Main Menu

সংস্কৃতির স্বরূপ প্রসঙ্গে

সংস্কৃতি বা কৃষ্টি (ইংরেজি: Culture) হচ্ছে মানুষের সর্বপ্রকার বৈষয়িক এবং আত্মিক সৃজন ও সম্পদের ব্যাপক অর্থবহ শব্দ। অনেক সময় সাহিত্য, শিল্প, দর্শন, সামাজিক আচরণ ও নীতি—অর্থাৎ মানুষের ভাবগত সৃষ্টিকর্মকে কেবল সংস্কৃতি বলে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু মানুষের সৃষ্টির সম্পূর্ণ অর্থে আর্থিক ও কারিগরি সৃজন কর্ম এবং তার ফসল অর্থাৎ উৎপাদনের যন্ত্র, কলকারখানা এবং উৎপাদিত বৈষয়িক সম্পদ ও সৌধকেও একটা মানব সমাজের সংস্কৃতি হিসাবে গণ্য করা উচিত। পার্থক্য হিসাবে ভাবগত সৃষ্টিকে ‘আত্মিক সংস্কৃতি এবং দেহগত সৃষ্টিকে বৈষয়িক সংস্কৃতি বলে চিহ্নিত করা চলে। কিন্তু এরূপ পৃথকীকরণও কেবলমাত্র আপেক্ষিকভাবে স্বীকার্য। আত্মিক ও বৈষয়িক সংস্কৃতির মধ্যে কোনো চরম পার্থক্য বা বিরোধের অবকাশ নাই। কোনো আত্মিক সংস্কৃতি দেহ এবং বৈষয়িক অবস্থা-নিরপেক্ষভাবে সৃষ্টি হতে পারে না। আবার কোনো বৈষয়িক কর্মই মনের কল্পনা বাদে সাধিত হতে পারে না।

সংস্কৃতি হচ্ছে সামাজিক সৃষ্টি। সামাজিক সম্পর্কের ভিত্তিতে মানুষের ব্যক্তিগত এবং যৌথ ক্রিয়া-কাণ্ডের ফলে এর উদ্ভব। এ কারণে সমাজ-সংগঠনের বিশিষ্ট রূপ দ্বারা সমাজের সংস্কৃতির রূপ প্রধানত নির্দিষ্ট হয়। এক সমাজ থেকে আর এক সমাজের সংস্কৃতি এই ভিত্তিতেই পৃথক হয়। আর্থিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে মানুষের সমাজের ইতিহাস শ্রেণীভেদের অবস্থাহীন আদিম সাম্যবাদী সমাজ এবং তারপরে শ্রেণীভেদ-সম্পন্ন দাস সমাজ, সামন্তবাদী সমাজ এবং পুঁজিবাদী সমাজ হিসাবে এ পর্যন্ত বিভক্ত হয়েছে। এই পর্যায় মানুষের সংস্কৃতির ইতিহাসকেও দাস সমাজের সংস্কৃতি, সামন্ত সমাজের সংস্কৃতি ও পুঁজিবাদী সমাজের সংস্কৃতি বলে চিহ্নিত করা হয়। এক একটা সমাজের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলির ভিত্তিতে সংস্কৃতির এই পরিচয়। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, দাস বা সামন্ততান্ত্রিক বা পুঁজিতান্ত্রিক সংস্কৃতি বলতে তার অভ্যন্তরে বৈচিত্র, বিরোধ এবং বিভিন্নতাশূন্য একটি অখণ্ড সৃষ্টিকে বুঝায়।

লেনিন তার ‘প্রলেতারীয় সংস্কৃতি প্রসঙ্গে’ প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন বুর্জোয়া যুগের ভাবাদর্শ ও সমাজতান্ত্রিক যুগের ভাবাদর্শ এক নয়।  কিন্তু মার্কসবাদি দৃষ্টি থেকে দেখলে  বুর্জোয়া বা পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার সুকৃতিকে গ্রহণ করতে হবে। তিনি লিখেছেন, 

‘বিপ্লবী প্রলেতারিয়েতের ভাবাদর্শ হিসাবে মার্কসবাদ বিশ্ব-ঐতিহাসিক তাৎপর্য অর্জন করেছে এই জন্য যে, মার্কস কখনোই বুর্জোয়া যুগের মূল্যবান সুকৃতিকে বিসর্জন দেয় নি, বরং উলটে, মানব চিন্তা ও সংস্কৃতির দুই সহস্রাধিক বছরের বিকাশের মধ্যে যা কিছ, মূল্যবান ছিলো তাকে আত্মস্থ করেছে ও ঢেলে সেজেছে। এই ভিত্তিতেই ও এই ধারাতেই, সর্ববিধ শোষণের বিরুদ্ধে প্রলেতারিয়েতের শেষ সংগ্রামস্বরপ তার একনায়কত্বের ব্যবহারিক অভিজ্ঞতায় অনুপ্রাণিত হয়ে আরো যে কাজ চলবে, তাকেই সত্যকার প্রলেতারীয় সংস্কৃতির বিকাশ বলে স্বীকার করা যায়।’

দাস সমাজে প্রভু এবং দাসের মধ্যে যে বিরোধ, সে বিরোধ প্রভুশ্রেণীর এবং দাসের বৈষয়িক ও মানসিক কর্মকাণ্ডেও প্রতিফলিত। সামন্ততান্ত্রিক সমাজেও অনুরূপ। পুঁজিতান্ত্রিক সমাজেও উৎপাদনের হাতিয়ারের ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত মালিকানা, উৎপাদনের যৌথ প্রক্রিয়া এবং উৎপাদিত সম্পদের ভোগ থেকে অধিকাংশকে বঞ্চিত রাখার ব্যবস্থায় যে শ্রেণীগত বিরোধ, দর্শনকোষ বৈষম্য, সংঘাত এবং ভাবভাবনার সৃষ্টি হয় তার প্রতিরূপ পুঁজিবাদী সমাজের সংস্কৃতি, বিশেষ করে তার আত্মিক সৃষ্টির ক্ষেত্রে প্রকাশ পায়। সমাজতান্ত্রিক সমাজে অর্থাৎ যে সমাজে উৎপাদনের ক্ষেত্রে মানুষ শোষক এবং শোষিত হিসাবে বিভক্ত নয়, সে সমাজের সংস্কৃতিতে মৌল কোনো আর্থিক সংঘাতের প্রতিফলনের অবকাশ নাই। কিন্তু সমাজতান্ত্রিক সমাজের সংস্কৃতিও বৈচিত্রহীন নয়। বিরোধাত্মক বৈচিত্র্যের স্থানে সমাজতান্ত্রিক সংস্কৃতির বৈচিত্র্য সাধিত হয় সমাজের বিভিন্নমুখী উন্নতি সাধনের বিচিত্র সৃজনকর্মের মাধ্যমে।

আলোকচিত্রের ইতিহাস: নিবন্ধে ব্যবহৃত আলোকচিত্রটি পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড ও উড়িষ্যায় জনপ্রিয় ছৌ নাচের দৃশ্য। ফটোটি তুলেছেন Ujjal.das84 CC-BY-SA-4.0.

তথ্যসূত্র:

১. সরদার ফজলুল করিম; দর্শনকোষ; প্যাপিরাস, ঢাকা; জুলাই, ২০০৬; পৃষ্ঠা ১১৯-১২০।

২. লেনিন রচনাটি লেখেন ৮ই অক্টোবর, ১৯২০ তারিখে। এখানে ভি. আই. লেনিনের বই সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক বিপ্লব, প্রগতি প্রকাশন মস্কো, ১৯৭১, পৃষ্ঠা ৯৮-১০০ থেকে নেয়া হয়েছে।






Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *