You cannot copy content of this page
আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > সংকলন > মাও সেতুং > সর্বহারা শ্রেণির একনায়কত্ব — মাও সেতুং

সর্বহারা শ্রেণির একনায়কত্ব — মাও সেতুং

মাও সেতুঙের শেষ জীবনের উদ্ধৃতি

সর্বহারা শ্রেণির একনায়কত্ব

*** সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে তারা নিজেরাই গোলার মুখে পড়ে। কৃষির সমবায়ে রূপান্তরের সময় পার্টিতে কিছু লোক ছিল যারা তাকে বিরোধিতা করেছিল এবং যখন বুর্জোয়া ডানপন্থাকে সমাচোলনার সময় এলো, তখন তারা এতে ক্ষুব্ধ হলো। আপনারা সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব করছেন, কিন্তু এখনও জানেন না বুর্জোয়ারা কোথায়। বুর্জোয়ারা আর কোথাও নয়, খোদ পার্টিতেই অবস্থান করছে—ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত যারা পুঁজিবাদের পথ ধরেছে। পুঁজিবাদের পথগামিরা এখনও পুঁজিবাদের পথেই রয়েছে। ১৯৭৫ বা ১৯৭৬। পিপলস ডেইলির সম্পাদকীয়তে উদ্ধৃত। ১০ মার্চ, ১৯৭৬।

*** সংশোধনবাদ কর্তৃক ক্ষমতা দখল মানেই হচ্ছে বুর্জোয়া কর্তৃক ক্ষমতা দখল। দশম পার্টি কংগ্রেসের দলিলে উদ্ধৃত (১৯৬৬)

*** বিপুল বিশৃংখলার পর বিশাল শৃংখলা আসে। এবং এটা প্রতি সাত বা আট বছর পর পরই হবে। দৈত্য ও দানবেরা লাফিয়ে বেরিয়ে আসবে। তাদের শ্রেণি চরিত্র দ্বারা চালিত হয়ে তারা বেরিয়ে আসতে বাধ্য। দশম পার্টি কংগ্রেসের দলিলে উদ্ধৃত (১৯৬৬)

*** এই ব্যক্তিটি শ্রেণি সংগ্রামকে আঁকড়ে ধরে না; সে কখনই এই চাবিকাঠিটির কথা উল্লেখ করেনি। এখনও তার মতবাদ হচ্ছে, “সাদা বিড়াল ও কালো বিড়াল,” যা সাম্রাজ্যবাদ ও মার্কসবাদের মধ্যে কোনো পার্থক্য করে না। ১৯৭৫ বা ১৯৭৬। ‘তেং শিয়াও পিং’-এর ২০ দফার সমালোচনাতে উদ্ধৃত। “অধ্যয়ন ও আলোচনা”। ১৪ এপ্রিল, ১৯৭৬।

*** কী! “তিনটি নির্দেশনাকে চাবিকাঠি হিসেবে গ্রহণ করা! স্থিতিশীলতা ও ঐক্য অর্থ শ্রেণিসংগ্রামকে বাতিল করা নয়; শ্রেণিসংগ্রাম হচ্ছে চাবিকাঠি এবং আর সব কিছুই এর উপর নির্ভর করে। সর্বহারা শ্রেণির একনায়কত্বকে সুসংবদ্ধ করা, পুঁজিবাদের পুনরুত্থানকে রোধ করা ও সমাজতন্ত্র গঠনের জন্য বর্তমান মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লব একান্তভাবে প্রয়োজনীয় ও খুবই সময়োপযোগী। নবম পার্টি কংগ্রেসের রিপোর্টে উদ্ধৃত।

*** অতীতে আমরা গ্রামাঞ্চলে, কারখানাগুলোতে, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সংগ্রাম চালিয়েছি এবং আমরা সমাজতান্ত্রিক শিক্ষা আন্দোলন পরিচালনা করেছি। কিন্তু এসবই সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ হয়েছে কারণ আমরা একটা পদ্ধতি, একটা ধরন বের করতে পারিনি যাতে আমাদের খারাপ দিকগুলোকে খোলাখুলিভাবে, সামগ্রিকভাবে এবং নিচে থেকে উন্মোচনের জন্য ব্যাপক জনগণকে জাগরিত করতে পারি। ১৯৬৭; নবম পার্টি কংগ্রেসের রিপোর্টে উদ্ধৃত।

*** আমরা মহান বিজয় অর্জন করেছি। কিন্তু পরাজিত শ্রেণি এখনও সংগ্রাম করবে। এই লোকেরা এখনও চারপাশে আছে এবং এই শ্রেণি এখনও রয়েছে। সুতরাং, আমরা চূড়ান্ত বিজয়ের কথা বলতে পারি না। এমনকি কয়েক দশকের জন্যও নয়। লেনিনবাদি দৃষ্টিভঙ্গি মতে, একটি সমাজতান্ত্রিক দেশের চূড়ান্ত বিজয়ের জন্য শুধুমাত্র দেশিয় ক্ষেত্রে সর্বহারা শ্রেণি ও ব্যাপক জনগণের প্রচেষ্টাই প্রয়োজনীয় নয়, বরং বিশ্ব বিপ্লবের বিজয় এবং বিশ্বব্যাপী মানুষ কর্তৃক মানুষকে শোষণের ব্যবস্থার বিলুপ্তিও প্রয়োজন যাতে সমগ্র মানব জাতিই মুক্তি অর্জন করবে। তাই, আমাদের দেশের বিপ্লবের চূড়ান্ত বিজয় সম্পর্কে হালকাভাবে বলা ভুল; এটা লেনিনবাদবিরোধী এবং বাস্তবতার সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

একদিকে শৃঙ্খলাকে ভয় করা ও অন্যদিকে তাকে রূঢ়ভাবে মোকাবিলা করার মূল হচ্ছে কারণ কারো চিন্তাধারায় এই বিষয়টিকে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করা যে, সমাজতান্ত্রিক সমাজ হচ্ছে একটি বিপরীতের একত্ব, যাতে দ্বন্দ্ব, শ্রেণি ও শ্রেণিসংগ্রাম বজায় রয়েছে। ১৯৫৭; প্রদেশ, মিউনিসিপ্যাল ও স্বায়ত্বশাসিত অঞ্চলের পার্টি কমিটিগুলোর সেক্রেটারিদের এক সম্মেলনে আলোচনা।

*** সাধারণভাবে, প্রতিবিপ্লবী বিবৃতি প্রদানকে স্বভাবতই নিষিদ্ধ করতে হবে। কিন্তু এগুলো যদি প্রতিবিপ্লবী ধরনে না হয়ে বিপ্লবি ছদ্মাবরণে হয়, তাহলে সেগুলোকে আপনাদের অনুমতি দিতে হবে। এতে এই বিবৃতিগুলো কী উদ্দেশ্যে, তা বুঝতে এবং তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালাতে আমাদের সুবিধা হবে। দুই ধরনের উদ্ভিদ জন্ম নেয়, ফসল ও আগাছা। প্রতি বছর আগাছা অবশ্যই সাফ করতে হবে, বাস্তবে বছরে কয়েকবারই … …। আগাছাগুলো একভাবে উপকারি; যখন উপড়ে ফেলা হয় তখন এগুলো সারে রূপান্তরিত হয়। আপনারা কি বলেন এগুলো কোনো কাজের নয়? ভাল কথা, অপ্রয়োজনীয়তাকে প্রয়োজনীয়তায় রূপান্তরিত করা যায় … … এখন থেকে দশ হাজার বছর পরও আগাছা জন্মাবে; তাই আমাদেরকে অবশ্যই সে পর্যন্ত সংগ্রাম চালাবার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। ১৯৫৭; প্রদেশ, মিউনিসিপ্যাল ও স্বায়ত্বশাসিত অঞ্চলের পার্টি কমিটিগুলোর সেক্রেটারিদের এক সম্মেলনে আলোচনা।

*** … … … সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সৃষ্ট ঐক্যই শুধুমাত্র শক্তিশালী হতে পারে। কারণ সংগ্রামটা হচ্ছে অনাপেক্ষিক, ঐক্য হচ্ছে আপেক্ষিক। কেউ কেউ বলে যে চিনা জনগণ ধৈর্যশীলভাবে শান্তিপ্রিয়। আমি মনে করি না যে তারা ততটা শান্তিপ্রিয়। চিনা জনগণ হচ্ছেন লড়াইপ্রিয়। ১৯৬৭; মাও সেতুং সাংস্কৃতিক বিপ্লবকে ব্যাখ্যা করলেন।  

*** [সম্রাট চিন শিহ-হুয়াং] আধুনিকতাকে সম্মান করা ও পুরনোকে হেয় করার ব্যাপারে একজন দক্ষ ব্যক্তি ছিলেন … …[লিন পিয়াও বললেনঃ “চিন শিহ-হুয়াং পুস্তকরাজি পুড়িয়ে দিয়েছিলেন এবং পণ্ডিত ব্যক্তিদেরকে জীবন্ত কবর দিয়েছিলেন”]। তা কি পরিমাণে করেছিলেন? তিনি মাত্র ৪৬০ জন পণ্ডিত ব্যক্তিকে জীবন্ত কবর দিয়েছিলেন। অথচ আমরা উৎখাত করেছি ৪৬,০০০ জনকে। প্রতিবিপ্লবিদেরকে দমন করার সময় আমরা কি কিছু সংখ্যক প্রতিবিপ্লবী বুদ্ধিজীবীকে খতম করিনি? গণতান্ত্রিক ব্যক্তিদের সাথে আমি একবার বিতর্ক করেছিলামঃ আপনারা আমাদেরকে চিন শিহ-হুয়াং-এর মতো আচরণের জন্য অভিযুক্ত করেন। কিন্তু আপনারা ভুল করেন; আমরা তাকে ১০০ গুণ ছাড়িয়ে গেছি। একনায়কত্ব চালানোর ব্যাপারে চিন শিহ-হুয়াং-কে অনুকরণ করার জন্য আপনারা আমাদেরকে ভর্তসনা করেন। আমরা সেগুলো সবই স্বীকার করি। যা দুঃখজনক তা হচ্ছে আপনারা যথেষ্টভাবে বলেননি। আপনাদের জন্য আমাদেরকে তা বলতে হয়েছে। ১৯৫৮; ৮ম পার্টি কংগ্রেসের ২য় অধিবেশনে ভাষণ।  

*** তাদেরকে বলে দিন, আমাদের ক্ষমতা শ্রমিক, কৃষক ও সৈনিকদের দ্বারা প্রদত্ত, ব্যাপক জনগণের দ্বারা প্রদত্ত, যারা জনসংখ্যায় শতকরা নব্বই ভাগেরও বেশি। কমিউনিস্ট পার্টি এই রাজনৈতিক ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য, যারা (আমাদের) ক্ষমতা দখলকে বিরোধিতা করে তাদের উপর প্রয়োগ করবে; কখনও দোদুল্যমান হবে না। ক্ষমতার জন্য আকাঙ্ক্ষাটা কী জিনিস? সর্বহারা শ্রেণির রয়েছে ক্ষমতার জন্য সর্বহারা আকাঙ্ক্ষা এবং তারা অর্জিত ক্ষমতার এক কণাও বুর্জোয়াদেরকে দেবে না। বুর্জোয়াদের ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষাটা কী? এটা হচ্ছে যে, তারা তার এক কণাও সর্বহারা শ্রেণিকে দেবে না। আমরা তাদের থেকেই এটা শিখেছি, তবে আমরা শিখেছি আরো ভালভাবে। ২৮ জুন, ১৯৭৬; চ্যাং চুন চিয়াও, “দেং শিয়াও পিং-কে সমালোচনা ও ডান বিচ্যুতিপূর্ণ বার্তাপ্রবাহকে প্রতিহত করা” সম্বন্ধে আলোচনাতে উদ্ধৃত। 

*** ১৯৪৯ সালে এটা চিহ্নিত করা হয়েছিল যে, দেশের মধ্যে প্রধান দ্বন্দ্ব হচ্ছে সর্বহারা ও বুর্জোয়াদের মধ্যকার দ্বন্দ্বটি। তের বছর পর শ্রেণিসংগ্রামের পুনর্বার বলা হয়েছিল এবং এই সত্যটিকেও উল্লেখ করা হয়েছিল যে, পরিস্থিতি ভালোর দিকে মোড় ঘুরা শুরু করেছে। মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লব কিসের জন্য? শ্রেণিসংগ্রাম চালাবার জন্য। লিউশাওচি শ্রেণিসংগ্রাম শুকিয়ে মরার তত্ত্ব হাজির করেছিল, কিন্তু সে নিজে কখনও শ্রেণিসংগ্রাম বাদ দেয়নি। সে তার বিশ্বাসঘাতক ও একগুঁয়ে অনুগামি চক্রটাকে রক্ষা করতে চেয়েছিল। লিনপিয়াও সর্বহারা শ্রেণিকে উৎখাত করতে চেয়েছিল এবং একটি ক্যু-দেতার চেষ্টা করেছিল। (তাহলে) শ্রেণিসংগ্রাম কী শেষ হয়ে গেছে? ১৯৭৫ বা ১৯৭৬; পিপলস ডেইলির সম্পাদকীয়তে উদ্ধৃত, ৬ এপ্রিল, ১৯৭৬।  

*** সমাজতান্ত্রিক সমাজ একটি বেশ দীর্ঘ ঐতিহাসিক সময়কাল ধরে থাকবে। সমাজতন্ত্রের ঐতিহাসিক পর্যায়কাল জুড়ে শ্রেণিসমূহ, শ্রেণিদ্বন্দ্ব ও শ্রেণিসংগ্রাম রয়েছে, সমাজতান্ত্রিক পথ ও পুঁজিবাদি পথের মধ্যকার সংগ্রাম রয়েছে, এবং পুঁজিবাদের পুনরুত্থানের বিপদ রয়েছে। আমাদেরকে অবশ্যই এই সংগ্রামের দীর্ঘস্থায়ী ও জটিল চরিত্রকে স্বীকৃতি দিতে হবে। আমাদের সতর্কতাকে অবশ্যই বাড়াতে হবে। আমাদেরকে অবশ্যই সমাজতান্ত্রিক শিক্ষা চালাতে হবে। শ্রেণিদ্বন্দ্ব ও শ্রেণিসংগ্রামকে অবশ্যই আমাদের সঠিকভাবে বুঝতে হবে ও মীমাংসা করতে হবে, আমাদের ও শত্রুর মধ্যকার দ্বন্দ্ব থেকে জনগণের মধ্যকার দ্বন্দ্বগুলোকে পৃথক করতে হবে এবং তাদেরকে সঠিকভাবে মীমাংসা করতে হবে। নচেৎ আমাদের আমাদের মতো একটি সমাজতান্ত্রিক দেশ তার বিপরীতে রূপান্তরিত হবে এবং অধপতিত হবে; পুঁজিবাদের পুনরুত্থান ঘটবে। এখন থেকে এটা আমাদেরকে প্রতি বছর, প্রতি মাসে ও প্রতিদিনই স্মরণ করতে হবে যাতে এই সমস্যা সম্পর্কে আমরা তুলনামূলকভাবে ভাল ধারনা অর্জন করতে পারি এবং যাতে আমাদের একটি মার্কসবাদী-লেনিনবাদী লাইন থাকে। ১৯৬২; ৮ম কেন্দ্রিয় কমিটির ১০ম প্লেনারি অধিবেশন, ৯ম পার্টি কংগ্রেসের দলিলে উদ্ধৃত।

*** যখন প্যারী কমিউনের উত্থান ঘটলো তখন তিনি (মার্কস) একে সমর্থন করলেন, যদিও তিনি অনুমান করেছিলেন যে, এটা ব্যর্থ হবে। যখন তিনি বুঝতে পারলেন যে, এটা হচ্ছে প্রথম সর্বহারা একনায়কত্ব, তখন তিনি ভাবলেন যে, যদি এটা মাত্র তিন মাসও টিকে থাকে তাহলেও এটা একটা ভাল ব্যাপার হবে। যদি আমরা অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করি তাহলে এটা সময়োপযোগী ছিল না … …। ১৯৫৯; লুসান সম্মেলনে ভাষণ।

*** বিপ্লবকে আঁকড়ে ধর, উৎপাদন বাড়াও। ৯ম পার্টি কংগ্রেসের দলিলে উদ্ধৃত।   

*** আমরা অগ্রসর প্রযুক্তি গ্রহণ করবো, কিন্তু তা একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পশ্চাৎপদ প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা ও অপরিহার্যতাকে বাতিল করতে পারে না। ইতিহাসের সূচনা থেকে বিপ্লবি যুদ্ধে সর্বদাই তারাই জয়ী হয়েছে যাদের হাতে অস্ত্রশস্ত্র ছিল কম এবং যারা অস্ত্রপাতির ক্ষেত্রে সুবিধা পেয়েছে তারা পরাজিত হয়েছে। আমাদের গৃহযুদ্ধের সময়, জাপবিরোধি প্রতিরোধ যুদ্ধের সময় এবং মুক্তিযুদ্ধের সময়, আমাদের দেশব্যাপী রাজনৈতিক ক্ষমতা ও আধুনিক অস্ত্রাগারের অভাব ছিল। যদি সবচেয়ে আধুনিক অস্ত্রপাতি না থাকার কারণে যুদ্ধ করতে কেউ না পারে তাহলে তা নিজেকে নিরস্ত্র করারই সামিল। ১৯৬১-৬২; ‘সোভিয়েত ইউনিয়নের রাজনৈতিক অর্থনীতি’র উপর নোট।

*** এবার আমাদের প্রতিনিধিদল যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন গেল তখন আমরা বেশ কিছু প্রশ্নে সরাসরি আগালাম। আমি চৌ-এন-লাইকে টেলিফোনে বললাম যে, এই লোকগুলো তাদের বৈষয়িক সাফল্যের জন্য অন্ধ হয়ে গেছে এবং তাদের সাথে ব্যবহারের সবচেয়ে ভাল পথ হচ্ছে তাদেরকে একটা ভালরকম ধোলাই দেয়া। তাদের বৈষয়িক সাফল্যগুলো কী? ৫ কোটি টন ইস্পাত, ৪০ কোটি টন কয়লা ও ৮ কোটি টন পেট্রোলিয়াম ছাড়া আর কিছুই নয়। এই পরিমাণ কি খুব বেশি কিছু? একেবারেই না। এখন এই প্রাচুর্যের জন্যই তাদের মাথা ঘুরে গেছে অহংকারে। কী কমিউনিস্ট! কী সব মার্কসবাদী! আমি বলি, এসব কিছুকে আরো দশগুণ, বা এমনকি একশগুণ কর, তবুও এটা খুব বেশি হবে না। তোমরা যা সব করছো তা হচ্ছে—পৃথিবী থেকে কিছু জিনিস বের করে এনেছো, এগুলোকে ইস্পাতে রূপান্তরিত করেছো এবং কিছু সংখ্যক গাড়ি, প্লেন ও অন্যান্য জিনিস তৈরি করেছো। এর মধ্যে এমন অসাধারণ কী রয়েছে? এবং তারপরও তোমরা এসব কিছুকে তোমাদের পিঠে এমনই ভারি বোঝায় পরিণত করেছো যে, তোমরা এমনকি বিপ্লবি নীতিগুলোকে পর্যন্ত ছুঁড়ে ফেলে দাও। এটা কি বৈষয়িক সাফল্যে অন্ধ হয়ে যাওয়া নয়? কেউ যদি উচ্চপদ লাভ করে তাহলে সে-ও বৈষয়িক অর্জনের দ্বারা অন্ধ হতে পারে। প্রথম সম্পাদক হওয়াটা এক ধরনের বৈষয়িক সাফল্য, যা একজনের মাথা বিগড়ে তাকে অহংকারী করতে পারে, যখন একজন মানুষের মাথা বিগড়ে যায় তখন একভাবে বা অন্যভাবে তাকে আমাদের একটা ভাল রকমের ধাতানি দেয়া উচিত। প্রদেশ, মিউনিসিপ্যাল ও স্বায়ত্বশাসিত অঞ্চলের পার্টি কমিটিগুলোর সেক্রেটারিদের এক সম্মেলনে আলোচনা (১৯৫৭)।  

*** বর্তমানে, বিপ্লবের কাজ এখনও সমাপ্ত হয়নি; এটা এখনো চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হয়নি শেষ পর্যন্ত কে কাকে উৎখাত করবে। সোভিয়েত ইউনিয়নে ক্রুশ্চেভ কি ক্ষমতায় নয়? বুর্জোয়ারাই কি ক্ষমতায় নয়? আমাদেরও এমন দৃষ্টান্ত আছে যেখানে রাজনৈতিক ক্ষমতা রয়েছে বুর্জোয়াদের দখলে; উৎপাদন ব্রিগেড, কারখানা ও “সিয়েন” কমিটি এবং জেলা ও প্রাদেশিক কমিটিতেও তাদের লোক রয়েছে; জননিরাপত্তা বিভাগের উপ-প্রধানও রয়েছে যারা তাদের লোক। ১৯৬৪; মাও উয়ান শিন-এর সাথে আলোচনা।

*** গণতান্ত্রিক বিপ্লবের পর শ্রমিক এবং গরীব ও নিম্ন-মাঝারি কৃষকরা এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকেন না, তারা বিপ্লব চান। অন্যদিকে কিছু সংখ্যক পার্টি সদস্য এগিয়ে যেতে চান না; কেউ কেউ পেছনেও গতি নিয়েছে এবং বিপ্লবকে বিরোধিতা করেছে। কেন? কারণ, তারা বড় অফিসার হয়ে বসেছে এবং বড় অফিসারের স্বার্থগুলো তারা রক্ষা করতে চায়। ‘পুঁজিবাদের পথিকেরা হচ্ছে পুঁজিবাদী উৎপাদন সম্পর্কের প্রতিনিধি’-তে উদ্ধৃত।  

*** লেনিন বলেছিলেন যে “ক্ষুদে উৎপাদন অবিরতভাবে, প্রতিদিন, প্রতি ঘণ্টায় স্বতঃস্ফুর্তভাবে এবং ব্যাপকভাবে পুঁজিবাদ ও বুর্জোয়াদেরকে জন্ম দেয়।” তারা শ্রমিকশ্রেণি ও পার্টি সদস্যদের একাংশের মাঝেও জন্মলাভ করে। সর্বহারা শ্রেণির কাতারে এবং রাষ্ট্র ও অন্যান্য যন্ত্রের ব্যক্তিদের মধ্যে—উভয়ক্ষেত্রেই এমন লোক রয়েছে যারা বুর্জোয়া জীবনযাপনের রীতি গ্রহণ করে। ১৯৭৫; “বুর্জোয়াদের উপর সামগ্রিক একনায়কত্ব প্রয়োগ প্রসঙ্গে”-তে উদ্ধৃত।

*** যেসব নেতৃস্থানীয় কেডার পুঁজিবাদী পথ গ্রহণ করেছে তারা শ্রমিকদের রক্ত শোষণ করে বুর্জোয়া উপাদানে পরিণত হয়েছে বা হচ্ছে। ১৯৬৪; “২০টি নিবন্ধের সারবস্তু কী”_ তে উদ্ধৃত।  

*** একদিকে আমলাতান্ত্রিক শ্রেণি এবং অন্যদিকে গরীব ও নিম্নমাঝারী কৃষকসহ শ্রমিকশ্রেণি হচ্ছে পরস্পরের প্রতি তীব্রভাবে বৈরি দুটো শ্রেণি।

আমাদের দেশে বর্তমানে পণ্যব্যবস্থা চালু রয়েছে, মজুরি ব্যবস্থাও অসম, যেমন ৮টি গ্রেডের মজুরি স্কেলে ও অন্যান্য ক্ষেত্রে রয়েছে। সর্বহারা একনায়কত্বের অধীনে এ বিষয়গুলোকে শুধুমাত্র সীমাবদ্ধ করা সম্ভব। তাই, যদি লিনপিয়াও-এর মতো ব্যক্তিরা ক্ষমতায় চলে আসে, তাহলে তাদের পক্ষে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা তৈরি করে নেয়া খুবই সহজ হবে। সেজন্য আমাদেরকে আরো বেশি করে মার্কসবাদী-লেনিনবাদী বই-পত্র পড়তে হবে। ১৯৭৫; বুর্জোয়াদের ওপর সামগ্রিক একনায়কত্ব প্রয়োগ প্রসঙ্গে। 

*** পুঁজিবাদের পথগামী অল্পসংখ্যক বড় ক্ষমতা করায়ত্তকারীদেরকে উৎখাত করতে হলে তা শুধু সাংগঠনিকভাবে করলেই চলবে না, বরং রাজনৈতিকভাবে, মতাদর্শগতভাবে এবং তত্ত্বগত ক্ষেত্রেও তা করতে হবে। দেশের জন্য ও বিশ্বের জন্য এটা একটা অতীব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। যদি সংশোধনবাদকে উৎখাত না করা যায় তাহলে তা পুনরুত্থান ঘটবে। এটা একটা মহান ঐতিহাসিক কর্তব্য। ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে বলা যায়, এটা সম্পূর্ণ হতে বাস্তবেই এখনও অনেক দেরি। ১৯৬৭; মাও সেতুং সাংস্কৃতিক বিপ্লবকে বিশ্লেষণ করলেন।

*** এখন আমি আপনাদের একটা প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করবোঃ সাংস্কৃতিক বিপ্লবের লক্ষ্য সম্পর্কে আপনারা কি বলেন? [উপস্থিতভাবে কেউ কেউ উত্তর দিলেনঃ এটা হচ্ছে পার্টির মধ্যকার ক্ষমতাসীন পুঁজিবাদের পথগামীদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম।] ক্ষমতাসীন পুঁজিবাদের পথগামীদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা প্রধান কাজ, কিন্তু এটা কোনোভাবেই লক্ষ্য নয়। লক্ষ্য হচ্ছে দৃষ্টিভঙ্গিগত সমস্যার সমাধান করাঃ এটা হচ্ছে সংশোধনবাদের শিকড়কে সমূলে উৎপাটিত করার প্রশ্ন।

কেন্দ্রিয় কমিটি বারংবার এর উপর জোর দিয়েছে যে, জনগণকে অবশ্যই নিজেরাই নিজেদেরকে শিক্ষিত করতে হবে ও মুক্ত করতে হবে। কারণ, বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গি তাদের উপর চাপিয়ে দেয়া যায় না। মতাদর্শের রূপান্তরের জন্য বাহ্যিক শর্তগুলোকে অভ্যন্তরীণ ভিত্তির মাধ্যমেই কাজ করতে হয় যদিও শেষেরটাই প্রধান। যদি বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন না হয়, তাহলে কীভাবে মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবকে একটি বিজয় বলা যেতে পারে? যদি বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গির রূপান্তরই না হয়, তাহলে যদিও মহান সাংস্কৃতিক বিপ্লবে ২০০০ জন ক্ষমতাসীন পুঁজিবাদের পথগামী হয়েছে, পরবর্তীতে ৪০০০ জন হতে পারে। ১৯৬৭; আলবেনিয়ার সামরিক প্রতিনিধিদলের প্রতি ভাষণ।

*** “ইতিহাসে নজিরবিহীন” — এটাও সঠিক। শুধুমাত্র আদিম সাম্যবাদী ব্যবস্থাকে বদলিয়ে দাসব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার, অর্থাৎ একটি শোষণহীন ব্যবস্থাকে বদলিয়ে একটি শোষণমূলক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার বিপ্লবটা বাদে অতীতের সমস্ত বিপ্লব এক ধরনের শোষণমূলক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় সমাপ্ত হয়েছে এবং প্রতিবিপ্লবীদের দমন করার কাজটা সামগ্রিকভাবে চালানোটা না ছিল প্রয়োজনীয়, না ছিল সম্ভব। শুধুমাত্র আমাদের বিপ্লব, সর্বহারা শ্রেণি ও কমিউনিস্ট পার্টি দ্বারা পরিচালিত ব্যাপক জনগণের বিপ্লবই শোষণমূলক সকল ব্যবস্থার ও সকল দৃষ্টান্তের চূড়ান্ত লক্ষ্যে চালিত।… ১৯৫৫; “হুফেং প্রতিবিপ্লবী চক্রের উপর তথ্যাবলী” সম্পর্কে সম্পাদকের নোট।  

*** দ্বন্দ্ববাদ অনুযায়ী একজন মানুষ যেমন অবশ্যই নিশ্চিতভাবেই মারা যাবে, সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাও একটি ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে একদিন শেষ হয়ে যাবে, কমিউনিস্ট ব্যবস্থা দ্বারা বাতিল হবে। যদি বলা হয় যে, সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও তার উৎপাদন সম্পর্ক ও উপরিকাঠামো বিলুপ্ত হবে না তাহলে তা কী ধরনের মার্কসবাদ হয়? তা কি একটা ধর্মীয় মতবাদ বা আধ্যাত্মবাদের মতোই হবে না যা চিরস্থায়ী ভগবানের প্রচার করে থাকে। প্রদেশ, মিউনিসিপ্যাল ও স্বায়ত্বশাসিত অঞ্চলের পার্টি কমিটিগুলোর সেক্রেটারিদের এক সম্মেলনে আলোচনা (১৯৫৭)। 

*** কমিউনিজমের সময় কোনো যুদ্ধ না থাকতে পারে, কিন্তু সংগ্রাম, জনগণের বিভিন্ন অংশের মধ্যকার সংগ্রাম অবশ্যই থাকবে; এক শ্রেণি কর্তৃক অন্য শ্রেণিকে উৎখাতের কোনো বিপ্লব না থাকতে পারে, কিন্তু বিপ্লব তখনো থাকবে। সমাজতন্ত্র থেকে কমিউনিজমে উত্তরণটা হচ্ছে বিপ্লবী। কমিউনিজমের এক স্তর থেকে আরেক স্তরে উত্তরণও তাই। প্রযুক্তিগত বিপ্লব ও সাংস্কৃতিক বিপ্লবও রয়েছে। কমিউনিজমকে অবশ্যই বহু স্তর ও বহু বিপ্লবের মধ্য দিয়েই যেতে হবে। ১৯৬১-৬২; সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘রাজনৈতিক অর্থনীতি’র উপর নোট।   

*** আমরা “আন্তর্জাতিক” গেয়ে গেছি ৫০ বছর ধরে, কিন্তু লোকে আমাদের পার্টি ভাঙতে চেষ্টা করেছে দশবার। আমি একে সম্ভব মনে করি যে, তারা এটা আরো দশবার, বিশবার বা ত্রিশবার করবে। তোমরা কি এটা বিশ্বাস কর না? তোমরা নাও করতে পারে, কিন্তু আমি করি। আমরা যখন কমিউনিজমে পৌঁছবো তখন কি কোনো সংগ্রাম লাগবে না? আমি তাও বিশ্বাস করি না। আমরা যখন কমিউনিজমে পৌঁছবো তখনও সংগ্রাম থাকবে, কিন্তু সেগুলো হবে নতুন ও পুরাতনের মধ্যে, সঠিক ও বেঠিকের মধ্যে, এই-ই সব। লক্ষ লক্ষ বছর পরেও ভুলটা কোনো কাজে লাগবে না এবং তা পরাজিত হবে। ১৯৭১; লিনপিয়াও-এর ঘটনার উপর আলোচনা। 

আরো পড়ুন:  কেডার --- মাও সেতুং
Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই “পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি” প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১০টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর “সমাজতন্ত্র” ও “মার্কসবাদ” গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন “বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা” নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top