Main Menu

ছবিতে বাংলাদেশ — ঋত্বিক ঘটক

একটা বিরাট জোচ্চুরির ফলে বাংলাদেশ কেটে দু’ভাগ হয়েছে। এবং কর্তাব্যক্তিরা চেষ্টাচরিত্তির করে দুই ভাগ বাংলার মধ্যে যোগাযোগটা কেটে দিয়েছেন। কিন্তু বাংলা বাঙালির, ছবি যদি করতে হয় তা হলে পুরো বাংলাদেশকে ভুললে চলবে না।

এই কথাটা আমি আগেও নানাভাবে প্রকাশ করতে চেষ্টা করেছি, জানি না কতখানি কৃতার্থ হয়েছি। কথাগুলো মনে পড়ল। কারণ, আমার একটা পূর্ববাংলায় যাবার সামান্য অবকাশ সৃষ্টি হয়েছে এবং সেটা সম্পূর্ণ ছবি করারই জন্য। ১৯৬০-৬১ সালে আমার একটা অবকাশ এসেছিল, আমি জসীমউদ্দিনের নকশী কাঁথার মাঠ করব বলে ঠিক করেছিলাম। সঙ্গে আমার ছিলেন উদয়শঙ্কর। বিভিন্ন রাজনৈতিক কারণে আমাকে সেটা করতে দেওয়া হয়নি। এর পর এতদিন বাদে আবার মনে হয় যেন একটা সুযোগ এসেছে। আমি আমার আপ্রাণ চেষ্টা করে সে সুযোগের সদ্ব্যবহার করব। জানি না শেষ অবধি পেরে উঠব কিনা।

দেখুন, ক্যামেরার ব্যবহার বা শব্দের ব্যবহার এগুলো ব্যাপারের দিক থেকে সম্পূর্ণ এহ বাহ্য। ওগুলোকে গুলে খাওয়ার একটা প্রশ্ন আছে। কিন্তু ঘটনাটা যেখান থেকে চালু হয় সেটা হচ্ছে মন। পৃথিবীর কোনো-না-কোনো কোণায়, আত্মজ হয়ে পূর্ববাংলার গয়না নৌকোর মাঝিদেরকে পদ্মার উপর দিয়ে যেতে যেতে দেখেছি। সেই মুখ এখানে কি অশোভনীয় ভাবে গুছিয়ে তোলা সম্ভব ? আমি আমার ছোট্ট জীবনে বাংলাদেশের প্রত্যেক জায়গা ঘুরেছি। চাটগাঁ থেকে পুরুলিয়া পর্যন্ত। সংগ্রামী মানুষের স্বরূপ কোথাও কোথাও এক, কিন্তু মুখের রেখাগুলো এক-এক রকম চরিত্র গ্রহণ করে, ওইগুলো নিয়ে ছেলেখেলা করা কোনো কাজের কথা নয়। এই কিছুদিন আগে এক ভদ্রলোক জিজ্ঞাসা করছিলেন, তিতাস একটি নদীর নাম ওটা আমি করতে চাই। ঋত্বিকবাবু, আপনি কি বলতে পারেন, যে কোথায় সেরকম চেহারা পাওয়া যাবে? আমি বললাম, আপনি যদি শুধু প্রাকৃতিক চেহারা মেলাবার চেষ্টা করেন তা হলে সুন্দরবনের ভিক্টোরিয়া পয়েন্ট এবং লালগোলার থেকে নীচে নেমে জলঙ্গীতে পদ্মা পেতে পারেন। কিন্তু মুখগুলো পাবেন কোথায় ? আমি ব্যক্তিগতভাবে ওই জোচ্চুরিতে জড়িত হতে প্রস্তুত নই। আমি ভৈরববাজার দেখেছি, মেঘনার সে চেহারা দেখেছি। এককালে তিতাস ধরেও গাঁয়ের মধ্যে গিয়েছি। অদ্বৈত মল্লবর্মণের অমন অপূর্ব লেখাটি আমি খুন করতে চাই না। আপনি অন্য ডিরেকটার দেখতে পারেন।

ভদ্রলোক বোধহয় আমার কথায় একটু মর্মাহতই হলেন এবং চলে গেলেন। কিন্তু তিনি আমার মর্মব্যথাটা বোঝেন নি।

ক্যামেরা এত বেশি সত্যবাদী, যে ওটাকে নিয়ে উলটোপালটা কারবার করা যায় না। ক্যামেরার বিভিন্ন লেন্স আছে, তাদের বিভিন্ন দায়িত্বও আছে, এবং সবচেয়ে বড়ো, যেটা কথা বলে composition-যার মধ্যে দিয়ে প্রায় সব কথাই বলা যায়। শব্দেরও একটা বিশেষ মূল্য আছে, তার ব্যবহারেও অনেক কিছু মানুষের মনে গেঁথে দেওয়া যায়। কিন্তু এগুলো হচ্ছে গতিপথের অংশ মাত্র। ছবি কাটাকুটিতেও অনেক কিছু বলা যায়। কিন্তু সেটাও একটা ব্যবহারিক অংশ মাত্র। আসল কথা হচ্ছে মন।

সেই মন নিয়ে আমি পূর্ববাংলায় যাচ্ছি। যে মানুষগুলোকে ছোটোবেলা থেকে দেখেছি, যারা আমাদের পাবনার ছোটো গ্রামে অষ্টমীর দিন এসে পায়ে মল পরে চারি নাচ করত। সেই ভূমিহীন মুসলমান কৃষকগুলোর চেহারা আমার চোখের সামনে জ্বলজ্বল করছে। শীতলক্ষা বুড়িগঙ্গা, পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা এদেরকে আজও ভোলার ক্ষমতা আমার নেই। এদের দুপাশের গ্রামের ওই যে কালোকোলো বাচ্চাগুলো, ওই যে আদুর গায়ে মহিলারা চান করতেন, তারা খেটে খাওয়া মানুষ এবং সারা জীবন বঞ্চিত। দেখি তাদের নিয়ে কিছু করে উঠতে পারি কিনা।

বাঙালিদের প্রথমে বুঝতে হবে আমরা বাঙালি। আমাদের ঐতিহ্য সুবিপুল। ছবিই হোক বা আর কিছুই হোক, আমরা সর্বপ্রথমে বাঙালি। হিন্দু-মুসলমান, সম্পূর্ণ বানানো কথা। সপ্তম শতাব্দীতে হিন্দু কোথায় ছিল বাংলাদেশে? দ্বাদশ শতাব্দীর আগে আউলিয়ারা যতদিন বাংলাতে আসেনি ততদিন এই যে গরিব বৌদ্ধ জনগণ, তাদের মুসলমান করল কে? ধর্ম আমি মানি না। আমি বাঙালিকে বাঙালি বলে পুজো করি।

এ-সব কথা হয়তো একটা ছবি-করিয়ের মুখ থেকে শুনে আপনাদের বিশ্বাস হচ্ছে না। কিন্তু আমি শুধু একটি ছবি করিনি। আপনারা যে-কোনো পণ্ডিতকে জিজ্ঞাসা করতে পারেন, জানতে পারবেন যে আমি একটাও বাজে কথা বলিনি।

তথাকথিত ছবি-করিয়েদের মতো আমি বকবক করতে পারলাম না, আপনারা আমায় ক্ষমা করবেন। সেইসঙ্গে আমার শ্রদ্ধাও গ্রহণ করবেন।

তথ্যসূত্র:

১. ঋত্বিককুমার ঘটক; চলচ্চিত্র মানুষ এবং আরও কিছু, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা; পুনর্মুদ্রণ নভেম্বর ২০১৫; পৃষ্ঠা ১৯৬-১৯৭।

আরো পড়ুন






Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *