You cannot copy content of this page
আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > বাংলাদেশ > ঠাকুরগাঁও জেলা প্রসঙ্গে

ঠাকুরগাঁও জেলা প্রসঙ্গে

ঠাকুরগাঁও উত্তরবঙ্গের একটি প্রাচীন জনপদ যা বর্তমানে বাংলাদেশের রংপুর বিভাগের একটি জেলা। ভৌগােলিক দিক থেকে ঠাকুরগাঁও অঞ্চল সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১০০ ফুটের বেশি উঁচু নয়। বেশির ভাগ ছােট নদী, শাখা নদী ও উপনদীর জল প্রবাহের কারণে প্রায় সবখানেই সমতল ভূমির সৃষ্টি হয়েছে। ভূ-প্রকৃতিগতভাবে বরেন্দ্র অতিপ্রাচীন এবং এর ইতিহাসও প্রাচীন। যতােদূর জানা যায় প্রাচীনকালে ঠাকুরগাঁও অঞ্চল পুণ্ড্রবর্ধনের অংশ ছিলাে। এই ভূখণ্ডই পাল শাসনামলে বরেন্দ্র অঞ্চল নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।

প্রাচীনকালে বৃহত্তর দিনাজপুর জেলার ভেতর দিয়ে তিনটি বড় নদী প্রবাহিত হতাে। সেগুলো হচ্ছে (১) পুনর্ভবা (২) করতােয়া ও (৩) আত্রাই। প্রাচীন ধর্মীয় গ্রন্থে এসব নদীর কথা উল্লেখ পাওয়া যায়। যেমন মহাভারতে করতােয়া, দেবীপুরাণ গ্রন্থে কল্লোলিনী আত্রাই এবং পুরাকাহিনীতে পুনর্ভবা নদীকে পবিত্র নদী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এই জেলার কূলবর্তী পুনর্ভবা নদীর তীরেই গড়ে উঠেছিল কোটিবর্ষ নগরী। মুসলিম শাসনামলে এই নদীর তীরেই গড়ে উঠছিলাে তুর্কি আক্রমণকারীদের দুর্গ দমদমা। সেই জন্য রামচরিত্র পুস্তকে সন্ধ্যাকর নন্দী এই নদীকে অতি ভয়ংকরী বলে চিহ্নিত করেছেন।

ঠাকুরগাঁওয়ের ইতিহাস

ঠাকুরগাঁওয়ের নদীগুলাের তীরেই বাঙালির প্রাচীনতম সংস্কৃতির অভ্যুদয় ঘটেছিলাে এবং বাঙালির চাষ-বাস, ধান, শস্য উৎপাদন, ঘরবাড়ি নির্মাণ ও জীবনের গতিপথ দেখা যায়। ৬০৬ অব্দে গৌড় দেশে শশাঙ্ক নামের একজন পরাক্রমশালী রাজা আক্রমণ করে গুপ্ত রাজাদের পরাজিত করে একটা স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। মুর্শিদাবাদের কর্ণ-সুবর্ণে তিনি রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেন। আবার অনেকের ধারণা শশাঙ্কের দ্বিতীয় রাজধানী ছিলাে উত্তরবঙ্গের পুণ্ড্রবর্ধন। শশাঙ্কই ছিলেন প্রথম বাঙ্গালি; যিনি বঙ্গদেশের বাইরে সাম্রাজ্য বিস্তারের সক্ষম হয়েছিলেন। পূর্বে বাঙালির এতাে বড় রাজ্য ছিলে না। (১) সমতট (২) গৌড় (৩) পুণ্ডু (৪) তাম্রলিপ্তি ও (৫) বঙ্গ নামেই রাজ্যগুলো পরিচিত ছিলো। একমাত্র সমতট ব্যতিত রাজা শশাঙ্কের রাজ্যের সবকটি অন্তর্ভুক্ত ছিলাে। এ থেকে প্রমাণিত করা যায় যে ঠাকুরগাঁও অঞ্চলও রাজা শশাঙ্কর রাজ্যের অধীনে ছিলাে।

আদিকাল থেকে শুরু করে তুর্কি অভ্যুদয় পর্যন্ত বিভিন্ন বিচিত্র রক্ত ও সংস্কৃতির ধারা এই অঞ্চলে বয়ে এসেছে এবং ধীরে ধীরে কোথায় কীভাবে তা বিলীন হয়ে গেছে তা কেউ সেভাবে বলতে পারেননি। কিন্তু মানুষ তার রক্ত দেহ গঠন, ভাষা, সভ্যতার বাস্তব উপাদান ও সংস্কৃতির ধারা কিছুটা রেখে যেতে বাধ্য হয়েছে। প্রাগৈতিহাসিককালে ভারতের উত্তর হিমালয় পাদদেশ সন্নিহিত অঞ্চলে মঙ্গলীয় বা মােঙ্গল জাতির বসবাস এই জেলায় বিস্তৃত ছিলাে। সময়ে সময়ে মােঙ্গল জাতি গােষ্ঠী ও ঠাকুরগাঁওয়ের দক্ষিণ বাঙালি জনগােষ্ঠির মধ্যে সংঘর্ষ বেঁধে যেত। স্থানীয়দের সাথে মােঙ্গল জাতিগােষ্ঠি না পেরে হিমালয় পাবর্ত্য অঞ্চলে আত্মগােপনে বসবাস করার আপ্রাণ চেষ্টা করেছে। আবার সুযােগ পেলেই মােঙ্গল জাতিগােষ্ঠি ঠাকুরগাঁও অঞ্চলে এসে বসবাস করার চেষ্টা করেছে যেখানে তাদের গােষ্ঠির লােকরা বাস করেছিলাে।

ঠাকুরগাঁও জেলার কৃতি ব্যক্তিত্ব

ঠাকুরগাঁও জেলার কীর্তিমান কয়েকজন ব্যক্তি এই জেলাকে তাঁদের কর্মের দ্বারা মহিমান্বিত করেছেন। ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে এই জেলার দুজন ব্যক্তিত্ব ও অগ্নিযুগের বিপ্লবী হচ্ছেন নরেন্দ্র চন্দ্র ঘোষ এবং স্বদেশরঞ্জন মুখোপাধ্যায়। এই জেলার ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব হচ্ছেন রাজা গণেশ। এছাড়াও অন্যান্য কীর্তিমান ব্যক্তি হচ্ছেন সুরবালা সেনগুপ্ত, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় এবং তৃপ্তি মিত্র। এই জেলা জন্ম নেয়া গুরুত্বপূর্ণ লেখক হচ্ছেন মো. আবদুল ওদুদ

ঠাকুরগাঁও জেলার নদনদী:

ঠাকুরগাঁও জেলায় অনেকগুলো নদী আছে। এই জেলার ছােট বড় অসংখ্য নদীর তীরেই প্রাচীন সময়ে গড়ে উঠেছিল বৌদ্ধবিহার, হিন্দুমন্দির, স্থানীয় শাসন কেন্দ্র, রাজধানী, ব্যবসা বাণিজ্যের নগর। এ নদীগুলাে হলাে আমনদামন, টাঙ্গন, নাগর, কুলিক, পুনর্ভবা, শুক, লাচ্ছি, ছিরামতি, ছোট ঢেপা, ছোট সেনুয়া, কাহালাই, গভুরা, যমুনা, বালিয়া, পিতানু, রুহিতা, কুমড়ি, গামারি, তুলাই, ডাহুক, তিরনাই, তিমাই, নোনা, পাথরাজ, তালমা, লাচ্ছি, ভুল্লী এবং সোজ ইত্যাদি। এই নদীগুলাে পূর্বে নাব্যতায় পূর্ণ ছিলাে এবং বৃহত্তর দিনাজপুর জেলার যাতায়াত ব্যবস্থাকে উন্নত করে রেখেছিলাে।

তথ্যসূত্র:

১. অজয় কুমার রায়, ঠাকুরগাঁও জেলার ইতিহাস, টাঙ্গন, দ্বিতীয় সংস্করণ আগস্ট ২০১৮, ঢাকা, পৃষ্ঠা ১৫-১৬।

Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই “পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি” প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১০টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর “সমাজতন্ত্র” ও “মার্কসবাদ” গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন “বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা” নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top