আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > জ্ঞানকোষ > স্বৈরতন্ত্র প্রসঙ্গে

স্বৈরতন্ত্র প্রসঙ্গে

গ্রিক ভাষার ডেসপটিস কথার অর্থ স্বৈরতন্ত্র (Despotism)। প্রাচীন আমলে কথাটির অর্থ ছিলো পরিবার অথবা ক্রীতদাসদের মালিক বা প্রভু। কথাটি ক্রীতদাস সদৃশ জনগণের একচ্ছত্র শাসকের প্রতি এবং বর্তমানে যথেচ্ছাচারী স্বৈরতন্ত্রী সরকারের ক্ষেত্রে প্রযুক্ত হয়; বিশেষ করে যে সরকার কার্যত কোনো আইন, বিরোধী-পক্ষ অথবা প্রথা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় না; ফলে ক্ষমতাসীনেরা যখন ও যেখানে ইচ্ছা অপরের অধিকার খর্ব করতে পারে। ইংরেজী অভিধানে স্বৈরতন্ত্রকে “একজন স্বৈরশাসকের শাসন, পরম কর্তৃত্বের অনুশীলন”[১] হিসাবে নির্ধারণ করে।

মঁতেসকু তাঁর ‘স্পিরিট অব লজ’ (১৭৪৮) গ্রন্থে স্বৈরতন্ত্রের বিশ্লেষণ প্রসঙ্গে লিখেছেন যে এই ধারায় ক্ষমতা ব্যক্তিবিশেষ, সংগঠন অথবা রাজনৈতিক প্রতিনিধির হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে। ক্ষমতার কেন্দ্রানুগতা ব্যক্তিবিশেষের হাতে নাও থাকতে পারে; একটি সংস্থাধীনে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকা সম্ভব। মূল গ্রিক অর্থানুসারে শাসিত মানুষের মধ্যে কোনো তারতম্য থাকে না। মঁতেসকু ক্ষমতার পৃথকীকরণ চেয়েছিলেন এই ধারণায় যে স্বৈরতন্ত্র যতটা সম্ভব বিভক্ত হয়ে মানুষের কাছে সহনশীল হবে।[২]

স্বৈরতন্ত্রে বিরোধীপক্ষ থাকে না, তার অবস্থান আইনের উর্ধ্বে। কোনো কোনো রাষ্ট্রচিন্তায় সদাশয় ব্যক্তির স্বৈরতন্ত্রের কথা বলা হয়, যিনি একচ্ছত্র অধিকারপ্রাপ্ত নৃপতি। তিনি মানুষের কল্যাণে তাঁর সর্বাধিক ক্ষমতা ব্যবহার করেন। জনগণের সার্বভৌমত্ব ও শ্রেণিহীন সাম্যের ভিত্তিতে তকভিল গণতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্রের এক প্রস্তাব করেন ১৮৫৬ সালে, যেখানে জনসাধারণের কোনো ক্ষমতা নেই, তাদের হয়ে শক্তিধর ও সদিচ্ছাসম্পন্ন জনৈক প্রতিনিধি লোকের মতামত ব্যতিরেকে তাদের কল্যাণ বিধান করেন ।[৩]

ভারতীয়, অটোমান এবং চীনা সাম্রাজ্যে প্রাচ্য স্বৈরতন্ত্র সম্পর্কে মার্কস লিখেছেন। ফ্রাঁসোয়া বার্নিয়েরের লেখা, মন্টেস্কু এবং হেগেলের যুক্তি, এবং এঙ্গেলসের বিশ্লেষণসমূহ মার্কস খেয়াল করে সিদ্ধান্ত টেনেছিলেন। প্রাচ্যের বিশেষ ধরনের অর্থনৈতিক প্রকৃতি, বিশেষভাবে সম্পত্তির মালিকানা সংক্রান্ত স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকের দৃষ্টিকে মার্কস তুলে ধরেন এবং উল্লেখ করেছেন যে “শ্রমপরায়ণ পিতৃতান্ত্রিক ও নিরীহ সামাজিক সংগঠনগুলি … … শান্ত-সরল গ্রাম-গোষ্ঠীগুলি যতই নিরীহ মনে হোক, প্রাচ্য স্বৈরাচারের তারাই ভিত্তি হয়ে এসেছে চিরকাল … , হরণ করেছে তার সমস্ত কিছু মহিমা ও ঐতিহাসিক কর্মদ্যোতনা।”[৪] এইভাবে প্রাচ্য স্বৈরতন্ত্র এবং স্বৈরতন্ত্র তার নখর রাষ্ট্র ও শোষণ উদ্ভবের কাল থেকে জনগণকে নিপীড়নের হাতিয়ার হয়েছে।

তথ্যসূত্র ও টিকা:

১. “The definition of despotism” dictionary.com. সংগৃহীত ১০ জুলাই, ২০১৮. http://www.dictionary.com/browse/despotism

২. সৌরেন্দ্রমোহন গঙ্গোপাধ্যায়, রাজনীতির অভিধান, আনন্দ পাবলিশার্স প্রা. লি. তৃতীয় মুদ্রণ, জুলাই ২০১৩, পৃষ্ঠা ৩১৫

৩. পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ৩১৫।

৪. কার্ল মার্কস, ভারতে ব্রিটিশ শাসন, ১০ জুন ১৮৫৩, কার্ল মার্কস ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস নির্বাচিত রচনাবলী, তৃতীয় খণ্ড, বারো খণ্ডে, প্রগতি প্রকাশন মস্কো, ১৯৭৯, পৃষ্ঠা ১৪২।

রচনাকাল: ২৩-২৪ মার্চ, ২০১৮।

আরো পড়ুন

Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই “পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি” প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১০টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর “সমাজতন্ত্র” ও “মার্কসবাদ” গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন “বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা” নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top