Main Menu

পুঁজির উদ্ভব গ্রন্থের সূচিপত্র

পুঁজির উদ্ভব — কার্ল মার্কস*

১. আদি সঞ্চয়ের রহস্য

২. ভূমি থেকে কৃষিজীবী জনগণের উচ্ছেদ

৩. পনের শতকের শেষ থেকে উৎখাতদের বিরদ্ধে রক্তাক্ত বিধান। পার্লামেণ্টের আইনে মজুরির অবনমন

৪. পুঁজিবাদী খামারীর উদ্ভব

৫. শিল্পের ওপর কৃষি বিপ্লবের প্রতিক্রিয়া। শিল্প পুঁজির জন্য ঘরোয়া বাজার সৃষ্টি

৬. শিল্প পুঁজিপতির উদ্ভব

৭. পুঁজিবাদী সঞ্চয়ের ঐতিহাসিক প্রবণতা

৮. উপনিবেশনের আধুনিক তত্ত্ব

পুঁজির উদ্ভব হচ্ছে কার্ল মার্কস লিখিত পুঁজি গ্রন্থের প্রথম খণ্ডের অষ্টম অংশ। এখানে রোদ্দুরে ডট কমে এই অষ্টম অংশের ২৬-৩৩ অধ্যায় প্রকাশ করা হচ্ছে।

 

পুঁজির আদি সঞ্চয় প্রক্রিয়ার সংক্ষেপিত রূপ

পাঠক বন্ধুরা, যারা উপরের ৮টি অধ্যায় পড়তে অনিচ্ছুক তারা নিচের অংশটুকু সংক্ষেপে পড়তে পারেন। এখানে এই ৮টি অধ্যায়ের সংক্ষিপ্ত রূপ প্রদান করা হয়েছে। সংক্ষিপ্ত রূপটি তৈরি করেছি আমি [অনুপ সাদি] মূলত রেবতী বর্মনকৃত কার্ল মার্কসের পুঁজি গ্রন্থের সারসংক্ষেপ থেকে; তবে আমি শব্দ ও অনেক তথ্য সহজিকরণ করেছি।

প্রাথমিক সঞ্চয়

পুঁজিবাদ প্রবর্তিত হবার আগে পর্যন্ত মুদ্রার কাজ ছিলো বাজারে দ্রব্য কেনা। কিন্তু যখন থেকে মুদ্রা দিয়ে একটা বিশেষ প্রকারের পণ্য কেনা হতে লাগল তখন থেকেই শুরু হয়েছে পুঁজিবাদী উৎপাদন প্রথা। এই বিশেষ প্রকারের পণ্যটা অন্য আর কিছুই না, শ্রমিকের শ্রম-শক্তি। তখন থেকেই মুদ্রা পরিবর্তিত হলো পুঁজিতে। পুঁজির একমাত্র ধর্ম তার আপন প্রসার এবং মুনাফা সৃষ্টি। এরূপ উৎপাদন প্রথা প্রবর্তিত হওয়ার আগে কতগুলো লোকের হাতে মুদ্রার সঞ্চয় হয়েছিল, একে বলা হয় ব্যবসায়িক পুঁজি। কেননা ব্যবসা থেকেই তা আহরণ করা হয়েছে। এই সঞ্চয়কে মার্কস আখ্যা দিয়েছেন প্রাথমিক সঞ্চয় (primitive Accumulation) |

বাইবেলে বলা হয়েছে, জ্ঞানবৃক্ষের ফল খেয়ে আদম যে পাপ করেছিল, তা থেকে উদ্ভব হয়েছে মানুষের দুর্গতি। তখন থেকেই মানুষকে জীবিকার ব্যবস্থা করতে হয়েছে শারীরিক পরিশ্রম দিয়ে। কিন্তু ‘বুর্জোয়া অর্থনীতি’ আমাদের শিক্ষা দিয়েছে যে, সব মানুষকেই গ্রাসাচ্ছাদনের জন্যে মেহনত করতে হয় না। অধিকাংশ লোক মাথার ঘাম পায়ে ফেলে উৎপাদন করবে, আর মুষ্টিমেয় কিছু লোক তার ফল ভোগ করবে। ‘বুর্জোয়া অর্থনীতি’ নীতি-শিক্ষা দিতেও ছাড়েনি। প্রথম থেকেই যারা অমিতব্যয়ী, সঞ্চয় করতে পারে নি, দুঃখ তাদেরই। সৎভাবে যারা জীবন-যাপন করেছে, তারাই শুধু এখনও পর্যন্ত বিনা মেহনতে জীবিকা অর্জন করতে পারছে। কিন্তু যথার্থ ইতিহাস কি তা-ই? ইতিহাস বলবে—এরকম অধিকার-বৈষম্যের কারণ যুদ্ধ, হত্যা, দস্যুতা-এক কথায় সব ধরনের জুলুম এবং জবরদস্তি। প্রাথমিক সঞ্চয় সম্ভব হয়েছিলো এগুলোরই সহায়তায়।

মুদ্রা, পণ্য, উৎপাদনের যন্ত্রপাতি ও উপকরণগুলো পুঁজিবাদের আগেও ছিলো। কিন্তু তখন তা পুঁজিরূপে ছিল না। পুঁজিতে এগুলোর রূপান্তর এমনি সম্ভব হয়নি। পুঁজিবাদী উৎপাদনের মূল কথাই হলো এমন একটা অবস্থার সৃষ্টি করা চাই যেন বহু লোক যন্ত্রপাতির অধিকার থেকে বিচ্যুত হয়, তবেই তারা নিজস্ব উৎপাদনের উপকরণের সাহায্যে আপন শ্রমশক্তিকে বাস্তব আকার দেয়ার সুযোগ পাবে না। একবার পুঁজিবাদী উৎপাদন শুরু হলে মানুষ ও তার যন্ত্রপাতির বিচ্ছেদ পুঁজিবাদ শুধু সংরক্ষণই করে না, বিচ্ছেদকে বাড়িয়ে তোলাই হয়ে ওঠে তার ধর্ম। অধিক থেকে অধিকতর লোককে তাদের যন্ত্রপাতির অধিকার থেকে বিচ্যুত করে শ্রমিক জীবন যাপন করতে বাধ্য করাই তখন পুঁজির প্রধান কাজ হয়ে ওঠে। উৎপাদনকারীকে তার যন্ত্রপাতি থেকে বিচ্যুত করাই হয়ে দাঁড়ায় তথা-কথিত প্রাথমিক সঞ্চায়ের ঐতিহাসিক কাজ ।

পুঁজিবাদের অর্থনৈতিক কাঠামো সামন্ত ব্যবস্থা থেকে উদ্ভূত হয়েছে। সামন্ত ব্যবস্থার ভেতরই পুঁজিবাদের বীজ নিহিত ছিল; প্রথমটার বিনষ্টি থেকেই পরেরটার জন্ম হয়েছে।

উৎপাদনকারী ফিউডাল বা সামন্ত যুগের বন্ধনদশা থেকে মুক্ত হয়েই প্রকাশ্য বাজারে তার শ্রমশক্তি বিক্রি করার অধিকার অর্জন করে। বুর্জোয়া এটুকুই বুঝতে পারে যে উৎপাদনকারীকে মজুরে পরিবর্তিত করতে হলে আগেকার গিল্ড প্রভৃতি উৎপাদন প্রথার বিলোপ আবশ্যক। কিন্তু সে স্বীকার করতে রাজী না বা দেখেও দেখতে চায় না যে উৎপাদনকারীকে মজুরে পরিণত করার সাথে সাথেই উৎপাদনের উপকরণের অধিকার তার হাত থেকে খসে পড়ছে। সামন্তবাদ থেকে উৎপাদনকারী মুক্তিলাভ করল বটে; কিন্তু সামন্তবাদ তাকে যেমন জীবিকার নিশ্চয়তা দিতে পারত, পুঁজিবাদ তা পারল না। পুঁজিপতি কর্তৃক যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য উপকরণ আপন অধিকারে আনার কাহিনী মানবজাতির ইতিহাসে রক্তের ও আগুনের অক্ষরে লেখা রয়েছে।

গিল্ডের উচ্ছেদই শুধু না, অভিজাতবর্গের বিনাশও পুঁজিপতির লক্ষ্য হয়ে দাঁড়াল। কেননা এই শ্রেণীর হাতেই তখনো সব বিত্তের অধিকার। মালিক সমাজের অধিকাংশ লোককে স্বাধীনভাবে যদৃচ্ছ শোষণ করবে—অভিজাত বর্গের অস্তিত্ব ছিল পুঁজিপতির এমন লক্ষ্যের পথে শ্রেষ্ঠ অন্তরায়। যেমনই হোক, মজুরের স্বাধীনতা লাভের সঙ্গে সঙ্গে নতুন রকমের দাসত্বও তার বেড়ে গেল। এই দাসত্ব সামন্তবাদী দাসত্ব থেকে পুঁজিবাদী দাসত্বে রূপ পরিবর্তন মাত্র। এই ব্যাপারটার মূল সত্য হলো পুঁজিবাদ কর্তৃক কৃষককে জমি থেকে ছিনিয়ে নিতে পারার সাফল্য।

