You cannot copy content of this page
আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > সংকলন > এঙ্গেলস > কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার, সমালোচনা — কল্পলৌকিক সমাজতন্ত্র ও কমিউনিজম

কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার, সমালোচনা — কল্পলৌকিক সমাজতন্ত্র ও কমিউনিজম

— কার্ল মার্কস ও ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস

সমাজতন্ত্রী ও কমিউনিস্ট সাহিত্য

৩. সমালোচনা— কল্পলৌকিক সমাজতন্ত্র ও কমিউনিজম

আধুনিক যুগের প্রতিটি বড় বড় বিপ্লবে যে সাহিত্য প্রলেতারিয়েতের দাবিকে ভাষা দিয়েছে, যেমন বাব্যেফ ও অন্যান্যদের রচনা, আমরা এখানে তার উল্লেখ করছি না।

সামন্ত সমাজ যখন উচ্ছেদ হচ্ছে তখনকার সর্বজনীন উত্তেজনার কালে নিজেদের লক্ষ্যসিদ্ধির জন্য প্রলেতারিয়েতের প্রথম সাক্ষাৎ প্রচেষ্টাগুলি অনিবার্য্যভাবেই ব্যর্থ হয়, কারণ প্রলেতারিয়েত তখন পর্যন্ত সুবিকশিত হয় নি, তার মুক্তির অনুকূল অর্থনৈতিক অবস্থাও তখন অনুপস্থিত। তেমন অবস্থা গড়ে উঠতে তখনও বাকি, আসন্ন বুর্জোয়া যুগেই কেবল তা গড়ে ওঠা সম্ভব ছিলো। প্রলেতারিয়েতের এই প্রথম অভিযানসমূহের সঙ্গী ছিলো যে বিপ্লবী সাহিত্য তার প্রতিক্রিয়াশীল একটা চরিত্র থাকা ছিলো অনিবার্য। সে সাহিত্য প্রচার করত সর্বব্যাপী কৃচ্ছসাধন, স্থূল ধরনের সামাজিক সমতা।

প্রকৃতপক্ষে যাকে সমাজতন্ত্রী ও কমিউনিস্ট মতাদর্শ বলা চলে, অর্থাৎ সাঁ-সিমোঁ, ফুরিয়ে, ওয়েন ইত্যাদির মতবাদ, জন্ম নিল প্রলেতারিয়েত এবং বুর্জোয়ার সংগ্রামের সেই অপরিণত যুগে, যার বর্ণনা আগে দেওয়া হয়েছে[১]।

এই জাতীয় মতের প্রতিষ্ঠাতারা শ্রেণি-বিরোধ এবং প্রচলিত সমাজব্যবস্থার বিধ্বংসী উপাদানগুলির ক্রিয়াটা দেখেছিলেন। কিন্তু প্রলেতারিয়েত তখনও তার শৈশবে; এদের চোখে বোধ হলো সে শ্রেণির নিজস্ব ঐতিহাসিক উদ্যম এবং স্বতন্ত্র রাজনৈতিক আন্দোলন নেই।

শ্রেণি-বিরোধ বাড়ে যন্ত্রশিল্প প্রসারের সঙ্গে সমান তালে; সেদিনের অর্থনৈতিক অবস্থা তাই তখনো এদের সামনে প্রলেতারিয়েতের মুক্তির বৈষয়িক শর্তগুলি তুলে ধরে নি। সুতরাং এরা খুঁজতে লাগলেন সে শর্ত সৃষ্টি করার মতো নূতন সমাজবিজ্ঞান, নূতন সামাজিক নিয়ম।

তাঁদের ব্যক্তিগত উদ্ভাবন-ক্রিয়াকে আনতে হলো ঐতিহাসিক ক্রিয়ার স্থানে। মুক্তির ইতিহাস-সৃষ্ট শর্তের বদলে কল্পিত শর্ত, প্রলেতারিয়েতের স্বতঃস্ফুর্ত শ্রেণি-সংগঠনের বদলে উদ্ভাবকদের নিজেদের বানানো এক সমাজ-সংগঠন। তাদের কাছে মনে হলো ভবিষ্যত ইতিহাস তাঁদেরই সামাজিক পরিকল্পনার প্রচার ও বাস্তব রূপায়ণ।

পরিকল্পনা প্রস্তুত করার সময় সর্বাধিক নিগৃহীত শ্রেণি হিসাবে প্রধানত শ্রমিক শ্রেণির স্বার্থ রক্ষার চেতনা তাঁদের ছিলো। তাঁদের কাছে প্রলেতারিয়েতের অস্তিত্বই ছিলো কেবল সর্বাধিক নিগৃহীত শ্রেণি হিসাবে।

শ্রেণিসংগ্রামের অপরিণত অবস্থা এবং তাঁদের স্বকীয় পরিবেশের দরুন এই ধরনের সমাজতন্ত্রীরা মনে করতেন যে তাঁরা সকল শ্রেণি-বিরোধের বহু ঊর্ধ্বে। তাঁরা চেয়েছিলেন সমাজের প্রত্যেক সদস্যের, এমন কি সবচেয়ে সুবিধাভোগীর অবস্থাও উন্নত করতে। সেইজন্য সাধারণত শ্রেণি নির্বিশেষে গোটা সমাজের কাছে আবেদন জানানো; এমন কি তুলনায় শাসক শ্রেণির কাছেই আবেদন-নিবেদন ছিলো এদের পছন্দ। কেননা, এদের ব্যবস্থাটা একবার বুঝতে পারলে লোকে কেমন করে না দেখে পারবে যে এইটাই সমাজের সর্বোত্তম-সম্ভব ব্যবস্থার জন্য সর্বোত্তম-সম্ভব পরিকল্পনা?

সেইজন্য সকল রাজনৈতিক, বিশেষত সকল বিপ্লবী প্ৰচেষ্টাকে এরা বর্জন করলেন; এদের অভিলাষ হলো শান্তিপূর্ণ উপায়ে নিজেদের উদ্দেশ্যসাধন; চেষ্টা হলো দৃষ্টান্তের জোরে, এবং যার ভাগ্যে ব্যর্থতাই অনিবাৰ্য এমন ছোটখাট পরীক্ষার মাধ্যমে নূতন সামাজিক বেদের (Gospel) পথ কাটতে।

ভবিষ্যত সমাজের এ ধরনের উদ্ভট ছবি আঁকা হয় এমন সময়ে যখন প্রলেতারিয়েত অতি অপরিণত অবস্থার মধ্যে ছিলো, নিজেদের অবস্থান সম্পর্কে তাদের ধারণাও ছিলো উদ্ভট; সমাজের ব্যাপক পুনর্গঠন সম্বন্ধে এ শ্রেণির প্রাথমিক স্বতঃস্ফুর্ত আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে এ ধরনের ছবির মিল দেখা যায়।

কিন্তু সমাজতন্ত্রী ও কমিউনিস্ট এই সব লেখার মধ্যে সমালোচনামূলক একটা দিকও আছে। বর্তমান সমাজের প্রত্যেকটি নীতিকে এরা আক্রমণ করল। তাই শ্ৰমিক শ্রেণির জ্ঞানলাভের পক্ষে অনেক অমূল্য তথ্যে তা পরিপূর্ণ। শহর ও গ্রামাঞ্চলের মধ্যে প্রভেদ, পরিবার প্রথা, ঘোষণা, রাষ্ট্রের কাজকে কেবলমাত্র উৎপাদনের তদারকে রূপান্তরিত করণ ইত্যাদি যেসব ব্যবহারিক প্রস্তাব এই লেখার মধ্যে আছে তাদের সবকটাই শ্ৰেণি-বিরোধের অন্তর্ধানের দিকেই কেবল অঙ্গুলি নির্দেশ করে, অথচ সে বিরোধ সেদিন সবেমাত্র মাথা তুলছিল, এই সব লেখার মধ্যে ধরা পড়েছিলো তাদের আদি অস্পষ্ট অনির্দিষ্ট রূপটুকু। প্রস্তাবগুলির প্রকৃতি তাই নিতান্তই কল্পলৌকিক।

সমালোচনামূলক-কল্পলৌকিক সমাজতন্ত্র ও কমিউনিজমের যা তাৎপর্য তার সঙ্গে ঐতিহাসিক বিকাশের সম্বন্ধটা বিপরীতমুখী। আধুনিক শ্রেণিসংগ্রাম যতই বিকশিত হয়ে সুনির্দিষ্ট রূপ নিতে থাকে, ঠিক ততই এই উদ্ভট সংগ্রাম-পরিহারের, শ্রেণিসংগ্রামের বিরুদ্ধে এইসব উদ্ভট আক্রমণের সকল ব্যবহারিক মূল্য ও তাত্ত্বিক যুক্তি হারায়। সেইজন্যই, এই সমস্ত মতবাদের প্রবর্তকের অনেক দিক দিয়ে বিপ্লবী হলেও তাঁদের শিষ্যরা প্রতিক্ষেত্রে কেবল প্ৰতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীতেই পরিণত হয়েছে। প্রলেতারিয়েতের প্রগতিশীল ঐতিহাসিক বিকাশের বিপরীতে তারা নিজ নিজ গুরুর আদি মতগুলিকেই আঁকড়ে ধরে আছে। তাই তাদের অবিচল চেষ্টা যেন শ্রেণিসংগ্রাম নিস্তেজ হয়ে পড়ে, যেন শ্রেণি-বিরোধ আপসে মিটে যায়। তারা এখনও তাদের সামাজিক কল্পলৌকিক পরীক্ষামূলক রূপায়ণের স্বপ্ন দেখে; বিচ্ছিন্ন ফালানস্টের প্রতিষ্ঠা, ‘হোম কলোনি’ স্থাপন, ‘ছোট আইকেরিয়া’[২] প্রবর্তনের স্বপ্ন দেখে, নব জেরুজালেমের ক্ষুদ্ৰাদপি ক্ষুদ্র সংস্করণ হিসাবে,— আর এই আকাশকুসুম বাস্তব করার জন্য আবেদন জানায় বুর্জোয়া শ্রেণির সহানুভূতি ও টাকার থলির কাছে। আগে যে প্রতিক্রিয়াপন্থী বা রক্ষণশীল সমাজতন্ত্রীদের বর্ণনা করা হয়েছে এরা ধীরে ধীরে নেমে যায় সেই স্তরে; তফাৎ শুধু তাদের আরও প্রণালীবদ্ধ পাণ্ডিত্যে, এবং সমাজবিদ্যার অলৌকিক মাহাত্যে অন্ধ ও সংস্কারাচ্ছন্ন বিশ্বাসে।

শ্রমিক শ্রেণির সমস্ত রাজনৈতিক প্রচেষ্টার এরা তাই তীব্ৰ বিরোধী, এদের মতে সে প্রচেষ্টা কেবলমাত্র নব বেদে অন্ধ অবিশ্বাসের ফল।

ইংল্যান্ডে ওয়েনপন্থীরা এবং ফ্রান্সে ফুরিয়েভক্তরা যথাক্রমে চার্টিস্ট (৩)  ও সংস্কারবাদীদের (৪) বিরোধী ।

টীকা

১. প্রথম অধ্যায় ‘বুর্জোয়া ও প্রলেতারিয়েত’ দ্রষ্টব্য

২. ‘ফালানস্টের’ হলো ফুরিয়ের কল্পিত সমাজতন্ত্রী উপনিবেশ; কাবে তাঁর ইউটোপিয়া এবং পরবতী আমেরিকাস্থিত কমিউনিস্ট উপনিবেশকে আইকেরিয়া নাম দেন। (১৮৮৮ খ্রীস্টাব্দের ইংরেজী সংস্করণে এঙ্গেলসের টীকা।) ওয়েন তাঁর আদর্শ কমিউনিস্ট গোষ্ঠীগুলিকে ‘হোম কলোনি’ বলতেন; ফুরিয়ের কল্পিত সর্বভোগ্য প্রাসাদের নাম ‘ফালানস্টের’। যে ইউটোপীয় কল্প রাজ্যের কমিউনিস্ট প্রতিষ্ঠান কাবে বর্ণনা করেছিলেন, তারই নাম ‘আইকেরিয়া’। (১৮৯০ খ্রীস্টাব্দের জার্মান সংস্করণে এঙ্গেলসের টীকা।)

৩. ১. চাৰ্টিস্টরা হচ্ছেন ১৯ শতকের চতুর্থ দশক থেকে ষষ্ঠ দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত গ্রেট ব্রিটেনে শ্রমিকদের রাজনীতিক আন্দোলনে অংশগ্রহীরা। কঠিন আর্থনীতিক অবস্থা এবং রাজনীতিক অধিকারহীনতার ফলেই এই আন্দোলন শুরু হয়। এই আন্দোলনের শ্লোগান ছিল ‘গণ-চার্টার’ কার্যে পরিণত করার জন্যে সংগ্রাম। ‘চাটার’-এ ছিল সর্বজনীন ভোটাধিকার এবং কয়েকটা শর্তের দাবি, যা শ্রমিকদের জন্যে ঐ অধিকার সুনিশ্চিত করবে। লেনিন বলেছেন, চাৰ্টিজম হল ‘প্রথম ব্যাপক, সত্যিকার সর্বজনীন, বৈপ্লবিক প্রলেতারীয় আন্দোলন যার ছিল রাজনীতিক আকার।

৪. Reformme পত্রিকার অনুগামীদের কথা বলা হচ্ছে, এরা প্রজাতান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং গণতান্ত্রিক ও সামাজিক সংস্কারের প্রচার করত । La Reforme ছিলো ফরাসী দৈনিক সংবাদপত্র, পেটি বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রীদের মুখপত্র। ১৮৪৩ থেকে ১৮৫০ পর্যন্ত প্যারিসে প্রকাশিত হয়েছিল। ১৮৪৭ খ্ৰীস্টাব্দের অক্টোবর ও ১৮৪৮ খ্রীস্টাব্দের জানুয়ারীর মধ্যে এঙ্গেলস এ পত্রিকায় একাধিক প্ৰবন্ধ লেখেন।

পড়ুন কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহারের অংশ সমাজতন্ত্রী ও কমিউনিস্ট সাহিত্য এই লিংক থেকে

কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহারের সূচিপত্রে যান এই লিংক থেকে

Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই “পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি” প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১০টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর “সমাজতন্ত্র” ও “মার্কসবাদ” গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন “বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা” নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top