You cannot copy content of this page
আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > প্রাণ > উদ্ভিদ > বৃক্ষ > পেঁপের তেরটি ভেষজ গুণাগুণ

পেঁপের তেরটি ভেষজ গুণাগুণ

ভূমিকা: পেঁপে বা বা পিপিয়া পাপিতা বা পাপতা হচ্ছে সপুষ্পক উদ্ভিদের কেরিকাসি পরিবারের একটি প্রজাতি। এটি সারা পৃথিবীতে মানুষসহ অন্যান্য বেশ কিছু প্রাণীর কাছে খুব জনপ্রিয়। পেটের অসুখে যেসব রোগীরা ভুগছেন পেঁপের ঝোল তাদের জন্য বেশ উপকারী। বাঙালি বাড়িতে কাঁচা পেপের কদর আছে।

আগে বাঙালির পেট-রোগা বলে একটা বদনাম ছিল এখন হয়তো স্বাস্থ্য-সচেতন হয়ে ওঠার জন্যে সেটা অনেকটা কমেছে। কিন্তু পেটের অসুখে কাঁচকলা ও কাঁচা পেঁপের ঝোল এখনও পথ্য। পাকা পেপে যেমন ফল হিসেবে প্রিয় তেমনই কাঁচা পেঁপে দিয়ে রান্না করা হয় নানারকম পদ যেমন শুক্তো, ডালনা, হেঁচকি, ঘন্ট, ঝোল এসব তো আছেই আম-আদা দিয়ে কাঁচা পেঁপের চাটনি বাঙালি-রসনার চিরপ্রিয়। ভোজ বাড়িতে কাঁচা পেঁপে প্লাস্টিকের মতো স্বচ্ছ ও পাতলা করে কেটে তৈরি করা হয় পাতিলেবুর রস সহযোগে রুচিকর কাঁচা পেঁপের প্লাস্টিকের চাটনি। এছাড়া পেঁপে কুরুনি দিয়ে কুরে নিয়ে ঘিয়ে ভেজে সেদ্ধ করে চিনি ও এলাচের গুঁড়া ও ক্ষীর দিয়ে তৈরি করা হয় পেঁপের হালুয়া। দুধে সেদ্ধ করে চিনি দিয়ে তৈরি করা হয় পায়েস, টক দই মিশিয়ে তৈরি করা হয় রায়তা, বেসন মিশিয়ে গোলোকের আকারে তৈরি করে তেলে ভেজে তৈরি করা হয় কোফতা। এই ভাবে নিরীহ-আটপৌরে, সস্তা, বারোমাস সুলভ তরকারি কাঁচা পেপে রসনায় হয়ে ওঠে অপরূপ।

কাঁচা পেঁপের আঠার (দুধের) আছে অনেক গুণ, কাঁচা পেঁপের পাতারও আছে অনেক উপকারিতা। পেঁপের আঠা বা দুধ দিয়ে মাংস রান্না করলে মাংস তাড়াতাড়ি সেদ্ধ হয়। কাঁচা পেঁপের আঠা (দুধ) না পাওয়া গেলে কাঁচা পেঁপে বেটে মাংসের সঙ্গে মিশিয়ে দিলেও মাংস সেদ্ধ হয় তাড়াতাড়ি। শুধু যে মাংস তাড়াতাড়ি সেদ্ধ হয় তাই নয় মাংস হজমও হয় তাড়াতাড়ি। পেঁপে ভাতে নিয়মিত খেলেও তা তাড়াতাড়ি হজম হয় এবং পেপে ভাতে অন্য খাবারও তাড়াতাড়ি হজম করাতে সাহায্য করে।

ওষুধ হিসেবে কাঁচা পেঁপের গুণ পাকা পেঁপের চেয়ে বেশি। পেপটিন বা পেঁপের আঠার গুণ অশেষ।

নানান অসুখ সারাতে কাঁচা পেঁপের ব্যবহার:

১. পেটের অসুখ দূর: প্রতিদিন দুপুরে ভাত খাওয়ার পর এবং রাতের ভাত বা রুটি খাওয়ার পর এক টুকরা কাঁচা পেঁপে ভাল করে চিবিয়ে খেলে এবং তারপরে এক গ্লাস জল খেলে সকালে পেট পরিষ্কার হয়- অম্বল ও বদহজমের কষ্ট দূর হয়। দুই চা চামচ পেঁপের আঠার ১ চা চামচ চিনি মিশিয়ে দুধের সঙ্গে খেলে অম্ল (অম্বল) ও অজীর্ণ রোগে উপকার হয়। কাঁচা পেঁপে বা পেঁপের গাছের আঠা পুরানো অজীর্ণ রোগে, পেটের অসুখ (অতিসার), পুরনা পেটের অসুখ কোষ্ঠবদ্ধতা (মল না হওয়া) প্রভৃতি রোগের পক্ষে বিশেষ উপকারী।

পেঁপের তরকারি নিয়মিত খেলে যাঁরা পেটের পীড়া বা উদরোগে ভুগছেন এবং যাঁরা হৃৎরোগে ভুগছেন তাঁদের খুব উপকার হয়। কাঁচা পেচের আঠা বা দুধের আর একটি গুণ হল- হজম সম্পর্কিত যে কোনো অসুখেই এটি কাজ দেয় অত্যন্ত পাচক (হজম করায়), বেদনা – নাশক, কৃমি নাশ করে।

২. দাদ সারাতে: ১০ ফোটা করে কাঁচা পেঁপের দুধ বা আঠা প্রতিদিন অল্প জলে মিশিয়ে খেলে দাদ ও চর্মরোগ সারে। কাঁচা পেঁপের আঠা লাগালেও কুষ্ঠরোগ নাশ করে, চর্মরোগ সারে (প্রথমে খুব জ্বালা করবে)।  

পেঁপের দুধ আর সোহাগ ফুটন্তু জলে মিশিয়ে তার প্রলেপ লাগালে পুরোনো চুলকুনি বা দাদে লাগালে চর্মরোগ সেরে যায়।  

৩. টিউমার দূর করতে: ২০ থেকে ২৫ ফোঁটা কাঁচা পেঁপের আঠা অল্প চিনির সঙ্গে মিশিয়ে কিছুদিন নিয়ম করে খেলে পিলে (প্লীহা) রোগ সারে ও পেটের ভিতর টিউমার এবং বায়ু গোলকের রোগে খুব উপকার পাওয়া যায়।

৪. প্লীহা সারাতে: দুই চা চামচ কাঁচা পেঁপের আঠা ২ চা চামচ চিনি মিশিয়ে কিছুদিন ধরে দিনে তিনবার করে খেলে পিলের আয়তন ক্রমশ কমে যায়।

কাঁচা পেঁপে মোটা করে ছাড়িয়ে সেই ছালের ছোট ছোট টুকরা ভিনিগারে ডুবিয়ে কাচের বোয়ামে রেখে আচার তৈরি করতে হবে। এই খোসার ৭ থেকে ৮ টুকরা দিনে ২ বার করে খেলে অনেক সময় পিলের রোগ একেবারে সেরে যায়।

কাচা পেঁপের খোসা ছাড়িয়ে ছোট ছোট টুকরা করে কেটে ভিনিগারে ডুবিয়ে কাচের বোয়ামে ভরে রেখে প্রথমে আচার তৈরি করতে হবে। এই আচার তিন থেকে চার টুকরা করে প্রতিদিন দুবার করে খেলে অনেক সময় কঠিন প্লীহা রোগ (পিলের অসুখ) সারে। পেঁপে শুকিয়ে গুঁড়া করে অল্প নুন মিশিয়ে খেলে দুরারোগ্য পিলের অসুখ সারে— এই ওষুধ পুরানো পেটের অসুখেও উপকারী।

পিলে ও লিভার বেড়ে যাওয়া, তার সঙ্গে জ্বর ও দুর্বলতার ওষুধ হিসেবে দিনে ও রাত্তিরে খাওয়া-দাওয়ার পর নিয়মিত ৫ থেকে ১০ ফোটা করে পেঁপের আঠা খেলে উপকার পাওয়া যায়।

৫.  অর্শ রোগে: কাঁচা পেঁপের তরকারি অর্শ ও পিলের অসুখে আরাম দেয় এবং লিভার (যকৃৎ) বৃদ্ধি রোধ করে।

৬. স্তনে দুধ বাড়ে: যে সব মায়েদের সদ্য বাচ্চা হয়েছে কাঁচা পেঁপের তরকারি নিয়মিত খেলে তাঁদের স্তনের দুধ বাড়বে। ।

৭. মেয়েদের মাসিকের সময়: গর্ভবতী মহিলাদের এবং যাঁদের মাসিক বেশি হয় তাঁদের পেঁপে খাওয়া উচিত নয়। কারণ পেঁপে রজঃ (রক্ত) ও ভ্রূণ নিঃসারক।  পেঁপের বীজ খেলে মেয়েদের ঋতু নিয়মিত হয় এবং বেশি পরিমাণে খেলে গর্ভপাত হয়।

৮. গ্যাস্ট্রিক সারাতে: বড় কাঁচা পেঁপে চিরে নিয়ে তার নীচে একটি চীনামাটির কাপ বা ডিশ রাখুন। এইভাবে দুধ বের করে নিন। এই দুধ বা আঠা তৎক্ষণাৎ রোদে শুকিয়ে নিন। এই আঠা গুঁড়া করে শিশিতে ভরে ঢাকনা বন্ধ করে রাখুন। গ্যাস্ট্রিক আলসার বা গ্যাস্ট্রিকের অসুখে এই চুর্ণ ব্যবহার করলে আশ্চর্য ভাল ফল পাওয়া যায়। পাকস্থলীর দাহ, বায়ু গোলক, ব্রণ, অম্লপিত্ত, বদহজম প্রভৃতি অসুখও এই চুর্ণ নিয়মিত খেলে সেরে যায়। এই রস খেলে অম্লপিত্ত (মুখ টকে যাওয়া টক ঢেকুর ওঠা) সারে যাবে।

৯. হৃদরোগ: প্রতিদিন সকালে শৌচাদি কর্মের পর (মল ত্যাগ করবার পর) কাঁচা পেঁপে সঁচ দিয়ে বিধে তার রস সংগ্রহ করুন (পরিমাণ ১০ থেকে ১৫ ফোঁটা)। তাতে সামান্য চিনি মিশিয়ে খান, বাজারের চলতি ওষুধের চেয়ে হৃদরোগে (হার্টের অসুখে) এই পেপটিন বেশি উপকার দেবে। পেঁপের পাতা খেলে বুক ধড়ফড়াননা কমে, নাড়ির গতি স্বাভাবিক হয়। হার্টের আরাম হয়। ঘাম দিয়ে শরীরের গ্লানি বেরিয়ে যায়। মূত্রের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়ে শরীর সুস্থ হয়। পেঁপের পাতাও হার্ট সবল করে। পেঁপের পাতা পানিতে সেদ্ধ করে চায়ের মতো তৈরি করে খাওয়ালে হৃদরোগে লাভ হয়।

পেঁপে পাতার কাথ হৃদরোগীরা খেলে মানসিক অস্থিরতা ও ঘাবড়ে যাওয়া কমে। জ্বরের জন্যে যদি হার্টের দুর্বলতা দেখা দেয় এবং নাড়ির গতি বৃদ্ধি পায় তাহলে এই কাথ খেলে উপকার পাওয়া যাবে এবং নাড়ির গতি শান্তও স্বাভাবিক হবে।

১০.  কৃমি নাশ: ফুটন্ত জলে অল্প মধু ও পেঁপের দুধ মিশিয়ে ২ চা চামচ পরিমাণ খাইয়ে তার দু ঘণ্টা পরে যদি ক্যাস্টর অয়েল অথাৎ এর বা রেড়ির তেলের জোলাপ খেলেই পেট থেকে গোল কৃমি বেরিয়ে যাবে।

১১. অরুচি ও মাথা ব্যাথা: কাঁচা পেঁপের রস বা দুধ খেলে অরুচি, অনিদ্রার কারণে মাথা ব্যথা ইত্যাদি অজীর্ণতা সম্পর্কিত সব অসুখেরই উপশম হয়।

১২. আমাশয় সারাতে: পেটের সহিত আম (আমাশা) বিনাশ করবার অভুত শক্তি আছে কাঁচা পেঁপের আঠায়। শিশুদের চেয়ে বড়দের অজীর্ণতায় কাঁচা পেঁপে বেশি উপকারী।

১৩. প্রাকৃতিক লবনের উৎস: কাঁচা পেঁপের আঠায় বা দুধে, এমন দু-তিনটি প্রাকৃতিক লবণ আছে যার জন্যে অজীর্ণ, অর্শ, প্লীহা ও যকৃতের (লিভারের) সব অসুখেই উপকার পাওয়া যায়।

তথ্যসূত্রঃ

১. সাধনা মুখোপাধ্যায়: সুস্থ থাকতে খাওয়া দাওয়ায় শাকসবজি মশলাপাতি, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, নতুন সংস্করণ ২০০৯-২০১০, পৃষ্ঠা,১০২-১০৬।

আরো পড়ুন:  পেঁপে সারা দুনিয়ায় চাষকৃত জনপ্রিয় ফল
Dolon Prova
জন্ম ৮ জানুয়ারি ১৯৮৯। বাংলাদেশের ময়মনসিংহে আনন্দমোহন কলেজ থেকে বিএ সম্মান ও এমএ পাশ করেছেন। তাঁর প্রকাশিত প্রথম কবিতাগ্রন্থ “স্বপ্নের পাখিরা ওড়ে যৌথ খামারে”। বিভিন্ন সাময়িকীতে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া শিক্ষা জীবনের বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে রোদ্দুরে ডট কমের সম্পাদক।

Leave a Reply

Top