Main Menu

যুব লীগের কর্তব্য — ভি. আই. লেনিন

আর সাধারণভাবে শ্রেণি কী? সমাজের একাংশের শ্রমকে যাতে অপর অংশ আত্মসাৎ করতে পায়, তাই হলো শ্রেণি। সমাজের একাংশ যদি সমস্ত জমি আত্মসাৎ করে থাকে, তাহলে পাই জমিদার শ্রেণি ও কৃষক শ্রেণি। সমাজের একাংশের হাতে যদি থাকে কলকারখানা, শেয়ার আর পুঁজি এবং অপর অংশ যদি সেসব কারখানায় খাটে, তাহলে পাই পুঁজিপতি শ্রেণি ও প্রলেতারীয় শ্রেণি।

জারকে তাড়িয়ে দেওয়া শক্ত হয় নি — মাত্র কয়েক দিনেই তা সম্ভব হয়। জমিদারদের বিতাড়িত করাও খুব কঠিন হয় নি — সেটা ঘটে মাস কয়েকের মধ্যে। পুঁজিপতিদের তাড়ানোও বিশেষ দুরূহ ছিলো না। কিন্তু শ্রেণির বিলোপ করা অতুলনীয় রকমের কঠিন; শ্রমিক ও কৃষকের ভাগাভাগিটা এখনো আমাদের আছে। কৃষক যদি তার পৃথক ভূমিখন্ডে কায়েমী হয়ে বসে এবং উদ্বৃত্ত শস্য, অর্থাৎ নিজের জন্য বা নিজের গরু-বাছুরের জন্য যা লাগছে না, তেমন শস্য সে যদি আত্মসাৎ করে, অথচ বাকি লোকেরা রুটি ছাড়া দিন কাটায়, তাহলে সেই কৃষক হয়ে দাঁড়ায় শোষক। যত বেশি শস্য সে নিজে ধরে রাখতে পারে ততই বেশি তার লাভ, বাকি লোকেরা অনশন দিক: ‘যত বেশি তারা অনশন দেবে ততই দুর্মূল্যে আমি এই শস্য বেচিতে পারব’। একটা সাধারণ পরিকল্পনা অনুসারে সাধারণ ভূমিতে, সাধারণ কলকারখানায় এবং সাধারণ নিয়মানুবর্তিতায় খাটতে হবে সবাইকে। এটা করা কি সহজ? দেখতেই পাচ্ছেন জার, জমিদার বা পুঁজিপতিদের তাড়িয়ে দেবার মতো অত সহজ সেটা নয়। এক্ষেত্রে দরকার যাতে কৃষকদের একাংশকে নতুন শিক্ষায়, নতুন তালিমে গড়ে তোলে প্রলেতারিয়েত, যেসব কৃষক ধনী এবং অবশিষ্টের দারিদ্র্য ও অনটন থেকে মুনাফা তুলছে তাদের প্রতিরোধ চূর্ণ করার জন্য যাতে মেহনতী কৃষকদের নিজের পক্ষে টানে। তাই, জারকে উচ্ছেদ করেছি, জমিদার পুঁজিপতিদের তাড়িয়ে দিয়েছি। এতেই প্রলেতারিয়েতের সংগ্রামের কর্তব্য সমাধা হলো না। সেটা হলো সেই ব্যবস্থার কর্তব্য যাকে আমরা বলি প্রলেতারিয়েতের একনায়কত্ব

“সাবেকী শোষক সমাজের ধ্বংস এবং নতুন কমিউনিস্ট সমাজের স্রষ্টা প্রলেতারিয়েতের চারপাশে সমস্ত মেহনতীদের ঐক্যবন্ধনে যা সাহায্য করে, সেইটাই নৈতিকতা।” — লেনিন

শ্রেণিসংগ্রাম এখনো চলছে, শুধু, তার রূপ বদলেছে। এ হলো সাবেকী শোষকদের প্রত্যাবর্তন রোধের জন্য, তমসাচ্ছন্ন কৃষকদের বিক্ষিপ্ত জনগণকে এক সমিতিতে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য প্রলেতারিয়েতের শ্রেণিসংগ্রাম। শ্রেণিসংগ্রাম চলছে এবং আমাদের কর্তব্য হলো সমস্ত স্বার্থকে তার অধীনস্থ করা। কমিউনিস্ট নৈতিকতাকেও আমরা এই কর্তব্যের অধীন করি। আমরা বলি: সাবেকী শোষক সমাজের ধ্বংস এবং নতুন কমিউনিস্ট সমাজের স্রষ্টা প্রলেতারিয়েতের চারপাশে সমস্ত মেহনতীদের ঐক্যবন্ধনে যা সাহায্য করে, সেইটাই নৈতিকতা।

কমিউনিস্ট নৈতিকতা হলো সেই নৈতিকতা, যা এই সংগ্রামে সাহায্য করে, সব রকম শোষণের বিরুদ্ধে, সব রকম ক্ষুদে মালিকানার বিরুদ্ধে যা ঐক্যবদ্ধ করে মেহনতীদের; কেননা গোটা সমাজের মেহনতে যা তৈরি হয়েছে ক্ষুদে মালিকানায় তা এসে পড়ে একজনের হাতে। আমাদের দেশে জমি তো সর্ব সাধারণের সম্পত্তি।

কিন্তু ধরা যাক, এই সাধারণ সম্পত্তির একটা টুকরো নিয়ে আমি তাতে আমার প্রয়োজনের দ্বিগুণ শস্য ফলিয়ে মুনাফাখোরি করলাম উদ্বৃত্তটা থেকে? ধরা যাক, আমি বলি, লোকে যত অনশন দেবে, ততই বেশি দাম মিলবে। সেটা কি কমিউনিস্টের মতো আচরণ হবে? না, আমার সে আচরণ হবে শোষকের মতো, মালিকের মতো। এর বিরুদ্ধে লড়তে হবে। এটা চলতে দিলে সবকিছু গড়িয়ে পৌঁছবে পুঁজিপতিদের আগের শাসনে, বুর্জোয়াদের শাসনে, আগেকার বিপ্লবে যা একাধিকবার ঘটেছে। এবং পুঁজিপতি ও বুর্জোয়া শাসনের প্রত্যাবর্তন রোধ করতে হলে বেনিয়গিরি চলতে দেওয়া উচিত নয়। আমাদের, অন্যের ঘাড় ভেঙে ব্যক্তি বিশেষের ধনবৃদ্ধি হতে দেওয়া চলবে না এবং প্রলেতারিয়েতের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হয়ে একটা কমিউনিস্ট সমাজ গড়ে তুলতে হবে মেহনতীদের। লীগের এবং কমিউনিস্ট যুব সংগঠনের মৌলিক কর্তব্যের এই হলো প্রধান দিক।

সাবেকী সমাজের ভিত্তি ছিলো এই নীতি; লুঠ করো নয় লুণ্ঠিত হও, অন্যের জন্য খাটো, নয় অন্যকে নিজের জন্য খাটাও, হও দাসমালিক, নইলে হও দাস। স্বভাবতই এরকম সমাজে বেড়ে ওঠা লোকেরা, বলা যেতে পারে, মায়ের দুধের সঙ্গে সঙ্গেই পায় এই মনোবৃত্তি, এই অভ্যাস, এই ধারণা: তুমি হয় দাসমালিক নয় দাস, নয় এক ক্ষুদে মালিক, একজন ক্ষুদে কর্মচারী, একজন ক্ষুদে রাজপুরুষ বা একজন বুদ্ধিজীবী — সংক্ষেপে এমন লোক যে কেবল নিজের কথাই ভাবে কারও জন্য যার এতটুকু মাথাব্যথা নেই।

এই জমির টুকরোটায় আমি কর্তৃত্ব করতে পারলেই হলো আর কারও জন্য আমার মাথাব্যথা নেই; অন্যে যদি দিন কাটায় অনশনে, সে তো আরও ভাল, শস্যের জন্য আমি বেশি টাকা পাব। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক বা কেরানীর একটা চাকরি যদি আমার থাকে, তাহলে আর কারও জন্য আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। ক্ষমতাধরদের যদি আমি ধামা ধরি, তোয়াজ করি, তাহলে হয়ত আমার চাকরিটি থাকবে, উন্নতিও হতে পারে, বুর্জোয়া হয়ে উঠতে পারি। এরকম মনোবৃত্তি, এরকম ভাবনা কমিউনিস্টের থাকা চলে না। শ্রমিক ও কৃষকেরা যখন প্রমাণ করে দিলো যে তাদের স্বপ্রচেষ্টায় তারা নিজেদের রক্ষা করতে ও নতুন সমাজ গড়তে সক্ষম, — তখন সেই হলো নতুন কমিউনিস্ট তালিমের সূত্রপাত — শোষকদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের মধ্যে তালিম, স্বার্থান্বেষী ও ক্ষুদে মালিকদের বিরুদ্ধে, সেই মনোবৃত্তি ও সেই অভ্যাসের বিরুদ্ধে প্রলেতারিয়েতের সঙ্গে মৈত্রীবন্ধনসহ তালিম, যা বলে ‘আমি নিজের লাভের সন্ধানী, অন্য কিছুর জন্য আমার মাথাব্যথা নেই’।

নবীন ও উঠতি প্রজন্ম কীভাবে কমিউনিজম শিখবে, এই হলো সেই প্রশ্নের উত্তর।

সাবেকী শোষক সমাজের বিরুদ্ধে প্রলেতারিয়ান ও মেহনতীরা যে অবিরাম সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে, তার সঙ্গে প্রতি পদক্ষেপে নিজেদের অধ্যয়ন, তালিম ও শিক্ষাগ্রহণ মিলিয়েই কেবল কমিউনিজম শিখতে পারে তারা। লোকে যখন আমাদের কাছে নৈতিকতার কথা তোলে, তখন আমরা বলি: কমিউনিস্টের কাছে যাবতীয় নৈতিকতা রয়েছে এই অটুট সংহত শৃঙ্খলায় ও শোষকদের বিরুদ্ধে সচেতন গণসংগ্রামে। শাশ্বত নৈতিকতায় আমাদের বিশ্বাস নেই এবং নৈতিকতা নিয়ে আষাঢ়ে যত গল্পের বুজরুকি আমরা ফাঁস করি। মানব সমাজকে উচ্চতর স্তরে উন্নয়ন ও শ্রম-শোষণ থেকে তার অব্যাহতির কাজে লাগবে নৈতিকতা।

এটি অর্জন করার জন্য আমাদের দরকার এই তরুণ প্রজন্মের, যারা সচেতন জীবনে জাগ্রত হয়ে উঠতে শুরু করেছে বুর্জোয়ার বিরুদ্ধে সুশৃঙ্খল ও মরিয়া সংগ্রামের মধ্যে। এই সংগ্রামে তারা সাচ্চা কমিউনিস্টদের গড়ে তুলবে, নিজেদের অধ্যয়ন, শিক্ষাগ্রহণ ও তালিমের প্রতিটি ধাপকে তাদের এই সংগ্রামের অধীন করে তুলতে হবে। কমিউনিস্ট যুবজনের তালিম বলতে মিষ্টিমধুর বক্তৃতা ও নৈতিক অনুশাসন বুঝা উচিত নয়। এটা তালিম নয়। লোকে যখন দেখল কীভাবে তাদের মা-বাপের জমিদার ও পুঁজিপতিদের জোয়ালের নিচে দিন কাটিয়েছে, শোষকদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম শুরু করলে যে-যন্ত্রণা নেমে আসে তাতে যখন তারা নিজেরাই ভুক্তিভোগী হলো, অর্জিতকে রক্ষা করার জন্য এই সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হলে কী আত্মত্যাগ প্রয়োজন, জমিদার ও পুঁজিপতিরা কী রকমের উন্মাদ শত্রু, এটা যখন তারা দেখল — তখন এই পরিবেশেই কমিউনিস্ট হবার তালিম পায় তারা। কমিউনিজমের সংহতি ও সম্পূর্ণীকরণের সংগ্রামই হলো কমিউনিস্ট নৈতিকতার ভিত্তি। এটা হলো কমিউনিস্ট তালিম, মানুষ করে তোলা ও শিক্ষাদানেরও ভিত্তি। কমিউনিজম কীভাবে শিখতে হবে সেই প্রশ্নের এই হলো জবাব।

তালিম, মানুষ করে তোলা ও শিক্ষাদানের কাজ যদি কেবল স্কুলে সীমাবদ্ধ ও জীবনের ঝঞ্ঝা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে, তবে তাতে আমাদের বিশ্বাস নেই। শ্রমিক ও কৃষকেরা যতদিন জমিদার ও পুঁজিপতিদের হাতে পীড়িত হচ্ছে এবং স্কুলগুলি যতদিন জমিদার ও পুঁজিপতিদের হাতে থাকছে, ততদিন তরুণ প্রজন্ম থাকবে অন্ধ ও অজ্ঞ। আর আমাদের স্কুলগুলির উচিত যুবজনের মধ্যে জ্ঞানের মূলকথাগুলি পৌঁছনো, স্বাধীনভাবে কমিউনিস্ট দৃষ্টিভঙ্গি অর্জনের সামর্থ্য সঞ্চারিত করা, তাদের করে তোলা চাই শিক্ষিত লোক। লোকে যতদিন স্কুলে পড়ছে সেই সময়ের মধ্যেই তাদের করে তুলতে হবে শোষকদের হাত থেকে মুক্তি লাভের সংগ্রামে অংশীদার। শিক্ষাদান, তালিম ও মানুষ করে তোলার কাজের প্রতিটি ধাপকে যদি শোষকদের বিরুদ্ধে সকল মেহনতীর সাধারণ সংগ্রামে অংশগ্রহণের সঙ্গে জড়াতে পারে, তবেই নবীন কমিউনিস্ট প্রজন্মের লীগ হিসেবে যুব কমিউনিস্ট লীগ তার নাম সার্থক করবে। কারণ আপনারা ভালই জানেন যে, রাশিয়া যতদিন একক শ্রমিক প্রজাতন্ত্র হয়ে থাকছে এবং বাকি দুনিয়ায় থাকছে সাবেকী বুর্জোয়া ব্যবস্থা, ততদিন আমরা থাকব তাদের চেয়ে দুর্বল, প্রতিপদে নতুন আক্রমণের বিপদ থাকবে আমাদের সামনে, আমরা যদি আটুট ও একাত্ম হতে শিখি, তাহলেই কেবল ভবিষ্যৎ সংগ্রামে জয়লাভ করতে পারব। আমরা এবং শক্তি সংহত করার পর সত্যিই অজেয় হয়ে উঠব। তাই, কমিউনিস্ট হওয়ার অর্থ হলো সমগ্র উঠতি পরিষদের সংগঠিত ও ঐক্যবদ্ধ করা এবং এই সংগ্রামে তালিম ও শৃংখলার দৃষ্টান্ত স্থাপন করা। তাহলে আপনারা কমিউনিস্ট সমাজের সৌধ নিমাণ শুরু করতে পারবেন এবং তা সমাধা করতে পারবেন।

অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১০টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর সমাজতন্ত্র মার্কসবাদ গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ।

জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।






Related News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *