You cannot copy content of this page
আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > বাংলাদেশ > ভাষা আন্দোলন প্রসঙ্গে

ভাষা আন্দোলন প্রসঙ্গে

১৯৫২ সনের ফেব্রুয়ারী মাসে পূর্ববাংলায় তদানীন্তন পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে ছাত্রদের আন্দোলন বাংলা ভাষা আন্দোলন (ইংরেজি: Language Movement ) নামে পরিচিত। ঐ বৎসর ২১ ফেব্রুয়ারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রগণ প্রাদেশিক সরকারের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দানের দাবিতে বিক্ষোভ প্রদর্শন করলে পুলিশ ছাত্রদের উপর গুলিবর্ষণ করে। গুলিবর্ষণে রফিক, সালাম, বরকত, জব্বারসহ কয়েকজন তরুণ ছাত্র ও শ্রমিক নিহত হন। বহু বিক্ষোভকারী আহত হন এবং ছাত্র, শ্রমিক, শিক্ষকসহ বহুসংখ্যক লোককে গ্রেফতার করা হয়। পাকিস্তানি সরকারের নির্যাতনে আন্দোলন সাময়িকভাবে স্তিমিত হয়ে পড়লেও বিক্ষোভের মূল পূর্ববাংলার সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বঞ্চনার সঙ্গে যুক্ত থাকায় ভাষা আন্দোলন ক্রমান্বয়ে অধিকতার ব্যাপকতা লাভ করতে থাকে। পরিশেষ ১৯৫৬ সালে পাকিস্তান সরকার বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষারূপে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়।

ভাষা আন্দোলন প্রধানত পূর্ববাংলার আন্দোলন। পাকিস্তানের ভৌগোলিক কাঠামোর মধ্যে পূর্ববাংলার অবস্থান ও তার জনসংখ্যা ভাষা আন্দোলনের শক্তির উৎস হিসাবে কাজ করছে। ভাষা জীবনের অপরাপর সমস্যা হতে বিচ্ছিন্ন কোনো সমস্যা নয়। ভাষা জীবনযাপনের উপায় বা মাধ্যম। এজন্য ইতিহাসে সাধারণত ভাষা আন্দোলন বলে জনতার কোনো আন্দোলন বা সংগ্রামকে চিহ্নিত করা যায় না। পূর্ববাংলার ভাষা আন্দোলন ছিল মূলত পূর্ববাংলার কৃষক, শ্রমিক ও মধ্যবিত্তের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক বিকাশের আন্দোলন।

১৯৪৭ সালের ১৪ অগাস্ট ভারতবর্ষের শাসক ইংরেজ শক্তির মধ্যস্থতায় অখন্ড ভারতের সংখ্যাগুরু হিন্দু সমাজের ভীতিমুক্ত পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা হওয়ায় পাকিস্তানের, বিশেষত পূর্ববাংলার জনসাধারণ সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক বিকাশের আশা ব্যাপকভাবে পোষণ করতে শুরু করে। কিন্তু পাকিস্তান রাষ্ট্রের শাসকশ্রেণী প্রধানত সামন্ততান্ত্রিক ও পশ্চিম পাকিস্তান কেন্দ্রিক হওয়াতে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাভাবিক বিকাশের চেষ্টাকে তারা নিজেদের সংকীর্ণ স্বার্থের বিরোধী বলে চিন্তা করতে থাকে। পূর্ববাংলাকে তারা পশ্চিম পাকিস্তানের দ্রব্যাদির বাজার এবং কর্মচারী ও সৈন্যবাহিনীর সংরক্ষিত এলাকা হিসাবে বজায় রাখার নীতি গ্রহণ করে। এই নীতি কার্যকর করতে তারা পূর্ববাংলার জনসাধারণের ভাষা বাংলাকে হীন এবং হিন্দু প্রভাবাধীন বলে পাকিস্তানে পরিত্যাজ্য বলে প্রচার করে ঊর্দূকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা বলে ঘোষণা করে।

১৯৪৮ সালের গোড়ার দিকে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল সাম্প্রদায়িক উগ্র ইসলামপন্থী মুহম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় ঘোষণা করেনঃ ‘উর্দূ, একমাত্র উর্দূই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’। তার এই উক্তি এবং পাকিস্তান সরকারের উল্লেখিত উপনিবেশবাদী আচরণ ও নীতির বিরুদ্ধে পূর্ববাংলার চেতনশীল ছাত্র ও মধ্যবিত্ত কর্মচারীদের মধ্যে ১৯৪৮ সাল থেকেই অসন্তোষ ধূমায়িত হতে থাকে। পূর্ববাংলার জনসাধারণ, বিশেষ করে কৃষক সমাজের মধ্যে তাদের জমি, খাজনা, ফসল ইত্যাদি সমস্যার ক্ষেত্রে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পূর্ব থেকেই কৃষক সমিতি ও কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে বিভিন্ন প্রকার আন্দোলন চলে আসছিল। এর মধ্যে উত্তরবঙ্গের তেভাগা, ময়মনসিংহের হাজংদের টঙ্ক এবং রাজশাহী নাচোল অঞ্চলের সাঁওতাল কৃষকদের আন্দোলন সরকারী নির্যাতনে পর্যুদস্ত হলেও বিশেষ খ্যাতি অর্জন করে এবং পূর্ববাংলার কৃষক সমাজে বিশেষ রাজনৈতিক চেতনার সঞ্চার করে।

পাকিস্তানের জনসংখ্যার শতকরা ৫৬ ভাগ পূর্ববাংলায় বাস করত। সমগ্র দেশের ১২ কোটি মানুষের মধ্যে সাতকোটির মুখের ভাষা বাংলা। সুতরাং বাংলা ভাষারই রাষ্ট্রভাষা হওয়া সঙ্গত ছিল।

ভাষা আন্দোলন ১৯৪৮ সাল থেকে বাংলাদেশের জীবনে ধরাবাহিক আন্দোলন। একদিকে পাকিস্তানী শাসকচক্রের ক্রমাধিক শোষণ এবং গভীরতর ষড়যন্ত্র, অপরদিকে ১৯৫৪, ১৯৬২, ১৯৬৬, ১৯৬৮-৬৯ এবং ১৯৭০ সালের রাজনীতিক, সামাজিক অর্থনৈতিক বিশিষ্ট আন্দোলনের মধ্যে ভাষা আন্দোলন পরিপক্বতা পেয়ে ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারী মাসেএবং বিশেষ করে ২১ ফেব্রুয়ারীর স্মৃতি দিবস থেকে বাংলাদেশের সর্বাত্মক জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের রূপ পরিগ্রহ করে। ৭ মার্চের তারিখে শেখ মুজিবুর রহমান রমনা ময়দানের জনসভায় আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ঘোষণা করে বলেনঃ “এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতা সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম।” ২৩ মার্চের ‘পাকিস্তান দিবস’কে ছাত্রসমাজ প্রতিরোধ দিবসে পরিণত করে। সিরাজ সিকদারের সংগঠন সবুজ পটভূমিতে রক্তসূর্য এবং বাংলাদেশের মানচিত্র অঙ্কন করে তারা এক নতুন জাতীয় পতাকার সৃষ্টি করে। ঘরে ঘরে পাকিস্তানী পতাকার বদলে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলিত হয়।

কিন্তু ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সর্বাধুনিক মারণাস্ত্র ট্যাঙ্ক, কামান, মেশিনগান নিয়ে বাংলাদেশের নিরস্ত্র জনতার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। বিরামহীন নিধনযজ্ঞ চলতে থাকে। লক্ষ লক্ষ লোক নিহত হয়। অগণিত নারী সম্ভ্রমহারা হয়। হাজার হাজার মানুষকে বন্দীশিবিরে নিক্ষেপ করা হয়। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রায় দুই কোটি মানুষ হৃতসর্বস্ব এবং আশ্রয়হীন হয়। এক কোটি লোক প্রাণ বাঁচাতে সীমান্তের উপারে ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করে। রক্তাক্ত অবস্থায় ২৬ শে মার্চ স্বাধীন বাংলা বেতারে ঘোষিত হয় স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার প্রতিষ্ঠার কথা। স্বাধীন আন্দোলনের জাতীয় নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী বন্দী করে পশ্চিম পাকিস্তানে অপসারণ করেও বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে দমন করতে পারে না।

জন্মলাভ করে ছাত্র-শিক্ষক-বুদ্ধিজীবি, শ্রমিক কৃষকের সন্তানদের মুক্তিবাহিনী। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকার প্রকাশ্যে এবং গোপনে পাকিস্তান সরকারের এই হত্যাকান্ডকে সমর্থন করে তাকে আরো নির্মম করে তোলার জন্য পাকিস্তান সরকারকে মারণাস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রাখে। কিন্তুভারত এবং সোভিয়েত ইউনিয়নসহ বিশ্বব্যাপী সংগ্রামী জনসাধারণ বর্বর পাকিস্তান সরকারের এই গণহত্যার নিন্দা করতে থাকে। বাংলাদেশের সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী এবং মুক্তিবাহিনী ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়েনের সক্রিয় সাহায্যের ভিত্তিতে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ চালাতে থাকে। অবশেষে ১৯৭১ সালের ৩রা ডিসেম্বর পাকিস্তান আন্তর্জাতিক জটিলতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা নিয়ে ভারতের উপর সর্বাত্মক হামলা শুরু করলে ভারতীয় বাহিনী পাল্টা আক্রমণ করে। ঢাকা ও বিভিন্ন শহরের পাকিস্তানী ঘাঁটিগুলোকে ভারতীয় বিমান বাহিনী ত্বরিৎ আক্রমণ করে বিধ্বস্ত করে দেয়। অবশেষে ১৬ তারিখে প্রায় ১ লক্ষ সৈন্য পাকিস্তানী সৈন্য আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্রবাহিনী ১৬ ডিসেম্বর তারিখে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাকে শত্রুমুক্ত করে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে পরিপূর্ণ করে।

১৯৫২ সালের ভাষার দাবিতে যে রক্তাক্ত সংগ্রাম শুরু হয় ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিণতি লাভ করে। বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন তাই ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসে এবং জাতীয় মুক্তির ক্ষেত্রে একটি অনন্য তাৎপর্য্যপূর্ণ আন্দোলন।

তথ্যসূত্র:
১. সরদার ফজলুল করিম; দর্শনকোষ; প্যাপিরাস, ঢাকা; জুলাই, ২০০৬; পৃষ্ঠা ২৫৭-২৫৯।

Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই “পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি” প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১০টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর “সমাজতন্ত্র” ও “মার্কসবাদ” গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন “বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা” নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top