আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > প্রাণ > উদ্ভিদ > বৃক্ষ > লিচু নিরক্ষীয় ও ক্রান্তীয় অঞ্চলের একটি জনপ্রিয় ফল

লিচু নিরক্ষীয় ও ক্রান্তীয় অঞ্চলের একটি জনপ্রিয় ফল

বৈজ্ঞানিক নাম: Litchi chinensis, Sonn সমনাম: Nephelium litchi Camb. বাংলা নাম: লিচু। ইংরেজি নাম: litchi, lychee, lychee nut ফরাসি নাম: cerisier de la Chine, litchi, litchi de chine, quenèpe chinois, quenepier chinois জার্মান নাম: Chinesische Haselnuß, Litchipflaume হিন্দি নাম: lichi, lici, licy ইন্দোনেশিয় নাম: kalengkeng, klengkeng, litsi জাভানিজ নাম: klengkeng খেমার নাম: Kuléén মালয় নাম: kelengkang, laici স্প্যানিশ নাম: Leché. জীববৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস জগৎ/রাজ্য: Plantae – Plants উপরাজ্য: Tracheobionta – Vascular plants অধিবিভাগ: Spermatophyta – Seed plants বিভাগ: Magnoliophyta – Flowering plants বর্গ: Sapindales পরিবার: Sapindaceae উপপরিবার: Sapindoideae গণ: Litchi প্রজাতি: Litchi chinensis, Sonn

পরিচিতি: লিচু বা লেচু (বৈজ্ঞানিক নাম: Litchi chinensis, ইংরেজি নাম: Litchi) হচ্ছে সাপিন্ডাসি পরিবারের লিচি গণের একটি সপুষ্পক উদ্ভিদ। এটি হলো বিশ্বের সবচেয়ে রোমান্টিক ফল। প্রায় ২০০০ বছর ধরে লিচু ফলটি এই মর্যাদা উপভোগ করে আসছে। লিছু গাছ একটি চিরসবুজ, মজবুত, বহুবর্ষী, বহু শাখাযুক্ত, মাঝারি থেকে বড় আকারের বৃক্ষ। লিচু একটি নিরক্ষীয় ও ক্রান্তীয় অঞ্চলের ফল । লিচু হলো সেপিন্ডাসিয়া পরিবারের লিচি গণের একমাত্র সদস্য।

আদিবাস: লিচুর আদি নিবাস চিন হলেও বর্তমানে এশিয়ার সব দেশ, অস্ট্রেলিয়া ও আমেরিকায় চাষ হয়।

বিবরণ: লিচু হচ্ছে চিরহরিৎ, মধ্যম-আকৃতির বৃক্ষ, ৩৫ মিটার পর্যন্ত উঁচু এবং ১ মিটার প্রশস্ত, শাখাপ্রশাখা ধূসর-বাদামী, বেলনাকার, মসৃণ বা লেন্টিসেলযুক্ত হয়। লিচুর পাতা ২-৪ জোড় পত্রক, পত্রবৃন্ত স্ফীত এবং গোড়ায় সামান্য ফাপা, ১-৭ সেমি লম্বা, রোমহীন, পত্রকবৃন্ত গোড়ায় সামান্য স্ফিত, উপরিভাগ খাঁজযুক্ত, পত্রক উপবৃত্তাকার বা বিডিম্বাকার, ৫১২ x ২-৬ সেমি, উপরিতল আঠালো, নিম্নল রোমহীন, গোড়া সমপার্শ্বীয় থেকে সামান্য তির্যক, সূক্ষ্মাগ্র থেকে সরু, প্রান্ত অখন্ডিত, সামান্য পশ্চাৎ বক্র, শীর্ষ সূক্ষ্মাগ্র থেকে দীঘাগ্র, মধ্যশিরার উপরিভাগ সরু খাঁজবিশিষ্ট।

লিচুর পুষ্পবিন্যাস ১৫-৩০ সেমি লম্বা যা স্বল্প সংখ্যক লম্বা খাড়া-ছড়ানো শাখাপ্রশাখা বিশিষ্ট, তামাটে-রোমশ। পুষ্প সবুজাভ বা হলুদাভ, সুগন্ধি। বৃতি ৪-অংশক, ১.৫-২.০ মিমি লম্বা। পাপড়ি অনুপস্থিত বা খুবই অস্পষ্ট। চাকতি পরিবর্তনীয় রোমশ বা রোমহীন। পুংকেশর ৬টি (১০), পুংদন্ড ২.৫ মিমি লম্বা, ঘনভাবে রোমশ, সূত্রাকার, পরাগধানী আয়তাকার, সূক্ষ্মায়। গর্ভকেশর ০.৫-১.০ মিমি লম্বা, বৃন্তক, গর্ভাশয় ঘন আঁচিলযুক্ত, গর্ভদন্ড বেলনাকার।

ফল গোলাকার বা ডিম্বাকার, রসালো, ৩.৫ x ৩.০ সেমি বা ফলের ব্যাস সাধারণত হয় ১-১.৫ ইঞ্চি। , পাকলে উজ্জ্বল লাল বা রক্ত-বেগুনি, আঁচিলযুক্ত বা প্রায় মসৃণ পরিবর্তীয়, এক-বীজী। বীজ উপবৃত্তীয়, ২.০ x ১.৫ সেমি, বহি:ত্বক চকচকে কালো বা গাঢ় বাদামী, ডিম্বক নাভী মূলীয়, গোলাকার, বীজোপাঙ্গ সাদা, হালকা হলুদ বা গোলাপী, তাজা অবস্থায় ৫ মিমি পর্যন্ত স্থূল। ফুল ও ফল ধারণ ঘটে এপ্রিল থেকে জুন মাসে।

ক্রোমোসোম সংখ্যা: 2n = ২৮, ৩০ (Fedorov, 1969).

আবাসস্থল ও চাষাবাদ: উর্বর, ঘন, আর্দ্র মৃত্তিকা, নিম্ন উচ্চতায়। বীজ দ্বারা এবং জোড় কলম দ্বারা চারা করা হয়। বাংলাদেশে এটি গ্রীষ্মকালীন ফল এবং এখানে ফেব্রুয়ারিতে এই ফলের মুকুল ধরে এবং ফল মে মাসের দিকে সাধারণত পেকে যায়। বাংলাদেশের প্রায় সকল স্থানেই লিচু গাছ জন্মায়, তবে উত্তরবঙ্গের রাজশাহী ও দিনাজপুর অঞ্চলে লিচুর ভাল ফলন হয়। এই এলাকার মঙ্গলবাড়িয়া লিচুর বড় আকার ও সুন্দর স্বাদের জন্য বিশেষভাবে জনপ্রিয়।

বিস্তৃতি: সম্ভবত ইন্দো চাইনিজ পেনিনসুলার উত্তরাংশে বা দক্ষিণ-পূর্ব চীনে উদ্ভুত, বর্তমানে অর্ধউষ্ণমন্ডলীয় এলাকায় ব্যাপক আবাদী। বাংলাদেশের সর্বত্র ব্যাপকভাবে আবাদী।

লিচুর অর্থনৈতিক ব্যবহার ও গুরুত্ব: ফলের রসালো অংশ খাওয়া হয়, বিভিন্ন পানীয়, জেলী এবং আচার তৈরীতে ব্যবহৃত হয়। এর কাঠ টেকসই এবং একারণে উচ্চ মূল্যবান (Benthall, 1984).

ঔষধি গুণ: ফল হৃৎপিন্ড, মস্তিস্ক এবং যকৃতের টনিক। সবুজ ফল শিশুদের গুটি বসন্তের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। মূল, বাকল এবং পুষ্প সিদ্ধ ক্বাথ গলার সংক্রমনে কুলকুচি করায় ব্যবহৃত হয়। বীজ বিভিন্ন স্নায়বিক অসুবিধায় ব্যবহৃত, আরচাইটিসেও। বীজ পাউডার বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ সমস্যায় ব্যবহৃত হয়। জাতিতাত্বিক ব্যবহার হিসেবে দেখা যায়, এদের সবুজ পাতার লেই প্রাণীয় কামড়ের স্থানে প্রয়োগ করা হয়।

জাত: বাংলাদেশে বোম্বাই, মাদ্রাজি, চায়না ৩, মঙ্গলবাড়ি, মোজাফফরপুর, বেদানা, বারিলিচু ১, বারিলিচু ২, বারিলিচু ৩ ও দেশি জাতের লিচু পাওয়া যায়।

লিচু ফল সংগ্রহ শেষে আগার ডাল ছাঁটাই (প্রায় এক ফুট), ডালের ছিদ্রকারী পােকা ও লিচু মাইট দমন এবং গাছে নিয়মিত সার প্রয়ােগের মাধ্যমে অনায়াসে লিচুর ফলন দ্বিগুণ করা যায়।

ডালপালা ছাঁটাই: লিচু সংগ্রহের সময় কমপক্ষে দেড় ফুট ডালসহ লিচু সংগ্রহ করলে পরবর্তী বছর অধিক ফলন পাওয়া যায়। লিচু সংগ্রহের সময় আগার সব ডালই ছাঁটাই করলে বেশী ফলন পাওয়া যায়। গাছের ভিতরের রুগ্ন, দূর্বল ও অপ্রয়ােজনীয় ও অফলন্ত ডালগুলাে ছেটে দিলে গাছে আলাে বাতাস চলাচল নিশ্চিত হবে, পােকা ও রােগের উপদ্রব কম হবে, এবং ফলন বাড়বে। ডালপালা ছাটাই এর পর অবশ্যই বর্দো-মিল্লার ক্ষত স্থানে লাগিয়ে দিতে হবে ।

সার প্রয়ােগ: প্রতিটি ২০-২৫ বছর বয়স্ক লিচু গাছের জন্য সুপারিশকৃত সারের পরিমাণ হলােঃ পঁচা গােবর/ আবর্জনা-পঁচা সার: ২০ কেজি, পচা খৈল: ২ কেজি টি এস পি: ২-৩ কেজি অথবা ডি এ পি: ৩-৪ কেজি, এম ও পি: ২-২.৫ কেজি, । সুপারিশকৃত সারগুলাে আম গাছের মত প্রয়ােগ পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে।

সার প্রয়ােগ পদ্ধতি: প্রথমত, গাছের গােড়া থেকে বৃত্তাকারে আড়াই ফুট বাদ দিয়ে গাছের ডাল-পালা চারি ধারে যে পর্যন্ত সম্প্রসারিত আছে, ঠিক ততদূর পর্যন্ত বৃত্তাকারে গাছের নিচের চারি ধারের মাটি কুপিয়ে দিন। দ্বিতীয়ত, সকল সার একত্রে মিশিয়ে গাছের তলায় কোপানাে অংশে সার সমপরিমানে ছিটিয়ে দিন। তৃতীয়ত, সার ছিটানাের পর পুনরায় হালকা কোপ দিয়ে সারগুলাে গাছের তলায় মাটির সাথে মিশিয়ে পানি সেচ দিয়ে মাটি ভিজিয়ে দিন। সবশেষে, সার প্রদানের পর গাছের গােড়ার মাটি কুচুরীপানা বা আবর্জনা দিয়ে মাচিং করলে ভাল ফল পাওয়া যায়।

পােকা ও রােগ দমন: ১. লিচু গাছের প্রধান শত্রু লিচু “মাইট”। লিচু সংগ্রহের পর পরই মাইট দমনকারী পেস্টিসাইড (ওমাইট বা ভাটিমেক বা যে কোন মাইটিসাইড) দিয়ে গাছ ভালভাবে স্প্রে করতে হবে। মাইট দমনের জন্য বছরে কমপক্ষে চার বার মাইটিসাইট স্প্রে করা প্রয়ােজন। তবে ফুল আসার আগে বা গাছে ফুল থাকা অবস্থায় গাছে স্প্রে করা যাবে না।

২. লিচু গাছে ডাল ছিদ্রকারী পােকা দেখা গেলে আমের ন্যায় “ক্লোরোপাইরিফস (ডাসবান, ক্লোরসেল, কাসির ইত্যাদি) জাতীয় কীটনাশক দিয়ে লিচু সংগ্রহের পর পরই গাছ ভালভাবে স্প্রে করতে হবে।

৩. লিচু ফলের আকার মার্বেল আকার হলে মাজরা পােকার আক্রমণ দেখা যায়। এ পােকা দমনে “ডেসিস” বা অনুরূপ কীটনাশক দিয়ে ফল ও পাতা ভালভাবে ৭ দিনের ব্যবধানে দু’বার স্প্রে করা প্রয়ােজন। যেসব কীটনাশকের ( ডেসিস বা অনুরূপ) বিষক্রিয়ার মাত্রা ৪-৫ দিনের বেশী থাকে না সেগুলাে ফলে স্প্রে করা যায়।

৪. ফলের আকার বৃদ্ধির সাথে সাথে লিচু ফলে এক ধরনের ছত্রাকের আক্রমণে ফল বিবর্ণ হয়ে যায়। এ রােগ প্রতিরােধ ব্যবস্থা হিসাবে “ম্যানকোজেব” জাতীয় ছত্রাকনাশক দিয়ে ৭ দিন পরপর ২-৩ বার স্প্রে করলে সুফল পাওয়া যায়।

. লিচু গাছে ফুল আসার পর পাউডারী মিলডিউ নামক ছত্রাকের আক্রমণ হলে এ রােগের আক্রমণে লিচুর ফুলে সাদা বা ধুসর বর্ণের পাউডারের আবরণ দেখা যায়। আক্রান্ত মুকুল নষ্ট হয় ও ঝরে পড়ে। প্রতিকার: গাছে মুকুল আসার পর কিন্তু ফুল ফোটার আগে একবার এবং এর একমাস পরে আরেকবার টিল্ট ২৫০ ইসি ০.৫ মিলিলিটার অথবা কুমুলাক্স/সালফোলাক ২ গ্রাম হারে প্রতিলিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।

৬. ফল ছিদ্রকারী পােকা: ফলের বাড়ন্ত পর্যায়ে পূর্ণ বয়স্ক পােকা ফলের বােটার কাছে খােসার নীচে ডিম পাড়ে। ডিম থেকে কীড়া বের হয়ে বোঁটার নিকট দিয়ে ফলের ভিতরে ঢুকে বীজ খেতে থাকে। এতে অনেক অপরিপক্ক ও পরিপক্ক ফল ঝরে পড়ে। প্রতিকার : বাগান পরিস্কার রাখতে হবে। আক্রান্ত ফল বাগান থেকে কুড়িয়ে মাটির গভীরে পুতে ফেলতে হবে। এ পােকা দমনের জন্য রিপকর্ড/সিমবুশ/বাসাথ্রিন/ফেনােম প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলি লিটার হারে মিশিয়ে ফলের মার্বেল অবস্থা থেকে শুরু করে ১৫ দিন পরপর ২-৩ বার স্প্রে করতে হবে। ফল সংগ্রহের অন্তত ১৫ দিন পূর্বে স্প্রে বন্ধ করতে হবে।

লিচু চাষে সমস্যা: নিম্নোক্ত কারণ সমূহের জন্য আপনার লিচু গাছে মুকুল আসার পরও গুটি কম হয়। প্রথমত সঠিকভাবে পরাগায়ন না হলে। এর প্রতিকার হচ্ছে পরাগায়ন বৃদ্ধি করার জন্য লিচুর বাগানে মৌমাছির চাষ করা। দ্বিতীয়ত, লিচু গাছে জাত ভেদে উভলিঙ্গি ফুলের পরিমাণ কম বেশি হয়। উভলিঙ্গি ফুল কম হলেও লিচুর গুটি কম হয়।

অন্যান্য তথ্য: বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের ১০ম খণ্ডে (আগস্ট ২০১০)   লিচু প্রজাতিটির সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, এদের শীঘ্র কোনো সংকটের কারণ দেখা যায় না এবং বাংলাদেশে এটি আশঙ্কামুক্ত হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশে লিচু সংরক্ষণের জন্য কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। প্রজাতিটি সম্পর্কে প্রস্তাব করা হয়েছে এটি সংরক্ষণের তেমন প্রযোজন নেই।[১]

তথ্যসূত্র:

১.  এস নাসির উদ্দিন (আগস্ট ২০১০)। “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস”  আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ প্রাণী জ্ঞানকোষ ১০ (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। পৃষ্ঠা ২১৫-২১৬। আইএসবিএন 984-30000-0286-0

আরো পড়ুন

Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই “পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি” প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১০টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর “সমাজতন্ত্র” ও “মার্কসবাদ” গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন “বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা” নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top