You cannot copy content of this page
আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > জ্ঞানকোষ > মৈত্রীর স্বরূপ এবং ব্যক্তি বিচ্ছিন্নতার উৎস

মৈত্রীর স্বরূপ এবং ব্যক্তি বিচ্ছিন্নতার উৎস

সামাজিক শ্রেণির ভেতরের মানুষগুলো যখন নানা উদ্দেশ্যে একত্রিত হয়, সংগঠন গড়ে তোলে, চিন্তার আদান-প্রদান করে, সংগঠনের কর্মসূচি প্রণয়ন করে তখন তাদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ, ভ্রাতৃত্ব, বন্ধুত্ব, ঐক্য, সংহতি ইত্যাদি গড়ে ওঠে। দর্শনের আলোচনায় মৈত্রী (Fraternity) হচ্ছে প্রেম আর সংহতির ভিত্তিতে জনগণের ভেতর এক ধরনের নৈতিক সম্পর্ক। শিল্প, সংস্কৃতি, নৈতিকতা, দান, দক্ষতা ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে মৈত্রী গড়ে ওঠে। মৈত্রীকে ফ্রান্স ও হাইতি প্রজাতন্ত্রের জাতীয় মূলমন্ত্রের অর্থাৎ স্বাধীনতা, সাম্য ও মৈত্রী’র একটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

ধর্মীয়, সরকারি, রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক বা পারিবারিক বন্ধনের বাইরে কিছু মানুষের কোনো সামাজিক, সেবামূলক, পেশাগত উদ্দেশ্যমুখী ঐক্যকে মৈত্রী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ভ্রাতৃত্ব [Brotherhood] বা সৌভ্রাতৃত্ব মূলত একটি ধর্মীয় ভাবধারাযুক্ত শব্দ। এর দ্বারা গোষ্ঠীবদ্ধ সমাজে ভাইকে বোঝানো হলেও একেশ্বরবাদী ধর্মগুলো দুনিয়ার দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়লে খ্রিস্টীয়, মুসলিম, হিন্দু বা অন্যান্য ধর্মীয় মানুষের ভ্রাতৃত্বকে বোঝানো হয়।

এই ভ্রাতৃত্ব ও মৈত্রীই সামন্তবাদী যুগ ভেঙে পড়ার পর পুঁজিবাদী সমাজের আবির্ভাবের প্রথমদিকের সংগঠন গড়ে উঠার ক্ষেত্র তৈরি করে। ভ্রাতৃত্বমূলক সংগঠন থেকেই ইয়োরোপে গিল্ড চালু হয়। পরে আসে নানারকম বন্ধুত্বমূলক সামাজিক সংগঠন। ফরাসি বিপ্লবে মৈত্রীর চেতনা শক্তিশালী রূপ ধারণ করে। পারস্পরিক যোগাযোগ ও সাংগঠনিক প্রয়োজনে মৈত্রী প্রতিষ্ঠিত হয়। পেশাগত ভিন্নতা আধুনিক বড় বড় নগরগুলোতে নাগরিকদেরকে মৈত্রীমূলক সংগঠন গড়তে সহায়তা করে। বের হয়ে আসে ফরাসি বিপ্লবের ও গণতন্ত্রের এই ভিত্তিটি। কিন্তু পুঁজিবাদের মূলনীতি ব্যক্তিগত মালিকানার সাথে মৈত্রীর দ্বন্দ্বটির সমাধান হয় না। ব্যক্তিগত মালিকানার উৎখাত করে সমাজের সদস্যদের সাথে মৈত্রীর সম্পর্কটি তাই সমাজতন্ত্রের আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে পড়ে।

উনিশ বিশ শতকের মালিকশ্রেণি ও শাসকেরা বিচ্ছিন্নতাকে মহিমান্বিত করার প্রক্রিয়াটি বাদ দেয় না। সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনগুলোর বিরুদ্ধে শাসকগোষ্ঠী নানাভাবে বিচ্ছিন্নতা ও বিযুক্তিকে কাজে লাগায়। জনগণকে পরস্পরের থেকে দূরে সরানোর জন্য পুঁজিবাদ পরস্পরের মাঝে দেয়াল গড়ে, ব্যক্তিকে বিচ্ছিন্ন করে, জনগণের নিজেদের চারিদিকে খোলস তৈরি করার উপাদান সরবরাহ করে ব্যক্তিবাদচর্চায় উৎসাহিত করে। বিচ্ছিন্নতা পুঁজিবাদের ধ্বজা। শেকসপিয়ারের নাটকের সব ভিলেনরাই ব্যক্তিবাদের চূড়ান্ত প্রতিনিধি। শেকসপিয়ারের চোখে পাপের অর্থই সমষ্টি বিরোধিতা।[১]

পুঁজিবাদ চায় মানুষ বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো, খড়কুটো-ধূলিকণা-বালুকণার মতো একাকি নিঃসঙ্গ হয়ে রাষ্ট্রে বাস করুক। পুঁজিবাদ চায় না মানুষের মধ্যে যৌথশক্তি বেড়ে উঠুক। পুঁজিবাদ চায়, সবকিছু হোক ব্যক্তিগত, সব সম্পদ হোক ব্যক্তিগত। নদী, পাহাড়, সমুদ্র, জল, জলাশয়, আকাশ, বাতাস ইত্যাদি অনেক কিছু যা যৌথ ছিলো সব কিছুকেই পুঁজিবাদ ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত করতে চায়।

মৈত্রী বলতে আমরা আদিম গোষ্ঠীবদ্ধ সমাজের পারস্পরিক নির্ভরশীলতা, সহযোগিতা ও সহমর্মিতা বুঝতে পারি। ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস তাঁর পরিবার ব্যক্তিগত মালিকানা ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি গ্রন্থে মৈত্রী নিয়ে কিছুটা আলোচনা করেছেন। সামজিক জীব হিসেবে মানুষ পরস্পরের সংগে সামাজিকভাবে সংযুক্ত। এঙ্গেলস লিখেছেন, সভ্যতার

“পূর্ববর্তী সকল স্তরে সমাজের উৎপাদন ছিল মূলত সমষ্টিগত এবং সেইমত ভোগ দখলও হতো সাম্যবাদী ছোট বড় গোষ্ঠীর মধ্যে উৎপন্ন দ্রব্যাদি প্ৰত্যক্ষভাবে বন্টন করে। এই সমষ্টিগত উৎপাদন অত্যন্ত সঙ্কীর্ণ গণ্ডির মধ্যে চলত, কিন্তু সেই সঙ্গে উৎপাদকরা তাদের উৎপাদন প্রক্রিয়া এবং উৎপন্ন বস্তুর মালিক ছিলো। তারা জানতো উৎপন্ন দ্রব্য কোথায় গেল, তারা নিজেরাই ভোগ করতো, ঐ জিনিস তাদের হাতছাড়া হতো না; এবং যতদিন উৎপাদন এই ভিত্তিতে চলে, ততদিন তা উৎপাদকদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে পারে না এবং তাদের বিরুদ্ধে কোনো বিজাতীয় ভৌতিক শক্তিও দাঁড় করাতে পারে না, যা নিয়মিত এবং অনিবাৰ্য হয়ে উঠেছে সভ্যতার যুগে।

কিন্তু ধীরে ধীরে উৎপাদনের এই প্রক্রিয়ার মধ্যে শ্রমবিভাগ ঢুকে পড়লো। এতে উৎপাদন ও দখলির সমষ্টিগত প্রকৃতি ক্ষুন্ন হলো, এতে ব্যক্তিগত দখলই প্রাধান্য লাভ করল এবং এইভাবে বিভিন্ন ব্যক্তির মধ্যে বিনিময়ের উদ্ভব হলো, … … ক্রমশ পণ্য উৎপাদনই হয়ে পড়ে প্রধান রূপ।”[২]

এইভাবে মৈত্রী ও ভ্রাতৃত্ববোধ সভ্যতা আরম্ভ হবার সাথে সাথে কমতে থাকে, যা পুঁজিবাদী সমাজে ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যের নামে বিলুপ্ত করে দেয়া হয়েছে। এর বিপরীতে সাম্যবাদীগণ চেষ্টা করেছেন মানুষের ভেতরে মৈত্রী গড়ে তোলার। লুই হেনরি মর্গানের কথায় আমাদেরকে জানাতে পারে মৈত্রী কীভাবে মানবসমাজে ফিরে আসতে পারে। মর্গান লিখেছেন, এঙ্গেলস যেই উদ্ধৃতি তাঁর বইয়ের সবশেষ অনুচ্ছেদে দিয়েছেন,

“সম্পত্তির আহরণ যার একমাত্ৰ লক্ষ্য সেই ঐতিহাসিক পর্বের পতন হিসাবে সমাজের বিলুপ্তি অবধারিত, কারণ এই পর্বের মধ্যেই নিহিত তার নিজ ধ্বংসের বীজ। সরকারের ক্ষেত্রে গণতন্ত্র, সমাজের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব, অধিকার ও সুবিধার ক্ষেত্রে সাম্য এবং সর্বজনীন শিক্ষা পবিত্র করে তুলবে সমাজের পরবর্তী উচ্চতর স্তরটিকে যেদিকে মানুষের অভিজ্ঞতা, বুদ্ধি ও জ্ঞান অবিচলিত এগোচ্ছে। সেটা হবে উচ্চতর রূপে প্রাচীন গোত্রগুলির স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের পুনরুজ্জীবন৷”[৩]

পুঁজিবাদী সমাজের বিচ্ছিন্নতা ও বিযুক্তির বিপরীতে গণতন্ত্র আর সমাজতন্ত্রের একটি নীতিরূপে কিছু দার্শনিকের কাছে সামাজিক জীব হিসেবে পুরনো সামাজিকতার চিন্তাটিই আসে মৈত্রীরূপে। কার্ল মার্কস শ্রমিকদের পারস্পরিক মৈত্রী ও ভ্রাতৃত্ববোধের উপর গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন। ১৮৬৪ সালের ২৮ অক্টোবর গোটা দুনিয়ার শ্রমিক শ্রেণির মুক্তির জন্য তিনি প্রথম আন্তর্জাতিক গঠন করেন এবং সেইদিনের উদ্বোধনী ভাষণে উল্লেখ করেন যে, ‘অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গিয়েছে, ভ্রাতৃত্বের যে বন্ধন বিভিন্ন দেশের শ্রমিকদের মধ্যে থাকা উচিত ও তাদের মুক্তি সংগ্রামে পরস্পরের জন্য একযোগে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে অনুপ্রাণিত করা উচিত সেই ভ্রাতৃত্ব বন্ধনের প্রতি অবহেলা তাদের বিচ্ছিন্ন প্রচেষ্টাগুলিকে’ সাফল্যের মুখ দেখতে পারে না। শ্রমিক শ্রেণির সাফল্য নির্ভর করে তাঁদের সারা দুনিয়ার শ্রমিক শ্রেণির ঐক্যে। তিনি আরো উল্লেখ করেন যে এই ঐক্য অর্জিত হতে পারে কেবল বুর্জোয়া শ্রেণির একনায়কত্বাধীন রাষ্ট্রসমূহে যে ‘পররাষ্ট্র নীতি জাতিগত কুসংস্কার ব্যবহার করছে, দস্যু-যুদ্ধে জনগণের রক্ত ও সম্পদ অপচয় করছে, সেই নীতি’কে[৪] ধ্বংস করেই। ফলে সমস্যাটির সমাধান রয়েছে সমাজের পরবর্তী উচ্চতর স্তর সাম্যবাদে।

তথ্যসূত্রঃ

১. উৎপল দত্ত, শেকসপীয়রের সমাজচেতনা।

২. ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস, পরিবার ব্যক্তিগত মালিকানা ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি, শেষ অধ্যায়, শেষাংশ, অনুচ্ছেদ ২

৩. পূর্বোক্ত, শেষ অধ্যায়, শেষাংশ, শেষ অনুচ্ছেদ।

৪. কার্ল মার্কস, শ্রমজীবী মানুষের আন্তর্জাতিক সমিতির উদ্বোধনী ভাষণ, ২৮ অক্টোবর, ১৮৬৪,  

Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই “পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি” প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১০টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর “সমাজতন্ত্র” ও “মার্কসবাদ” গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন “বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা” নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top