You cannot copy content of this page
আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > জীবনী > লুই অগ্যুস্ত ব্লাঁকি ফরাসি কল্পলৌকিক সাম্যবাদের বিশিষ্ট প্রবক্তা

লুই অগ্যুস্ত ব্লাঁকি ফরাসি কল্পলৌকিক সাম্যবাদের বিশিষ্ট প্রবক্তা

লুই অগ্যুস্ত ব্লাঁকি (ফরাসি: Louis Auguste Blanqui) (১ ফেব্রুয়ারি, ১৮০৫- ১ জানুয়ারি, ১৮৮১) ছিলেন ফরাসি সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে বিখ্যাত বিপ্লবী, ফরাসি কল্পলৌকিক সাম্যবাদের বিশিষ্ট প্রবক্তা। তাঁর প্রতিষ্ঠিত মতবাদ ব্লাঁকিবাদ নামে পরিচিত।

ফ্রান্সের আল্প-মেরিটিমের পুগেত তেনেরিতে ব্লাঁকির জন্ম হয়। তাঁর পিতা কঁভঁসিয়ঁর সদস্য ছিলেন। ব্লাঁকি আইন ও চিকিৎসাবিদ্যায় শিক্ষালাভ করেন। কিন্তু এই দুই বিদ্যার একটিতেও তাঁর মন বসেনি। তাঁর মন টেনেছিলো রাজনীতিতে। ১৮৩০ সালের বিপ্লবে তিনি অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু লুই ফিলিপের শাসনে অল্পদিনেই তাঁর মোহভঙ্গ হয়। তিনি প্রজাতন্ত্রী সমিতি সংগঠন করতে শুরু করেন। ১৮৩১ ও ১৮৩৬ সালে দুবার তাঁকে জেলে যেতে হয়। ১৮৩৮-এ তিনি ‘ঋতুর সমিতি’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। এই সংগঠনে তাঁর সহযোগী ছিলেন আর্মাঁ বার্বে ও মার্তাঁ রেবনার। ১৮৩৯ সালে এই সমিতি যে অভ্যুত্থানের ডাক দেয়, তা ব্যর্থ হয়। ব্লাঁকি ও তাঁর সহযোগীদের প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। অবশ্য পরে প্রাণদণ্ড মকুব করে এঁদের যাবজ্জীবন কারাবাসের দণ্ড দেওয়া হয়।

জেলে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাঁকে মুক্তি দেয়া হয়। ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের ঠিক আগে তিনি জেলের হাসপাতাল থেকে মুক্তি পান। কিন্তু তাঁর সহযোগী বার্বে তাঁর বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ আনায় মে মাসে তাঁকে আবার দশ বছরের জন্য কারাগারে পাঠানো হয়।

কারাবাসের এই সময় তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক মতবাদ গড়ে ওঠে। ১৮২৮ সালে বুয়োনারতি (১৭৬১-১৮৩৭) প্রকাশিত বাব্যুফের ‘সাম্যের জন্যে ষড়যন্ত্র’ নামক গ্রন্থ থেকেই তিনি প্রলেতারিয়েতের একনায়কত্ব ধারনায় পৌঁছান। সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার একমাত্র পন্থা হিসেবেই তিনি প্রলেতারিয়েতের একনায়কত্বকে গ্রহণ করেছিলেন। তিনি মনে করতেন যে, প্রলেতারিয়েতদেরকে বুর্জোয়া শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে। এই সংগ্রামের হাতিয়ার, ট্রেড ইউনিয়ন, ধর্মঘট ও বৈপ্লবিক অভ্যুত্থান। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিলো যে, বুর্জোয়া শাসন তার সামাজিক বিকাশের চরম বিন্দুতে পৌঁছাবার আগেই এই বুর্জোয়া সামাজিক সংগঠনকে উপড়ে ফেলতে হবে। এখানেই মার্কসীয় মতবাদের সংগে তাঁর মৌলিক পার্থক্য। ব্লাঁকির দর্শনে বিপ্লব মানেই প্রগতি। শেষ পর্যন্ত ব্লাঁকির দর্শনে সামাজিক লক্ষ্য নয়, বিপ্লবই বিপ্লবের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়।

১৮৫৯ সালে তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েই আবার গুপ্ত সমিতির সংগঠন আরম্ভ করেন। স্বভাবতই ১৮৬৭ সালে আবার তাঁকে জেলে যেতে হয়। ১৮৬৫? সালে তিনি বেলজিয়ামে পালিয়ে যান এবং সেখান থেকে গুপ্ত সমিতির পরিচালনা করতে থাকেন। ১৮৭০ সালে তিনি আবার যখন ফ্রান্সে ফিরে আসেন, তখন তিনি প্যারিসের একটি সশস্ত্র, সুশৃঙ্খল গুপ্ত সমিতির অবিসংবাদিত নেতা। এই বাহিনীর সংখ্যা তখন প্রায় চার হাজার। এই সশস্ত্র বাহিনীর বাইরেও তাঁর অনুগামিরা ছড়িয়ে ছিলো।

সেঁদার বিপর্যয়ের পর প্যারিসের জনতার নেতৃত্ব দেয় ব্লাঁকির অনুগামিরা। দ্বিতীয় সাম্রাজ্যের পতনে এঁদের ভূমিকা অনেকখানি। কিন্তু নতুন সরকারে ব্লাঁকিপন্থীদের নেয়া হয়নি। ব্লাঁকিপন্থীগণ বিপ্লবী পার্টির ক্রিয়াকলাপের বদলে মুষ্টিমেয় চক্রান্তকারীর অভিযানে বিশ্বাসী ছিলো, অভ্যুত্থানের বিজয়ের জন্য প্রয়োজনীয় প্রত্যক্ষ বাস্তব পরিস্থিতির পরোয়া করত না এবং জনসংযোগ উপেক্ষা করত।

১৮৭১ সালের ৩১ অক্টোবর ব্লাঁকির নেতৃত্বাধীন বাহিনীর সংগে সরকারি বাহিনীর সংঘর্ষ হয় এবং কয়েক ঘণ্টার জন্যে যে অস্থায়ী সরকার গঠিত হয় তাঁর নেতাও ছিলেন ব্লাঁকি। ১৮৭১ সালের জানুয়ারিতে তিয়ের জার্মানদের সংগে যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষর করেন। ব্লাঁকিও স্বাস্থ্য উদ্ধারের জন্য ‘ল’তে (Lot) চলে যান। সেখানে ঠিক প্যারিস কমিউনের অভ্যুত্থানের অব্যবহিত পূর্বে ১৭ মার্চ তিয়েরের আদেশে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার করা হয় ৩১ অক্টোবরের প্যারিসের অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণের জন্যে। সুতরাং ব্লাঁকি স্বয়ং প্যারিস কমিউনের নেতৃত্ব দিতে পারেননি। কিন্তু তাঁর অনুগামিরা অর্থাৎ ব্লাঁকিপন্থীরা এই কমিউনের নেতৃত্ব দেন। প্যারিস কমিউনের পরাজয়ের পর তাঁকে আবার যাবজ্জীবন কারাবাসের দণ্ড দেয়া হয়। ১৮৭৯ সালের রাজক্ষমার পর তিনি বন্দিদশা থেকে মুক্তি পান। ১৮৮১ সালের ১ জানুয়ারি প্যারিসে তাঁর মৃত্যু হয়।

লুই অগ্যুস্ত ব্লাঁকি রচিত গ্রন্থের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ফরাসি ভাষায়,

১. L’Armée esclave et opprimée

২. Critique sociale, দুই খণ্ডে: Capital et travail এবং Fragments et notes,

৩. Instructions pour une prise d’armes,

৪. Maintenant il faut des armes,

৫. Ni dieu ni maître,

৬. Qui fait la soupe doit la manger,

৭. Réponse,

৮. Un dernier mot.

ইংরেজিতে অনূদিত ও প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ হচ্ছে,

১. The Eternity According to the Stars, tr. by Mathew H. Anderson, with an afterword by Lisa Block de Behar (Literary Escapes and Astral Shelters of an Incarcerated Conspirator). In CR: The New Centennial Review 9/3: 61-94, Winter 2009. The first full-length translation into English.

২. Eternity by the Stars, tr. with an intro by Frank Chouraqui (New York: Contra Mundum Press, 2013). First critical edition.

তথ্যসূত্র:

১. প্রফুল্ল কুমার চক্রবর্তী; ফরাসি বিপ্লব; পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষদ, জানুয়ারি, ২০০০; পৃষ্ঠা, ৪৩৫-৪৩৬।

২. ভ. ই. লেনিন, আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের ঐক্য প্রসঙ্গে; প্রগতি প্রকাশন, মস্কো; ১৯৭৩; পৃষ্ঠা-৪৩৩।

রচনাকাল ৩১ জানুয়ারি, ২০১৫, প্রথম প্রকাশ প্রাণকাকলিতে।

Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই “পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি” প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১০টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর “সমাজতন্ত্র” ও “মার্কসবাদ” গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন “বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা” নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top