Main Menu

অরবিন্দ ঘোষ ছিলেন ভাববাদী চিন্তাবিদ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, কবি ও শিল্পশাস্ত্রী

শ্রী অরবিন্দ ঘোষ ছিলেন ভাববাদী চিন্তাবিদ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, কবি ও শিল্পশাস্ত্রী। তিনি বৈদান্তিক ভাবধারার সঙ্গে পাশ্চাত্যের আধুনিক রাষ্ট্রদর্শনের সংমিশ্রণে এক নতুন দিকের সুচনা করেছেন। ইংল্যান্ডে ছাত্রজীবনে তিনি গুপ্ত বিপ্লবী সংস্থার সঙ্গে যুক্ত হন। দেশে ফিরে বরােদায় অধ্যাপনার সঙ্গে বৈপ্লবিক চিন্তাভাবনার প্রচার থেকে ক্রমে প্রকাশ্য রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। এরপর কলকাতায় এসে অধ্যাপনা, ‘বন্দেমাতরম’ পত্রিকা সম্পাদনা এবং গোপনে সশস্ত্র অভ্যুত্থানের প্রয়াসী হন। ফলে বছরকাল কারারুদ্ধ থাকেন। মুক্তির পর তিনি সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মতৎপরতা থেকে সরে যান এবং পণ্ডিচেরিতে যোগসাধনা এবং দার্শনিক সৃজন কর্মে জীবন অতিবাহিত করেন। দ্বিতীয় বিশ্ব-মহাযুদ্ধের সময়ে তিনি ক্রিপস প্রস্তাব গ্রহণের পক্ষপাতী এবং ফ্যাসিবাদবিরােধী যুদ্ধপ্রচেষ্টার সমর্থক ছিলেন।

দর্শনচিন্তায় শ্রী অরবিন্দের প্রধান অবদান হলো তাঁর অতিমানস (Supermind) তত্ত্ব। সচ্চিদানন্দের সঠিক জ্ঞান ও পূর্ণশক্তির উপলব্ধিকেই অতিমানস বলা চলে; যোগসাধনার মাধ্যমে সেই উপলব্ধির সাহায্যে জগৎ ও জীবনের ঈপ্সিত পরিবর্তন সাধিত হয়। তাঁর ‘দিবা জীবন’ প্রত্যয়ের তাৎপর্য হলো হলো মানবমনের স্বভাবগত অহংবােধ ও ভেদবুদ্ধির ঊর্ধ্বে অর্থাৎ মানসস্তর থেকে অতিমানস স্তরে উঠে চরম সত্য ব্রহ্মকে জানা। সেজন্য ধর্মীয় অনুশাসন ও আচার অনুষ্ঠান নিষ্প্রয়োজন।

তিনি অধ্যাত্মভাবে পরিমণ্ডিত এমন এক আদর্শ সমাজের কথা ভেবেছেন যা সকলের জীবনকেই করে তুলবে সুন্দর ও সমৃদ্ধ। আধ্যাত্মিক প্রেরণাই হবে তার সঞ্চালক। সেই সঙ্গে তিনি চেয়েছেন বিশ্বের রূপান্তরের জন্য সর্বজ্ঞ ও বিশ্বচেতনাসম্পন্ন দিব্য অতিমানসের অবতরণ। মানুষকে সেজন্য মন অতিক্রম করে অতিমানস অভিমুখে বিবর্তিত হতে হবে। তখন অতিমানসিক গুণসমন্বিত একটি জাত বা গােষ্ঠী গড়ে উঠবে। তাঁর মতে অন্তর্মুখী সমচেতনার বিকাশের মাধ্যমে যাবতীয় সামাজিক ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের অবসান ঘটিয়ে সম্প্রীতি, সমন্বয় ও এক্য অর্জন করা যায়।

প্রকৃতিগতভাবে মানুষ চায় চিন্তার স্বাধীনতা, নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী জীবনের বিকাশ ও সৃজনকর্মের অবকাশ। কিন্তু রাষ্ট্র তার অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। সৃজনশীল মানুষের অসন্তোষ ও বিক্ষোভ দানা বাঁধে নৈরাজ্যবাদ ভিত্তিক চিন্তায়। তাঁর মতে মানবিক বিকাশের পরিপন্থী প্রচলিত ব্যবস্থায় ব্যক্তিমানুষের সত্তা যখন অবদমিত হয়, তখন তার সামাজিক চাপ ও চাহিদা নৈরাজ্যবাদে বিকল্প পথের সন্ধান করে। নৈরাজ্যবাদের হিংসাত্মক দিকটিকে বাদ দিয়ে তিনি তার মানব অধিকারের আদর্শকে প্রাধান্য দেন। নৈরাজ্যবাদকে তিনি নতুন এক নামে ‘কো-অপারেটিভ কমিউনিজম’ বলে চিহ্নিত করেন। তাতে সমবায়ী সম্পর্কের ভিত্তিতে সকলের শ্রম ও সম্পদ সাধারণভাবে সারা সমাজের বলে গণ্য হবে, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ক্ষুন্ন হবে না।

তিনি অনুভব করেন যে মানবসমাজের যথার্থ বিকাশ ও অগ্রগতির জন্য মানবপ্রকৃতির পরিবর্তন হওয়া কাম্য, পরিবর্তনটা তাঁর দৃষ্টিতে স্পষ্টতই আধ্যাত্মিক। তিনি চাইতেন বস্তুগত বিষয় থেকে আত্মিক স্তরে উত্তরণ। অধ্যাত্মবাদে মণ্ডিত সমাজ সর্বস্তরের মানুষকে যান্ত্রিক প্রশাসনে তাড়না বা পীড়ন না করে ছােটবড় সকলের অন্তরাত্মাকে উত্তোলন করবে, অতিমানসের স্তরে মানুষের উত্তরণ হলে আধ্যাত্মিক বিবর্তনধারায় গড়ে উঠবে এক নতুন মানব সমাজ, তাতে আর্থ-সামাজিক অসাম্য দূরীভূত হবে। তার দার্শনিক বুনিয়াদকে তিনি আধ্যাত্মিক কমিউনিজম নামে অভিহিত করেন।

চিত্রের ইতিহাস: অরবিন্দ ঘোষের আলিপুর জেলে ১৯০৮ সালে  পুলিশের তোলা দুটি আলোকচিত্র।

তথ্যসূত্র:

১. গঙ্গোপাধ্যায়, সৌরেন্দ্রমোহন. রাজনীতির অভিধান, আনন্দ পাবলিশার্স প্রা. লি. কলকাতা, তৃতীয় মুদ্রণ, জুলাই ২০১৩, পৃষ্ঠা ২১-২২।

আরো পড়ুন

অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১০টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর সমাজতন্ত্র মার্কসবাদ গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ।

জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।






Related News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *