Main Menu

দুকড়িবালা দেবী উপনিবেশবাদ বিরোধী বাংলার বিপ্লবী

দুকড়িবালা দেবী ১৮৮৭ সালের (বাংলা ১২৯৪, ৬ শ্রাবণ) ২১ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন বীরভূম জেলায় নলহাটি থানার ঝাউপাড়া গ্রামে। পিতা নীলমণি চট্টোপাধ্যায় এবং মা কমলকামিনী দেবী। স্বামী ছিলেন ঝাউপাড়া গ্রামেরই ফণীভূষণ চক্রবর্তী। মাসিমা নামে তিনি বিপ্লবী মহলে পরিচিতি। তিনি ছিলেন বাংলার প্রথম পর্যায়ের নারী বিপ্লবীদের মধ্যে অন্যতম। ব্রিটিশ দ্বারা যেসব বিপ্লবী নারী সাজা পান তাদের মধ্যে তিনিই  প্রথম সশ্রম কারাদণ্ড প্রাপ্ত।

দুকড়িবালার বোনপোর নাম ছিলও নিবারণ ঘটক। তিনি ছিলেন মাইনিং ক্লাসের ছাত্র। মাসিমা দুকড়িবালা নিবারণ ঘটককে খুব স্নেহ করতেন। বোনপো প্রায়ই তার বাড়িতে বন্ধুবান্ধব নিয়ে আসতেন। স্বদেশী বই, বে-আইনী বই লুকিয়ে পড়বার আড্ডা ছিল মাসিমার বাড়ি। দুকড়িবাবা দেবীর কেমন সন্দেহ হতো। তিনি সকলের আড়ালে বইগুলি দেখেন এবং পরে বোনপোকে ধমক দেন। একদিন তাঁর বাড়িতে মাস্টারমশাই নাম নিয়ে এলেন অধ্যাপক জ্যোতিষ ঘোষ। সিয়ারসোল রাজস্টেটে রণেনবাবু নাম নিয়ে এলেন ফেরারী বিপিন গাঙ্গুলী। রাজবাড়ির কর্মচারীরূপে বিপিনবাবু লাঠি, ছোরা খেলা ও মুষ্টিযুদ্ধ শিক্ষার শিক্ষক হয়ে আত্মগোপন করে আছেন। এঁদের আত্মবিশ্বাস ও সাহস দেখে দুকড়িবালা দেবী মুগ্ধ হয়ে যান, বিস্মিত হয়ে যান। তাঁর মনে এঁদের প্রতি সহানুভূতি ও শ্রদ্ধা জেগে ওঠে। ধীরে ধীরে একটা পরিবর্তন দেখা দিল তার মনে। বোনপো নিবারণের বিবাহ নিয়ে তুমুল তর্ক বাধল মাসি-বোনপোর মধ্যে। শর্ত ছিল তর্কে যে হারবে সে বিজয়ীর পথ ও মত গ্রহণ করবে। তর্কে হেরে গেলেন। বললেন, “এ বার আমায় দলে নিয়ে নাও।” বোনপো নিবারণ বলেন, “তুমি কি এপথে আসতে পারবে মাসিমা ? এমন বিপদের মুখে পা বাড়াতে নাই-বা এলে?” সিংহী গর্জে উঠে বললেন, “তুমি যদি দেশের জন্য প্রাণ দিতে পার, তোমার মাও পারে।”

একদিন বোনপো নিবারণ সাতটা মাউজার (Mauser) পিস্তল এনে লুকিয়ে রাখতে দিলেন মাসিমা দুকড়িবালা দেবীকে। এগুলি ছিল রডা কোম্পানি থেকে চুরি করে আনা মাল। এই চুরির কাহিনী অভিনব। ১৯১৪ সালের ২৬ অগাস্ট রডা কোম্পানির জেটি সরকার শ্রীশ মিত্র বড়সাহেবের হুকুম মতো মাল খালাস করতে জাহাজ ঘাটে যান। তিনি ২০২টি অস্ত্রপূর্ণ বাক্স খালাস করে সাতটি গরুর গাড়ি বোঝাই করে নিয়ে আসতে থাকেন। ছ’খানা গাড়ি তিনি রডা কোম্পানির গুদামে পৌঁছে দেন। একটি গাড়ির গাড়োয়ান ছদ্মবেশী বিপ্লবী হরিদাস দত্ত গাড়িটাকে নিয়ে উধাও হন। সেই গাড়িতে ৯টি বাক্সে ছিল কার্ট্রিজ এবং একটিতে ৫০টি মসার পিস্তল। মালগুলি পরে বিপ্লবীদের বিভিন্ন কেন্দ্রে প্রেরিত হয়।

১৯১৭ সালের জানুয়ারি মাসে ১ তারিখে পুলিস দুকড়িবালা দেবীর বাড়ি ঘিরে ফেলে। তল্লাশীতে পাওয়া যায় সাতটা মাউসার পিস্তল। শত জেরাতেও মাসিমার মুখ থেকে বের করতে পারল না যে, কে দিয়েছে তাকে পিস্তলগুলি। গ্রামের মেয়ে গ্রামের বৌ দুকড়িবালা দেবী কোলের শিশু বাড়িতে রেখে চলে গেলেন পুলিসের সঙ্গে। স্পেশাল ট্রাইবুনালের বিচারের রায়ে দুকড়িবালা দেবীর সাজা হয় দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড। নিবারণ ঘটকও রেহাই পান নি। তার জন্য কারাবাসের আদেশ হয় পাঁচ বছর। দুকড়িবালা দেবীর কারাবাসের করুণ কাহিনী ননীবালা দেবীর জীবনীতে আগেই লেখা হয়েছে। বন্দীজীবনের অসহ্য পরিবেশের মধ্যে থেকেও, প্রতিদিন আধ মণ ডাল ভাঙতে থাকা সত্ত্বেও তিনি তার বাবাকে চিঠি লিখলেন, তিন ভালোই আছেন, তাঁর জন্য যেন তারা চিন্তা না করেন, শুধু বাচ্চাদের যেন তারা দেখেন, শিশুরা যেন না কাঁদে।

এমনই ছিলেন তখনকার দিনের অগ্রগামী নারী-সৈনিকরা। মুক্তি পেয়েছিলেন তিনি ১৯১৮ সালের ডিসেম্বর মাসে।[১]

২৮ এপ্রিল ১৯৭০ সালে (১৪ বৈশাখ ১৩৭৭ বাংলা) তার মৃত্যু হয়।[২]

তথ্যসূত্র:

১. কমলা দাশগুপ্ত (জানুয়ারি ২০১৫)। স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলার নারী, অগ্নিযুগ গ্রন্থমালা ৯। কলকাতা: র‍্যাডিক্যাল ইম্প্রেশন। পৃষ্ঠা  ৬১-৬২। আইএসবিএন 978-81-85459-82-0।

২. প্রথম খন্ড, সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত ও অঞ্জলি বসু সম্পাদিত (২০০২)। সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান। কলকাতা: সাহিত্য সংসদ। পৃষ্ঠা ২০৯। আইএসবিএন 81-85626-65-0।  

আরো পড়ুন

জন্ম ৮ জানুয়ারি ১৯৮৯। বাংলাদেশের ময়মনসিংহে আনন্দমোহন কলেজ থেকে বিএ সম্মান ও এমএ পাশ করেছেন।

তাঁর প্রকাশিত প্রথম কবিতাগ্রন্থ স্বপ্নের পাখিরা ওড়ে যৌথ খামারে । বিভিন্ন সাময়িকীতে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া শিক্ষা জীবনের বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে রোদ্দুরে ডট কমের সম্পাদক।






Related News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *