You cannot copy content of this page
আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > সংকলন > এঙ্গেলস > ফ্রিডরিখ এঙ্গেলসের কয়েকটি উদ্ধৃতি

ফ্রিডরিখ এঙ্গেলসের কয়েকটি উদ্ধৃতি

০১. মার্কস সবার আগে ছিলেন বিপ্লববাদী। তাঁর জীবনের আসল ব্রত ছিল পুঁজিবাদী সমাজ এবং এই সমাজ যেসব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করেছে তার উচ্ছেদে কোনো না কোনো উপায়ে অংশ নেওয়া, আধুনিক প্রলেতারিয়েতের মুক্তিসাধনের কাজে অংশ নেওয়া, একে তিনিই প্রথম তার নিজের অবস্থা ও প্রয়োজন সম্বন্ধে, তার মুক্তির শর্তাবলী সম্বন্ধে সচেতন করে তুলেছিলেন। তাঁর ধাতটাই ছিল সংগ্রামের। এবং যে আবেগ, যে অধ্যবসায় ও যতখানি সাফল্যের সঙ্গে তিনি সংগ্রাম করতেন তার তুলনা মেলা ভার। ১৮৮৩ সালের ১৭ মার্চ লন্ডনের হাইগেট সমাধিক্ষেত্রে ফ্রিডরিখ এঙ্গেলসের ইংরেজিতে প্রদত্ত বক্তৃতা

০২. শুধু চিন্তার জন্য চিন্তা নয়, চিন্তাকে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করাই কমিউনিস্টদের নীতি।

০৩. আমরা আমাদের ইতিহাস গড়ি নিজেরাই, কিন্তু প্রথমত আমরা তা গড়ি অতি সুনির্দিষ্ট পূর্বশর্ত ও পরিস্থিতির মধ্যে। তাদের ভেতর অর্থনৈতিকতা শেষ বিচারে নির্ধারক। কিন্তু রাজনৈতিক ইত্যাদি পরিস্থিতি, এমনকি লোকের মস্তিষ্কে জীবিত ঐতিহ্যও নির্দিষ্ট একটা ভূমিকা নেয়, যদিও তা নির্ধারক নয়। কনিসবার্গে ইয়োসেফ ব্লকের নিকট পত্র; লণ্ডন, ২১[২২] সেপ্টেম্বর, ১৮৯০।

০৪. কমিউনিজম হলো প্রলেতারিয়েতের মুক্তির জন্য আবশ্যক পরিবেশ সংক্রান্ত মতবাদ। কমিউনিজমের মূলনীতিসমূহ

০৫. ভাবাদর্শ (Ideology) এমন একটি প্রক্রিয়া যা তথাকথিত মনিষী যে সচেতনভাবে সম্পাদন করেন সেকথা ঠিক, কিন্তু এ সচেতনতা ভ্রান্ত সচেতনতা। তাঁকে চালিত করে যে প্রকৃত প্রেরনাশক্তি তা তাঁর কাছে অজ্ঞাত থেকে যায়, অন্যথায় তা ভাবাদর্শগত প্রক্রিয়াই হত না। ফ্রানয মেরিং সমীপে চিঠি

০৬. পুঁজিবাদী সমাজ হলো সামন্তবাদী সমাজের পচন ও বিনাশের ফল। বিকাশের একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে মালিকানার সামন্ততান্ত্রিক সম্পর্ক সমূহ উন্নয়নশীল উৎপাদন শক্তির সঙ্গে আর সামঞ্জস্য রাখতে পারে না। উৎপাদন বিকাশের বদলে তাঁরা উৎপাদনের বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এগুলি পরিবর্তিত হলো তার শৃঙ্খলে, সে শৃঙ্খল ভাঙ্গতে হত এবং ভেঙ্গে ফেলা হলো। কমিউনিস্ট পার্টির ইস্তেহার

০৭. প্রতিটি ঐতিহাসিক যুগের অর্থনৈতিক উৎপাদন ও তা থেকে আবশ্যিকভাবে সমাজের যে কাঠামো উদ্ভূত হয় সেটাই গঠন করে সেই যুগের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসের ভিত; ফলস্বরূপ [জমির উপর আদিম গোষ্ঠিগত মালিকানার অবলুপ্তির পর থেকে] সমগ্র ইতিহাসই হচ্ছে শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস, সমাজ বিকাশের বিভিন্ন পর্যায়ে শোষিত ও শোষকদের মধ্যেকার, আধিপত্যহীন ও অধিপতি শ্রেণীসমূহের মধ্যেকার সংগ্রামের ইতিহাস; এই সংগ্রাম বর্তমানে এমন এক পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে যেখানে শোষণ, পীড়ন ও শ্রেণী সংগ্রাম থেকে একইসাথে ও চিরকালের কতো সমগ্র সমাজকে মুক্ত না করে, শোষিত ও নিপীড়িত শ্রেণীটি (প্রলেতারিয়েত শ্রেণী) তাকে শোষণ ও পীড়ন করছে যে শ্রেণীটি (বুর্জোয়া শ্রেণী) তার কবল থেকে নিজেকে আর মুক্ত করতে পারে না। কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার-এর জার্মান সংস্করণের ভূমিকা, ১৮৮৩

০৮. ডারউইন জানতেন না তিনি মানবসমাজকে নিয়ে কী তীব্র স্যাটায়ার রচনা করেছেন যখন তিনি দেখিয়েছেন যে উন্মুক্ত প্রতিযোগীতা বা টিকে থাকার সংগ্রাম, যাকে এতদিন অর্থনীতিবিদরা মানবসমাজের সর্বোচ্চ ঐতিহাসিক প্রাপ্তি হিসেবে দাবি করে আসছিলেন, আসলে প্রাণিজগতের অতি স্বাভাবিক একটি চিত্র। প্রকৃতির দ্বান্দ্বিকতা থেকে।  

০৯. কর্তৃত্বমূলক যত ব্যাপার আছে তার মধ্যে নিশ্চয়ই সবচেয়ে কর্তৃত্বপ্রধান হলো বিপ্লব। বিপ্লব হলো এমন এক কাজ যাতে জনসংখ্যার এক অংশ কর্তৃত্বাশ্রয়ী উপায় আদৌ যা আছে সেই বন্দুক, বেয়নেট ও কামানের মাধ্যমে জনসংখ্যার অপর অংশের ওপর নিজেদের ইচ্ছা চাপিয়ে দেয়। আর বিজয়ী দল যদি নিজেদের সংগ্রাম ব্যর্থ হতে দিতে না চায় তাহলে তাদের নিজেদের শাসন বজায় রাখতে হবে অস্ত্রের সাহায্যে প্রতিক্রিয়াশীলদের মনে ভীতি সঞ্চার করেই। বুর্জোয়া শ্রেণীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র জনগণের এমন কর্তৃত্ব কাজে না লাগালে কি প্যারিস কমিউন একদিনও টিকতে পারতো? বরং সে কর্তৃত্ব যথেষ্ট অসঙ্কোচে প্রয়োগ না করার জন্যই কি তাকে আমাদের তিরস্কার করা উচিত নয়? কর্তৃত্ব প্রসঙ্গে

১০. আধুনিক সমাজতন্ত্র যে বিপ্লব সাধনের প্রচেষ্টা চালায় সংক্ষেপে তা হলো বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে প্রলেতারিয়েতের বিজয় এবং সকল শ্রেণি-বৈষম্য ধ্বংস করার ভিতর দিয়ে একটি নতুন সমাজ সংগঠনের প্রতিষ্ঠা। এই বিপ্লব যে চালাবে সেই প্রলেতারিয়েতেরই যে শুধু এর জন্য প্রয়োজন তা নয়, এর জন্য আরো প্রয়োজন এক বুর্জোয়া শ্রেণির যার হাতে সমাজের উৎপাদন-শক্তিগুলি এতোটা বিকশিত হয়েছে যে শ্রেণি-ভেদগুলির চূড়ান্ত ধ্বংস সাধন সম্ভব। … … সমাজের উৎপাদন-শক্তিগুলির বিকাশের একটি নির্দিষ্ট স্তরেই, আমাদের আধুনিক অবস্থার পক্ষে অতি উন্নত একটা স্তরেই, উৎপাদনকে এমন পরিমাণে বাড়ানো সম্ভব যার ফলে শ্রেণি-ভেদের বিলোপ জিনিসটা হতে পারে একটা সত্যকার অগ্রগতি, সামাজিক উৎপাদন-পদ্ধতিতে অচলতা বা এমনকি অবনতি না ঘটিয়ে স্থায়ী হতে পারে। কেবলমাত্র বুর্জোয়াদের হাতেই উৎপাদন-শক্তিগুলি এসে পৌঁছেছে বিকাশের এই স্তরে। কাজে কাজেই এদিকেও ঠিক প্রলেতারিয়েতের মতোই বুর্জোয়া শ্রেণি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের এক আবশ্যিক পূর্বশর্ত। অতএব যিনি বলবেন যে, যে দেশে যদিবা প্রলেতারিয়েত নেই, সেই সঙ্গে বুর্জোয়াও তো নেই, সে দেশে এই বিপ্লব সাধিত হবে আরো সহজে, তিনি কেবল প্রমাণ করবেন যে, সমাজতন্ত্রের ‘অ-আ-ক-খ’ এখনো শিখতে হবে তাকে। রাশিয়ায় সামাজিক সম্পর্ক প্রসঙ্গে  

১০. সমাজতন্ত্র কোনো অলৌকিক প্রাজ্ঞের আকস্মিক আবিষ্কার নয়। সমাজতন্ত্র হচ্ছে ইতিহাসের সৃষ্টি, দ্বন্দ্বমান শ্রেণি: প্রলেতারিয়েত এবং পুঁজিপতির সংগ্রামেরই পরিণাম। এন্টি-দ্যুরিং-এর ভূমিকা

১১. আমরা মানুষরা প্রকৃতির উপর যে বিজয় অর্জন করেছি তা নিয়ে নিজেদের বেশি পিঠ চাপড়ানি দেওয়ার দরকার নেই। প্রতিটি বিজয়ের জন্য প্রকৃতি আমাদের উপর প্রতিশোধ নেয়। একথা ঠিক যে প্রতিটি বিজয় প্রথমত, আমরা যে ফল চেয়েছিলাম, তা এনে দিয়েছে; কিন্তু দ্বিতীয়ত এবং তৃতীয়ত, ভিন্ন, অপ্রত্যাশিত ফল দেখা দিয়েছে, যা অনেক ক্ষেত্রে প্রথমটির নেতি ঘটিয়েছে। মেসোপটেমিয়া, গ্রিস, এশিয়া মাইনর ও অন্যত্র যারা বনভূমি ধ্বংস করে কৃষিযোগ্য জমি সংগ্রহ করেছিল, তারা স্বপ্নেও ভাবেনি যে বনের সঙ্গে জল সংগ্রহের কেন্দ্র বা আর্দ্রতার ভান্ডার সরিয়ে তারা ঐ দেশগুলির বর্তমান হতাশ পরিস্থিতির ভিত্তি স্থাপন করছে। আল্পসের ইতালীয়রা যখন উত্তরের ঢালে সযত্নে রক্ষিত পাইন বনগুলিকে দক্ষিণের ঢাল থেকে কেটে সাফ করে, তখন তারা জানত না যে এর ফলে তারা বছরের বড় সময়ের জন্য তাদের পার্বত্য ঝর্ণাগুলির জল কেড়ে নিচ্ছে। তার ফলে আবার বর্ষাকালে আরো তীব্রভাবে তাদের জলধারা সমতলভূমিরতে আসতে থাকে…..। এইভাবে, প্রতি পদক্ষেপে আমাদের স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়, যে আমরা প্রকৃতির উপর সেইরকম শাসন চালাই না, যা চালায় কোনো বিজয়ী এক বিদেশী জাতির উপর, যেন আমরা প্রকৃতির বাইরে দাঁড়িয়ে। বরং আমরা, আমাদের রক্ত, মাংস ও মগজ  সহ,   প্রকৃতির অঙ্গ;  আমরা তার মাঝেই বিদ্যমান, এবং আমরা তার উপর প্রভুত্ব করার যে কথা বলি, তার বাস্তবতা এইটুকুই, যে অন্য সব প্রাণীর তুলনায় আমাদের সুবিধ্‌ আমরা তার নিয়মাবলী শিখতে ও সার্থকভাবে প্রকাশ করতে পারি। ‘The Part Played by labour in the Transition from Age to Man’ থেকে

১২. সমস্ত সম্পদের উৎস হলো শ্রম — অর্থতত্ত্ববিদরা একথা বলেন। যে প্রকৃতির কাছ থেকে পাওয়া উপাদানকে শ্রম রূপান্তরিত করে সম্পদে, সেই প্রকৃতির পরেই শ্রমের স্থান। কিন্তু শুধু এই নয়, এর চাইতেও তার গুরুত্ব অপরিসীমভাবেই বেশি। সমস্ত মানবিক জীবনের প্রাথমিক মূলগত শর্ত হলো শ্রম এবং তা এতোটা পরিমাণে যে একদিক থেকে বলতে হবে যে, স্বয়ং মানুষই হলো শ্রমের সৃষ্টি। এপ-বানর থেকে মানুষের বিবর্তনে শ্রমের ভূমিকা।

১৩. প্রকৃতি হচ্ছে দ্বান্দ্বিকতার উত্তম পরীক্ষা ক্ষেত্র। এবং আধুনিক বিজ্ঞানের অবদান এখানে যে, আধুনিক বিজ্ঞান প্রতিনিয়ত এ পরীক্ষার জন্য মূল্যবান উপাত্তসমূহের ক্রমাধিক পরিমাণে যোগান দিয়ে চলেছে। আধুনিক বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে, শেষ বিচারে প্রকৃতি ক্রিয়ারত দ্বান্দ্বিকভাবে, পরাদার্শনিক অর্থাত স্হির ভাবে নয়। প্রমাণিত হয়েছে, প্রকৃতি চিরন্তন কোনো পৌনঃপুনিক বৃত্তের মধ্যে একই ভাবে পাক খাচ্ছে না, প্রকৃতি যথার্থই ঐতিহাসিকভাবে বিকশিত হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে ডারউইন, নামই আমরা সর্বাগ্রে উচ্চারণ করব। ডারউইনই বিশ্ব প্রকৃতি সম্পর্কে পরাদার্শনিক ধারণার ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত হেনেছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন, জৈবজগতের বৃক্ষলতা, পশু এবং পরিশেষে মানুষ, এরা সবই কোটি কোটি বছর ধরে বহমান বিবর্তনের ফল। কিন্তু দ্বান্দ্বিকভাবে চিন্তা করতে সক্ষম এমন প্রকৃতিবিজ্ঞানীর সংখ্যা এখনো কম। সেই কারণেই মানুষের নতুন আবিষ্কার এর সঙ্গে সনাতনী চিন্তার বিরোধই এখনো তত্ত্বগত প্রকৃতি বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে প্রবল। এবং তার কারণেই শিক্ষক, ছাত্র, লেখক আর পাঠক সকলের মনে তৈরি হচ্ছে হতাশা আর সীমাহীন বিভ্রান্তি । এ্যান্টি-ডুরিং

১৪. মানুষের মনে নিজস্ব সম্পত্তির উত্তরাধিকারী রেখে যাওয়ার যে উদগ্র আকাঙ্ক্ষা বর্তমান, আসন্ন সমাজ বিপ্লব স্হায়ী সম্পত্তি অর্থাত উৎপাদন যন্ত্রের বেশিরভাগ মানুষের উপর সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্টার মধ্য দিয়ে, তা প্রায় নির্মুল করে দেবে। এইভাবে পুজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থা এবং সম্পত্তির উপর পুঁজিবাদী ব্যক্তি মালিকানার অবসান ঘটার পরই একমাত্র জীবনসঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে মানুষের মধ্যে বিষয় সম্পত্তি ঘটিত ভাবনা চিন্তার, যে প্রভাব এখনও কাজ করে তা গৌণ হয়ে যাবে। এবং সেইদিন বিবাহের ক্ষেত্রে মানুষের পারস্পরিক ভালোবাসা ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে কাজ করবে না, একমাত্র তখনই সমাজে যথার্থ অর্থে বিবাহের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠিত ও প্রচলিত হবে।

আরো পড়ুন:  ফিদেল ক্যাস্ত্রোর কয়েকটি উদ্ধৃতি
ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
কার্ল মার্কসের সাথে মার্কসবাদের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস (২৮ নভেম্বর, ১৮২০ - ৫ আগস্ট ১৮৯৫) ছিলেন জার্মান বিপ্লবী, দার্শনিক, সমাজ বিজ্ঞানী, লেখক ও রাজনৈতিক তাত্ত্বিক। তাঁর রচিত গ্রন্থগুলো হচ্ছে “পবিত্র পরিবার” (১৮৪৪), “ইংল্যান্ডে শ্রমিক শ্রেণির অবস্থা” (১৮৪৫) “এ্যান্টি-ডুরিং” (১৮৭৮) “প্রকৃতির দ্বান্দ্বিকতা (১৮৮৩), “পরিবার ব্যক্তিগত মালিকানা ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি” (১৮৮৪) প্রভৃতি। ১৮৪৮ সালে ছাপা মার্কস ও এঙ্গেলসের সুবিখ্যাত “কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার”।

Leave a Reply

Top