আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > সংকলন > মার্কস > ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, তার ইতিহাস ও ফলাফল

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, তার ইতিহাস ও ফলাফল

লন্ডন, শুক্রবার ২৪শে জুন, ১৮৫৩

ভারত বিষয়ে বিধান প্রণয়ন স্থগিত রাখার জন্য লর্ড স্ট্যানলির মোশনের উপর বিতর্ক আজ সন্ধ্যা পর্যন্ত মুলতুবী রাখা হয়েছে। ১৭৮৩ সালের পরে ইংলন্ডে এই প্রথম ভারত প্রশ্ন মন্ত্রিসভা-টেকা-না-টেকার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেন হল?

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সত্যকার সূত্রপাত হিসাবে ১৭০২ সালের অতি পূর্ববর্তী কোনো যুগকে নির্দিষ্ট করা চলে না, ওই সময়টায় পূর্ব ভারতীয় বাণিজ্যের একচেটিয়া দাবি করে বিভিন্ন সংঘ একটি একক কোম্পানিতে মিলিত হয়। তার আগে পর্যন্ত আদি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অস্তিত্বই বারে বারে বিপন্ন হয়েছে, ক্রমওয়েলের প্রটেক্টরেটের সময় একবার বেশ কয়েক বছর ধরে তা স্থগিত থাকে, একবার তৃতীয় উইলিয়মের আমলে পার্লামেন্টের হস্তক্ষেপে তার সম্পূর্ণ উচ্ছেদ-প্রাপ্তিরই আশঙ্কা দেখা দেয়। ওই ওলন্দাজ রাজকুমারের উত্থান কালেই যখন বৃটিশ সাম্রাজ্যের রাজস্ব-আদায়ী হয় হুইগেরা, যখন জন্ম হয় ব্যাঙ্ক অব ইংলন্ডের, যখন ইংলন্ডে রক্ষা-শুল্ক ব্যবস্থা পাকাপাকি কায়েম এবং ইউরোপে শক্তি সাম্যের প্রশ্ন নিশ্চিতরূপেই মীমাংসিত, তখনই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অস্তিত্ব স্বীকার করে পার্লামেন্ট। বাহ্যিক মুক্তির এ পর্বটা এলিজাবেথ ও প্রথম চার্লস-এর আমলকার মতো রাজকীয় খিলাৎ-সৃষ্ট একচেটিয়ার পর্ব নয়, পার্লামেন্টের অনুমোদনে অধিকারপ্রাপ্ত জাতীয় একচেটিয়ার পর্ব। ইংলন্ডের ইতিহাসের এ পর্বটার সঙ্গে বস্তুত ফ্রান্সের লুই ফিলিপ পর্বের অত্যন্ত সাদৃশ্য বর্তমান — সাবেকি ভূমিজীবী অভিজাতরা পরাজিত কিন্তু টাকা-ওয়ালাদের বা বড় ধনপতিদেরদের নিশান ছাড়া তাদের জায়গা নিতে বুর্জেয়ারা তখনো অক্ষম। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সাধারণ লোককে ভারত বাণিজ্য থেকে বহিস্কৃত করে ঠিক সেই সময়টায় যখন কমন্স সভা তাদের বাদ দেয় পার্লামেন্ট প্রতিনিধিত্ব থেকে। এ থেকে তথা অন্যান্য ঘটনা থেকে দেখি, সামন্ত অভিজাততন্ত্রের ওপর বুর্জোয়াদের প্রথম বিজয় মিলে যাচ্ছে জনগণের বিরুদ্ধে অতি প্রগাঢ় এক প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে, কবেট-এর মতো একাধিক জনবাদী লেখক যে গণমুক্তির সন্ধান করেছেন ভবিষ্যতে নয় অতীতে, তা এই ব্যাপারেরই তাড়নায়। সঙ্গে ১৬৮৮ সালের ‘গৌরবোজ্জ্বল বিপ্লবের (৯) মিলন সাধিত হয়। সেই একই শক্তিতে যার সাহায্যে উদারনৈতিক স্বার্থ ও উদারনৈতিক রাজবংশেরা সর্বদেশে ও সর্বকালে মিলেছে ও জোট বেঁধেছে, — অর্থাৎ দুর্নীতির শক্তিতে, তৃতীয় উইলিয়মের পক্ষে যা আশীর্বাদস্বরূপ এবং লুই ফিলিপের কাছে যা কালান্তক অভিশাপ সেই নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্রের সর্বপ্রথম ও সর্বশেষ চালক শক্তি। পার্লামেন্টারি অনুসন্ধান থেকে দেখা যাচ্ছে, ১৬৯৩ সালেই ক্ষমতাধিষ্ঠিত ব্যক্তিদের ‘উপটৌকন এই খাতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাৎসরিক খরচ দাঁড়ায় ৯০,০০০ পাঃ, যে ক্ষেত্রে বিপ্লবের আগে এ অঙ্ক ১,২০০ পাঃ ছাড়িয়েছে কদাচিৎ। ডিউক অব লিডস অভিযুক্ত হন ৫,০০০ পাঃ উৎকোচ গ্রহণের দায়ে, এবং ন্যায়পর রাজা স্বয়ং ১০,০০০ পাঃ নিয়েছেন বলে দোষী সাব্যস্ত হন। এই প্রত্যক্ষ উৎকোচ ছাড়াও প্রতিযোগী কোম্পানিগুলিকে বিতাড়িত করা হয়েছে নিম্নতম সুদে সরকারকে বিপুল টাকা ঋণদানের লোভ দেখিয়ে এবং প্রতিদ্বন্দ্বী ডিরেক্টরদের কিনে নিয়ে।

সরকারকে উৎকোচ-বশীভূত করে ক্ষমতা পায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, যেমন পায় ব্যাঙ্ক অব ইংলন্ড, তা বজায় রাখতেও উৎকোচ দিতে বাধ্য হয় তারা, যেমন বাধ্য হয় ব্যাঙ্ক অব ইংলন্ড। একচেটিয়ার মেয়াদ ফুরোবার প্রতিটি পর্বেই সনদের মেয়াদ বৃদ্ধি এ কোম্পানি পায় কেবল সরকারকে নতুন ঋণ ও নতুন উপটৌকন দিতে চেয়ে ।

সপ্তবর্ষ যুদ্ধের (১০) ঘটনাবলীতে বাণিজ্য শক্তি থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি পরিণত হয় সমর ও রাজ্য শক্তিতে। প্রাচ্যের বর্তমান ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপিত হয় তখনই। ইস্ট ইন্ডিয়া স্টক উঠে গেল। ২৬৩ পাউন্ডে আর ডিভিডেন্ট তখন দেওয়া হত শতকরা ১২—১/২ হারে। কিন্তু এবার দেখা দিলো কোম্পানির নতুন এক শত্ৰু — প্রতিদ্বন্দ্বী ব্যবসায়ী সংঘের রূপে নয়, প্রতিদ্বন্দ্বী মন্ত্রী ও প্রতিদ্বন্দ্বী জনগণের রূপে। বলা হল, কোম্পানির রাজ্য জয় করা হয়েছে ব্রিটিশ নৌবাহিনী ও ব্রিটিশ স্থল সৈন্যের সাহায্যে এবং কোনো ব্রিটিশ প্রজার ক্রাউন থেকে স্বাধীনভাবে সার্বভৌম রাজ্য থাকতে পারে না। শেষ যুদ্ধগুলিতে জেতার ফলে যে ‘আশ্চর্য সম্পদ’ লাভ হয়েছে বলে কল্পনা করা হয়েছিল তাতে ভাগ পাবার দাবি জানাল সেদিনের মন্ত্রীরা আর সেদিনের জনগণ। কোম্পানি তার অস্তিত্ব বাঁচায় ১৭৬৭ সালের এই চুক্তিতে যে, জাতীয় রাজকোষে সে বছরে দেবে ৪,০০,০০০ পাউন্ড।

কিন্তু ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি চুক্তি পালন করার বদলে আর্থিক সংকটে জড়িয়ে পড়ে এবং ইংরেজ জনগণকে কর দেবার বদলে আর্থিক সাহায্যের প্রার্থনা জানায় পার্লামেন্টে। এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ অদল বদল হল সনদে। নতুন অবস্থা সত্ত্বেও কোম্পানির হাল উন্নত না হওয়ায় এবং যুগপৎ উত্তর আমেরিকায় ইংরেজ জাতির উপনিবেশ খোয়া যাওয়ায় অন্যত্র কোনো একটা বৃহৎ উপনিবেশিক সাম্রাজ্য পুনর্লাভের প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই সকলের কাছে অনুভূত হতে থাকে। খ্যাতনামা ফক্স ভাবলেন, তাঁর বিখ্যাত ইন্ডিয়া বিল আনার যোগ্য মুহুর্তা এসেছে। ১৭৮৩ সালে, এ বিলে ডিরেক্টর ও প্রোপ্রাইটরদের কোর্ট বাতিল করে পার্লামেন্ট দ্বারা নিযুক্ত সাতজন কমিশনারের হাতে ভারত শাসনের গোটা ভার ন্যস্ত করার প্রস্তাব থাকে। লর্ড সভায় আপোগণ্ড রাজার [তৃতীয় জর্জ ] ব্যক্তিগত প্রভাবের জোরে মিঃ ফক্সের বিল পরাস্ত করা এবং ফক্স ও লর্ড নর্থের তদানীন্তন কোয়ালিশন সরকার ভেঙে দিয়ে সুবিখ্যাত পিটকে সরকারের নেতৃত্বে বসাবার উপলক্ষ্য হয়। ১৭৮৪ সালে পিট উভয় সভা থেকেই একটি বিল পাশ করিয়ে নেন যাতে প্রিভি কাউন্সিলের ছয়জন সভ্য নিয়ে একটি বোর্ড অব কন্ট্রোল প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেওয়া হয়, এই সভ্যদের কাজ ছিল:

‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ভূখণ্ড ও সম্পত্তি, রাজস্ব বা নাগরিক ও সামরিক শাসনের সঙ্গে এতটুকু সম্পর্কিত এমন সমস্ত কাজকর্ম ও ব্যবস্থার যাচাই, তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ করা।’

এই প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক মিল বলেন :

“এ আইন পাশ করার পেছনে দুটি লক্ষ্য ছিল। মিঃ ফক্সের বিলের কু-উদ্দেশ্য বলে যা বলা হয়েছিল সে অভিযোগ এড়াবার জন্য দরকার ছিল যাতে দেখায় যেন প্রধান ক্ষমতা ডিরেক্টরদের হাতেই থাকছে। মন্ত্রিসভার সুবিধার দিক থেকে প্রয়োজন ছিল যাতে আসলে সে ক্ষমতা সবই নিয়ে নেওয়া যায়। প্রধানত এই প্রশ্নেই মিঃ পিটের বিল তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীর থেকে এই বলে তফাৎ ঘোষণা করতে চায় যে একটা বিলে ডিরেক্টরদের ক্ষমতা চূৰ্ণ করা হচ্ছিল, অন্য বিলে তা প্রায় অক্ষুন্ন রাখা হয়েছে। মিঃ ফক্সের আইনে মন্ত্রীদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হত সোজাসুজি। মিঃ পিটের আইনে সে-ক্ষমতার প্রতিষ্ঠা হল গোপনে ও শঠতা করে। ফক্সের বিলে কোম্পানির ক্ষমতা হস্তান্তরিত হচ্ছিল পার্লামেন্ট-নিযুক্ত কমিশনারদের কাছে। মিঃ পিটের বিলে সে ক্ষমতা দেওয়া হল রাজ-নিযুক্ত কমিশনারদের হাতে।”(১১)

১৭৮৩ ও ১৭৮৪ সালের বছরগুলিই তাই প্রথম এবং অদ্যাবধি একমাত্র বছর যখন ভারতীয় প্রশ্ন পরিণত হয় মন্ত্রিসভার প্রশ্নে। মিঃ পিটের বিল পাশ হওয়ায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সনদ নতুন করে দেওয়া হয় এবং কুড়ি বছরের জন্য সরিয়ে রাখা হয় ভারত প্রশ্ন। কিন্তু ১৮১৩ সালে অ্যান্টি-জাকোবিন যুদ্ধ (১২) এবং ১৮৩৩ সালে সদ্যপ্রবর্তিত সংস্কার বিলের (১৩) তলে অন্য সমস্ত রাজনৈতিক প্রশ্নই চাপা পড়ে।

তাই, প্রথমত এই কারণেই, ভারত প্রশ্ন ১৭৮৪ সালের আগে বা পরে একটা মস্ত রাজনৈতিক প্রশ্ন হয়ে উঠতে পারেনি, তার আগে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে সর্বাগ্রে অস্তিত্ব ও গুরুত্ব অর্জন করতে হয়েছিল, তার পরে দায়িত্ব না নিয়ে তার যতটা ক্ষমতা গ্রাস করা সম্ভব তা চক্ৰতন্ত্র গ্রাস করে বসে, এবং তারো পরে সনদ নতুন করে দেওয়ার প্রতি পর্বে, ১৮১৩ সালে ও ১৮৩৩ সালে ইংরেজ জনগণ সর্বাধিক গুরুত্বের অন্য প্রশ্নে ব্যস্ত থাকে।

এবার অন্য দিক থেকে দেখা যাক। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি শুরু করে কেবল তাদের এজেন্টদের কারখানা-কুঠি। আর মাল রাখার গুদাম প্রতিষ্ঠা করে, তা রক্ষার জন্য কয়েকটা দুর্গ বানায় তারা। যদিও ১৬৮৯ সালেই তারা ভারতে একটা ডোমিনিয়ন প্রতিষ্ঠা ও রাজস্বকে তাদের আয়ের অন্যতম সূত্র করে তোলার কথা চিন্তা করেছিল। তবু ১৭৪৪ সাল পর্যন্ত তারা বোম্বাই, মাদ্রাজ ও কলকাতার আশেপাশের কিচু গুরুত্বহীন জেলাই কেবল অধিকার করে। পরে কর্ণাটকে যে যুদ্ধ বেধে যায় তার ফলে নানা সংগ্রামের পর তারা প্রকৃতপক্ষে ভারতের ওই অঞ্চলটার সার্বভৌম প্রভু হয়ে দাঁড়ায়। বাঙলায় যুদ্ধ এবং ক্লাইভের বিজয়ের ফলাফল হয় আরো প্রভূত। এর ফল হল সত্য করে বাঙলা বিহার ও উড়িষ্যা অধিকার। ১৮শ শতাব্দীর শেষে এবং বর্তমান শতাব্দীর প্রথম বছরগুলিতে টিপু সাহেবের সঙ্গে যুদ্ধবিগ্রহ বাধে এবং তার ফলে শক্তির বিরাট বৃদ্ধি এবং অধীনতামূলক ব্যবস্থার প্রভূত সম্প্রসারণ (১৪)। অবশেষে ১৯শ শতকের দ্বিতীয় দশকে জয় করা গেল প্রথম সুবিধাজনক ষকটা সীমান্ত – মরুভূমি বরাবর ভারতের সীমান্ত। তার আগে পর্যন্ত প্রাচ্যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য এশিয়ার সেই সব অঞ্চল পর্যন্ত পৌছয়নি যা চিরকাল ভারতের প্রত্যেকটি বড়ো বড়ো কেন্দ্রীয় শক্তির পীঠস্থান হিসাবে কাজ করেছে। কিন্তু সাম্রাজ্যের যেটি ভঙ্গুর জায়গা, পুরনো বিজয়ীরা যতবার বিতাড়িত হয়েছে। নতুন বিজয়ীদের কাছে ততবার যেখান থেকে অভিযান এসেছে, সেই পশ্চিম সীমান্তের প্রাচীর ব্রিটিশের হাতে ছিল না। ১৮৩৮ থেকে ১৮৪৯ সালের পর্বে, শিখ ও আফগান যুদ্ধগুলির কালে পঞ্জাব ও সিন্ধুকে বলপূর্বক গ্রাস করে ব্রিটিশ শাসন পূর্ব ভারতীয় মহাদেশের নৃতাত্ত্বিক, রাজনৈতিক ও সামরিক সীমানা জুড়ে নিশ্চিতরূপে প্রতিষ্ঠিত হল (১৫)। মধ্য এশিয়া থেকে আসা কোনো অভিযানী সৈন্যকে প্রতিহত করতে এবং পারস্য সীমান্তের দিকে রুশ অভিযানের বিরুদ্ধে এ অধিকার অপরিহার্য। এই শেষ দশকে ব্রিটিশ ভারতের ভূখণ্ডে যুক্ত হয়েছে ১,৬৭,০০০ বৰ্গ মাইল, যার অধিবাসী সংখ্যা ৮৫,৭২,৬৩০ জন। আর অভ্যন্তরে সব কটি দেশীয় রাজ্যই এখন ব্রিটিশ এলাকা দ্বারা পরিবেষ্টিত, নানা ধরনের ব্রিটিশ ক্ষুদ্র আধিপত্য-এর অধীন ও একমাত্র গুজরাট ও সিন্ধু ছাড়া সমুদ্র উপকূল থেকে বিচ্ছিন্ন। বাইরের দিক থেকে ভারত এবার শেষ হল। একটি বৃহৎ ইঙ্গ ভারতীয় সাম্রাজ্যের অস্তিত্ব কেবল ১৮৪৯ সাল থেকেই।

এই ভাবে কোম্পানির নামের আড়ালে ব্রিটিশ সরকার দুই শতক ধরে লড়াই চালিয়ে শেষ পর্যন্ত ভারতের স্বাভাবিক সীমা পর্যন্ত পৌঁছিয়েছে। এবার বুঝতে পারি, কেন এই সারাটা সময় ইংলন্ডের সব পার্টিই, এমন কি কপট শান্তি স্তরে যারা মুখরতম হতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, তারাও একটি বৃহৎ ভারত সাম্রাজ্যের arrondissement [পরিসীমা] সম্পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত চোখ ঠেরে চুপ করে ছিল। প্রথমত, তাদের তীব্র জনহিতৈষণার প্রয়োগ করতে হলে সে সাম্রাজ্যটা আগে অবশ্যই পাওয়া চাই। এই দিক থেকে সনদ নবায়নের আগের সমস্ত পর্বের তুলনায় বর্তমান বছরে, ১৮৫৩ সালে ভারত প্রশ্নের পরিবর্তিত অবস্থার কথা আমরা বুঝতে পারি।

ফের আবার অন্যদিক থেকে দেখা যাক। বিভিন্ন পর্যায়ে ভারতের সঙ্গে ব্রিটিশ বাণিজ্যের ধারা পর্যালোচনা করলে আমরা ভারত বিধানের বিশিষ্ট সংকটটিকে আরো ভালো করে বুঝতে পারব।

এলিজাবেথের রাজত্বকালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কারবার শুরুর সময় ভারতের সঙ্গে লাভজনকভাবে বাণিজ্য চালাবার জন্য কোম্পানি বছরে ৩০,০০০ পাউন্ড মূল্যের সোনা, রূপা ও বৈদেশিক মুদ্রা রপ্তানি করার অনুমতি পায়। এ ঘটনা সে যুগের সবকিছু কুসংস্কার বিরোধি এবং টমাস মান তাঁর (A Discourse of Trade, from England unto the East-Indies) পুস্তকে (১৬) ‘বাণিজ্য ব্যাবস্থা’র বুনিয়াদ দিতে বাধ্য হন এই কথা স্বীকার করে যে, মহার্ঘ ধাতুই দেশের একমাত্র সম্ভব সত্যকার সম্পদ, যদিও সেই সঙ্গেই যুক্তি দেন যে তার রপ্তানি নিরাপদে অনুমোদন করা যায় যদি ব্যালান্স অব পেমেন্ট হয় রপ্তানিকারী দেশের অনুকূল। এই অর্থে তিনি বলতে চান যে পূর্ব ভারত থেকে আমদানি করা পণ্য প্রধানত ফের-চালান যায় অন্যান্য দেশে, ফলে ভারতে তার দাম দেবার জন্য যে স্বর্ণ ও রূপা ব্যয় করা হয়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণ স্বর্ণ ও রূপা পাওয়া যায়। একই প্রেরণায় স্যার জোসিয়া চাইল্ড লিখেছিলেন তাঁর (A Treatise. Wherein Is Demonstrated I. That the East-India Trade Is the Most National of All Foreign Trades) (১৭)। ক্ৰমে ক্ৰমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সমর্থনকারীরা আরো সম্পর্ধিত হয়ে ওঠে এবং এই বিচিত্র ভারত ইতিহাসের একটা কৌতুহলের বিষয় হিসাবে লক্ষ্য করা যেতে পারে যে ভারতস্থিত একচেটিয়া মালিকেরাই ইংলন্ডে অবাধ বাণিজ্যের প্রথম প্রচারক।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রসঙ্গে পার্লামেন্টি হস্তক্ষেপের দাবি ফের ওঠে ব্যবসায়ী শ্রেণির কাছ থেকে নয়, শিল্পজীবী শ্রেণির কাছ থেকে ১৭শ শতকের শেষ ও ১৮শ শতকের বেশির ভাগ কাল জুড়ে, যখন পূর্ব ভারতের সুতি ও পশমি বস্ত্ৰ বেচারা ব্রিটিশ কারখানা মালিকদের ধ্বংস করছে বলে ঘোষণা করা হয় — এ মত প্রকাশিত হয় জন পোলেক্সফোনের (১৮) লেখায়, অদ্ভুতভাবে সত্য প্রমাণিত হয় দেড় শতাব্দী পরে, কিন্তু অতি ভিন্ন একটা অর্থে। পার্লামেন্ট তখন হস্তক্ষেপই করে। তৃতীয় উইলিয়ম, ১১ ও ১২ অ্যাক্ট, ক্যাপশন ১০ আইন বলে ভারত, পারস্য ও চিন থেকে আমদানি করা রেশমি বস্ত্র ও ছাপা বা রঙ-করা ক্যালিকো পরা নিষিদ্ধ হল ও তার পরিধানকারী বা বিক্রয়কারী সকলের উপরেই ২০০ পাউন্ড জরিমানা ধার্য হল। পরে যারা ‘আলোকপ্ৰাপ্ত’ হয়ে ওঠেন সেই ব্রিটিশ মাল উৎপাদকদের বারম্বার বিলাপে ১ম, ২য় ও ৩য় জর্জের আমলেও অনুরূপ আইন হয়। এই ভাবে ১৮শ শতকের বেশির ভাগটা ধরে ভারতের মাল ইংলন্ডে সাধারণত আমদানি করা হত ইউরোপিয় মহাদেশে বিক্রয়ের জন্য এবং খাস ইংলন্ডের বাজার থেকে তা বাদ দিয়ে রাখার জন্য।

লুব্ধ দেশিয় শিল্পপতিদের প্রার্থিত পার্লামেন্টের এই পূর্ব ভারতীয় হস্তক্ষেপ ছাড়াও সনদ নবায়নের প্রতি পর্বেই লন্ডন, লিভারপুল ও ব্রিস্টলের ব্যবসায়ীরা কোম্পানির বাণিজ্য একচেটিয়া ভেঙে ভাগ নেবার চেষ্টা করে সেই বাণিজ্যে, যা ধরা হত এক খাটি স্বর্ণখনি বলে। এই সব প্রচেষ্টার ফলে ১৭৭৩ সালের আইনে কোম্পানির সনদ ১৮১৪ সালের ১লা মার্চ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়ে এই ব্যবস্থা করা হল যাতে প্রায় সব রকমের পণ্যই কোম্পানি বহির্ভূত ব্যক্তিবিশেষ ইংলন্ড থেকে রপ্তানি এবং কোম্পানির ভারতীয় কর্মচারীরা ইংলন্ডে আমদানি করার অধিকার পায়। কিন্তু এই সুবিধাদান এমন সব শর্ত দিয়ে বাঁধা হয় যাতে ব্রিটিশ ভারতে ব্যক্তিগত ব্যবসায়ীদের রপ্তানির ক্ষেত্রে তার কোনো ফল পড়ল না। ১৮১৩ সালে সাধারণ বাণিজ্যের চাপ কোম্পানি আর আটকাতে পারল না এবং চিন বাণিজ্যের একচেটিয়া ব্যতীত ভার বাণিজ্য কতকগুলি শর্তে উন্মুক্ত হল সাধারণ প্রতিযোগিতায়। ১৮৩৩ সালে সনদ নবায়নের সময় শেষ পর্যন্ত এই বাকি প্রতিবন্ধকগুলিও নাকচ হয়, আদৌ কোনোরূপ বাণিজ্য চালানো কোম্পানির নিষিদ্ধ হয়, চূর্ণ হয় তাদের বাণিজ্যিক সত্তা, ভারত ভূমি থেকে ব্রিটিশ প্রজা বহিস্কৃত রাখার অধিকার তাদের কেড়ে নেওয়া হয়।

ইতিমধ্যে পূর্ব ভারতীয় বাণিজ্যে কতকগুলি গুরুতর বিপ্লব ঘটে, তাতে সে বাণিজ্য প্রসঙ্গে ইংলন্ডের বিভিন্ন শ্রেণিস্বার্থের অবস্থান-ভঙ্গি একেবারে বদলে যায়। গোটা ১৮শ শতক ধরে ভারত থেকে ইংলন্ডে যে ধন প্রেরিত হয় তা অর্জিত হয়েছিল অপেক্ষাকৃত নগণ্য বাণিজ্যের দরুন ততটা নয়, যতটা সে দেশের প্রত্যক্ষ শোষণের দরুন, এবং যে বিপুল ঐশ্বর্য জোর করে আদায় করে ইংলন্ডে পাচার করা হয়েছিল তার দরুন। ১৮১৩ সালে ভারত বাণিজ্য উন্মুক্ত হওয়ার কিছু কাল মধ্যেই তা তিন গুণেরও বেশি বেড়ে ওঠে। কিন্তু এই সব নয়। বাণিজ্যের গোটা চরিত্রই বদলে যায়। ১৮১৩ সাল পর্যন্ত ভারত ছিল প্রধানত রপ্তানিকারী দেশ আর এখন সে হয়ে দাঁড়াল আমদানিকারক, এবং এমন দ্রুত গতিতে যে, ১৮২৩ সালেই যে বিনিময় হার ছিল সাধারণত টাকায় ২ শিঃ ৬ পেঃ তা নেমে গেল ২ শিলিঙে। অবিস্মরণীয় কাল থেকে দুনিয়ার সূতিমালের বৃহৎ কারখানা ভারতবর্ষ এবার ভেসে গেল ইংরেজি টুইস্ট ও সুতিবস্ত্ৰে। ভারতের নিজস্ব উৎপন্নকে ইংলন্ড থেকে বহিস্কৃত করা বা কেবল অতি কঠোর শর্তে প্রবেশানুমতি দেবার পর ব্রিটিশ কারখানা-মাল অল্প এবং নামমাত্র শূল্কে প্লাবিত হতে থাকল। ভারতে যার ফলে তার একদা অতো বিখ্যাত দেশীয় সুতিবস্ত্রের ধ্বংস। ১৭৮০ সালে ব্রিটিশ উৎপন্ন ও কারখানা-মালের মূল্য ছিল মাত্র ৩,৮৬,১৫২ পাঃ, সেই বছরেই রপ্তানি বুলিয়নের পরিমাণ ছিল ১৫,০৪১ পাঃ এবং ১৭৮০ সালে রপ্তানির মোট মূল্য ছিল ১,২৬,৪৮,৬১৬ পাঃ অর্থাৎ ভারত বাণিজ্য ছিল গোটা বৈদেশিক বাণিজ্যের মাত্র ১/৩২ ভাগ। ১৮৫০ সালে গ্রেট ব্রিটেন ও আয়ার্ল্যান্ড থেকে ভারতে রপ্তানির মোট পরিমাণ ছিল ৮০,২৪,০০০ পাঃ, যার মধ্যে শুধু সুতিবস্ত্রের পরিমাণ ৫২,২০,০০০ পাঃ, অর্থাৎ মোট রপ্তানির ১/৮ ভাগের বেশি এবং বৈদেশিক সুতি বাণিজ্যের ১/৪ অংশেরও বেশি। কিন্তু সুতি মাল উৎপাদনেও এখন ব্রিটেনের ১/৮ ভাগ লোক নিযুক্ত এবং তা থেকে আসছে সমগ্র জাতীয় আয়ের ১/১২ ভাগ। প্রত্যেকটা বাণিজ্য সংকটেই পূর্ব ভারতীয় বাণিজ্য ব্রিটিশ সুতি কারখানা মালিকদের পক্ষে হয়ে উঠেছে ক্ৰমেই একান্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং পূর্ব ভারতীয় মহাদেশ হয়েছে আসলে তাদের সেরা বাজার। যে হারে সুতি মাল উৎপাদন হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্রিটেনের গোটা সমাজ কাঠামোর পক্ষে মূল স্বাৰ্থ ঠিক সেই হারেই পূর্ব ভারতও হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্রিটিশ সুতি মাল উৎপাদনের পক্ষে মূল স্বার্থ।

যে টাকা-ওয়ালারা ভারতকে তার ভূসম্পত্তিতে পরিণত করেছে, যে চক্ৰতন্ত্র তাকে জয় করেছে তার সৈন্য দিয়ে আর যে কল-ওয়ালারা তাকে প্লাবিত করেছে তার বস্ত্রে, তাদের স্বাৰ্থ ততদিন পর্যন্ত হাতে হাত দিয়েই চলেছে। কিন্তু শিল্প স্বাৰ্থ যতই ভারতীয় বাজারের ওপর নির্ভরশীল হতে থাকে, ততই ভারতের দেশীয় শিল্প ধ্বংস করার পর ভারতে নতুন উৎপাদনী শক্তি সৃষ্টির প্রয়োজনীয়তা সে অনুভব করতে শুরু করে। তৈরি মাল দিয়ে একটা দেশকে ক্ৰমাগত প্লাবিত করে চলা যায় না, যদি না পরিবর্তে কিছু উৎপন্ন বিনিময় করার সামৰ্থ্য সে দেশকে দেওয়া যায়। শিল্প স্বাৰ্থ দেখল, বাড়ার বদলে বাণিজ্য তাদের কমছে। ১৮৪৬ সাল পর্যন্ত চার বছরে গ্রেট বৃটেন থেকে ভারতে আমদানির পরিমাণ ২৬.১ কোটি টাকা, ১৮৫০ সাল পর্যন্ত পরের চার বছরে সে পরিমাণ মাত্র ২৫.৩ কোটি টাকা, আর প্রথম পর্বে (ভারত থেকে) রপ্তানি ছিল ২৭.৪ কোটি টাকা, পরের পর্বে ২৫.৪ কোটি। তারা দেখল তাদের মাল পরিভোগের ক্ষমতা ভারতে সর্বনিম্ন মাত্রায় সঙ্কুচিত হয়ে এসেছে, অধিবাসীদের মাথা পিছু হিসাবে তাদের মাল পরিভোগের পরিমাণ দাঁড়ায় ব্রিটিশ ওয়েস্ট ইন্ডিজে প্রায় ১৪ শিঃ, চিলিতে ৯ শিঃ ৩ পেঃ, ব্রোজিলে ৬ শিঃ ৫ পেঃ, কিউবায় ৬ শিঃ ২ পেঃ, পেরুতে ৫ শিঃ ৭ পেঃ, মধ্য আমেরিকায় ১০ পেঃ, অথচ ভারতে তা মাত্র ৯ পেঃ । তারপর দেখা দিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ফসলের ঘাটতি, ১৮৫০ সালে যাতে তাদের ক্ষতি হয় ১,১০,০০,০০০ পাঃ, ইস্ট ইন্ডিজ থেকে যথেষ্ট পরিমাণে কাঁচা তুলার জোগান না থাকায় আমেরিকার ওপর নির্বর করতে হচ্ছে বলে তারা ব্যাজার। তাছাড়া তারা দেখল ভারতে পুঁজি ঢালার চেষ্টা করলেই ভারতীয় কর্তৃপক্ষের প্রতিবন্ধকতা ও ঘোর প্যাচের সম্মুখীন হতে হয়। এইভাবে একদিকে শিল্প স্বাৰ্থ এবং অন্যদিকে টাকা-ওয়ালা ও চক্ৰতন্ত্রের দ্বন্দ্বে ভারত পরিণত হলো রণক্ষেত্রে। কারখানা মালিকেরা ইংলন্ডে তাদের ক্রমবর্ধমান আধিপত্যের সচেতনতায় এবার দাবি করছে। ভারতে এই প্রতিবন্ধক শক্তিগুলির ধ্বংস, ভারত শাসনের গোটা সাবেকি ব্যবস্থাটার বিনাশ ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চূড়ান্ত বিলোপ।

এবার চতুর্থ ও শেষ আর একটা দিক থেকে ভারত প্রশ্ন বিচার্য। ১৭৮৪ সাল থেকে ভারতের অর্থসঙ্গতি ক্ৰমাগত সংকটে পড়েছে। বর্তমানে তার জাতীয় ঋণ ৫ কোটি পাঃ, চলেছে। রাজস্বের উৎসগুলির ক্ৰমাগত হ্রাস ও ব্যয়ের তেমনি বৃদ্ধি যা অনিশ্চিতরূপে ঠেকা দেওয়া হয়েছে আফিম করের জুয়াড়ি আয় দিয়ে, বর্তমানে তা আবার চিনাদের নিজস্ব পোস্ত চাষ শুরুতে বিপন্ন, তাছাড়া নিরর্থক ব্ৰহ্ম যুদ্ধের (১৯) আশঙ্কিত খরচায় এ ব্যয় বাড়বে।

মিঃ ডিকিনসন বলছেন, ‘অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে, ভারতের সাম্রাজ্য খোয়া গেলে ইংলন্ড ধ্বংস পাবে বলে সে সাম্রাজ্য রাখার জন্য আমাদের নিজস্ব অর্থসঙ্গতিকেই ধ্বংসে টানা হচ্ছে।’(২০)

এইভাবে দেখলাম, ১৭৮৩ সালের পর ভারতীয় প্রশ্ন কীভাবে এই প্রথম ইংলন্ডের প্রশ্ন, মন্ত্রিসভার প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।

কার্ল মার্কস কর্তৃক ১৮৫৩ সালের সংবাদপত্রের পাঠ অনুসারে

২৪ জুন লিখিত, New-York Daily Tribune পত্রিকার ৩৮১৬ নং সংখ্যায় ১৮৫৩ সালের ১১ জুলাই প্রকাশিত

স্বাক্ষর : কার্ল মার্কস

বিশেষ দ্রষ্টব্য: লেখাটি কার্ল মার্কসফ্রিডরিখ এঙ্গেলস রচিত প্রগতি প্রকাশন মস্কো থেকে প্রকাশিত ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ গ্রন্থ থেকে সংকলিত। এখানে তথ্যসূত্র ও টীকাসমূহ প্রদান করা হয়নি।

আরো পড়ুন

কার্ল মার্কস
বিশ্ব সাম্যবাদী আন্দোলনের মহান বিপ্লবী, সমাজতান্ত্রিক সমাজ বিজ্ঞান ও অর্থনীতির প্রতিথযশা তাত্ত্বিক কার্ল মার্কস (৫ মে, ১৮১৮ – ১৪ মার্চ, ১৮৮৩) প্রুশিয়ার রাইল ল্যান্ড প্রদেশের ট্রিভ্স নামক স্থানে ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দের ৫ মে এক ইহুদী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ১৮৪৭ সালের বসন্তে মার্কস ও এঙ্গেলস ‘কমিউনিস্ট লীগ’ নামে একটি গুপ্ত প্রচার সমিতিতে যোগ দেন। ১৮৪৭ এ নভেম্বরে লন্ডনে অনুষ্ঠিত লীগের দ্বিতীয় কংগ্রেসে তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং কংগ্রেস থেকে দায়িত্ব পেয়ে সুপ্রসিদ্ধ ‘কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার’ রচনা করেন। ১৮৫০-এর দশকের শেষদিক ও ৬০-এর দশকে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পুনরুজ্জীবন মার্কসকে আবার প্রত্যক্ষ কার্যকলাপের মধ্যে টেনে আনে। ১৮৬৪ সালে (২৮ সেপ্টেম্বর) বিখ্যাত আন্তর্জাতিক শ্রমিক সঙ্ঘ— প্রথম আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠিত হয় লন্ডনে। মার্কস ছিলেন এই সমিতির প্রাণস্বরূপ। ১৮৮৩ সালের ১৪ মার্চ আরাম কেদারায় বসে মার্কস নীরবে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

Leave a Reply

Top