You cannot copy content of this page
আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > সংকলন > মার্কস > ভূমি থেকে কৃষিজীবী জনগণের উচ্ছেদ

ভূমি থেকে কৃষিজীবী জনগণের উচ্ছেদ

“ভূমি থেকে কৃষিজনগণের ঢালাও উচ্ছেদের শেষ প্রক্রিয়াটা হলো, ‘মহাল সাফ’, অর্থাৎ মানুষগুলোকে সেখান থেকে ঝোঁটিয়ে দূর করা।”— কার্ল মার্কস

ভূমি থেকে কৃষিজনগণের ঢালাও উচ্ছেদের শেষ প্রক্রিয়াটা হলো, অবশেষে, তথাকথিত ‘মহাল সাফ’, অর্থাৎ মানুষগুলোকে সেখান থেকে ঝোঁটিয়ে দূর করা। এ পর্যন্ত যেসব ইংরেজী পদ্ধতির বিচার করা হয়েছে তার তুঙ্গ বিন্দু হলো ‘সাফ করা’। আগের একটি পরিচ্ছেদে আধুনিক অবস্থার বৰ্ণনায় যা আমরা দেখেছি, যখন উচ্ছেদের মতো স্বাধীন চাষী আর থাকে না, তখন শুরু হয় কুটির ‘সাফ’; ফলে নিজেদের চাষ করা জমিতে নিজেদের বসবাসের মতো একটা জায়গাও ক্ষেতমজুরেরা পায় না। কিন্তু ‘মহাল সাফের সত্য ও সঠিক তাৎপৰ্য্য কী সেটা আমরা জানতে পারি আধুনিক রোমান্সের প্রতিশ্রুত দেশ স্কটল্যান্ডের উচ্চভূমিতে। সেখানে প্রক্রিয়াটার বৈশিষ্ট্য হলো একচোটে তা কার্যকরী করার আয়তন (আয়র্ল্যান্ডে একসঙ্গে কতিপয় গ্রামকে ‘সাফ করার’ মাত্রায় গেছে জমিদাররা; স্কটল্যান্ডে ‘সাফ হচ্ছে’ জার্মান প্রিনসিপ্যালিটিগুলোর মতো বড়ো বড়ো এলাকা), শেষত, তছরুপ করা জমি দখলে রাখার মতো একটা অদ্ভুত মালিকানা প্রথা।

স্কটল্যান্ডের উচ্চভূমির কেলটরা ছিলো কোম অনুসারে সংগঠিত, প্রতিটি কোম যে ভূমিতে বাস করত তার মালিক ছিলো। কোমের প্রতিনিধি, কুলপ্রধান বা ‘মহাশয়’ ছিল কেবল সে সম্পত্তির খেতাবী মালিক, যেমন ইংলন্ডের রাণী হলেন সমস্ত জাতীয় ভূমির খেতাবী মালিক। ইংরেজ সরকার যখন এই সব ‘মহাশয়দের’ অন্তর্যুদ্ধ ও নিম্নের সমভূমিতে তাদের অবিরাম হানা দমন করতে সক্ষম হলো, তখন কোমপতিরা তাদের কালধন্য দস্যুবত্তি মোটেই ত্যাগ করলে না; শুধু তার রূপটা তারা বদলাল। ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকারে, এবং তাতে যেহেতু কোমভুক্তদের সঙ্গে তাদের সংঘাত বাধল, তাই স্থির করল খোলাখুলি শক্তি প্রয়োগ করেই তাদের বিতাড়িত করবে। ‘ইংলন্ডের কোনো রাজাও তাহলে তাঁর প্রজাদের সমুদ্রে তাড়িয়ে দেবার দাবি করতে পারতেন,’ বলেন প্রফেসর নিউম্যান।[২৯] স্কটল্যান্ডে এই যে বিপ্লবটা শুরু হয় দাবিদারের অনগামীদের শেষ অভ্যুত্থানের পর[৩০] তার প্রথম পৰ্যায়গুলো অনুধাবন করা যাবে স্যার জেমস সটুয়ার্ট[৩১] ও জেমস অ্যান্ডারসনের[৩২] লেখায়। ১৮শ শতকে উচ্ছেদ-হওয়া গলদের দেশত্যাগ করা নিষিদ্ধ ছিলো, উদ্দেশ্য ছিলো জোর করে তাদের গ্লাসগো ও অন্যান্য শিল্প শহরে তাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া।[৩৩] ১৯শ শতকে প্রচলিত পদ্ধতির[৩৪] দৃষ্টান্ত হিসেবে সাদারল্যান্ডের ডাচেস যেভাবে ‘সাফ করেছিলেন’ সেটা এখানে দিলেই যথেষ্ট হবে। অর্থনীতিতে ভালো পাঠ নেওয়া এই ব্যক্তিটি তাঁর সম্পত্তির শাসনভার নিয়ে ঠিক করলেন যে একটা আমূল আরোগ্যলাভ ঘটাবেন ও গোটা যে অঞ্চলটার জনসংখ্যা আগেকার অনুরূপ পদ্ধতিতে ১৫,০০০-এ নেমে এসেছিলো তাকে পুরোপুরি মেষ চারণভূমিতে পরিণত করবেন। ১৮১৪ থেকে ১৮২০ সালের মধ্যে এই ১৫,০০০ অধিবাসী, ৩,০০০ পরিবারকে নিয়মিতভাবে হানা দিয়ে নির্মূল করা হয়। ধবংস করা হয় তাদের সমস্ত গ্রাম, তাদের সমস্ত ক্ষেত পরিণত হয় চারণভূমিতে। উচ্ছেদ চালু করে ব্রিটিশ সৈন্যরা, অধিবাসীদের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ বাধে। কুটির ছাড়তে অস্বীকার ক’রে জনৈক বৃদ্ধা তার নিজের কুটিরের আগুনেই পড়ে মরে। এইভাবে এই সুচরিতা মহিলা আত্মসাৎ করলেন ৭,৯৪,০০০ একর জমি যা স্মরণাতীত কাল থেকে ছিলো কোমের হাতে। বিতাড়িত অধিবাসীদের জন্য তিনি সমদ্র উপকূলে ৬,০০০ একর বরাদ্দ করেন, পরিবার পিছু ২ একর। এতদিন পর্যন্ত এই ৬,০০০ একর পতিত পড়েছিলো, তার মালিকদের এ থেকে কোনো আয় হতো না। ডাচেস তাঁর অন্তরের মহত্ত্বে এতদূর গেলেন যে গড়ে একর প্রতি ২ শিলিং ৬ পেনি খাজনায় এগুলো ইজারাই দিয়ে দিলেন সেই কোমের লোকেদের হাতে যারা শতকের পর শতক তার পরিবারের জন্য রক্ত ঢেলেছে। কোমের এই অপহৃত গোটা জমিটা ২৯টা বড়ো বড়ো মেষ খামারে ভাগ করলেন, তার প্রতিটিতে রইল মাত্র একটি করে পরিবার, এবং তারাও বেশির ভাগ হলো বাইরে থেকে আনা ইংরেজ ক্ষেতমজুর। ১৮২৫ সাল নাগাদ ১৫,০০০ গলের জায়গা নিল ১,৩১,০০০ ভেড়া। অধিবাসীদের যে অবশিষ্টরা সমুদ্রতীরে নিক্ষিপ্ত হয়েছিলো তারা মাছ ধরে প্রাণধারণের চেষ্টা করল। উভচরে পরিণত হল তারা, দিন কাটাল, জনৈক ইংরেজ লেখক যা বলেছেন, অর্ধেক মাটিতে অর্ধেক জলে, এবং উভয় ক্ষেত্রেই আধাপেটা।[৩৫]

তথ্যসূত্র ও টিকা

২৯. F. W. Newman, ‘Lectures on Political Economy’, London, 1851, p. 132.

৩০. ১৭৪৫-১৭৪৬ সালের অভ্যুত্থানের কথা বলা হচ্ছে। এ অভ্যুত্থান বাধায় স্টুয়ার্ট রাজবংশের অনুগামীরা; তারা দাবি করে যে চার্লস এডওয়ার্ড, তথাকথিত ‘তরুণ দাবিদার’ ইংলন্ডের সিংহাসনে বসবেন। জমিদারদের শোষণ ও ভূমি থেকে ঢালাও উচ্ছেদের বিরদ্ধে স্কটল্যান্ড ও ইংলন্ডের জনগণের প্রতিবাদও এ অভ্যুত্থানে প্রতিফলিত হয়। ইংরেজ ফৌজ অভ্যুত্থান দমন করার পর স্কটল্যান্ডের উচ্চভূমিতে কোম প্রথা ভেঙে যেতে শুরু করে এবং ‘মহাল সাফ’ আরো প্রচন্ড আকার নেয়। – সম্পাদক

৩১. স্টুয়ার্ট বলছেন: ‘এসব জমির খাজনা’ (কোমভুক্তরা কোমপতিকে যে ভেট দেয়, সেটা ইনি ভুল করে এই অর্থনৈতিক বর্গের অন্তর্ভুক্ত করেছেন) ‘যদি তাদের আয়তনের সঙ্গে তুলনা করা হয়, তাহলে তা খুবই কম বলে মনে হবে। কিন্তু খামারটা কতজন লোককে পুষছে সেটার যদি তুলনা করা হয়, তাহলে দেখা যাবে যে ভালো ও উর্বর অঞ্চলে সমমূল্যের একটি খামারে যত লোক প্রতিপালিত হয়, উচ্চভূমির সম্পত্তিতে হয় সম্ভবত তার দশগুণ।’ (James Steuart, “An Inquiry into the Principles of Political Economy’’, London, 1767, Vol. II., ch. XVI., p. 104.)

৩২. James Anderson, ‘Observations on the Means of Exciting a Spirit of National Industry etc.’, Edinburgh, 1777.

৩৩. ১৮৬০ সালে জোর করে উচ্ছেদ করা লোকদের মিথ্যা ওজর দিয়ে চালান দেওয়া হতো কানাডায়। কিছু লোক পাহাড়ে এলাকায় ও আশেপাশের দ্বীপে পালিয়ে যায়। পুলিস তাদের পিছু নেয়, সংঘর্ষ হয়, তারপর তারা পালায়।

৩৪. অ্যাডাম স্মিথের ভাষ্যকার বুকানান ১৮১৪ সালে বলেন: ‘স্কটল্যান্ডের উচ্চভূমিতে মালিকানার প্রাচীন ব্যবস্থা প্রত্যহ লঙ্ঘিত হচ্ছে … পুরুষানুক্রমিক ইজারাদারের’ (ভুল করে সংজ্ঞাটা দেওয়া হয়েছে) ‘প্রতি দৃকপাত না করে জমিদার এখন জমি দিচ্ছে সর্বোচ্চ খাজনা যে দিতে চাইছে তাকে, আর সে যদি উন্নয়নপন্থী হয়, তাহলে সঙ্গে সঙ্গেই চাষের একটা নতুন পদ্ধতি অবলম্বন করে। আগে জমি ছিল ছোটো ছোটো ইজারাদার বা শ্রমজীবীতে আকীর্ণ, জমির লোকসংখ্যা ছিল তার উৎপন্নের অনুপাতে। কিন্তু উন্নত চাষ ও বর্ধিত খাজনার নতুন প্রথায় যথাসম্ভব বেশি উৎপাদন তোলা হচ্ছে যথাসম্ভব কম খরচে; এবং এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে অপ্রয়োজনীয় লোকদের সরিয়ে দেওয়ায় জনসংখ্যা কমে দাঁড়াচ্ছে জমিটা যত জনকে প্রতিপালিত করতে পারে তত জনে নয়, যত জনকে নিযুক্ত করতে পারে তত জনে। ভূমিচ্যুত প্রজারা হয় আশেপাশের শহরে জীবিকার সন্ধানে যায়…’ ইত্যাদি। (David Buchanan, ‘Observations on etc., A Smith’s Wealth of Nations’, Edinburgh, 1814, Vol. IV., p. 144.) ‘স্কচ অভিজাতরা আগাছা তোলার মতো করে পরিবারগুলোকে তুলে ফেলছে; গ্রাম ও গ্রামবাসীদের সঙ্গে তারা যে ব্যবহার করছে সেটা বন্য পশুর উৎপাতে উত্ত্যক্ত ভারতীয়রা প্রতিশোধ নেবার জন্য বাঘভরা জঙ্গলের ক্ষেত্রে যা করে, তার মতো… মানুষ বিকিয়ে যাচ্ছে ভেড়ার লোম বা মাংসের বিনিময়ে, তার চেয়েও শস্তায়… মোগলদের অভিসন্ধির চেয়েও এটা কত খারাপ, তারা চীনের উত্তরাঞ্চলে ঢুকে পড়ার পর পরিষদে প্রস্তাব দিয়েছিলো যে অধিবাসীদের নির্মূল ক’রে দেশটাকে চারণভূমিতে পরিণত করা হোক। এ প্রস্তাবটাকে বহু উচ্চভূমির মালিক নিজের দেশে এবং নিজ দেশবাসীর বিরুদ্ধে কার্যকর করেছে।’ (George Ensor, ‘An Inquiry concerning the Population of Nations’, London, 1818, pp. 215, 216.)

৩৫. সাদারল্যান্ডের বর্তমান ডাচেস যখন ‘টম কাকার কুটিরের’ লেখিকা মিসেস বিচার-স্টো’কে লন্ডনে প্রচন্ড ঘটা করে অভ্যর্থনা জানিয়ে মার্কিন প্রজাতন্ত্রের নিগ্রো ক্রীতদাসদের জন্য তাঁর সহানভূতি দেখান। — গৃহযুদ্ধের সময় এ সহানভূতিটা তিনি তাঁর সহ-অভিজাতদের সঙ্গে একত্রে বেশ বুদ্ধিমানের মতোই ভুলে গিয়েছিলেন, সে যুদ্ধে প্রতিটি ‘মহৎ’ ইংরেজ হৃদয়ই সপন্দিত হয়েছিল দাসমালিকদের জন্য – তখন আমি New-York Tribune পত্রিকায় সাদারল্যান্ড দাসদের ঘটনাগলো প্রকাশ করি। (কেরি তা অংশত সংক্ষিপ্ত আকারে দিয়েছেন তাঁর ‘The Slave Trade’ , Philadelphia, 1853, pp. 202, 203.) আমার প্রবন্ধটা একটি স্কচ সংবাদপত্রে পুনঃমুদ্রিত হয় এবং খাসা একটু বিতর্ক বাধে পত্রিকাটির সঙ্গে সাদারল্যান্ড মোসায়েবদের।

আরো পড়ুন:  নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব প্রসঙ্গে লেনিনবাদ
কার্ল মার্কস
বিশ্ব সাম্যবাদী আন্দোলনের মহান বিপ্লবী, সমাজতান্ত্রিক সমাজ বিজ্ঞান ও অর্থনীতির প্রতিথযশা তাত্ত্বিক কার্ল মার্কস (৫ মে, ১৮১৮ – ১৪ মার্চ, ১৮৮৩) প্রুশিয়ার রাইল ল্যান্ড প্রদেশের ট্রিভ্স নামক স্থানে ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দের ৫ মে এক ইহুদী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ১৮৪৭ সালের বসন্তে মার্কস ও এঙ্গেলস ‘কমিউনিস্ট লীগ’ নামে একটি গুপ্ত প্রচার সমিতিতে যোগ দেন। ১৮৪৭ এ নভেম্বরে লন্ডনে অনুষ্ঠিত লীগের দ্বিতীয় কংগ্রেসে তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং কংগ্রেস থেকে দায়িত্ব পেয়ে সুপ্রসিদ্ধ ‘কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার’ রচনা করেন। ১৮৫০-এর দশকের শেষদিক ও ৬০-এর দশকে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পুনরুজ্জীবন মার্কসকে আবার প্রত্যক্ষ কার্যকলাপের মধ্যে টেনে আনে। ১৮৬৪ সালে (২৮ সেপ্টেম্বর) বিখ্যাত আন্তর্জাতিক শ্রমিক সঙ্ঘ— প্রথম আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠিত হয় লন্ডনে। মার্কস ছিলেন এই সমিতির প্রাণস্বরূপ। ১৮৮৩ সালের ১৪ মার্চ আরাম কেদারায় বসে মার্কস নীরবে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

Leave a Reply

Top