আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > প্রাণ > উদ্ভিদ > বৃক্ষ > রক্তজবা ফুল এশিয়ার এক বৈচিত্র্যময় ফুল

রক্তজবা ফুল এশিয়ার এক বৈচিত্র্যময় ফুল

বৈজ্ঞানিক নাম: Hibiscus rosa-sinensis L., Sp., Pl.: 694 (1753). বাংলা নাম: রক্তজবা, জবা, জবা কুসুম ইংরেজি নাম: China Rose, Chinese hibiscus, Shoe Flower. জীববৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস জগৎ/রাজ্য: Plantae (অবিন্যাসিত): Angiosperms (অবিন্যাসিত): Eudicots (অবিন্যাসিত): Rosids বর্গ: Malvales পরিবার: Malvaceae গণ: Hibiscus প্রজাতি: H. rosa-sinensis বৈজ্ঞানিক নাম: Hibiscus rosa-sinensis.

ভূমিকা: রক্তজবা (বৈজ্ঞানিক নাম: Hibiscus rosa-sinensis, ইংরেজি নাম: China Rose, Chinese hibiscus, Shoe Flower) মালভেসি পরিবারের হিবিস্কাস গণের একটি ছোট বৃক্ষ। আমাদের দেশের অনেকেই বাড়ির আঙিনা কিংবা বাসাবাড়ির ছাদের টবে নানা জাতের ফুলগাছ লাগিয়ে থাকে। এসব গাছের মধ্যে জবা একটি। দেশের সর্বত্রই এই ফুলের চাষ হয়। চিন দেশ এর উৎপত্তি স্থান।

বর্ণনা: রক্তজবা গাছ টি ২-৪ মি. উঁচু, কাণ্ড খসখসে, পাতা মসৃণ ও চকচকে, ফুল ১০-১৫ সে. মি. চওড়া। ফুল এক ক অথবা দ্বৈত। গাছটি কষ্টসহিষ্ণু, অল্প যত্নে জন্মে। শাখা কলম দ্বারা এর বংশ বিস্তার হয়। প্রায় সারা বছরই গাছে ফুল ফোটে। বর্তমানে অনেক ধরনের হাইব্রীড জবার অস্তিত্ব পাওয়া যায় এবং সেগুলোর মধ্যে বর্ণবৈচিত্র প্রচুর। দেখতে সুদৃশ্য হওয়াতে এদেরকে আমরা সাধারণত বাগানে শোভাবর্ধনকারী উদ্ভিদ হিসাবে লালন করে থাকি।

জবা হচ্ছে গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদ যারা ৪ মিটার পর্যন্ত উঁচু হয়। কান্ড বহুল শাখান্বিত,কাষ্ঠল, মসৃণ। পাতা ২-৫ সেমি লম্বা বৃন্তযুক্ত, মসৃণ অথবা  কিছু তারকাকার এবং সাধারণ রোমের মিশ্রণে রোমাবৃত, ফলক ২-১০ x ১.৫-৮.০ সেমি, ডিম্বাকার থেকে ডিম্বাকারভল্লাকার অথবা উপবৃত্তাকার, কীলকাকার, দীর্ঘা, কচ থেকে দন্তর, কিনারা কখনও অখন্ড অথবা শীর্ষের দিকে সভঙ্গ, নিম্নপ্রান্ত ৩-৫ করতল শিরিত, মসৃণ অথবা নিম্নপৃষ্ঠে বিক্ষিপ্তভাবে কিছু তারকাকৃতি রোম বর্তমান, উপপত্র ৩-১০ মিমি লম্বা, রৈখিক থেকে রৈখিক-ভল্লাকার অথবা তুরপুন আকার, মসৃণ।

পুষ্প একক, কাক্ষিক, ঋজু থেকে অর্ধঝুলন্ত। পুষ্পবৃন্তিকা কমবেশী পত্রবৃন্তের সমান লম্বা, মধ্যাংশের উপরে সন্ধিত, রোমশ। উপবৃতির খন্ড ৫-৮টি, বৃতির প্রায় অর্ধেক লম্বা, ভল্লাকার, নিম্নপ্রান্ত যমক, বিক্ষিপ্ত কিছু তারকাকার রোমযুক্ত। বৃতি ঘন্টাকার, ৫-খন্ডকযুক্ত, খন্ডগুলো ১.৫-২.০ সেমি লম্বা, নিম্নাংশ মাঝখান পর্যন্ত যমক, ভল্লাকার থেকে ব-দ্বীপ সদৃশ, তীক্ষ থেকে দীর্ঘাঘ, ক্রমশ: তারকাকার রোমশ। দলমন্ডল আড়াআড়িভাবে ৫১০ সেমি, পাপড়ি ৫টি, বিডিম্বাকার, ৪-৬ X ২-৪ সেমি, নানান বর্ণের, সাধারণত লাল, গোলাপী – হলুদ।

পুংকেন্দ্রীয় স্তম্ভ ৫-৮ সেমি লম্বা, পাপড়ি থেকে কিছুটা লম্বা, পরাগধানীবাহক শুধুমাত্র উপরের অর্ধাংশে বিদ্যমান, পরাগধানী বৃক্কাকার। গর্ভাশয় ৫-কোষীয়, গর্ভদন্ড ১টি, দূরস্থ ৫-শাখান্বিত, গর্ভমুণ্ড চাকতিসম। বাংলাদেশে ইহার ফল ধরে না। ফুল ধারণ ঘটে  জানুয়ারী থেকে ডিসেম্বর মাসে।

টীকা: বাংলাদেশে এই প্রজাতির দুইটি উপপ্রজাতি বিদ্যমান যেমন উপপ্রজাতি rosa-sinensis এবং উপপ্রজাতি tiloflorus (Griff. ex Mast.) Hochr., যারা পত্রকিনারার বৈশিষ্টে পার্থক্যমন্ডিত। বর্তমানে সংকরায়নের মাধ্যমে উদ্ভূত অনেক আবাদী জাতের চাষ হচ্ছে যেগুলিতে নানা বর্ণে রঞ্জিত বিভিন্ন আকারের পাতা এবং নানা বর্ণের ফুল ফোটে।

ক্রোমোসোম সংখ্যা:  2n = ৩৬, ৪২, ৭২, ৯২ (Fedorov, 1969).

আবাসস্থল: বসতভিটার বাগান এবং নগরাদ্যোনের একটি অতি পরিচিত শোভাবর্ধক উদ্ভিদ।

বিস্তৃতি: ইহার আদি নিবাস সম্ভবত চীন (Kirtikar et al., 1935), বর্তমানে গ্রীষ্মমন্ডল এবং অর্ধগ্রীষ্মমন্ডলের সর্বত্র শোভাবর্ধক হিসেবে লাগানো হয়। বাংলাদেশে ইহা একটি অতি প্রিয় শোভাবর্ধনকারী ঝোপ এবং দেশের সর্বত্র ফুলের বাগানে ইহা লাগানো হয়।

অন্যান্য তথ্য: বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের ৯ম খণ্ডে (আগস্ট ২০১০) রক্তজবা প্রজাতিটির সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, এদের শীঘ্র কোনো সংকটের কারণ দেখা যায় না এবং বাংলাদেশে বর্তমান অবস্থায় এই প্রজাতিটিকে আশংকা মুক্ত (lc) হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশে রক্তজবা সংরক্ষণের জন্য কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। প্রজাতিটি সম্পর্কে প্রস্তাব করা হয়েছে যে এটির  বিভিন্ন আকারের পাতা ও বিভিন্ন বর্ণের ফুল বিশিষ্ট আবাদী জাতকে স্ব-স্থানের বাইরে সংরক্ষণ করতে হবে।

অর্থনৈতিক ব্যবহার ও গুরুত্বর দিক: উপপ্রজাতি rosa-sinensis এর বাকল থেকে এক প্রকার উত্তম তপ্ত পাওয়া যায় (Khan and Mia, 1989), ইহার পাতা এবং পুষ্প উপশমকারী, পাপড়ির কৃাথ জ্বরে আরামদায়ক এবং শীতলকারক পানীয় হিসেবে ব্যবহৃত হয় (Kirtikar et al.,1935).

জাতিতাত্বিক ব্যবহার: বর্ণিত আছে ইহার পুষ্প গর্ভনিরোধক গুণাবলী সম্পন্ন (Paul and Nayar, 1988). চীনারা ইহার পাপড়ি থেকে চুল এবং চোখের ভ্র এর রং তৈরি করে। শিশুরা ইহার পুষ্প থেকে একটি লাল রং তৈরি করে যা কাগজকে রঙিন করতে ব্যবহৃত হয়। জুতা কালো করতে ইহার পাপড়ি ব্যবহৃত হয় আর এই জন্যই উদ্ভিদটির ইংরেজী নাম সু ফ্লাওয়ার।

জবা ফুল দেখতে খুব সুন্দর হলেও এর ঔষধি গুণ কিন্তু কম নয়। চোখ উঠলে, মাথায় টাক পড়লে কিংবা হাতের তালু থেকে চামড়া ওঠা শুরু হলে জবা ফুল বেটে রস লাগালে দ্রুত নিরাময় হয়। ডায়াবেটিসের রোগী নন, অথচ প্রচুর পরিমাণে পানি পান করার পরপরই ঘন ঘন যাদের মূত্র ত্যাগ করতে হয়, তারা জবা গাছের ছালের রস পানিসহ নিয়মিত কয়েকদিন এক চা চামচ পরিমাণ করে খেলে উপকার পাবেন।

বিস্তৃতি: উল্লেখ্য ঝুমকো জবা, লংকা জবাসহ জবার আরো বেশ কিছু প্রজাতি বাংলাদেশে যথেষ্ট জনপ্রিয়।

জবার বহুমুখী ঔষধি গুরুত্ব:

জবা ফুলে নানা ঔষধি গুনাগুণ রয়েছে। অনিয়মিত মাসিক, চোখ উঠা, মাথায় টাক , হাতের তালুতে চামড়া উঠা ইত্যাদি রোগে ঔষধি গুনাগুণ রয়েছে।

১. বমি করবার প্রয়োজনে: যেসব দ্রব্য অস্বাস্থ্যকর বা কুখাদ্য হিসেবে পরিচিত, যেসব দ্রব্য আমরা খাই না তেমন কিছু, যেমন অজান্তে মাছি, চুল অথবা এই ধরনের কোনো জিনিস পেটে গেলে, তার পরিণতিতে বমির উদ্রেক হয়, অথচ বমি হচ্ছে না; এক্ষেত্রে ৪/৫ টি জবা ফুল নিয়ে বোঁটার সঙ্গে যে সবুজ ক্যালিস্ক অংশ থাকে, এই অংশটাকে বাদ দিয়ে ফুল অংশটাকে পানি ও চিনি পরিমাণমত দিয়ে চটকে সরবত করে দিনে ২/১ বার খেলে বমি হয়ে পেট থেকে ওগুলি সব বেরিয়ে যাবে।

২. ঘন ঘন প্রস্রাব: যারা প্রচুর পরিমাণে পানি পান করে আবার ঘন ঘন প্রস্রাব করে অথচ ডায়াবেটিস রোগী নয়, এই ক্ষেত্রে জবা গাছের ছালের রস এক কাপ পানির সাথে পরিমাণমত চিনিসহ মিশিয়ে ৭/৮ দিন খেলে উপকার পাওয়া যায়।

৩. টাক পড়া রোগ: চুল স্বাভাবিক আছে অথচ ফাঙ্গাসে কিছু জায়গা চুল উঠে টাক হয়ে গেছে এ অবস্থায় জবাফুল বেটে ওখানে লাগালে কিছু দিনের মধ্যে চুল উঠে যাবে। এক /দুইটা ফুল বেটে ৭/৮ দিন যে কোনো সময় লাগাতে হবে এবং দুই/এক ঘণ্টা রাখতে হবে অথবা যতক্ষণ সম্ভব রাখতে হবে।

৪. হাতের তালুতে চামড়া উঠা: শীত কালে হাতের তালুতে চামড়া উঠে খসখসে হয়ে গেলে জবা ফুল তালুতে মাখলে খুব উপকার পাওয়া যায়। দিনে দুই তিন বার এক /দুইটা ফুল হাতের মধ্যেই ডলে ডলে লাগাতে হবে। লাগিয়ে স্বাভাবিক কাজ কর্ম করা যাবে। যতক্ষণ সম্ভব রাখতে হবে।

বি. দ্র. যে কোনো উদ্ভিদজাত ওষুধ নিজ দায়িত্বে ব্যবহার করুন।

তথ্যসূত্র:

১. এম মতিয়ুর রহমান (আগস্ট ২০১০)। “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস”  আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ। (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। পৃষ্ঠা ৪১-৪২। আইএসবিএন 984-30000-0286-0

আরো পড়ুন:  অশোক গাছের ওষধি গুণাগুণ
Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই “পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি” প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১০টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর “সমাজতন্ত্র” ও “মার্কসবাদ” গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন “বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা” নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top
You cannot copy content of this page