You are here
Home > প্রাণ > উদ্ভিদ > কুলেখাড়া ভেষজ গুণাগুণ সম্পন্ন একটি শাক

কুলেখাড়া ভেষজ গুণাগুণ সম্পন্ন একটি শাক

ক্ষরিক বা কুলেখাড়া বা গোকুলকাঁটা
বৈজ্ঞানিক নাম: Hygrophila auriculata, Schumach..
সমনাম: Astercantha longifolia (L.) Nees; Barleria auriculata Schumach.; Barleria longifolia L.;
 Hygrophila schulli M. R. Almeida & S. M. Almeida; Hygrophila spinosa T.Anderson
সাধারণ নাম: Marsh Barbel
বাংলা নাম: কুলেখাড়া বা গোকুলকাঁটা
সংস্কৃত নাম कोकिलाक्ष
জীববৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস
জগৎ/রাজ্য: Plantae
বিভাগ: Angiosperms
অবিন্যাসিত:Eudicots
বর্গ: Lamiales
পরিবার: Acanthaceae 
গণ: Hygrophila 
প্রজাতি: Hygrophila auriculata, Schumach..

পরিচিতি: সাধারণত পুরনো মূল থেকে ফে’কড়ি বেরিয়ে গাছও হয়, আবার বীজ থেকেও গাছ হয়; বর্ষাকালে যখন নতুন গাছ গজায় তখন দেখতে অনেকটা হিঞ্জে বা হেলেঞ্চা (Enhydra fluctuans) শাকের গাছের মতো, তবে তার পাতা এই হিণ্ডে বা হেলেঞ্চা শাকের পাতা থেকে একটু লাম্বা; সমগ্র পাতার গায়ে সরু শুয়োর মতো কাঁটা আছে। প্রথমদিকে গাছে কোনো কাঁটা হয় না; আশ্বিন-কার্তিকের পর থেকে পাতার গোড়া থেকে কাঁটা বেরোয়, ক্ষুপ জাতীয় গাছ, দেড় দুই ফুট উচু হয়, আবার জায়গা হিসেবে ৩/৪ ফুটও উচু হতে দেখা যায়; যেখানে হয় সেখানে ঝোপ হ’য়ে যায়, সাধারণতঃ জমির আলে অথবা রাস্তার পাশে অল্প জল যেখানে থাকে, যাকে আমরা গাঁয়ের ভাষায় পগার বলি, সেখানে হয়ে থাকে। মূলে বহু, শিকড় হয়, গাছের কাণ্ডটা একটি ফাঁপা এবং চতুষ্কোণ অর্থাৎ চারকোণা হয়; ফুল হয় অগ্রহায়ণ-পৌষ মাসে, রং অল্প বেগুনি। বীজ ভিজালে চটচটে ও লালার মতো হয়। একে চলতি কথায় কুলেখাড়ার গাছ, আবার কোন কোন জায়গায় কুলপো শাক বলে। এটির হিন্দি নাম তালমাখনা।

রোগ প্রতিকারে

১. আমাশয় বা শোথেঃ- পায়ের চেটো (যে অংশটার ওপর ভর দিয়ে আমরা হেঁটে বেড়াই) ফুলে যায়, এটা সাধারণতঃ পেটে আম (অপক্ক মল) জমার জন্য হয়; সেক্ষেত্রে কেবলমাত্র পাতার রস (ডাঁটা বাদ) ৪ চা-চামচ একটু গরম করে ছেকে, সকালে ও বিকালে দু’বার খেতে হবে; এর সঙ্গে ২/৫ ফোঁটা মধু দেওয়াও চলে। এর দ্বারা ঐ ফুলোটা চলে যাবে।

২. পাণ্ডু রোগে – এ রোগের লক্ষণ হ’লো শরীরের রং ফ্যাকাসে হওয়া (হলদে নয়), যাকে প্রচলিত ভাষায় বলা হয় ‘এনিমিয়া’। এক্ষেত্রে অমোঘ ঔষধ হ’লো, কেবলমাত্র কুলেখাড়া পাতার রস ৪ চা-চামচ একটু গরম করে দু’বেলা খাওয়া।

৩. বাতরক্ত- যে রোগে শরীরে ক্ষত হয়, ফেটে যায়, রস গড়ায়, আয়ুর্বেদে এটাকে বলা হয় বাতরক্ত; এক্ষেত্রে সমগ্র গাছকে থেতো করে ৪ চা-চামচ রস একটু গরম করে দু’বেলা খেতে হয়। এটা কিন্তু বাগভটের উপদেশ। এর সঙ্গে ঐ রস যদি গায়ে মাখা যায় ত’তে আরও তাড়াতাড়ি উপশম হয়। এটা বাংলার বৈদ্যককুলের প্রত্যক্ষ উপলব্ধ যোগ।

৪. অনিদ্রায়ঃ- কুলেখাড়া শিকড়ের (মূলের) রস ২ থেকে ৪ চা-চামচ সন্ধ্যার পর খাওয়ালে সুখনিদ্রা হয়, এটা হরীত সংহিতার উপদেশ।

৫. অশ্মরী (পাথুরী) রোগ – সে পিত্তের থলিতেই হোক আর কিডনিতেই হোক, পিত্তবিকারে যে পাথুরী (stone) হয়, সেখানে কুলেখাড়া বীজ আধ চা-চামচ আধ গ্লাস জলে গুলে সবটাই খেতে হয়।

৬. দীর্ঘস্থায়ি সম্ভোগে – যাঁরা ইচ্ছুক তাঁরা শোধিত আত্মগত (আলকুশী Mucuma prurita) বীজের গুড়ো আধ চামচ ও কুলেখাড়া বীজের গুড়ো আধ চামচ একসঙ্গে গরম দুধে গুলে খাবেন, এটার দ্বারা ঐ উদ্দেশ্যটা সিদ্ধ হবে। তবে এখানে একটা কথা বলা দরকার যে “তালমাখনা’ হলো কুলেখাড়া বীজ-এই যে অনেকের ধারণা আছে সেটা কিন্তু ঠিক নয়; বাজারে যেটা তালমাখনা বলে বিক্রি হয় ওটা পৃথক দ্রব্য, আর বাজারে যেটা কুলেখাড়া বা কোকিলাক্ষ বীজ বলে বিক্রি হয় ওটাও কুলেখাড়া বীজ নয়। আসল কুলেখাড়া বীজের রং অবিকল কোকিলের চোখের রং হবে।

৭. শোথেঃ- সে যকৃৎ দোষেই হোক আর কিডনির দোষেই হোক, এই শোথ চলে যায়—যদি সমগ্র গাছ অন্তর্ধূমে দগ্ধ করে অর্থাৎ মুখঢাকা পাত্রে পুড়িয়ে যে ছাই পাওয়া যাবে, সেটাকে গুড়ো করে দু’বেলা এক গ্রাম (১৫ গ্রেণ) করে ঠান্ডা জল দিয়ে খাওয়া যায়, এর দ্বারা প্রস্রাব পরিষ্কার হবে এবং কয়েকদিনের মধ্যেই ফুলো কমে যাবে; এটা চক্রদত্তের উপদেশ।

৮. রক্তপাতরোধেঃ- উড়িষ্যার গ্রামাঞ্চলে ক্ষেত-খামারে (ধান কাটার সময়) কোনো কিছুতে হাত বা পা কেটে বা ছ’ড়ে গিয়ে রক্ত পড়তে থাকলে এই পাতাকে থেতো করে ঐ কাটায জায়গায় চেপে দিয়ে বোধে দিলে; এর দ্বারা অতি শীঘ্রই রক্ত বন্ধ হয়ে যায়। আর ক্ষতও শুকিয়ে যাবে।

৯. হারপিসে :- একে পোড়া নারেঙ্গাও বলে, এটি পিত্ত-শ্লেষ্মা-বিকৃতিজনিত রোগ; এ রোগে কুলেখাড়ার পাতা, কাঁচা হলুদ একসঙ্গে বেটে লাগাতে হয়, এটাতে জ্বালা যন্ত্রণা চলে যাবে এবং ক্ষতও শুকিয়ে যাবে।

১০. শীতলী রোগে :- পায়ের শিরাগুলি কালো ও মোটা হয়ে কুচকে কোঁচোর মতো জড়িয়ে যায়, তার জন্য যন্ত্রণাও হয়। এক্ষেত্রে ঐ গাছপাতা বাটা লাগালে কাজ হবে, এর সঙ্গে ঐ কুলেখাড়ার পাতা রস করে ৪/৫ চা-চামচ ক’রে খেতে হবে।

১১. বাজীকরণে – অকালে যাদের যবজনোচিত রতিশক্তি কমে গিয়েছে, সেক্ষেত্রে এই কুলেখাড়ার মূল চূর্ণ ২ গ্রাম দুধ সহ খেলে এই অসুবিধেটা কিছুদিনের মধ্যে উপশমিত হয়। এটা চরক সংহিতার চিকিৎসাসস্থানে ২৬ অধ্যায়ে বলা হয়েছে। এই উদ্দেশ্যে সুশ্রুত সংহিতায়ও ব্যবস্থা দেওয়া হয়েছে ধারোঞ্চ দুধের সঙ্গে।

১২. ক্রোধী- কোন অল্প কারণে হঠাৎ রেগে যায়, হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়, বিশেষতঃ শৈশবাবস্থায়ও এটা দেখা যায় যে, অনেকে জেদীও থাকে; এক্ষেত্রে এই কুলেখাড়া পাতা ও ডাঁটা দিয়ে ঝোল করে বেশ কিছুদিন খাওয়ালে ওটার পরিবর্তন দেখা যাবে। আরও একটা লাভ হবে এটাতে যকৃৎকেও (লিভারকে) সক্রিয় করবে।

সতর্কীকরণ: ঘরে প্রস্তুতকৃত যে কোনো ভেষজ ওষুধ নিজ দায়িত্বে ব্যবহার করুন।

তথ্যসূত্রঃ

১. আয়ূর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্রচার্য: চিরঞ্জীব বনৌষধি‘ খন্ড ২, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১৩৮৪, পৃষ্ঠা,২১-২৫।

আরো পড়ুন

Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম বই প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১০টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর সমাজতন্ত্র মার্কসবাদ গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top