আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > জ্ঞানকোষ > সিপিআই (এম) মার্কসবাদ-লেনিনবাদ, সাম্য ও স্বাধীনতাবিরোধী গণশত্রুদের পার্টি

সিপিআই (এম) মার্কসবাদ-লেনিনবাদ, সাম্য ও স্বাধীনতাবিরোধী গণশত্রুদের পার্টি

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) বা কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (মার্কসবাদী) বা সিপিআই (এম) বা সিপিএম (ইংরেজি: Communist Party of India (Marxist) ভারতের একটি মার্কসবাদ-লেনিনবাদ, গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও সাম্যবিরোধী একটি রাজনৈতিক দল। ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দের জুন মাস অবধি নতুন সি পি আই (এম) ও পুরানাে সিপিআই দলের পূর্বের ইতিহাস ছিল একই। জুলাই মাসে তেনালিতে নতুন দল আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত হয়। পুরানাে অবিভক্ত দলের বহু বিশিষ্ট নেতা নতুন দলে যােগদান করেন। তাঁদের পুরানাে দল থেকে সাসপেন্ড করা হয়। শতকরা ৩০ থেকে ৪০ জন অবিভক্ত দলের সদস্য নতুন দলে যােগ দেন। ওই সময় ত্রিচুরে এক ভাষণে ই এম এস নামবুদ্রিপাদ বলেন যে পুরানাে নেতৃত্বে মার্কসীয় শ্রেণিসংগ্রামের পরিবর্তে শ্রেণি সমন্বয়ের আদর্শ রূপায়িত হচ্ছিল বলে দলে ভাঙন ধরে।[১]

১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর-নভেম্বরে কলকাতায় অনুষ্ঠিত সপ্তম কংগ্রেসে নতুন কোনও মতাদর্শগত প্রশ্ন তুলে ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে মস্কোয় অনুষ্ঠিত বিশ্বের ৮১টি দেশের পার্টিসমূহের সম্মেলনে বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনের ঐক্য বজায় রাখার প্রশ্নে গুরুত্ব আরােপ করা হয়। মধ্যপন্থীদের বাম পক্ষে টানার প্রচেষ্টাকালে নামবুদ্রিপাদ পার্টির দক্ষিণপন্থীদের অতি বেশি চীনবিরােধী মনােভাবের নিন্দা করেন। ১৯৬৪ সালের কলকাতা কংগ্রেসেই অবিভক্ত পার্টির সর্বভারতীয় সম্মেলনে (১৯৫১) গৃহীত কর্মসূচি পালটে ‘বুর্জোয়া-জমিদার রাষ্ট্র ও সরকার’-এর অপসারণের উদ্দেশ্যে জনগণতন্ত্রিক ফ্রন্ট গড়ার নীতি গৃহীত হয়। স্থির হয়, গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদপুঁজিবাদবিরােধী যে সব শক্তি আত্মপ্রকাশ করবে, কেবল তাদের নিয়েই ফ্রন্ট গড়া হবে। কর্মসূচি রচনার আগে বি টি রণদিভেকে আহ্বায়ক করে একটি কমিশন গঠিত হয়।

১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দের সাধারণ নির্বাচনে সিপিআই (এম) দলের অংশ গ্রহণের ফলে দলের দলের কমিউনিস্টরা রুষ্ট হন। তাঁরা চেয়েছিলেন সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে শাসনক্ষমতা দখল। পশ্চিমবঙ্গে ১৯৬৭ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠিত হবার পর দার্জিলিং জেলার তিন জায়গায় ভূমিহীন কৃষকদের বিদ্রোহে সিপিআই (এম) সচকিত হয়ে ওঠে। পার্টির মধ্যে নকশালপন্থী নামে অভিহিত একটি সশস্ত্র বিপ্লবকামী উপদল গড়ে ওঠে। গণশত্রু জ্যোতি বসু ছিলো তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, তার নির্দেশেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ বেপরোয়া গুলি চালায়। নারী শিশুসহ মারা যান মোট এগারো জন।

২০০৭ সালের ১৪ মার্চ সিঙ্গুরে পুলিশের সঙ্গে স্থানীয় গ্রামবাসীদের সংঘর্ষে সিপিআই (এম) নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট সরকার হত্যা করে চৌদ্দ জন। এছাড়াও আছে বিজন সেতু গণহত্যা, যা ঘটে ১৯৯০ সালের এপ্রিলে, হত্যা করা হয় ১৭ জনকে।  সবচেয়ে বড় গণহত্যা যা ১৯৭৯ সালে মরিচঝাপিতে ঘটে, যেখানে সংখ্যাটি ১৫০ থেকে ১৫০০ জনও হতে পারে। এই গণহত্যাগুলোর ঘটনাগুলো মূলত ঘটে ব্রাহ্মণ্যবাদী এবং জমিদারতন্ত্রীদের জমি ও ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে। সিঙ্গুরে টাটাকে জমি দিতে গেলে কৃষকরা রুখে দাঁড়ায়। প্রায় ৩০ বছর ক্ষমতায় থেকেও আঞ্চলিক কাঁচামালনির্ভর কোনো কারখানা না গড়ে টাটার মাধ্যমে এই সিপিআই (এমের) গণশত্রুরা ন্যানো গাড়ির কারখানা বানাতে গণহত্যায় মেতে উঠে।

কেরলেও ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বরে কুন্নিকল নারায়ণন ও তাঁর কন্যা অজিথা উইনাদ পার্বত্য অঞ্চলে একটি বিপ্লবী ঘাঁটি গড়ে তােলেন। উভয় রাজ্যেই সিপিআই (মার্কসবাদী) প্রধান সরকার কমিউনিস্ট ও সমাজতন্ত্রীদের দমন এবং গণহত্যায় তৎপর হয়ে ওঠে। কমিউনিস্ট নাম বাদ দিয়ে নিজেদের বামপন্থী হিসেবে পরিচয় দিতে শুরু করে।

১৯৬৯ খ্রি পাটির বর্ধমান প্লেনামে মতাদর্শগত প্রথম দলিলে সমাজতন্ত্রী রাষ্ট্রের প্রথম বৈশিষ্ট্য হিসেবে সর্বহারার একনায়কত্বের আদর্শ তুলে ধরা হয়। পরবর্তী কংগ্রেসগুলিতে সে আদর্শ বজায় থাকে, তবে কাগজেই। সর্বহারার একনায়কত্বের কায়েম তো বহুদূর, কংগ্রেসের একনায়কত্ব কায়েম রাখতে সব সময় কংগ্রেসের হত্যা, খুন, গুমের পক্ষে দাড়িয়েছে সকল সময়।

১৯৭০-৭৭ সাল পর্যন্ত ইন্দিরা গান্ধীর সকল গণহত্যার পক্ষে দাঁড়ায় সিপিআই (এম)। ইন্দিরা সরকার সিপিএম-এর প্রায় হাজারখানেক নেতা-কর্মিকে ১৯৭০-৭৭ সালে হত্যা করা সত্ত্বেও জ্যোতি বসুর সরকার কংগ্রেসের বিচার না করে উলটা কংগ্রেস সরকারকে সমর্থন জুগিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে সিপিআই (এম)-এর অগ্রগতি রোধ করতে গোয়েন্দা সংস্থা “র”-এর ব্যবস্থাপনায় চক্রান্ত করা হয়। এই চক্রান্তে কংগ্রেস দলকে দুবার টাকা দেয় সিআইএ।[২] এই ঘটনারও বিচার করেনি সিপিআই (এম) ও জ্যোতি বসু। উলটে কংগ্রেস সরকারকে ক্ষমতায় রাখতে মরিয়া সংগ্রাম চালায় সিপিএম।

১৯৯২ সাল থেকে পরিচালিত কংগ্রেস চালিত সকল সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় কংগ্রেসের পক্ষে দাঁড়ায় এই সাম্প্রদায়িক সংগঠনটি। সিপিআই (এম) কংগ্রেসের সমস্ত অপকর্মের সহযোদ্ধা, যেমন ২০১২ সালেও কংগ্রেসকে ক্ষমতায় রাখার মরিয়া চেষ্টা করেছে। গণশত্রু প্রকাশ কারাত অক্টোবর ২০১২ সালেও বলে যে, সিপিএম “ইউপিএ সরকারের পতন চায় না। সরকার ভেঙে নির্বাচনে যেতেও চায় না।”[৩]

১৯৭২ খ্রি সামান্য সংশােধন ছাড়া দলের কর্মসুচির কোনও পরিবর্তন হয়নি। অবশ্য ১৯৭০-৭১ খ্রিস্টাব্দে তৃণমূল স্তরে মেহনতি মানুষের ফ্রন্ট গঠন এবং ১৯৭৫ খ্রি জয়প্রকাশ নারায়ণের নেতৃত্বে ভ্রষ্টাচার বিরােধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে যােগদানের কর্মসূচি গৃহীত হয়। ১৯৭৮ খ্রি ডিসেম্বরে হাওড়ায় সালকিয়ার প্লেনমে দলের সাংগঠনিক বিষয়াদি প্রাধান্য পায়। ১৯৮১ খ্রি বিজয়ওয়াদায় একাদশ পার্টি কংগ্রেস থেকে ১৯৮৫ খ্রি কলকাতায় দ্বাদশ কংগ্রেস পর্যন্ত পার্টির সদস্য সংখ্যা সারা দেশে প্রায় নব্বই হাজারে পৌঁছয়।

সােভিয়েত ইউনিয়নের আমূল পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে ১৯৯২ খ্রি জানুয়ারিতে পার্টির মাদ্রাজ কংগ্রেসে মূল কর্মসুচি পুনর্মূল্যায়নের জন্য একটি কমিশন গঠন করা হয়েছে।

১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দে চণ্ডীগড়ে অনুষ্ঠিত পার্টির পঞ্চদশ কংগ্রেস এই অভিমত প্রকাশ করে যে বিশ্বে কেন্দ্রীয় দ্বন্দ্ব হিসাবে সমাজতন্ত্র ও সাম্রাজ্যবাদের দ্বন্দ্ব যথারীতি বিদ্যমান; মার্কসবাদ পূর্বের মতই প্রাসঙ্গিক রয়েছে; প্রয়ােগে পার্থক্য থাকতে পারে। জাতীয় ক্ষেত্রে (১) অর্থনৈতিক, (২) জাতীয় ঐক্য, (৩) বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন ও (৪) দুর্নীতিকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অবক্ষয় স্বরূপ চ্যালেঞ্জ হিসাবে দেখা হয়। সিদ্ধান্ত হয় যে বাম ও ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির সমাবেশের মধ্য দিয়ে কংগ্রেস ও সাম্প্রদায়িক শক্তি সমূহকে কোণঠাসা করা হবে। বি জে পি এবং কংগ্রেসের দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জের মােকাবিলা এবং উভয় শক্তির বিরুদ্ধে শ্রমিক, কৃষক, পেটি বুর্জোয়া এবং একচেটিয়া নয় এমন বুর্জোয়া শ্রেণির মৈত্রী গঠন করা কর্তব্য। দ্বিতীয়ত, বাম ও গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের অন্তর্বর্তীকালীন কৌশলগত স্লোগান থেকে শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বে জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের স্তরে উত্তরণের কর্মসূচি অনুসরণ, যার চালিকাশক্তি হবে শ্রেণী সংগ্রাম।[১] 

চণ্ডীগড় কংগ্রেসের জাতীয় ক্ষেত্রে গৃহীত বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা সরাসরি লেনিনবাদের লঙ্ঘন। লেনিন যেখানে বলছেন যে, “বিচ্ছেদের স্বাধীনতা ছাড়া স্বাধীন মিলন মিথ্যা কথা” সেখানে সিপিএম বিচ্ছেদের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। যারা বিচ্ছেদের স্বাধীনতা মানে না লেনিন তাদেরকে “সমাজতন্ত্রের প্রতি বেইমান”[৪] বলে সম্বোধন করেছেন। সমাজতন্ত্রের প্রতি বেইমান, মার্কসবাদ-লেনিনবাদের শত্রু, জাতীয়তাবাদী-হিন্দুত্ববাদী সিপিএমের পতনকে এগিয়ে নেয়া প্রতিটি গণতান্ত্রিক মানুষের সামাজিক কর্তব্য।

দ্রষ্টব্য: ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি; জনগণতন্ত্র

তথ্যসূত্র:

১. গঙ্গোপাধ্যায়, সৌরেন্দ্রমোহন. রাজনীতির অভিধান, আনন্দ পাবলিশার্স প্রা. লি. কলকাতা, তৃতীয় মুদ্রণ, জুলাই ২০১৩, পৃষ্ঠা ৭৫-৭৬।

২. মৃণালকান্তি দাস, ষড়যন্ত্রের নেপথ্যে সিআইএ, ন্যাশনাল বুক এজেন্সি প্রাইভেট লিমিটেড, প্রথম প্রকাশ জানুয়ারি ২০১১, পৃষ্ঠা ২৮০।

৩. কলকাতা প্রতিনিধি, দৈনিক প্রথম আলো আর্কাইভ, “ইউপিএ সরকারের বিরুদ্ধে মমতা অনাস্থা আনলে সিপিআই সমর্থন দেবে।” ১৬ অক্টোবর ২০১২, http://archive.prothom-alo.com/detail/news/298214

৪. ভি আই লেনিন, “সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ও জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার”, থিসিস, প্রথম অনুচ্ছেদ, জুলাই ১৯১৬, ইংরেজি বাক্যটি এমন “the basis of a free union and a free union is a lying phrase without right to secession”.

আরো পড়ুন:  মোগল সাম্রাজ্য ছিল দক্ষিণ এশিয়ার সামন্তবাদনির্ভর এক জনবিরোধী প্রাচীন সাম্রাজ্য
Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই “পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি” প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১০টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর “সমাজতন্ত্র” ও “মার্কসবাদ” গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন “বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা” নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top
You cannot copy content of this page