আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > সংকলন > মাও সেতুং > যে বোকা বুড়োটি পাহাড় সরিয়েছিলেন — মাও সেতুং

যে বোকা বুড়োটি পাহাড় সরিয়েছিলেন — মাও সেতুং

১২ই জুন, ১৯৪৫

[চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সপ্তম জাতীয় কংগ্রেসে এটি হচ্ছে কমরেড মাও সে তুং-এর সমাপ্তিসূচক ভাষণ]

আমাদের কংগ্রেস খুবই সাফল্যমণ্ডিত হয়েছে। আমরা তিনটি কাজ করেছি। প্রথমতঃ, পার্টির লাইন নির্ধারণ করেছি যে লাইন হচ্ছে সাহসের সাথে জনগণকে সমবেত করা এবং জনগণের শক্তিকে সম্প্রসারিত করা যাতে করে আমাদের পার্টির নেতৃত্বে জাপানী আক্রমণকারীদের তারা পরাজিত করবেন, সমগ্র জনগণকে মুক্ত করবেন ও গড়ে তুলবেন একটি নয়া-গণতান্ত্রিক চীন। দ্বিতীয়তঃ, পার্টির নতুন গঠনতন্ত্র আমরা গ্রহণ করেছি। তৃতীয়তঃ, পার্টির নেতৃস্থানীয় সংস্থা কেন্দ্রীয় কমিটি নির্বাচিত করেছি। এখন থেকে আমাদের কর্তব্য হচ্ছে সারা-পার্টির সদস্যবৃন্দকে নেতৃত্ব দিয়ে পার্টি-লাইনকে কার্যকর করা। আমাদের কংগ্রেস হয়ে দাড়িয়েছে বিজয়ের কংগ্রেস, ঐক্যের কংগ্রেস। প্রতিনিধিরা তিনটি রিপোর্ট সম্পর্কেই চমৎকার মন্তব্যাদি করেছেন। অনেক কমরেড আত্মসমালোচনা করেছেন এবং ঐক্যকে লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করে আত্মসমালোচনার মাধ্যমে ঐক্যে উপনীত হয়েছেন। এই কংগ্রেস হচ্ছে ঐক্যের, আত্মসমালোচনার ও পার্টির অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের প্রতীকস্বরূপ।

কংগ্রেস শেষ হওয়ার পর অনেক কমরেড তাঁদের নিজ নিজ কর্মস্থলে ফিরে যাবেন, বিভিন্ন যুদ্ধফ্রন্টে ফিরে যাবেন। কমরেডগণ, আপনারা যেখানেই যান না কেন, আপনাদের কাজ হবে পার্টির কমরেডদের মাধ্যমে ব্যাপক জনগণের মধ্যে কংগ্রেসের লাইনটি প্রচার করা।

কংগ্রেসের লাইন প্রচারের ক্ষেত্রে আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে বিপ্লবের বিজয় যে সুনিশ্চিত এ বিষয়ে সমগ্র পার্টি ও জনগণের আস্থা জাগিয়ে তোলা। প্রথমে অগ্রবাহিনীর রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে যাতে করে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ও আত্মবলিদানে নির্ভীক হয়ে প্রতিটি বাধাবিঘ্ন অতিক্রম করে তা বিজয় অর্জন করতে পারে। কিন্তু এটাই যথেষ্ট নয়; সমগ্র জনগণের রাজনৈতিক চেতনাকেও আমাদের জাগিয়ে তুলতে হবে যাতে করে তারা স্বেচ্ছায় ও আনন্দের সঙ্গে বিজয় অর্জনের জন্য একযোগে সংগ্রাম করে যাবে। সমগ্র দেশের জনগণকে এই বিশ্বসে উদ্দীপ্ত করে তুলতে হবে যে চীন চীনা জনগণেরই, প্রতিক্রিয়াশীলদের নয়।

“যে বোকা বুড়োটি পাহাড় সরিয়েছিল” হচ্ছে একটা প্রাচীন চীনা উপকথা। তাতে বহু প্রাচীনকালের উত্তর চীনে বসবাসকারী এক বুড়োর কাহিনী বলা হয়েছে। “উত্তর পাহাড়ের বাঁকে বুড়ো” নামে সে পরিচিত ছিল। তার বাড়িটি ছিল দক্ষিণমুখী এবং তার দোরগোড়া ছাড়িয়েই পথরোধ করে দাঁড়িয়েছিল থাইহাং আর ওয়াংয়ু নামের দুটো উচু পাহাড়। তার ছেলেদের ডেকে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে পাহাড় দুটোকে খুড়ে উপড়ে ফেলার জন্য কোদাল হাতে নিয়ে কাজে লেগে পড়ল। আরেক জন ‘সাদা দাড়িওয়ালা জ্ঞানী’ নামে পরিচিত বৃদ্ধ তাদের দেখে উপহাসভরে বলল, “তোমরা কী বোকার মতোই না কাজ করছ! তোমাদের কজনের পক্ষে এই বিরাট দুটো পাহাড় গড়ে উপড়ে ফেলা একেবারেই অসম্ভব। ” বোকা বুড়ো জবাব দিল, “আমি মরলে আমার ছেলেরা এ কাজ চালিয়ে যাবে। তারা যখন মরে যাবে তখন আমার নাতিরা, তারপর তাদের ছেলে ও নাতিরা অনন্তকাল ধরে এ কাজ চালিয়ে যাবে। পাহাড় দুটো অনেক উঁচু, কিন্তু তারা আর উঁচু হতে পারবে না এবং আমরা যতটুকু খুঁড়ে ফেলব, ততটুকু তারা নীচুই হয়ে পড়বে। তাহলে কেন আমরা এগুলিকে সমান করে দিতে পারব না?” জ্ঞানী বুড়োর ভুল অভিমত এভাবে খণ্ডন করে দিয়ে তার প্রতিজ্ঞায় অবিচল থেকে প্রতিদিনই সে মাটি খুঁড়ে যেতে লাগল। এই দেখে ভগবান মুগ্ধ হয়ে গেলেন, তিনি দুজন দেবদূতকে প্রেরণ করলেন, তারা এসে পাহাড় দুটোকে পিঠে করে সরিয়ে নিয়ে চলে গেলেন।

আজ চীনা জনগণের মাথার ওপর দুটো প্রকাণ্ড পাহাড়ের মতো বোঝা চেপে রয়েছে। একটি হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদ, আর অন্যটি হচ্ছে সামন্তবাদ। চীনের কমিউনিস্ট পার্টি অনেকদিন আগেই এই দুটোকে ধুড়ে উপড়ে ফেলার ব্যপারে মনস্থির করেছে। আমাদের অবশ্যই অধ্যবসায় সহকারে অবিরাম কাজ করে যেতে হবে, তাহলে আমরাও ভগবানের মন গলাতে পারব। আমাদের ভগবান কিন্তু চীনা জনগণ ছাড়া আর কেউ নয়। তারা যদি একযোগে উঠে দাঁড়ায় আর আমাদের সঙ্গে মিলে খুঁড়তে শুরু করে তবে এই দুটো পাহাড়কে উপড়ে ফেলা যাবে না কেন?

আমেরিকায় ফিরে যাচ্ছেন এমন দুজন আমেরিকানকে আমি গতকাল কথা প্রসঙ্গে বলেছিলাম যে আমেরিকান সরকার আমাদের ক্ষতি করার চেষ্টা করছে, আমরা তা করতে দেব না। কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে চিয়াং কাইশেককে সমর্থন করার আমেরিকান সরকারের নীতির আমরা বিরোধিতা করি। কিন্তু আমাদের একটা পার্থক্য করতে হবে প্রথমতঃ আমেরিকান জনগণ ও তাদের সরকারের মধ্যে এবং দ্বিতীয়তঃ আমেরিকান সরকারের মধ্যেকার নীতি নির্ধারণকারীদের ও তাদের অধীনস্থ সাধারণ কর্মীদের মধ্যে। আমি ঐ দুজন আমেরিকানকে বলেছিলাম, আপনাদের সরকারের নীতি নির্ধারণ কারীদের বলবেন — আমাদের মুক্ত এলাকায় প্রবেশ করতে আপনাদের নিষেধ করছি কারণ আপনাদের নীতি হচ্ছে কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে চিয়াং কাই-শেককে সমর্থন করা, তাই আপনাদের সম্পর্কে আমাদের সতর্ক থাকা প্রয়োজন। যদি জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে মুক্ত এলাকায় আসতে চান তাহলে আপনারা আসতে পারেন কিন্তু তার আগে একটা চুক্তি হওয়া দরকার। আমরা আপনাদের চোরের মতো অন্ধকারে সর্বত্র ঘোরাফেরা করতে দিতে পারি না। প্যাট্রিক জে, হার্লি প্রকাশ্যে চীনা কমিউনিস্টদের সঙ্গে সহযোগি তার বিরুদ্ধে ঘোষণা করার পরও আপনারা কেন মুক্ত এলাকায় এসে যেখানে-সেখানে ঘুরঘুর করে বেড়াতে চান?[২] আমেরিকান সরকারের কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে চিয়াং কাই-শেককে সমর্থন করার নীতি আমেরিকান প্রতিক্রিয়াশীলদের নির্লজ্জতারই প্রকাশ। কিন্তু চীনা ও বৈদেশিক প্রতিক্রিয়াশীলদের চীনা জনগণের বিজয় অর্জনকে বাঁধা দেবার সমস্ত অপচেষ্টা ব্যর্থ হতে বাধ্য। বর্তমান বিশ্বের গতিধারায় গণতান্ত্রিক শক্তিগুলিই হচ্ছে প্রধান ধারা আর প্রতিক্রিয়া হচ্ছে একটি প্রতিকূল ধারা মাত্র। এই প্রতিক্রিয়াশীল বিপরীত ধারা জাতীয় স্বাধীনতা ও জনগণের গণতন্ত্রের প্রধান ধারাকে দাবিয়ে রাখার অপচেষ্টা করছে, কিন্তু এটা কোনদিনই প্রধান ধারায় পরিণত হতে পারবে না।

আজ পুরাতন পৃথিবীতে এখনো তিনটি বৃহৎ দ্বন্দ্ব বিদ্যমান রয়েছে যে দ্বন্দ্ব গুলি সম্পর্কে স্তালিন অনেকদিন আগেই বলে গেছেন। প্রথমতঃ, সাম্রাজ্যবাদী দেশসমূহের শ্রমিকশ্রেণী ও বুর্জোয়াশ্রেণীর মধ্যেকার দ্বন্দ্ব; দ্বিতীয়তঃ, বিভিন্ন সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির মধ্যেকার দ্বন্দ্ব; এবং তৃতীয়তঃ ঔপনিবেশিক ও আধাঔপনিবেশিক দেশগুলি এবং উপনিবেশ-শাসক সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির মধ্যেকার দ্বন্দ্ব।[৩] তিনটি দ্বন্দ্ব যে কেবলমাত্র আগের মতো বিদ্যমান রয়েছে তাই নয়, বরং সেগুলি আরও তীব্রতর ও ব্যাপকতর হয়েছে। এই শক্তিগুলির অস্তিত্ব ও বিকাশের ফলে একটা সময় আসবে যখন সোভিয়েত বিরোধী, কমিউনিস্ট-বিরোধী ও গণতন্ত্র-বিরোধী বিপরীত যে ধারাটি আজও বিদ্যমান রয়েছে তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে।

এই সময়ে চীনে দুটি কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হচ্ছে — কুওমিনতাঙ-এর ষষ্ঠ জাতীয় কংগ্রেস ও কমিউনিস্ট পার্টির সপ্তম জাতীয় কংগ্রেস। এই দুটি কংগ্রেসের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন একটির উদ্দেশ্য হচ্ছে কমিউনিস্ট পার্টি ও চীনের অন্য সমস্ত গণতান্ত্রিক শক্তিগুলিকে নির্মূল করে দেওয়া এবং এভাবে চীনকে অন্ধকারে নিমজ্জিত করা; অন্যটির উদ্দেশ্য হচ্ছে জাপানী সাম্রাজ্যবাদ ও তার অনুচরদের, চীনের সামন্ততান্ত্রিক শক্তিগুলিকে উচ্ছেদ করে দেওয়া এবং একটা নয়া-গণতান্ত্রিক চীন গড়ে তােলা এবং এভাবে চীনকে আলাের দিকে নিয়ে যাওয়া। এই দুটি লাইনের মধ্যে পারস্পরিক সংঘাত শুরু হয়েছে। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সপ্তম জাতীয় কংগ্রেসের লাইনের দ্বারা পরিচালিত হয়ে চীনের জনগণ পরিপূর্ণ বিজয় অর্জন করবে এবং কুওমিনতাঙ-এর প্রতিবিপ্লবী লাইন অনিবার্যভাবেই ব্যর্থ হবে।

টীকা:

১. চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সপ্তম জাতীয় কংগ্রেসের তিনটি রিপোর্ট ছিল : কমরেড মাও সে-তুঙ-এর রাজনৈতিক রিপোর্ট, কমরেড চু তের সামরিক রিপোর্ট, এবং কমরেড লিউ শাও-চির পার্টির সংবিধান পরিবর্তন সংক্রান্ত রিপোর্ট।

২. প্যাট্রিক জে. হালি, রিপাবলিকান পার্টির প্রতিক্রিয়াশীল এই রাজনীতিবিদকে ১৯৪৪ সালের শেষের দিকে চীনে আমেরিকান রাষ্ট্রদূত নিদ্ভুক্ত করা হয়। ১৯৪৫ সালের নভেম্বরে তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন, কারণ চিয়াং কাই-শেকের কমিউনিস্ট-বিরোধী নীতির প্রতি তাঁর সমর্থন চীনের জনগণের দৃঢ় প্রতিরোধ জাগিয়ে তোলে। ওয়াশিংটনে আমেরিকান পররাষ্ট্র দপ্তরের এক সাংবাদিক সম্মেলনে ১৯৪৫ সালের ২রা এপ্রিল হার্লি চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে সহযোগিতার বিরুদ্ধে প্রকাশ্য ঘোষণাটি করেন। বিস্তৃত তথ্যের জন্য এই খণ্ডের ‘হালি-চিয়াং দ্বৈত সঙ্গীতের চরম ব্যর্থতা প্রবন্ধটি দেখুন।

৩. দ্রষ্টব্যঃ জে. ভি. স্তালিন : লেনিনবাদের ভিত্তি রচনাবলী, বাংলা সংস্করণ, নবজাতক প্রকাশন, ষষ্ঠ খণ্ড।

[প্রবন্ধটির প্রতিলিপি নবজাতক প্রকাশনী, কলকাতা, কতৃক অনুদিত “মাও সেতুঙ এর নির্বাচিত রচনাবলীর ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা নং ৪১১ এর অনুবাদ হতে তৈরী করা হয়েছে।]

আরো পড়ুন

Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই “পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি” প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১০টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর “সমাজতন্ত্র” ও “মার্কসবাদ” গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন “বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা” নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top