You cannot copy content of this page
আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > জীবনী > আত্মশুদ্ধিব্রত পালনকারী অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের পেটি-বুর্জোয়া চিন্তাধারা

আত্মশুদ্ধিব্রত পালনকারী অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের পেটি-বুর্জোয়া চিন্তাধারা

আনু মুহাম্মদ (জন্ম: ২২ সেপ্টেম্বর, ১৯৫৬) হচ্ছেন অর্থনীতির অধ্যাপক, একসময় মার্কসবাদপুঁজিবাদ বিশ্লেষণ করে কিছু লেখা লিখেছিলেন। বর্তমানে পরিবেশ ও জাতীয় সম্পদ রক্ষা আন্দোলনের সাথে জড়িত। তাঁর লেখার উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তিনি বাংলাদেশের ও বিশ্ব পুঁজিবাদী অর্থনীতির বৈশিষ্ট্যসমূহকে ফুটিয়ে তোলেন। ১৯৯০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর সাম্রাজ্যবাদী একমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার বিশ্লেষণ প্রকাশ পেয়েছে তাঁর বিভিন্ন বইয়ে। তাঁর বিশ্লেষণের ধারায় তিনি সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। ২০০৭ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর একটি বই বিপ্লবের স্বপ্নভূমি কিউবা। এই বই তাঁকে লাতিন আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অর্থনীতিবাদী বামপন্থী আন্দোলনের প্রতি আগ্রহী করে তোলে।

কিউবা ভ্রমণের সময় তিনি কিউবা দেখে মুগ্ধ হন, হুগো শ্যাভেজের আন্দোলন তাঁকে নিশ্চয় অনুপ্রাণিত করে। কিন্তু কিউবা ও বলিভিয়ার প্রধান সমস্যা যে স্বাধীন কৃষিভিত্তিক পুঁজির বিকাশহীনতা, বৃহৎ শিল্পের অপর্যাপ্ততা তা তিনি দেখতে ব্যর্থ হন। উনার বিপ্লবের স্বপ্নভূমি কিউবা বই থেকে উনি আসলে মার্কসবাদ থেকে দূরে সরা শুরু করে আন্দোলনমুখী হয়েছেন। আন্দোলনটাই সব চূড়ান্ত লক্ষ্য কিছুই নয়, এই বের্নস্তাইনপন্থী নীতিতে গেছেন। হুগো শাভেজের পক্ষে কথা বলা মূলত কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন বা মাওবাদ না বোঝার ফল। হুগো শাভেজও পশ্চাৎভূমি বিষয়টি বুঝতে না পেরে জাতীয় শিল্প না গড়ে মার্কিনবিরোধী একাধিক সাম্রাজ্যবাদের উপর নির্ভর করেছিলেন, ফল হয়েছে বলিভিয়া আর টিকতে পারছে না।

পরিবেশ আন্দোলন মূলত সাহায্য করছে বৃহৎ শিল্পনির্ভর পুঁজিবাদী দেশগুলোকে তা তিনি দেখতে ব্যর্থ হয়েছেন। পরিবেশ আন্দোলনকে অবশ্যই যে মার্কসবাদী-লেনিনবাদী-মাওবাদী আন্দোলনের অধীন হতে হবে এটিও তিনি অনুধাবন না করে, জাতীয় সম্পদ রক্ষা করার চেষ্টা করছেন।

ইউরোপ-আমেরিকায় পরিবেশ আন্দোলন জনপ্রিয় হয়েছে। এটির প্রধান কারণ হচ্ছে, ইউরোপ আমেরিকা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে আর কোনো যুদ্ধে জড়ায়নি। ইউরোপ আমেরিকার জনগণের বৃহৎ অংশটি এখন গোটা দুনিয়া শোষণের ভাগ পায়। ফলে উন্নত সাম্রাজ্যবাদী দেশের জনগণ যে সুবিধা পায় তাতে তারা গোটা দুনিয়ার নিপীড়িত দেশগুলোকে শোষণের পক্ষে থাকে। এই প্রেক্ষাপটে আনু মুহাম্মদের চিন্তাধারাকে আমাদের মূল্যায়ন করা দরকার।

অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ পরিবেশ আন্দোলন নিয়ে আগ্রহী হলেও তিনি পেটি বুর্জোয়া চিন্তা দ্বারা খুবই আচ্ছন্ন। ফলে তিনি পুঁজিবাদের লোভী চিহ্নটিকে দেখছেন না। যেমন তিনি গত ১১ মার্চ ২০১৯ তারিখে লিখেছেন “বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমানে নিয়ন্ত্রণ করে সরকারের সমর্থনপুষ্ট কতিপয় মাস্তান, আর তাদের টিকিয়ে রাখে তাদের আজ্ঞাবহ মেরুদন্ডহীন সুবিধাবাদী প্রশাসন। … … যে শিক্ষক নামের ব্যক্তিরা এর সাথে জড়িত তাদের জন্য ঘৃণা ও ধিক্কার। নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে শিক্ষকতা থেকে অব্যাহতি তাদের ন্যূনতম প্রাপ্য।”[১]

অর্থনীতিবিদ আমাদের শ্রদ্ধেয় আনু মুহাম্মদ লুটেরা নির্ভর ক্ষুদে-মালিকানা দেখছেন না কেন? কারণ তাঁর চিন্তাকাঠামোতে ক্ষুদে মালিকানার সমস্যাগুলো ধরা পড়ছে না। বিপ্লবের স্বপ্নভূমি কিউবা গ্রন্থে আমরা দেখি তিনি বৃহৎ শিল্পায়নের পক্ষে মত প্রকাশ করছেন না, কিউবা যে নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনব্যবস্থা বিপ্লবের ত্রিশ বছরেও তৈরি করতে পারেনি, বিদেশি তেলের উপরেই নির্ভরশীল ছিলো, তা নিয়ে ফিদেলের ব্যর্থতাকে তিনি বড় করে দেখছেন না।[২] 

আনু মুহাম্মদ গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে বড় করে দেখতে চান, কিন্তু গণতন্ত্রের কোনো সুনির্দিষ্ট মূর্ত রূপ বলেন না। ফলে উনার কাছে ভোটের ব্যবস্থা চালু থাকাকে মনে হচ্ছে নড়বড়ে গণতন্ত্র। উনি গত ২৬ নভেম্বর ২০১৮ তারিখে সমকালে লিখেছেন, “আট বছরে পুঁজি পাচার হয়েছে ছয় লাখ কোটি টাকার বেশি”।[৩] পুঁজি তো আন্তর্জাতিক শক্তি, সেটি পাচার হয় কীভাবে? যেখানে মুনাফা বা লুট করতে সহজ হবে, পুঁজি তো সেখানেই যাবে। ফলে উনি পশ্চাৎভূমি বলতে যা বোঝায় তাও বুঝছেন না। অর্থাৎ শোষণ বুঝেছেন বলেও মনে হচ্ছে না। উনি মূলত গত ১০-১২ বছর আন্দোলন দেখছেন এবং তা করতে চাইছেন, তাঁর বেশিরভাগ লেখা কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকাকে দেখানো হয় না। যেমন একই লেখায় তিনি লিখেছেন আন্দোলন করবার জন্য “জনগণের এই সংগঠিত শক্তি এমনি এমনি গড়ে উঠবে না। তার জন্য দরকার দেশের সর্বত্র মানুষের সে রকম শক্তি বা সংস্থা গড়ে তোলা।”[৩] এই শক্তি বলতে কি উনি কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলার কথা বোঝালেন? একেবারেই পিচ্ছিল কথা।

বাংলাদেশে গত প্রায় পাঁচ দশকে যে ক্ষুদে মালিক শ্রেণিটির বাড় বাড়ন্ত, তারা কি উৎপাদনের সাথে জড়িত ছিলো, নাকি লুটের সাথে জড়িত ছিলো, নাকি উভয়টিই? একজন কৃষক এক কেজি ডাল বা একটি কলার কাঁদি বেচতে হলেও হাটে তোলা দিতে হয়। শহরে ঢুকতে হলে চাঁদা দিতে হয় তাদের। কীভাবে বিভিন্ন ঘাটে ঘাটে টাকা দিয়ে জনগণ টিকে আছে, সেটি তিনি খেয়াল করছেন না। এলাকার সব ক্ষমতাধর ক্ষুদে মালিকরাই যে রাষ্ট্র, প্রশাসনের সমন্বয়ে শ্রমিক ও কৃষক শোষণ করে তিনি সেটি বেমালুম চেপে গেলেন।

অনুৎপাদনশীল লুটেরা ক্ষুদে মালিকানার সমস্যা হচ্ছে এই ক্ষুদে মালিকানা সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বৃহৎ মালিকানার বিরোধী। অনবরত ব্যক্তিগত মালিকানার পূজারি কিছু কিছু ক্ষুদে মালিক রাষ্ট্রীয় মালিকানায় বৃহৎ শিল্প স্থাপনের বিরোধী। বাংলাদেশে ক্ষুদে মালিকদের বড় অংশটি মুৎসুদ্দি; অর্থাৎ এরা বাংলাদেশে কৃষিনির্ভর বৃহৎ কারখানা স্থাপনের বিরোধী। লুটেরা ক্ষুদে মালিকদের এসব চরিত্র না দেখে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের সব রাগ গিয়ে পড়েছে শিক্ষক এবং মাস্তানদের দিকে। একজন অধ্যাপকের বেতন এখন লক্ষ টাকা ছাড়িয়েছে। ফলে এই শিক্ষক, যাদের জ্ঞানের সাথে কোনো সম্পর্ক নেই, সে যে একটি মাস্তান তা বুঝতে কোনো গবেষক হবার দরকার নেই।

বাংলাদেশে যে চাঁদা ট্যাক্স আকারে সরকারের ট্যাক্স ঘরে যায়, তার কত গুণ অধিক যায় চাঁদা আকারে ক্ষুদে মালিকদের ঘরে তা নিয়ে কোনো গবেষণা নেই। তো এই চাঁদাবাজি, এই মাস্তানির ধারা কোথা থেকে তৈরি হয় তা তিনি খেয়াল করলেন না। কীভাবে প্রশাসন কাজ করে তিনি খেয়াল না করে সব রাগ ঝাড়ছেন “মাস্তান আর মেরুদণ্ডহীনদের উপর”। আনু মুহাম্মদ চাচ্ছেন নীতিহীন লোক শিক্ষকতায় থাকবে না। “নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে শিক্ষকতা থেকে অব্যাহতি তাদের ন্যূনতম প্রাপ্য।” এই বাক্যটির মানে হচ্ছে উনি যেন ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠিরকে আনবেন।

পুঁজিবাদের কি নৈতিকতা নেই? পুঁজির নীতি কি? টমাস হবস যে Greedy Nasty Brute মানুষ চান তা তো এই মাস্তানেরাই। ফলে আনু মুহম্মদের উপরের সব কথার অর্থ দাঁড়াচ্ছে দাস ও সামন্ত যুগের সেই কৃষকের ফরিয়াদ যারা সৎ রাজা চায়; এবং উনি নিচ্ছেন সেই ইমামের ভূমিকা যিনি ক্ষমতার পুঁজিবাদী শোষণমূলক কাঠামোটির বিরুদ্ধে বিপ্লবের-বিদ্রোহের পথ না দেখিয়ে আত্মশুদ্ধিব্রত পালন করাতে চান শিক্ষকদের দিয়ে। শিল্পায়নবিরোধী পরিবেশ আন্দোলনের পক্ষে আনু মুহাম্মদের অবস্থান তাঁকে সেই ক্ষুদে মালিকানার পক্ষেই অবস্থান নিতে বাধ্য করেছে, যেই ক্ষুদে মালিকানার মাস্তানি ও অনৈতিকতাকে তিনি ঘৃণা করছেন।

তথ্যসূত্র:

১. আনু মুহাম্মদ, ফেসবুকে প্রদত্ত স্ট্যাটাস, ১১ মার্চ ২০১৯, https://www.facebook.com/anumuhammadbd/posts/10214897940144563

২. আনু মুহাম্মদ, বিপ্লবের স্বপ্নভূমি কিউবা, বিশ্বায়িত পুঁজিবাদে ল্যাটিন আমেরিকা, ১ ফেব্রুয়ারি ২০০৭, শ্রাবণ ঢাকা, পৃষ্ঠা ৭৯-৮০।

৩ আনু মুহাম্মদ, নড়বড়ে গণতন্ত্র ও নির্বাচন, দৈনিক সমকাল, ২৮ নভেম্বর ২০১৮, https://samakal.com/todays-print-edition/tp-editorial-comments/article/18115019/

Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই “পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি” প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১০টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর “সমাজতন্ত্র” ও “মার্কসবাদ” গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন “বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা” নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top