমার রায়, ঠাকুরগাঁও জেলার ইতিহাস, টাঙ্গন, দ্বিতীয় সংস্করণ আগস্ট ২০১৮, ঢাকা, পৃষ্ঠা ১৫-৩১।

২. রায়, ধনঞ্জয় ২০০৬, দিনাজপুর জেলার ইতিহাস, পৃষ্ঠা ৭- ৩৮

৩. রায়, নীহাররঞ্জন ১৪২০, বাঙালির ইতিহাস (আদিপর্ব), পৃষ্ঠা ৬১,  ৪১২, ৪১৩

৪. সিদ্দিকী, আশরাফ ১৯৭২, (সম্পাদনা) দিনাজপুর জেলা গেজেটিয়ার, পৃষ্ঠা ২৮-৩১

৫. শওকত আলীর ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ উপন্যাসের সারাংশ তুলে ধরা হয়েছে

Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই “পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি” প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১০টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর “সমাজতন্ত্র” ও “মার্কসবাদ” গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন “বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা” নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top