You cannot copy content of this page
আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > বই > বই পর্যালোচনা > চার্বাক সুমনের ব্যঙ্গ উপন্যাস ‘সদর ভাইয়ের অমর কাহিনি’র একটি পর্যালোচনা

চার্বাক সুমনের ব্যঙ্গ উপন্যাস ‘সদর ভাইয়ের অমর কাহিনি’র একটি পর্যালোচনা

চার্বাক সুমনের (জন্ম ১৯৮৩) ব্যঙ্গ উপন্যাস সদর ভাইয়ের অমর কাহিনি বঙ্গদেশের বিপ্লবাকাঙ্ক্ষী কিছু ভাঁড়ামোপূর্ণ নেতার জীবনচরিত। বঙ্গে বিপ্লব শব্দটি জনপ্রিয় হয় বিশ শতকের গোড়ায়। তখন থেকেই এখানে বিপ্লব করার জন্য কিছু নেতার আবির্ভাব হয়। এই নেতাজীরা প্রায় একশো বছর ধরে যা চর্চা করেছেন তার কিছু বাস্তব ও যাদুবাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে চার্বাক সুমনের এই গল্পে।

চার্বাক সুমনের এটি এমন এক উপন্যাস, যেই উপন্যাসের নাম ‘সদর ভাইয়ের অমর কাহিনি’। এই উপন্যাসের গল্পের মাধ্যমে আমরা এক নেতার সাক্ষাত পাই যার নাম সদর ভাই ওরফে সদরুদ্দিন। সদর ভাইকে শুরুতে নেতাজী নামে সম্বোধন করা হয়েছে। তবে প্রথম পর্বেই তার নামের সাক্ষাত পাওয়া গেছে যদিও তার জন্মকালের নামের কোনো হদিস পাওয়া যায়নি।

কিন্তু চার্বাক সুমনের সৃষ্ট এই নেতাজীকে যেন কেহ ঘুণাক্ষরেও নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু না ভেবে বসেন। এই গল্পের নায়ক হচ্ছেন এক মোটা বুদ্ধির স্থুল দেহের ভাঁড়। এই নেতা তিন কাল মানে ব্রিটিশ, পাকিস্তান এবং সমকালীন আমলে বেঁচে বর্তে আছেন। এই গল্প পড়তে গেলে আমরা দেখবো যেই লোকটির হবার কথা ছিল রামকৃষ্ণ মিশনের সাধু এবং যার নাম হতে পারতো স্বামী শিবদাসানন্দ মহাথেরো, তিনি কীভাবে হয়ে যান একটি বিপ্লবী পার্টির নেতা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই মানুষগুলোর ক্রিয়াকলাপ জনগণের সামনে ফুটে উঠেই এবং সেই ক্ষেত্রে আমরা পাই একজন গল্পকারকে যার নাম চার্বাক সুমন।

সদর ভাইয়ের অমর কাহিনি ইতিহাসের বিবরণ নয়, তবে এর মাঝে সত্যের ঘাটতিও নেই। মহাচিনের গল্পকার লু স্যুন (২৫ সেপ্টেম্বর, ১৮৮১— ১৯ অক্টোবর, ১৯৩৬) তাঁর ‘বিদ্রুপ কী’ প্রবন্ধে বলেছিলেন যে, সত্যই হচ্ছে বিদ্রুপের প্রাণশক্তি। এই গল্পেও আমরা পাবো সত্যরূপি বিদ্রুপকে যা আমাদেরকে চেনাতে সাহায্য করবে বিশ শতকের সেইসব সামন্তীয় ও খুদে বুর্জোয়া নেতাদের যারা শেষ পর্যন্ত জনগণের কাছে বেশ কিছু ক্ষেত্রে কৌতুকের উৎসে পরিণত হয়েছেন।

কিরে, সবাই মিলে মামা হালিম পার্টিতে যোগ দে।

‘সদর ভাইয়ের অমর কাহিনী’ নামক ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ মিশ্রিত যে রচনাটি বেশ কয়েকটি পর্বে লেখা হয়েছে। পর্বগুলো হচ্ছে ‘বাড়িতেছে মৃগশাখাধামে’, ‘কলসীর তলকানা’, ‘পোকা আম স্বাদে মিঠা’, ‘একমাত্র হালাল দল’, ‘ডিমের রং সাদা’, ‘গুরু কহিল মুরিদ ভাবিল’, ‘কূর্ম সকল করিল দল’, ‘ডাব গাছে নারকেল ধরে’ এবং ‘ব্যাঙের মাথায় ছাতা’। এই বড় আকারের গল্পটির সবগুলো পর্বই যেন হয়ে উঠেছে বাঙলার বামপন্থি ও বিপ্লবপন্থীদের অজানা ইতিহাসের বাস্তব চিত্র। এই চিত্রটি বাঙালি মধ্যবিত্তের কাছে সুখকর নয়, যেমন সুখকর নয় সেই ভালো মানুষ নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের কাছে ১৯৭১—এর শ্রেণিযুদ্ধটি, যা মাত্র চার দশক অতিবাহিত হবার মধ্যেই বেহাত হয়ে যায় টাকার মালিকদের কাছে। সেই শ্রেণিযুদ্ধটি সুখের বদলে কাড়ি কাড়ি যন্ত্রণা হয়ে দেখা দেয় যুদ্ধের ময়দানে লড়ে হারিয়ে যাওয়া যোদ্ধাদের এবং তার সমর্থকদের কাছে। কেন ১৯৭১ তৎকালীন বিপ্লবীদেরকে হেয় করে তুলেছিল পরবর্তীকালের ইতিহাসে, তাও যেন আমরা এই ব্যঙ্গরচনায় দেখতে পাই। জনগণের সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ঘটাতে অসমর্থ সেই বিপ্লবীরা হারিয়ে যায় ইতিহাসের গ্রাসে। কিন্তু এই কথাগুলোই সব শেষ কথা নয়।

গল্পটি শুরু হয়েছে গল্পকার লু স্যুনের গল্প ‘আ’ কিউ’র সত্য ঘটনা’র কথা স্মরণ করে এবং লেখক স্বীকার করছেন যে আ’ কিউ’র ন্যায় আমাদের নেতাজী সদর ভাইয়ের জীবন তত ‘চমকপ্রদ নহে’। এই চমকহীন নেতার গোপন জীবনের পরতে পরতে লুক্কায়িত আত্মনিগ্রহ, অপমান, ভাঁড়ামো, উচ্চাশা, অবৈজ্ঞানিকতা, কুযুক্তিপনা পাঠককে দেখিয়ে দেয় বিপ্লব ও সাম্যবাদ সম্পর্কে বিহ্বলতা তাদেরকে ভাঁড়ে পরিণত করেছে। কিন্তু নেতাজি ও তার সাগরেদ কমেস, পেলু, ফিরাচল প্রভৃতি চরিত্ররা ‘আ’ কিউ’র মতোই দমবার পাত্র নন।

সদরুদ্দিন কৈশোর বয়সে যখন স্কুলে পড়ত তখন তার এক মাষ্টারমশাই তার ভেতরে দল বা পাট্টি গঠনের ঝোঁক ঢুকাই দেয় এবং উদাহরণ দেয় মাটির কলসের যেমন তলা কানা বা ফুটা হয়ে যায় তেমনি বঙ্গদেশের তলাও ফুটা হয়ে গেছে। আর এই ফুটা বন্ধ করতে পারলেই দেশের ‘পূর্তি’ বা ‘উন্নতি’ হবে। তাই নেতা সেই কিশোর বয়সেই দল গঠনের নিমিত্তে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন এবং কলসির ছিদ্র খুঁজে পেলেও অদ্যাবধি তিনি দেশের ছিদ্র খুঁজে পাননি বিধায় সেই ফুটা বন্ধ করতে পারছেন না।

দল গঠনের নিমিত্তে দল গঠনের প্রক্রিয়া শেখার জন্য নেতা সদরভাই আর সাগরেদ কমেশ ‘সহস্র সহস্র  মাইল পথ  পাড়ি’ দিয়ে দিল্লি গেছিলেন। সেথায় ‘ইউনিয়ন’ করে, শ্রমিক আন্দোলন করে, আরো নানা কোশেশ শেষে বঙ্গদেশে এসে দল গঠন শুরু করেন। নানা কঠোর পরিশ্রম, জেল খাটা, ‘বিপ্লবের সহজ পন্থা’ পুস্তক রচনা, নানা রকমের আহাম্মকি আর বুজরুকির মাধ্যমে তিনি দলের সবচেয়ে বড় পদও একদা বাগিয়েছেন। বিভিন্ন পার্টি আর গ্রুপের ভেতরে সংঘাত বেঁধেছে, সাথে সাথে ঐক্য ঐক্য খেলাও জমে উঠেছে, কারণ বিপ্লব করতে হলে তো মিত্রদের সাথে ঐক্য করতেই হবে, এই মহা সত্য সদর ভাইয়ের চেয়ে আর কে বেশি বোঝে। নেতা সদর ভাই অন্য দলগুলোর সাথে ঐক্যের যে প্রক্রিয়া নিয়া আলোচনা করেন তা পড়লেই পাঠকগণ গল্পের সুরটা খেয়াল করতে পারবেন,

“– আমাদিগকে একটি ঝুড়ি মধ্যে অবস্থান করিতে হইবে। তথায় বিপ্লব শিখিয়া লইয়া দশদিক ব্যাপ্ত করিয়া ছুটিতে হইবে। দশ দিক ব্যাপ্ত করিতে পারিলে বুর্জোয়াদিগের নিশ্চয় লুকাইবার স্থান সংকট হইবে।

–বুঝিলাম। কহিলেন আগন্তুক, আমাদিগের পার্টিও আপনার সহিত জোট বাঁধিবে।

–জোট হইতে পারে না । ইহা বিপ্লবের নীতির সহিত যাইতেছে না।

–তাহা হইলে কী করিবেন?

–মোচা গঠন করিতে হইবে।

–মোচা কী প্রকারে ক্রিয়া করিতে থাকে?

–ইহা বামদিগকে একত্র করিবে। অতঃপর রাজপথে নামিবে, দেশ তাকাইয়া থাকিবে । মানুষ ছুটিয়া আসিবে, পরবর্তী কালে দশদিক ব্যাপ্ত করিব।

–উত্তম প্রস্তাব করিতেছেন। তাহা হইলে সকল পার্টিকে সংবাদ দিতে হইল।

সমূদয় দল আসিয়া একমাত্র হালাল পার্টির অফিস মধ্যে জমায়েত হইল। তাহাদিগের হট্টগোলে কমরেডগণ মুগ্ধ হইয়া গেল। লেখক স্বয়ং বারংবার দেখিয়া যাইতে লাগিলেন বাঙ্গালার সর্বাধিক জ্ঞানী-ত্যাগী-মহানায়কেরা একত্রিত হইয়াছেন। ভাবিলেন, ইহাদিগকে দেখিতে পাইয়াছি-জীবন ধন্য হইল!”

এইভাবেই নেতা সদরসহ তার অনেক নকল নির্বোধ ভাঁড় ও ‘মুরিদ’রা একই বৃত্তে বারবার ঘুরেছেন, একই আহাম্মকি বারবার করেছেন, এবং দেশের ফুটাটা যে কোথায় তা আর খুঁজে পান নাই। লু শ্যুনের গল্পের ‘আ’ কিউ’ কৃষক হলেও নেতাজি সামন্ত পরিবারের প্রতিভু। এই নেতা ও তার অনুসারীরা হয়ে উঠেছে একেকজন সামন্তীয় সমাজতন্ত্রী, উদার গণতন্ত্রী এবং সমাজ গণতন্ত্রীদের বিদ্রূপাত্মক চরিত্র; যারা শ্রমিক কৃষককে বিপ্লব বোঝাতে চান; কিন্তু বিপ্লবের মূল শক্তি প্রলেতারিয়েত, শ্রমিক ও কৃষকগণ তাদেরকে নিয়ে অনবরত মস্করা করে যায়। এই নেতাজি ও তাদের সাগরেদরা সাম্রাজ্যবাদের পক্ষে থাকে, সামন্তবাদের তীব্র বিরোধিতা করে না, বুর্জোয়া বিরোধিতায় ভুল জায়গায় আঘাত করে। পুরুষতন্ত্রের সমর্থন ও নারী শোষণে পারঙ্গম এই নেতারা মার্কস লেনিনের মুখস্ত বুলি কপচায়, কিন্তু নিজেদের সুবিধাবাদিতা ও পরজীবিতাকে টিকিয়ে রাখতে কার্পণ্য করে না।

একুশ শতকের ২০১৪ সালে লেখা এই গল্প যেন জমিদার জ্যোতি বসু, বিমান বসু, মনি সিংহ, শিবদাস ঘোষ, খালেকুজ্জামান ভুঁইয়া ও তাদের সাথে চলমান সেইসব ক্ষুদে বুর্জোয়া ভাঁড়দের জীবনকাহিনী যারা বিপ্লব ফাটাতে গিয়ে জনগণের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে সাম্রাজবাদ পুঁজিবাদের ঘাত প্রতিঘাতে নিজেদেরকে আউলিয়ে ফেলে। পথহারা এই নেতাজি ও তাদের সাগরেদদের দল ভাঙার ঐতিহ্য এবং তাদের নিচতা, ক্ষুদ্রতা আর শঠতার বিদ্রূপাত্মক গল্প রচিত হয়েছে চার্বাক সুমনের লেখায়। আমরা তার কাছে আরো অনেক লেখার প্রত্যাশা করি যে লেখাগুলো ফুটিয়ে তুলবে সত্যকে, বিদ্রুপের অফুরন্ত শক্তিতে।

দশ পর্বের লেখাটি পড়তে পারবেন এই লিংকে গিয়ে

রচনাকাল ৪ আগস্ট, ২০১৪।

আরো পড়ুন:  ফ্রানয মেহরিং জার্মানির সমাজতান্ত্রিক তাত্ত্বিক ও নেতা
Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই “পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি” প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১০টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর “সমাজতন্ত্র” ও “মার্কসবাদ” গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন “বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা” নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top