চৌদ্দ শতকের শেষাংশে ইংল্যাণ্ডে দাসত্ব প্রথা প্রায় উঠেই গিয়েছিল। তখন জনসংখ্যার অধিকাংশই ছিল কৃষক। তারা জমিদারদের অধীনে নিজ নিজ জমি চাষ করত। কৃষি মজুরের সংখ্যা ছিল খুবই কম। অনেক সময় অনেক কৃষকই অবশ্য কৃষি মজুরের কাজ করত। কৃষি-মজুরও কখনো পুরোপুরি জমিচ্যুত হয়নি, তাদের বসতবাড়ির সাথে অন্ততঃ চার পাঁচ একর জমি সংযুক্ত থাকতই। তাছাড়া অন্যান্য কৃষকের মতোই গোচারণ ভূমি এবং গ্রাম-স্থানীয় অধিকার তারা ভোগ করত।

মধ্যযুগে উৎপাদন প্রথা ইউরোপের সব দেশেই প্রায় একই রকম ছিল। রাজার নিচে ছিল কিছু অভিজাত। সর্বনিম্নে কৃষক। জমির বিভাগও করা হতো এই স্তর অনুসারে। কৃষকদের ভিতর জমি ভাগ করে দেয়া হতো বটে, কিন্তু এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভূখণ্ডগুলোর ভিতর মাঝে মাঝে দেখা যেত বৃহদায়তন ভূমিখণ্ড। এগুলো জমিদারেরা নিজেদের অধিকারেই রাখত। কৃষকরা সপ্তায় কয়েক দিন করে জমিদারের জমিতে বেগার দিত।

পনের শতকের শেষার্ধে উৎপাদন প্রথায় পুঁজিতান্ত্রিক রূপান্তরের প্রথম সূচনা দেখা দিল। রাজা এবং সামন্ত অভিজাতবর্গের পরস্পর যুদ্ধের ফলে নতুন এক শ্রেণির অভিজাতের জন্ম হলো। এই নতুন অভিজাতদের ধারণা হলো, অর্থই একমাত্র শ্রেষ্ঠ শক্তি; যে কোন উপায়ে অর্থ উপার্জন ও সঞ্চয় করা চাই। চাষের জমিকে মেষ চারণের ভূমিতে পরিণত করাই হয়ে দাঁড়াল তাদের একমাত্র চেষ্টা। পশমের তখন খুব চাহিদা। এই নতুন অভিজাতবর্গ তাই বেআইনীভাবে এবং জবরদস্তি করে এজমালী জমি ও ব্যক্তিগত ভূমি দখল করতে শুরু করে দিল এবং তা ঘিরে ফেলতে লাগল।

এই সময়ে আরো একটা ঘটনা আত্মপ্রকাশ করল। রিফর্মেশনের সময়ে ক্যাথলিক চার্চ ছিলো ইংল্যাণ্ডের বহু জমির মালিক। ধর্ম প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিধ্বস্ত করে জমি বাজেয়াপ্ত করার সঙ্গে সঙ্গে ধর্মযাজক সম্প্রদায় নিঃস্বত্ব হয়ে পড়ল। জমিগুলো খুব কমদামে বিক্রি করা হলো রাজার অনুগতদের কাছে। তারা কৃষকদের স্বত্ব অস্বীকার করে তাদের জমি থেকে উৎখাত করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করল না। এভাবে অনেক মানুষ জমিচ্যুত হলে রাণী এলিজাবেথের সময়ে Poor Rate আইন করে এদের “পপ্যার’ (Pauper) বলে ঘোষণা করা হলো। উইলিয়াম কবেট তার ইতিহাসে উল্লেখ করেছেন-সব আইনের গোড়াতেই একটা করে ভূমিকা (Preamble) সন্নিবিষ্ট করা হয়, কিন্তু Poor Rate আইনে কোন ভূমিকা নেই। বিষয়টা এতই লজ্জাকর এবং বর্বরোচিত ছিল যে ব্যবস্থাপকরা তা বাদই রেখে গেছেন।

কৃষকদের চেয়ে একটু উচ্চস্তরে ছিলো ফার্মার সম্প্রদায়। সতের শতকের শেষ দশকেও দেখা গেছে, কৃষকের সংখ্যা ছিল ফার্মারের সংখ্যা থেকে বেশি। কৃষকদের নাম ছিলো ইয়ম্যান। তারা নিজেদের জমিতে নিজেরা খাটত, ফার্মাররা জমিদারদের কাছ থেকে জমি বন্দোবস্ত নিয়ে কৃষি মজুর সহযোগে ফসল উৎপাদন করত। এদের আমরা বলব পুঁজিপতি। ১৭৫০ এর ভিতরে স্বাধীন উৎপাদনকারী কৃষকশ্রেণী একেবারেই নির্মূল হয়ে গেল। সাথে সাথে বিলুপ্ত হলো সর্বসাধারণের অধিকারভুক্ত জমি।

স্টুয়ার্টদের সিংহাসনে পুনঃঅধিষ্ঠিত হওয়ার সময় থেকে আইনের সাহায্যেই এই জমি আত্মসাৎ শুরু হলো। ১৬৮৮-র বিপ্লব শুধু উইলিয়াম অব অরেঞ্জকেই বিদেশ থেকে আমদানী করেনি, সাথে সাথে পুঁজিপতির দলকেও সৃষ্টি করেছে। রাষ্ট্রের অধীনে যে সব জমি ছিল, সেগুলো প্রায় বিনামূল্যেই বিক্রি হতে লাগল। তাছাড়া অনেক ভূস্বামী রাষ্ট্রের কোনো অনুমতির অপেক্ষা না রেখেই নিজের জমির সাথে রাষ্ট্রের নাম জুড়ে দিল। এভাবে রাষ্ট্রের এবং চার্চের জমিগুলো অধিকার করে নতুন ভূস্বামীরা আপন সম্প্রদায় গড়ে তুলল। বুর্জোয়া পুঁজিপতিরা এই ব্যবস্থাকে সমর্থন না করে পারে না, কেননা এ থেকে মজুরের সংখ্যাও বাড়বে, আবার পুঁজিতান্ত্রিক উপায়ে চাষ করিয়ে উদ্ধৃত্ত মূল্য উপার্জনও সম্ভব হবে।

পনের ও ষোল শতকে কি করে সম্পূর্ণ জুলুমের সাহায্যে জমি কৃষকদের হাত থেকে ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে তা আমরা দেখেছি। আঠার শতকে কিন্তু আগের মতো জমি আত্মাসাৎ করে নেয়া বেআইনি থাকল না। পার্লামেন্ট আইন করে এই ব্যাপারটাকে সমর্থন করতে লাগল। ‘জমি ঘেরাও করে নেয়া’—মূলক (enclosure) পার্লামেন্টের আইনগুলোর দিকে তাকালেই তা আমরা বুঝতে পারি। এই আইনগুলোর বলেই ভূস্বামীরা সাধারণ সম্পত্তিগুলো নিজেদের ভেতর ভাগ বাটোয়ারা করে নিতে পেরেছে।

আঠার শতকে তেমন বুঝতে পারা যায় নি, উনিশ শতকেই ভাল করে বোঝা গেছে—সামাজিক বিত্তের বৃদ্ধি দারিদ্রেরই নামান্তর। এই সময়ে সমাজের সর্বনিম্নতম লোকেরা ক্রমেই গরীব হতে লাগল; জমির ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মনিব থেকে তারা দিন মজুরে পরিণত হতে লাগল। জীবনযাত্রার জন্যে যা ন্যূনতম, উপার্জন যখন তারও নীচে নেমে আসল, তখনই মজুরির পরিপূরক হয়ে আসলো পুওর রেট (Poor Rate)।

চার্চ ও রাষ্ট্রের সম্পত্তি আত্মসাৎ, সাধারণ সম্পত্তির উপর জোর করে অধিকার বিস্তার, সামন্ত যুগের কৃষকদের সম্পত্তি থেকে অপসারণ—এগুলোই হলো প্রাথমিক সঞ্চয়ের নৃশংস কাহিনী। এসব কারণে পূজিবাদী প্রথায় জমি চাষের একদিকে যেমন সুবিধা হয়ে গেল, তেমনি কৃষককে মজুরে পরিণত করে শহরে কারখানায় খাটানোরও সুযোগ দেখা দিল। এই হচ্ছে আদি পুঁজি সঞ্চয়ের করুণ রক্তাক্ত ইতিহাস।

আরো পড়ুন






Related News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *