Main Menu

ভূমি থেকে কৃষিজীবী জনগণের উচ্ছেদ — কার্ল মার্কস

এমন কি ১৭শ শতকের শেষ দশকেও ইয়োমেন সম্প্রদায় বা স্বাধীন কৃষক শ্রেণি ছিলো খামারী শ্রেণির চেয়ে অনেক সংখ্যাবহুল। ক্রমওয়েলের শক্তির মেরুদন্ড ছিলো তারাই এবং এমন কি ম্যাকওয়েলের স্বীকৃতি অনুসারেই, মাতাল জমিদার ও তাদের সেবাদাস গ্রাম্য যাজকেরা, প্রভুর পরিত্যক্ত প্রণয়িনীকে বিবাহ করতে যারা বাধ্য হতো, তাদের তুলনায় এরা ছিলো অনেক সেরা। ১৭৫০ সাল নাগাদ ইয়োমেন সম্প্রদায় অদৃশ্য হয়,[১৩] আর ১৮শ শতকের শেষ দশকে অন্তর্ধান করে ক্ষেতমজুরদের সর্বজনীন জমির শেষ চিহ্ন। এক্ষেত্রে আমরা কৃষি বিপ্লবের নিছক অৰ্থনৈতিক কারণগুলি সরিয়ে রাখছি। যে জবরদস্তিমূলক পদ্ধতি প্রযুক্ত হয়েছিলো, কেবল সেইটে আলোচনা করছি।

স্টুয়ার্ট রাজবংশের পুনরধিষ্ঠানের পর ভূস্বামীরা আইনের আশ্রয় নিয়ে যে উচ্ছেদ-কর্ম চালায় সেটা ইউরোপ মহাদেশের সর্বত্র চালু হয় আইনী আনুষ্ঠানিকতার বালাই না রেখেই। জমির সামন্ত ভোগশর্ত তারা উচ্ছেদ করে, অর্থাৎ রাষ্ট্রের নিকট সমস্ত দায়-দায়িত্ব থেকে তারা মুক্ত হয়, চাষী ও বাকি জনসাধারণের ওপর কর চাপিয়ে তারা রাষ্ট্ৰকে ‘ক্ষতিপূরণ দেয়’, যেসব সম্পত্তিতে তাদের কেবল সামন্ত পাট্টা ছিলো সেখানে আধুনিক ব্যক্তিগত মালিকানার অধিকার তারা নিজেদের জন্য প্রতিষ্ঠা করে, বসবাসের সেই সব আইন পাশ করায়, যা খুঁটিনাটির ক্ষেত্রে উপযুক্ত অদলবদল করলে, ইংরেজ কৃষিশ্রমিকদের ব্যাপারে সেই ফলাফল ঘটায় যা রুশ কৃষকদের ক্ষেত্রে ঘটিয়েছিলো তাতার বরিস গদুনভের ফরমান[১৪]।

‘গৌরবোজ্জ্বল বিপ্লবে[১৫] অরেঞ্জের তৃতীয় উইলিয়মের[১৬] সঙ্গে সঙ্গে ক্ষমতায় এলো জমিদার ও উদ্বৃত্ত মূল্যের পুঁজিপতি আত্মসাৎকারীরা। এরা নতুন যুগের প্রবর্তন করে বিশালাকারে রাষ্ট্ৰীয় ভূমির চৌর্যবৃত্তি অনুসরণ ক’রে — এতদিন পর্যন্ত এ চৌর্যটা চলছিল অনেক নম্রভাবে। রাষ্ট্ৰীয় সম্পত্তিগুলো দান করা হচ্ছিলো, বিক্রি করা হচ্ছিলো অবিশ্বাস্য কম দামে, এমন কি সোজাসুজি দখল করে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছিলো ব্যক্তিগত মহালে।[১৭]

“বুর্জোয়া পুঁজিপতিরা … জমির অবাধ বাণিজ্যে উৎসাহদান, বড়ো বড়ো খামার ব্যবস্থায় আধুনিক কৃষির এলাকা বিস্তার, এবং নিজেদের জন্য হাতের কাছেই মজুদ, মুক্ত কৃষি প্রলেতারীয়দের সরবরাহ বৃদ্ধির
ব্যবস্থা করে।”– কার্ল মার্কস

এ সবই ঘটে আইনী রীতিনীতি বিন্দুমাত্র পালন না করে। এইভাবে জয়াচুরি করে দখল করা রাজকীয় ভূমি এবং সেই সঙ্গে প্রজাতান্ত্রিক বিপ্লবের সময় গির্জার যেসব সম্পত্তি পুনরায় অপহৃত হয় নি, সেগুলিই হলো ইংরেজ চক্ৰতন্ত্রের[১৮] বর্তমান রাজসুলভ মহালের ভিত্তি। বুর্জোয়া পুঁজিপতিরা এ কাজগুলির আনুকুল্য করে অন্যান্য উদ্দেশ্যের মধ্যে জমির অবাধ বাণিজ্যে উৎসাহদান, বড়ো বড়ো খামার ব্যবস্থায় আধুনিক কৃষির এলাকা বিস্তার, এবং নিজেদের জন্য হাতের কাছেই মজুদ, মুক্ত কৃষি প্রলেতারীয়দের সরবরাহ বৃদ্ধির জন্য। তাছাড়া এই নয়া ভূমিজীবী অভিজাতরা ছিলো নতুন ব্যাঙ্কতন্ত্র, সদ্য গড়ে ওঠা উচ্চ ফিনান্স ও তখন রক্ষণ শুল্কের ওপর নির্ভরশীল বৃহৎ হস্তশিল্প-কারখানা মালিকদের স্বাভাবিক মিত্র। নিজেদের স্বার্থে ইংরেজ বুর্জোয়ারা কাজ করেছিলো ঠিক সুইডিশ বুর্জোয়াদের মতোই বিচক্ষণতার সংগে, যারা প্রক্রিয়াটা উলটিয়ে চক্ৰতন্ত্রের কাছ থেকে রাজকীয় জমি উদ্ধারের জন্য নিজেদের অর্থনৈতিক মিত্র কৃষকদের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে সাহায্য করে রাজাদের। এটা ঘটে ১৬০৪ সালের পর, দশম ও একাদশ চার্লসের রাজত্বকালে। গোষ্ঠী সম্পত্তিটা ছিলো তা থেকে সর্বদাই স্বতন্ত্র, এটা একটা প্রাচীন টিউটোনীয় প্ৰথা, সামন্তবাদের আবরণেও তা টিকে থাকে। আমরা দেখেছি কী ভাবে এ সম্পত্তির জবরদস্তি দখল ও সাধারণত সেই সঙ্গে আবাদ জমির চারণভূমিতে রূপান্তর শুরু হয় ১৫শ শতকের শেষে ও চলতে থাকে ১৬শ শতকের সময়েও। কিন্তু সে সময় প্রক্রিয়াটা চলছিলো ব্যক্তিগত বলপ্রয়োগ মারফত, আইনসংস্থা যার বিরুদ্ধে ১৫o বছর ধরে ব্যৰ্থ লড়াই চালায়। ১৮শ শতকে যে অগ্ৰগতি ঘটল সেটা প্ৰকাশ পায় এই ব্যাপারে যে জনগণের ভূমি অপহরণে এখন আইন নিজেই হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে, যদিও বড়ো বড়ো খামারীরা সেই সঙ্গে নিজেদের ছোটখাটো স্বকীয় পদ্ধতিরও আশ্রয় নিত।[১৯] এ দস্যুতার পার্লামেন্টী চেহারা হলো সর্বজনীন জমি ঘেরাওয়ের আইন, অন্য কথায়, জনগণের জমিকে ব্যক্তিগত সম্পত্তিরূপে জমিদারদের দান করার জন্য ডিক্রি, জনগণকে উচ্ছেদের ডিক্রি। স্যার এফ. এম. ইডেন গ্রাম গোষ্ঠীর সম্পত্তিকে সামন্ত প্ৰভুদের স্থানগ্রহণকারী বড়ো বড়ো ভূস্বামীদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি বলে দেখাবার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু তাঁর এই ধূর্ত ওকালতিকেই তিনি খণ্ডন করে বসেন যখন নিজেই তিনি ‘সর্বজনীন জমি ঘেরাও-দখলের জন্য পার্লামেন্টের একটি সাধারণ আইন’ দাবি করেন (তাতে করে স্বীকার করে নেন যে ও-জমির ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে রূপান্তরের জন্য একটি পার্লামেন্টী কুদেতা আবশ্যক) এবং তদুপরি উচ্ছেদকৃত গরিবদের ‘ক্ষতিপূরণের’ জন্য তিনি আইনসভার কাছে আবেদন জানান।[২০]

একদিকে যখন স্বাধীন ইয়োমেনদের জায়গা নিলো উঠবন্দী চাষী, বছরে বছরে ইজারা নেওয়া ছোটো খামারী, ভূস্বামীর মর্জির ওপর নির্ভরশীল এক দাসসুলভ জনতা, তখন অন্যদিকে রাষ্ট্ৰীয় মহাল অপহরণ ছাড়াও সর্বজনীন ভূমির নিয়মিত লুণ্ঠনে সেই সব বড়ো বড়ো খামারের ফেঁপে উঠতে বিশেষ সাহায্য হয়, যাদের ১৮শ শতকে বলা হত ক্যাপিটেল ফার্ম[২১] বা বণিক ফার্ম[২২], এবং কারখানা শিল্পের জন্য প্রলেতারীয় হিশেবে ‘মুক্তি পায়’ কৃষিজীবীরা।

তথ্যসূত্র ও টিকাঃ

১৩. ‘A Letter to Sir T. C. Bunbury, Bart.: On the High Price of Provisions.’ By a Suffolk Gentleman. Ipswich, 1795, p. 4. এমনকি বড় বড় খামার প্রথার গোঁড়া প্রচারক হলেও ‘Inquiry into the Connection between the Present Price of Provisions and the Size of Farms etc.’ (London, 1778, p. 139.) গ্রন্থের লেখক বলছেন: “আমাদের ইয়োমেন সম্প্রদায়ের অন্তর্ধানে আমি খুবই আফসোস করি, এই লোকেরাই এ জাতির স্বাধীনতা বজায় রেখেছিল; দুঃখ হয়ে দেখি যে তাদের জমিগুলো এখন একচেটিয়া লর্ডদের হাতে গেছে, ইজারা দেওয়া হচ্ছে ছোটো ছোটো খামারীদের কাছে, যাদের ইজারার শর্ত এমনি যে প্রতিটি দুষ্ট উপলক্ষে তাদের তাড়িয়ে দেওয়া সম্ভব — এ শর্ত গোলামের চেয়ে সামান্য ভালো।’

১৪. স্পষ্টতই ফিওদর ইভানভিচের রাজত্বকালে, যখন রাশিয়ার কার্যত শাসক ছিলেন বরিস গদুনভ — তখন পলাতক কৃষকদের খুঁজে বার করার ফরমানের কথা বলা হচ্ছে যা জারী হয় ১৫৯৭ সালে। এই ফরমান অনুসারে জমিদারদের অসহ্য পীড়ন ও গোলামি শর্ত ফেলে যে সব কৃষক পালাত, পাঁচ বছরের মধ্যে তাদের খুঁজে বার ক’রে পূর্বতন মনিবের কাছে প্রত্যর্পণ করা চলত। — সম্পাদক

১৫. ইংরেজ বুর্জোয়া ইতিহাসে ‘গৌরবোস্তজবল বিপ্লব’ কথাটি ব্যবহৃত হয় ১৬৮৮ সালের কুদেতা প্রসঙ্গে, যাতে ভূমিজীবী অভিজাত শ্রেণি ও বৃহৎ বুর্জোয়ার মধ্যে একটা আপোসের ভিত্তিতে ইংলন্ডে চালু হয় নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্র। – সম্পাদক

১৬. এই বুর্জোয়া নায়কের ব্যক্তিগত নৈতিক চরিত্রের নানা দিকের একটি: ‘১৬৯৫ সালে লেডি অর্কনিকে আয়ারল্যান্ডস্থ বিপুল জমি দান হলো রাজার প্রীতি ও লেডির প্রভাবের একটি প্রকাশ্য ঘটনা… মনে হয় লেডি অর্কনির মধুর আপ্যায়নই ছিল fæda labiorum ministeria [প্রেমের কদর্য প্রতিদান]।” (বৃটিশ মিউজিয়মে স্লোন পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ, ৪২২৪ নং, পাণ্ডুলিপিটির নাম “The Character and Beha viour of King William, Sunderland etc., as represented in Original Letters to the Duke of Shrewsbury from Somers, Halifax, Oxford, Secretary Vernon etc.’ অনেক মজার ব্যাপারে তা পূর্ণ।)

১৭. ‘অংশত বিক্রয় মারফত এবং অংশত দান হিশেবে রাজকীয় ভূমির বেআইনী হস্তান্তর ইংলন্ডের ইতিহাসের একটি কলঙ্কজনক অধ্যায়… জাতির উপর এক প্ৰকাণ্ড জয়াচুরি।” (F. W. Newman, “Lectures on Political Economy’, London, 18:51, pp. 129, 130.) (ইংলন্ডের বর্তমান বড়ো বড়ো ভূসম্পত্তিগলি কী ভাবে তাদের হাতের এলো তার বিশদ বিবরণের জন্য (Evans, N.H.) “Our Old Nobility.” By Noblesse Oblige. London, 1879. দ্রষ্টব্য। ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস )

১৮. দৃষ্টান্তস্বরূপ ই বার্কের বেডফোর্ড ডিউক বংশের ওপর লেখা পুস্তিকা পড়ে দেখুন, ‘উদারনীতিকতার উচ্চ ঝাড়ে’ লর্ড জন রাসেল ওই ঝাড়েরই এক কঞ্চি। (‘A Letter from the Right Honourable Edmund Burke to a Noble lord, on the Attacks made upon him and his Pension, in the House of Lords by the Duke of Bedford, and the Earl of Lauderdale, Early in the present Sessions of Parliament’, London, 1796. — সম্পাদক)

১৯. কুটিরে নিজেদের ও ছেলেপলেদের ছাড়া অন্য কোনো জীবন্ত প্ৰাণী রাখা খামারীরা নিষিদ্ধ করে এই অজুহাতে যে কুটিরবাসীরা কোনো পশু, বা হাঁসমুরগী রাখলে তাদের প্রতিপালনের জন্য তারা খামারীর গোলা থেকে চুরি করবে; তারা আরো বলে যে, কুটিরবাসী মজুরদের গরিব করে রাখলে তারা পরিশ্রমী থাকবে, ইত্যাদি; কিন্তু আমার বিশ্বাস, আসল ব্যাপার হলো এই যে খামারীরা সর্বজনীন ভূমির উপর পুরো অধিকার রাখতে চায়।’ (‘A Political Inquiry into the Consequences of Enclosing Waste Lands’, London, 1785, p. 75.)

২০. Eden, উক্ত গ্রন্থ, ভূমিকা।

২১. ‘Capital Farms’ (‘Two Letters on the Flour Trade and the Dearness of Corn.’ By a Person in Business. London, 1767, pp. 19, 20.)

২২. ‘Merchant Farms’ (‘An Inquiry into the Causes of the Present High Price of Provisions’, London, 1767, p. 111, টিকা) নাম না দিয়ে প্রকাশিত এই চমৎকার রচনাটি রেভারেন্ড ন্যাথানিয়েল ফর্স্টারের লেখা।






Related News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *