Main Menu

জ্যাক দেরিদা প্রতিক্রিয়াশীল ফরাসি দার্শনিক

১৯৩০ সনের ১৫ই জুলাই আলজেরিয়ার এল বিয়ারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি প্যারিসের প্রখ্যাত Ecole normale Superieure-এ পড়াশুনো করেন এবং সেখানেই ১৯৬৪ সনে দর্শনের শিক্ষক নিযুক্ত হন। তার Speech and Phenomena (১৯৭৩), Writing and Difference (১৯৭৮) এবং Of Grammatology (১৯৭৬) গ্রন্থ প্রকাশের পরপরই তিনি ফরাশি চিন্তার জগতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। ১৯৬৮ সন থেকে জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং ১৯৭৪ সন থেকে ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন।

ফরাশি দার্শনিক জ্যাক দেরিদা সাম্প্রতিক ইউরোপীয় দর্শন, ভাষা এবং সাহিত্যে নিজের চিন্তার বিশেষ প্রভাব সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন। বিশেষত তার ‘অবিনির্মাণ’ পদ্ধতি উল্লেখ্য। এতে কোনো নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে কোনো বিষয় বা বিষয়সমূহ অবদমিত, ত্যজিত, বর্জিত, বিযুক্ত, অপেক্ষিত হয়েছে তা বুঝানোর জন্য ঐ পদ্ধতিকে উল্টে বিপ্রতীপ কৌশল প্রয়োগ করা হয়।

দেরিদীয় অবিনির্মাণ (decnstruction) অনুযায়ী কোনো আলোচনা বা রচনাকর্মে বিধৃত দার্শনিক অবস্থান বিপ্রতীপ হয়ে যায়। দেরিদার মতে পাশ্চাত্য দর্শনের ভিত্তি হলো ধীকেন্দ্রিকতা। এ হলো তাৎপর্য, সত্য, যুক্তি, জ্ঞানের ক্রমস্তরিক ভিত্তিমূলক ধারণা। তাৎপর্য/প্রকরণ, আপতিকতা/আকস্মিকতা (essence/acceident), গুরুত্বপূর্ণ/গুরুত্বহীন,  আক্ষরিক/ব্যঞ্জনাত্মক, স্বাতিক্রমণিক/অভিজ্ঞতামূলক,—এসব বিভাজনে রয়েছে উচ্চস্তরিক স্বাতন্ত্র্য। এখানে ধরে নেয়া হচ্ছে, আসক্ত শব্দদ্বয়ের প্রথমটিই আদি বা মূল বা অগ্রবর্তী; দ্বিতীয়টি হলো প্রথমটি থেকে আহরিত, প্রথমটির জটিল প্রকাশ কিংবা প্রথমটির পরিবর্তিত যুগপৎ রূপায়ণ। এই আসক্ত স্বাতন্ত্র বা বৈপরীত্যকে অবিনির্মাণ করার উদ্দেশে প্রথমে শব্দদ্বয়ের উচ্চস্তরিক পরম্পরাকে উল্টে দিতে হবে। দেখাতে হবে, প্রথম শব্দটিই দ্বিতীয়টির পরিবর্ত (veriant)। কারণ দ্বিতীয় শব্দটিতে এমনসব বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত হয়েছে, যার ফলে পরবর্তী হলো অগ্রবর্তী এবং কখনোই এর উল্টোক্রম গ্রাহ্য হবে না। অর্থাৎ আক্ষরিকের বিশেষ রূপ হিসেবে ব্যঞ্জনাত্মক (যার ব্যঞ্জনাধর্ম বিস্মৃত হয়েছে) গ্রাহ্য হবে না।

দেরিদা তার De la grammatologie বা Of Grammatology গ্রন্থে একটি সুন্দর দৃষ্টান্ত উল্লেখ করেছেন, কথা ও রচনা (speech and writing)। চিন্তাবিদেরা ভাষার সরাসরি স্বাভাবিক রূপ হিসেবে গণ্য করেন কথাকে। তাদের মতে, কথা বলা বা বক্তৃতা দেওয়ার সময়ের জীবন্ত অবস্থাকে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে লিখিত ‘রচনা’ কেবল দুর্বল বিকল্প। এভাবে তারা ভাষার জটিল বৈশিষ্ট্যকে অবদমিত করেন। কেননা তারা ভাষার একটি আদর্শায়িত নমুনার উপর ভিত্তি করেন, বিশেষত নির্ভর করেন কোনো ব্যক্তির কথা-বলা শোনার অভিজ্ঞতার উপর—এতে তাৎপর্য যুগপৎ উপস্থিত রয়েছে মনে হয়। রচনাকে নৈর্ব্যক্তিক, ফাকা ধারণকৌশল হিসেবে গণ্য করা হয়। অবশ্য দেখানো যায়, এই একেবারেই ফাকা পৌনঃপুনিকতার ক্ষমতা সকল চিহ্নেরই শর্ত এবং কথা বা বাচ্য হলো রচনার বা বিশেষ রচনারই ভিন্ন প্রকাশ। অর্থাৎ সংকীর্ণ অর্থে কথা এবং রচনা উভয়েরই শর্ত হলো ঐ ফাঁকা পৌনঃপুনিকতা। এই বৈপরীত্য ধীকেন্দ্রিক উচ্চস্তরতাকে ধ্বংস করে দেয় এবং ধীকেন্দ্রিক ধারণা থেকে অবদমিত ভাষার বিভিন্ন দিককে অবদমন থেকে মুক্ত করে। তাঁর মতে “পাঠের বাইরে কিছুই নেই”।

সংক্ষিপ্তভাবে দেরিদার অবদান হলো: (১) পাশ্চাত্য দর্শনে ধীকেন্দ্রিকতার প্রাসঙ্গিকতা বা স্থায়িত্ব এবং এর অনিবার্য অসামঞ্জস্য বা স্ববিরোধকে ব্যাখ্যা করা; (২) আপাত প্রান্তিক উপাদানের গুরুত্ব এবং বর্জন ও অবদমনের (exclusion and repression) উপর পদ্ধতির নির্ভরশীলতা; (৩) সাহিত্য সমালোচকদের জন্য ভাষা ও কূটাভাষ বা বৈপরীত্য ব্যাখায় সৃজনশীল এবং রচনাকর্মের অলঙ্কার ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে দার্শনিক চিন্তাধারায় নতুন এক আলোচনা পদ্ধতি প্রবর্তন, (৪) তার কৃত অন্যান্য তত্ত্বের অবিনির্মাণ থেকে প্রমাণ হয়, তাৎপর্য ভাষা উৎসৃষ্ট, ভাষার উৎস থেকে জাত নয়; তাৎপর্য কখনোই সম্পূর্ণ নিরূপিত নয়, কারণ তাৎপর্য পরিপ্রেক্ষিতে অনায়ত্ত বা অবর্ণিত (that cannot be curcumscribed) শক্তিসমূহেরই ফল। (৫) তার চিন্তাধারা  অনেক বিষয়ে আমাদের বিশ্বাস সম্পর্কে প্রশ্ন জাগায়। যেমন তার মতে উৎস, বর্তমান বা উপস্থিতি, অহম (self) ইত্যাদি বাস্তব ভিত্তি নয়, ফল।

দেরিদার প্রধান সমস্যা হচ্ছে তিনি ভাষার উপরে গুরুত্ব দিলেও বস্তু এবং বস্তুর পরিবর্তনশীলতা এবং গতিময়তা বুঝতে পারেননি। বস্তুর গতি না বোঝার কারণে সমাজের পরিবর্তনশীলতা তিনি বোঝেননি, এই কারণে তাঁকে আমরা প্রতিক্রিয়াশীল দার্শনিক বলছি। দেরিদার প্রথম দিককার রচনাতে প্লেটো, কান্ট, রুশো, হেগেল, হুসাল, ফ্রয়েড প্রমুখ সম্পর্কে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ রয়েছে। কিন্তু, তার Glas (১৯৭৪), La verite en peinture (১৯৭৮), La carte postale (১৯৮০) ইত্যাদি পরবর্তী সময়ের রচনাতে প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো বরং সাহিত্যিক। তার রচনাবলি সাহিত্য ও দর্শনের তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাখ্যা এবং দুইয়ের সীমাকে অনেকটা অতিক্রম করে যায়।

তথ্যসূত্র:

১. আফজালুল বাসার; বিশ শতকের সাহিত্যতত্ত্ব; বাংলা একাডেমী, ঢাকা; ফেব্রুয়ারি, ১৯৯১; পৃষ্ঠা ৩০৩-৩০৪।

আরো পড়ুন






Related News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *