Main Menu

বেগুনের নানাবিধ গুনাগুণ

বেগুনেরও (ইংরেজি: Eggplant) গুণ অনেক। বেগুন বাজারে দুরকম রঙের পাওয়া যায়- সাদা ও বেগুনি। বেগুনি বা কালো বেগুনের গুণ অনেক বেশি। বেগুন যত কচি হবে তাতে গুণ তত বেশি থাকবে। এই রকম কচি বেগুন খেলে শরীরের বল বৃদ্ধি পাবে। অত্যাধিক বীজযুক্ত বেগুন বিষের মতো ক্ষতিকর বলে মনে করা হয়। সংস্কৃত শ্লোকেই আছে ‘বৃম্ভাকং বহু বীজাণাং বিষম্।’ বৃন্তাক অর্থাৎ বেগুন বেশি বীজযুক্ত হলে বিষ হয়।

খাওয়া-দাওয়ায় বেগুনের ব্যবহার ও গুনাগুণ:

বসন্তকালে বেগুন খাওয়া ভাল। এতে কফ নাশ হয়। হিং ফোড়ন দিয়ে বেগুনের তরকারি তেল দিয়ে বাপ্পা করলে ও খেলে যাঁদের বায়ুর প্রকোপ বেশি তাঁদের উপকার হবে। যাঁদের কফের প্রকোপ বেশি তাঁদেরও শীতকালে হিং ফোড়ন দেওয়া ও তেলে রান্না করা কচি বেগুনের তরকারি নিয়মিত খেলে সর্দিকাশি কমবে।

বেগুন মধুর, তীক্ষ্ণ ও উষ্ণ। পিত্তনাশক, জ্বর কমায়, খিদে বাড়ায়। পরিপাক করা সহজ এবং পুরুষত্ব বৃদ্ধি করে অর্থাৎ বীর্যবর্ধক। সুকোমল অর্থাৎ কচি, নরম বেগুন ভোজনের দিক থেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ এবং শরীরের সব দোষই দূর করে। বেগুন পোড়া যদিও একটু পিত্তের প্রকোপ করতে পারে। কিন্তু খুব সহজেই হজম হয়, খিদে বাড়ায়। মেদ বৃদ্ধি রোধ করে। যাঁরা মোটা হতে চান না তাঁদের পক্ষে বেগুন পোড়া খাওয়া ভাল। আমাশা হলেও বেগুন পোড়া খেলে উপকার পাওয়া যেতে পারে। অবশ্য বেগুন পোড়া বা বেগুনের তরকারিতে অতিরিক্ত, তেল আর নুন দিলে তা কিছুটা গুরুপাক হয়ে যায়। সঠিক পরিমাণ মত তেল দিয়ে রান্না করলে বা বেগুন পোড়া মাখলে বা খেলে শরীর স্নিগ্ধ হয়। বেগুন ও টমেটো দিয়ে স্যুপ রান্না করে খেলে মন্দাগ্নি অথাৎ খিদে না পাওয়ার অস্বস্তি দূর হয়, শরীরে নতুন করে আমাশার আম সৃষ্টি হওয়াও বন্ধ হয়ে যায়।

সুস্থ থাকতে বেগুন:

১. লিভারের অসুখে: কচি বেগুন পুড়িয়ে রোজ সকালে খালি পেটে একটু গুড় মিশিয়ে খেলে ম্যালেরিয়ার দরুণ লিভার বেড়ে যাওয়া কমে। এছাড়াও লিভারের দোষের জন্যে যদি চেহারায় হলদেটে ভাব আসে সেটাও ক্রমশ কমে যায়।

২. কম ঘুমে: যাঁদের ঘুম ভাল হয় না তাঁরা যদি একটু বেগুন পোড়ায় মধু মিশিয়ে সন্ধ্যেবেলা চেটে চেটে খান তাহলে তাঁদের রাত্তিরে ভাল ঘুম হবে।

৩. বায়ুর প্রকোপে: বেগুনের তরকারি, বেগুন পোড়া, বেগুনের স্যুপে রোজ যদি একটু  হিং ও রসুন মিশিয়ে খাওয়া যায় তাহলে বায়ুর প্রকোপ তো কমেই সে কথা আগেই বলা হয়েছে। যদি কারো পেটে বায়ু গোলকের সৃষ্টি হয়ে থাকে সেটাও কমে যায় বা সেরে যায়।

৪. ঋতুর সমস্যায়: মহিলাদের ঋতু ঠিক মতো না হলে বা কোনো কারণে বন্ধ হয়ে গেলে তাঁরা যদি শীতকালে নিয়ম করে বেগুনের তরকারি বাজরার রুটি এবং গুড় খান। তাহলে উপকার পাবেন। অবশ্য যাঁদের শরীরে গরমের ধাত বেশি তাঁদের পক্ষে এটা না খাওয়াই ভাল।

৫. প্রস্রাবের সমস্যায়: এছাড়া বেগুনের আরও একটি গুণ হলো বেগুন মূত্রবর্ধক। মূত্রকৃচ্ছতা অর্থাৎ প্রস্রাব কম হলে কচি বেগুনের তরকারি (তেল ও হিং ফোড়ন দিয়ে রান্না করা) বা বেগুন পোড়া খেলে প্রস্রাবের পরিমাণ বাড়বে। নিয়মিত বেগুন খেলেও মূত্রকৃচ্ছ্রতা সারে। যদি মুত্রথলিতে পাথর হয়, তবে  প্রস্রাব পরিষ্কার হওয়ায় প্রারম্ভিক অবস্থার কিডনির ছোট পাথরও গলে গিয়ে প্রস্রাবের সঙ্গে বেরিয়ে যায়।

৬. অর্শ রোগে: মুরগির ডিমের সাইজের ছোট গোল সাদা বেগুন অর্শের পক্ষে উপকারী।

৯. ফোঁড়ায়: বেগুনের পুলটিস বাঁধলে ফোড়া তাড়াতাড়ি পেকে যায়।

১০. ধুতরার বিষে: বেগুনের রস খেলে ধতুরোর বিষ নেমে যায়।

বৈজ্ঞানিকদের মতে: বেগুনে কার্বোহাইড্রেট, ফ্যাট, প্রেটিন এবং কিছু কিছু লবণ কম বা বেশি মাত্রায় আছে। এতে ভিটামিন এ, বি, সি ও লােহাও আছে। খাদ্যগুণ ও ভিটামিন বেশি থাকায় এবং দামেও সস্তা হওয়ায় বেগুন নিয়মিত খাওয়া যেতে পারে।

তাহলে দেখা যাচ্ছে নাম বেগুন হলে কি হবে বেগুনে অনেক গুণ আছে। বেগুনের এই সব গুণ দেখে এবং বেগুনের তরকারি ও বেগুন পােড়া খেয়ে মুগ্ধ হয়ে একজন বৈদ্য-কবি তাঁর ক্ষেম-কুতুহল’ নামক গ্রন্থে বেগুনকে ‘শাক-নায়ক অথাৎ তরকারির মধ্যে প্রধান ভূমিকা, এই উপাধি দিয়েছেন।

বেগুনের আরও গুণ এবং অন্যান্য নাম:

বেগুনের গুণের আরও অনেক ব্যাখ্যান আছে, সংস্কৃতে আছে বেগুনের আরও অনেক নাম। সংস্কৃতে গোল বেগুনকে বলা হয় বৃত্তফলা। যে বেগুনে শাঁস বেশি থাকে অথাৎ পুরুষ্টু বেগুনকে বলা হয় মাংসফলা। বেগুন অনেক দিন ধরে গাছে থাকে বলে বলা হয় সদাফলা। বাত রোগের পক্ষে উপকারী বলে বেগুনের আর একটি নাম বাতিঙ্গা। বেগুন অনিদ্রা রোগ দূর করে এবং বেগুন খেলে ভাল ঘুম হয় বলে এর আর একটি নাম নিদ্রালু।

ভাবপ্রকাশের মত, অনুসারে বেগুন স্বাদু, তীক্ষ, উষ্ণ, কটুবিপাক, অপিত্তকর, জ্বর, বাত ও কফনাশক, অগিবর্ধক, শুক্রজনক ও লঘুপাক। বার মাস যে বেগুন পাওয়া যায় তা বায়ু ও কফ নাশ করলেও রক্তপিত্তকর। পুরনো গাছের ও বেশি বীজযুক্ত বেগুন খেলে চুলকুনি ও চর্মরোগ হয় সেইজন্যে যাঁদের চুলকুনি বা পাঁচড়া আছে তাঁদের বিচিওয়ালা বেগুন একেবারেই খাওয়া উচিত নয়।

বৈদ্যরাজ চরক, বলেছেন বেগুনের রসে মধু মিশিয়ে খেলে কফ জনিত রোগ সারে। বিখ্যাত বৈদ্য চক্রদত্ত বলেছেন বেগুন জ্বরয় সেইজন্যে কচি ও শাঁসালো বেগুন খেলে জ্বর সারে। বৈদ্য বঙ্গসেন বলেছেন আগের দিন সন্ধ্যেবেলা বেগুন ভাল ভাবে সেদ্ধ করে পরের দিন তার শাঁস মধু দিয়ে মেখে খেলে অনিদ্রা দূর হয়। বেগুন একেবারে পুড়িয়ে ছাই করে সেই ছাই বা ভস্ম গায়ে মাখলে চুলকুনি ও চর্মরোগ সারে।

বেগুনের বীজ ও পাতা এবং আঙুলহাড়া সারানোয় বেগুন:

ক. বেগুনের বীজ খেলে অম্বল হয়। বেগুনের বীজ উত্তেজক।

খ. কোষ্ঠ সাফ করে।

গ. এরকম কথাও বলা হয়ে থাকে যে বেগুনের পাতার রস খেলে রক্তওঠা তৎক্ষণাৎ বন্ধ হয়। ঘ. বলা হয়ে থাকে আঙুলহাড়া হলে আঙুল যখন প্রথমদিকে ব্যথায় টনটন করতে থাকে একটি সরু লম্বা বেগুনের শাঁস কিছুটা বের করে নিয়ে সেই বেগুনের মধ্যে আঙুলটা ঢুকিয়ে রাখলে অনেক আরাম পাওয়া যায় ও ব্যথা কমে।

ঙ. বেগুন পাতার রস খেলে সব রকমের বিষদোষ দূর হয় এ কথাও বলা হয়।

বেগুনের নাম নীলা: সংস্কৃত ভাষায় বেগুনের নাম বার্তাকু সকলেরই জানা। কিন্তু রং কালো বা নীল বলে এর আরেকটি নাম নীলা। খেতে অতি সুস্বাদু বলে এর আর একটি নাম নৃপপ্রিয় ফলা।

বেগুন ও টমেটো বা টোম্যাটোর স্যুপের উপকারীতা:

তৈরি করার পদ্ধতি: আধ কেজি কচি বেগুন প্রেশার কুকারে অল্প জল দিয়ে সেদ্ধ করে নিন। আটটি আস্ত টোম্যাটো এক টুকরো আদা ছেচা, ৬ কোয়া রসুন অল্প জল দিয়ে প্রেশার কুকারে সেদ্ধ করুন।

টোম্যাটোর খোসা ছাড়িয়ে নিন বিচি ফেলে দিন। এবারে সেদ্ধ বেগুন ও সেদ্ধ টোম্যাটো জলসুদ্ধ একসঙ্গে চটকে মসৃণ করে নাইলনের ছাকনি দিয়ে ছেকে নিন। আন্দাজ মতো নুন ও অল্প চিনি দিয়ে কম আঁচে বসিয়ে দিন। সমস্তটা ফুটে উঠলে গোলমরিচের গুঁড়ো দিন। ১ চা চামচ এরারুট অল্প জলে গুলে মিশিয়ে দিন ও নেড়ে ঘন করে নিন।

এবারে নামিয়ে নিয়ে ছোট ছোট কাঁচের বাটিতে ঢেলে ওপরে ছোট এক টুকরো করে মাখন বা মাজারিন দিয়ে গরম গরম পরিবেশন করুন। মচমচে করে সেঁকা টোস্টের সঙ্গে জলখাবার হিসেবে খাওয়া যায় বা রাত্তিরে রুটি খাওয়ার আগে এক বাটি করে খাওয়া যায়। আগেই বলা হয়েছে বায়ু ও কফের প্রকোপে যাঁরা কষ্ট পাচ্ছেন বা যাঁরা অখিদেতে ভুগছেন বা যাঁদের আমাশার ধাত আছে তাঁরা এই স্যুপ নিয়ম করে খেলে উপকার পাবেন।

তথ্যসূত্রঃ

১. সাধনা মুখোপাধ্যায়: সুস্থ থাকতে খাওয়া দাওয়ায় শাকসবজি মশলাপাতি, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, নতুন সংস্করণ ২০০৯-২০১০, পৃষ্ঠা, ৭৬-৮০।

আরো পড়ুন

জন্ম ৮ জানুয়ারি ১৯৮৯। বাংলাদেশের ময়মনসিংহে আনন্দমোহন কলেজ থেকে বিএ সম্মান ও এমএ পাশ করেছেন।

তাঁর প্রকাশিত প্রথম কবিতাগ্রন্থ স্বপ্নের পাখিরা ওড়ে যৌথ খামারে । বিভিন্ন সাময়িকীতে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া শিক্ষা জীবনের বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে রোদ্দুরে ডট কমের সম্পাদক।






Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *