Main Menu

ভূমি থেকে কৃষিজীবী জনগণের উচ্ছেদ — কার্ল মার্কস

ইংলন্ডে ভূমিদাসপ্রথা কার্য্যত অদৃশ্য হয় ১৪শ শতকের শেষ ভাগে। তখনকার এবং আরো বেশি করে ১৫শ শতকের জনগণের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই[১] ছিলো মুক্ত কৃষক-মালিক, তা তাদের স্বত্বাধিকার যে সামন্ত পাট্টাতেই ঢাকা থাক না কেন। বড়ো বড়ো সামন্ত মহালগুলিতে সাবেকী যে গোমস্তা ছিলো নিজেই একজন ভূমিদাস, তার জায়গায় এসে দাঁড়ায় মুক্ত খামারী। কৃষিতে যারা মজুরি খাটত তাদের একাংশ ছিলো কৃষক, তারা তাদের অবসরটা কাজে লাগাত বড়ো বড়ো খামারে খেটে; আর একাংশ ছিলো একটা স্বাধীন, বিশেষ শ্রেণীর মজুরি-শ্রমিক, কিন্তু সংখ্যায় তারা তুলনামলকভাবে ও মাথাগুনতিতে ছিলো খুবই কম। এই শেষোক্তরাও আবার কার্যত ছিল চাষীই, কেননা মজুরি ছাড়াও তারা পেত ৪ বা ততোধিক একর পরিমাণ আবাদযোগ্য জমি ও থাকার কুটির। তাছাড়া সমস্ত চাষীদের সঙ্গে তারাও সর্বজনীন জমির ভোগস্বত্ব পেত, তাতে গরুভেড়া চরত তাদের, কাঠ, জ্বালানি, বিচালি প্রভৃতি পেত তা থেকে।[২] ইউরোপের সমস্ত দেশেই সামন্ত উৎপাদনের বৈশিষ্ট্য হলো যথাসম্ভব বেশি সংখ্যক সামন্ত প্রজার মধ্যে জমির বণ্টন। রাজার মতো সামন্ত প্রভুর ক্ষমতাও তার খাজনা তালিকার দৈর্ঘ্যের ওপর নয়, নির্ভর করত প্রজার সংখ্যার ওপর, আর শেষোক্তরাও আবার ছিলো কৃষক-মালিকদের সংখ্যার ওপর নির্ভরশীল।[৩]  তাই নর্মান বিজয়ের পর ইংলন্ডের জমি যদিও বিশালাকার কয়েকটি ব্যারনিতে ভাগ করে দেওয়া হয়েছিল, যার একেকটার মধ্যে ছিলো শ’ নয়েক করে পুরনো অ্যাঙ্গলো-স্যাক্সন জমিদারি, তাহলেও এগুলি ছিলো ছোটো ছোটো কৃষক সম্পত্তিতে আকীর্ণ, বড়ো বড়ো সামন্ত মহাল ছিলো কেবল এখানে ওখানে। এই পরিস্থিতির সঙ্গে ১৫শ শতকের পক্ষে যা অতি বৈশিষ্ট্যসূচক, শহরগুলির সেই উন্নতির ফলে জনগণের তেমন ঐশ্বর্য সম্ভব হয়, চ্যান্সেলর ফোর্টেস্ক যার অমন সোচ্চার বর্ণনা দিয়েছেন তাঁর ‘Laudibus Legum Angliae’ বইয়ে কিন্তু পুঁজিবাদী ঐশ্বর্য তাতে সম্ভব হতে পারত না।

যে বিপ্লবে পুঁজিবাদী উৎপাদন পদ্ধতির ভিত পাতা হয়, তার প্রস্তাবনাটা অভিনীত হয় ১৫শ শতকের শেষ তৃতীয়াংশে এবং ১৬শ শতকের প্রথম দশকগুলিতে। একগাদা মুক্ত প্রলেতারীয়কে শ্রমবাজারে নিক্ষেপ করা হয় সামন্ত পোষ্য বাহিনীগুলোকে ভেঙে, যারা স্যার জেমস স্টুয়ার্টের সুষ্ঠু উক্তি অনুসারে, ‘সর্বত্র গৃহ ও প্রাসাদগুলিকে খামোকা ভরে রাখছিল’[৪]। নিজেই যা বুর্জোয়া বিকাশের একটা ফল সেই রাজশক্তিই যদিও তার নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্বের জন্য সংগ্রামে তাড়াহুড়ো করে বলপ্রয়োগে এই পোষ্য বাহিনীগুলোকে ভেঙে দেয়, তাহলেও সেইটেই তার একমাত্র কারণ নয়। রাজা ও পার্লামেন্টের সঙ্গে উদ্ধত সংগ্রামে বড়ো বড়ো সামন্ত প্রভুরা অনেক বৃহদাকারের এক প্রলেতারিয়েত গড়ে দেয় ভূমি থেকে জোর করে কৃষকদের উচ্ছেদ ক’রে — যে জমিতে প্রভুর মতোই সমান সামন্ত অধিকার ছিলো কৃষকদের — এবং সর্বজনীন জমি জবর দখল করে। ফ্লেমিশ পশমী বস্ত্রোৎপাদনের দ্রুত উন্নতি এবং তদনুযায়ী ইংলন্ডে পশমের দামবৃদ্ধি এই উচ্ছেদগুলির পেছনে প্রত্যক্ষ প্রেরণা দেয়। বড়ো বড়ো সামন্ত যুদ্ধবিগ্রহে সাবেকী অভিজাতরা ধ্বংস পেয়েছিল। নতুন অভিজাতরা ছিলো স্বকালের সন্তান, টাকাই ছিলো তাদের কাছে সব ক্ষমতার সেরা ক্ষমতা। সুতরাং আবাদ জমিকে মেষ চরণভূমিতে পরিণত করাই হলো তাদের ধ্বনি। কী ভাবে ছোটো চাষীদের উচ্ছেদে দেশ ধ্বংস পাচ্ছিলো সেটা হ্যারিসন বর্ণনা করেছেন তাঁর “Description of England. Prefixed to Holinshed’s Chronicles” গ্রন্থে। ‘আমাদের মহা মহা জবরদখলীদের কীসের পরোয়া?’ চাষীদের বাড়ি আর শ্রমিকদের কুটির হয় ধূলিসাৎ করা হয়, নয় ধ্বংসের নির্বন্ধে ছেড়ে দেওয়া হয়। হ্যারিসন বলছেন, ‘প্রতিটি মহালের পুরনো রেকর্ড যদি খোঁজা যায় …  তাহলে অচিরেই দেখা যাবে যে কোনো কোনো মহালে সতেরো, আঠারো বা কুড়িটি বাড়ি লোপ পেয়েছে… বর্তমানের মতো এতো কম লোকে ইংলন্ড আর কখনো ভূষিত ছিলো না… এখানে ওখানে দু’একটি বৃদ্ধি পেলেও হয় একেবারে ক্ষয়প্রাপ্ত, নয় সিকিপরিমাণ বা আধাআধি হ্রাসপ্রাপ্ত শহর ও নগরের কথা, মেষচারণের জন্য ধূলিসাৎ করা শহর যেখানে এখন মহালটি ছাড়া আর কিছুই দণ্ডায়মান নেই, তার কথা… আমি কিছু বলতে পারি।’

এই সব প্রাচীন ইতিবৃত্তকারদের অভিযোগ সর্বদাই কিছুটা অতিরঞ্জিত হয়, কিন্তু উৎপাদনের অবস্থায় বিপ্লব সমকালীনদের মনে কী রেখাপাত করছিল সেটা তারা বিশ্বস্তভাবেই প্রতিফলন করেন। চ্যান্সেলর ফোর্টেস্ক আর টমাস মোরের রচনা তুলনা করলেই ১৫শ ও ১৬শ শতকের মধ্যেকার ব্যবধানটা উদ্ঘাটিত হয়ে উঠবে। থর্নটন সঙ্গতভাবেই যা বলেছেন, ইংরেজ শ্রমিক শ্রেণী কোনো উৎক্রমণ ছাড়াই নিক্ষিপ্ত হয় তার স্বর্ণযুগ থেকে লৌহযুগে।

তথ্যসূত্র ও টীকাঃ

১. ‘যে ক্ষুদে মালিকেরা নিজ হাতে তাদের নিজের জমি চষত ও সামান্য সচ্ছলতা ভোগ করত… তারা সে সময় বর্তমানের চেয়ে জাতির একটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। সে যুগের শ্রেষ্ঠ পরিসংখ্যানিক লেখকদের বিশ্বাস করলে, অন্যূন ১,৬০,০০০ মালিক, সপরিবারে যারা ছিলো সমগ্র জনসংখ্যার সপ্তমাংশেরও বেশি, তারা জীবিকার্জন করত ছোটো ছোটো স্বাধীন-স্বত্ব (freehold estate) থেকে। এই সমস্ত ক্ষুদে ভূস্বামীদের গড় আয়… বছরে ৬০ থেকে ৭০ পাউন্ড বলে ধরা হয়েছে। হিশেবে ক’রে দেখা গেছে যে যারা অন্যের জমি খাজনায় নিত তাদের চেয়ে যারা নিজেদের জমি চাষ করত তাদের সংখ্যা ছিলো বেশি।’ (Macaulay, “History of England’, 10th ed., London, 1854, Vol. I., pp. 333, 334.) এমন কি ১৭ শতকের শেষ তৃতীয়াংশেও ইংরেজ জনগণের ৪/৫ ভাগই ছিল কৃষিজীবী (উক্ত গ্রন্থ, পঃ ৪১৩)। ম্যাকওয়েলের উদ্ধৃতি দিলাম, কারণ ইতিহাসের নিয়মিত কারচুপিকারক হিশেবে তিনি এই ধরনের তথ্যকে যথাসম্ভব কমিয়ে দেখেন।

২. আমাদের ভুললে চলবে না যে এমন কি ভূমিদাসও শুধু তার গৃহসংলগ্ন জমিটিরই মালিক ছিল না, যদিও করদায়ী মালিক, সার্বজনীন জমিরও সহভোগী ছিল। ‘সেখানকার’ (দ্বিতীয় ফ্রিদরিখের আমলে সাইলেসিয়ায়) ‘কৃষকেরা ভূমিদাস।’ তাহলেও এই ভূমিদাসদের সার্বজনীন জমি ছিল। ‘এতদিন পর্যন্তও সর্বজনীন জমি ভাগাভাগি ক’রে নেবার জন্য সাইলেসীয়দের রাজী করানো যায় নি, অথচ নেইমার্কে আজ এমন একটা গ্রামও নেই, যেখানে এই বাটোয়ারা বিপুল সাফল্যের সঙ্গে কার্যকর হয় নি।’ (Mirabeau, “De la Monarchie Prussienne’, Londres, 1788, T. II., pp. 125, 126.)

৩. ভূসম্পত্তির বিশুদ্ধ সামন্ত সংগঠন ও তার বিকশিত ক্ষুদে চাষ সমেত জাপান থেকে আমরা আমাদের ইউরোপীয় মধ্যযুগের যতটা সত্য ছবি পাই, তা আমাদের সমস্ত ইতিহাসগ্রন্থ থেকেও পাওয়া যায় না, কেননা সেগুলি প্রধানত বুর্জোয়া কুসংস্কার-প্রণোদিত। মধ্যযুগের বিপরীতে ‘উদারনীতিক’ হওয়া খুবই সুবিধাজনক।

৪. J. Steuart, ‘An Inquiry into the Principles of Political. Economy’, Vol. II., Dublin, 1770, p. 52.

অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১০টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর সমাজতন্ত্র মার্কসবাদ গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ।

জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।






Related News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *