আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > জীবনী > চে গ্যেভারা ফোকো মতবাদের অনুসারী এক গেরিলা বিপ্লবী

চে গ্যেভারা ফোকো মতবাদের অনুসারী এক গেরিলা বিপ্লবী

এর্নেস্তো গ্যেভারা দে লা সের্না (স্পেনীয় ভাষায় Ernesto Guevara de la Serna) বা চে’ গ্যেভারা, (Che Guevara) (জুন ১৪, ১৯২৮-অক্টোবর ৯, ১৯৬৭) বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে খ্যাতিমান মার্কসবাদী বিপ্লবীদের অন্যতম। তার আসল নাম ‘এর্নেস্তো গেভারা দে লা সেরনা’। জন্মসুত্রে তিনি আর্জেন্টিনার নাগরিক। তিনি পেশায় একজন ডাক্তার ছিলেন এবং ফিদেল কাস্ত্রোর দলে প্রথমে দলের চিকিৎসক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি অনুকরণীয় এক বিপ্লবীতে পরিণত হন। চে সম্পর্কে ফিদেল বলেছিলেন,

“আমরা যদি বলি যে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে কেমন দেখতে চাই, আমাদের বলতে হবে: তারা চে’র মত হোক! আমরা যদি বলি যে আমরা আমাদের সন্তানদের কেমন শিক্ষিত দেখতে চাই, আমাদের দ্বিধাহীনভাবে বলতে হবে: আমরা তাদের চে’র আদর্শে শিক্ষিত দেখতে চাই! আমরা যদি একটি মানুষের প্রতিমূর্তি কল্পনা করি, যিনি আমাদের সময়ের নন, ভবিষ্যতের; আমি আমার অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে বলছি যে সেই প্রতিমূর্তি, যিনি তার আচরণ ও কর্মে সম্পূর্ণ কলঙ্কমুক্ত, হলেন চে।”[১]  

তরুণ বয়সে মেডিসিন বিষয়ে পড়ার সময় চে দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণ করেন। যা তাকে অসহায় মানুষের দুঃখ কষ্ট অনুধাবন করার সুযোগ এনে দেয়। এই সময় এই সব অঞ্চলের সর্বব্যাপী দারিদ্র্য তাঁর মনে গভীর রেখাপাত করে। এই ভ্রমণকালে তাঁর অর্জিত অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে এই অঞ্চলে বদ্ধমূল অর্থনৈতিক বৈষম্যের স্বাভাবিক কারণ হলো রাষ্ট্রের একচেটিয়া পুঁজিবাদ, নয়া ঔপনিবেশিকতাবাদসাম্রাজ্যবাদ; এবং এর একমাত্র সমাধান হলো বিশ্ব বিপ্লব।[২] তখন থেকেই তিনি মার্কসবাদ নিয়ে পড়ালেখা শুরু করেন এবং স্বচক্ষে এর বাস্তব প্রয়োগ দেখার জন্য গুয়াতেমালা ভ্রমণ করেন। মার্কসবাদী বিশ্বাসের বশবর্তী হয়ে চে রাষ্ট্রপতি জাকোবো আরবেনজ গুজমানের নেতৃত্বাধীন গুয়াতেমালার সামাজিক সংস্কার আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৫৪ সালে সিআইএ-এর ষড়যন্ত্রে গুজমানকে ক্ষমতাচ্যুত করা হলে চে-র বৈপ্লবিক চেতনা বদ্ধমূল হয়।

৫ মার্চ ১৯৬০ কিউবার হাভানায় ফিদেল এবং চে’র মার্চপাস্ট

পরবর্তীকালে মেক্সিকো সিটিতে বসবাসের সময় তাঁর সঙ্গে রাউল ও ফিদেল কাস্ত্রোর আলাপ হয়। ১৯৫৬ সালে চে ফিদেল কাস্ত্রোর নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী সংগঠন ছাব্বিশে জুলাই আন্দোলনে যোগ দেন। ১৯৫৯ সালে এই সংগঠন কর্তৃক কিউবার ক্ষমতা দখলের পর তিনি রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। এই সময় তিনি বিভিন্ন নিবন্ধ ও বই রচনা করেন।

১৯৬৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি, আলজিয়ার্সে “আফ্রো-এশীয় সংহতি” আয়োজন করে এক “অর্থনৈতিক সেমিনারের” যেখানে চে বক্তৃতায় সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে আগুন বর্ষণ করেন এবং এটিই চে’র সবশেষ প্রকাশ্য আন্তর্জাতিক বক্তৃতা হিসেবে গণ্য হয়। এখানেই তিনি রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি সাম্রাজ্যবাদী শোষণকারী হিসেবে উল্লেখ করেন। ৩ নভেম্বর, ১৯৬৬-তে চে বলিভিয়ার রাজধানী লাপাজে পৌঁছান। তার ইচ্ছা ছিল কঙ্গো-কিনশাসা ও বলিভিয়াতে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। বলিভিয়াতে থাকার সময় গেরিলা যুদ্ধ করতে গিয়ে তিনি সিআইএ-’র মদদপুষ্ট বলিভিয়ান বাহিনীর কাছে ধরা পড়েন। ১৯৬৭ সালের ৯ই অক্টোবর, বলিভিয়ার শহর লা হিগুয়েরাতে বলিভিয়ার সেনাবাহিনী তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে।

চে কবিতা লিখতেন। তাঁর কবিতায় ফুটে উঠেছে কৃষিসংস্কার, ন্যায় বিচার, রুটি এবং স্বাধীনতার কথা। গণমানুষের মর্যাদাকে প্রতিষ্ঠিত করার লড়াইয়ে চে আমাদের কাছে অসীম প্রেরণা। চে সম্পর্কে ২০ শতকের মহত্তম কবি পাবলো নেরুদা লিখেছেন,

“একমাত্র চে-কেই আমরা দেখি বিষণ্ণ এক যোদ্ধার প্রতিকৃতিতে, যিনি ভালোবাসতেন বিপ্লব আর ভালোবাসতেন কবিতা। যার অস্ত্রের পাশেই থাকত কবিতা।”[৩]

চে একদিকে ছিলেন সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদের শত্রু, অন্যদিকে টাকা এবং মুনাফার শত্রু। তিনি জানতেন মুনাফা, পুঁজি, পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে নিরন্তর লড়াই চালাতে হবে। এই লড়াই করতে গিয়ে মতাদর্শিক এবং মূর্ত উভয় অস্ত্রের সন্ধান করেছেন। তিনি ১৯৬৫ সালে লেখেন,  

“পুঁজিবাদের ভোঁতা অস্ত্র দিয়ে সমাজতন্ত্র কায়েম সম্ভব নয়। পণ্যকে পুঁজিবাদী অর্থনীতির কাছে রেখে মুনাফা আর ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার প্রবণতাকে প্রশ্রয় দিলে তা শেষ পর্যন্ত কানা গলিতে নিয়েই ফেলবে। বিভ্রান্তি এড়িয়ে অনেক পথ পাড়ি দিয়ে লক্ষ্যের কাছাকাছি পৌঁছে ভুল বাঁক নিলেই বিপদ।”[৪]  

চের শিক্ষাচিন্তা ছিলো গণ মানুষের পক্ষে। তিনি ১৯৫৯ সালে লাসভিয়াস বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতায় যেসব কথা বলেছিলেন তা তাঁর শিক্ষাচিন্তার মর্মকে তুলে ধরে। তিনি সব মানুষকে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়কে অভিজাতদের কবল থেকে মুক্ত করে জনগণের জন্য উন্মুক্ত করতে চেয়েছিলেন। তিনি মনে করতেন যে, শিক্ষা কোনো বিলাস দ্রব্য নয় যে শুধু যাদের বাবার পকেটে টাকা আছে তারাই শিক্ষিত হবে। মহান শ্রমিক কৃষকগণ যারা দিনে আট ঘন্টা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতে পারে না বিধায় তিনি অভিজাতদের পক্ষের বিশ্ববিদ্যালয়ের সমালোচনা করেন।

তিনি মনে করতেন, দেশের সাধারণ মানুষের ইচ্ছা, আশা, আকঙ্খা মুক্তভাবে যাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডিতে পৌঁছতে পারে। তিনি চেয়েছিলেন যে,  কিউবার ঘরে ঘরে প্রতিদিনি রুটির সংগে শিক্ষাকেও পৌঁছে দিতে হবে। তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে, বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে গিয়েছিল; মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বসিন্দা, সেদিনের সেই যুবক ডাক্তার আর্নেস্তোকে সংগ্রামই অন্য মানুষে রূপান্তরিত করেছিল, তিনি বিপ্লবের গুরুত্ব বুঝতে পেরেছিলেন, জনগণের কাতারে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি সেই বক্তৃতায় আরো বলেছিলেন,

“বিশ্ববিদ্যায়গুলো ভেঙ্গেচুরে ভিন্ন ধাচে গড়ার সময় এসেছে। কালোদের, মিশ্র বর্ণের, শ্রমিকদের, চাষিদের জন্য এ বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় হবে গণমানুষের।[৫]

মূল নিবন্ধ ফোকো তত্ত্ব

১৯৬০-এর দশকে চে গ্যেভারা ১৯৫৯ সালের কিউবান বিপ্লবের সময় তার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তার বই গেরিলা যুদ্ধে বিপ্লবের ফোকো তত্ত্বটির বিকাশ করেছিলেন। চে গ্যেভারা পার্টিকে মার্কসবাদী ধারায় না চালিয়ে, ফিদেল ক্যাস্ত্রোর মতোই গেরিলা যুদ্ধের উপর নির্ভর করেছিলেন। এই মতবাদে প্রধান কেন্দ্রবিন্দু থাকে ছোট একটি গেরিলা ইউনিট দ্বারা আক্রমণের মাধ্যমে অতর্কিত ক্ষমতা করায়ত্ব করার দিকে। ফোকোবাদে প্রলেতারিয়েতের অগ্রগামী পার্টির কোন প্রয়োজন নেই, গেরিলাবাদী সামরিক সংগঠন থাকলেই হবে। এই মতবাদ সমরবাদী কারণ তা রাজনীতির ঊর্ধ্বে যুদ্ধকে স্থান দিয়ে থাকে।

চেকে সন্ত্রাসবাদী-সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সিআইএ-র সহযোগিতায় হত্যা করে। সাম্রাজ্যবাদীরা চেকে নৈরাজ্যবাদী উগ্র বামপন্থী হিসেবে উল্লেখ করে। মার্কসবাদী-লেনিনবাদী ও মাওবাদীরা চে এবং ফিদেল ক্যাস্ত্রোর চিন্তাকে সংশোধনবাদ হিসেবে উল্লেখ করেন।

চেকে সাম্রাজ্যবাদী-পুঁজিবাদী প্রচারমাধ্যম তরুণদের কাছে ফ্যাশনপ্রিয় মানুষে পরিণত করেছেন, চের চেহারাকে পরিণত করেছে একজন আদর্শ বিড়িখোর হিসেবে। চের জনপ্রিয় ফটোগুলিতে দেখা যায় চে নানা ভঙ্গিতে বিড়ি খাচ্ছেন। এসব করে জনগণের শত্রু প্রচারমাধ্যমগুলো তরুণদেরকে দেখাতে চেয়েছে যে, চে একজন বিড়িখোর, যেন চে কোনোদিন কোনো যুদ্ধ করেনি, বিপ্লব করেনি, চে গোটা দুনিয়া বিপ্লবের জন্য ঘুরে বেড়ায়নি, চে শুধু বিড়ি খেয়েছে।

সাম্রাজ্যবাদী প্রচারমাধ্যমের  বিপরীতে অন্যদিকে আমরা দেখি চে স্বেচ্ছাসেবার মাধ্যমে সমাজতন্ত্র নির্মাণের চেষ্টা করছেন। চে ফিদেলের চেয়েও জনগণের কাছের মানুষ, কৃষি সংস্কারের এবং অর্থনৈতিক চিন্তায় মাওবাদের কাছাকাছি।

মৃত্যুর পর তিনি সংশোধনবাদী ও সমাজতন্ত্র অনুসারীদের জন্য অনুকরনীয় ও অসীম প্রেরণায় পরিণত হন। চে সম্পর্কে জাঁ পল সার্ত্রে বলেছেন যে, “চে ছিলেন আমাদের সময়ের সর্বোচ্চ পুর্ণাঙ্গ মানব।”[৬]  চে যেন চিরকালীন তারুণ্যের প্রতীক, ভুলত্রুটি সত্ত্বেও চে সাম্রাজ্যবাদ ও স্বৈরাচারবিরোধী লড়াইয়ে জনগণের প্রেরণার অনেক উৎসের একটি।

তথ্যসূত্র:

১. ফিদেল ক্যাস্ত্রো, ১৮ই অক্টোবর, ১৯৬৭।

২. A speech by Che Guevara to the Second Economic Seminar of Afro-Asian Solidarity in Algiers, Algeria on February 24, 1965;

৩. চে সম্পর্কে তার প্রিয় কবি পাবলো নেরুদা।

৪. চে, সমাজতন্ত্র ও কিউবার মানুষ ১৯৬৫।

৫. চে, ১৯৫৯ সালে লাসভিয়াস বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতায়

৬. জাঁ পল সার্ত্রে; মোটরসাইকেল ডাইরীজ (২০০৪) সিনেমার জন্য ট্রেইলারে উদ্ধৃতিতে উল্লেখিত।

রচনাকাল ১৩ জুন, ২০১৪

আরো পড়ুন অনুপ সাদির সংকলিত ও অনূদিত কয়েকটি উদ্ধৃতি:

১. চে গ্যেভারার কয়েকটি উদ্ধৃতি

আরো পড়ুন

Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই “পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি” প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১০টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর “সমাজতন্ত্র” ও “মার্কসবাদ” গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন “বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা” নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top