আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > জ্ঞানকোষ > ব্যক্তিবাদ বা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ কাকে বলে

ব্যক্তিবাদ বা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ কাকে বলে

ব্যক্তিবাদ বা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ (ইংরেজি: Individualism) প্রত্যয়টির মর্মার্থ হলো হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত অবাধ ব্যক্তিসত্তা। ব্যক্তিস্বাতন্ত্রে রাষ্ট্র ব্যক্তিমানুষকে স্বাধীনভাবে চলতে দেয়। এই মতবাদে সমাজজীবনের কেন্দ্রবিন্দু হলো মানুষ। মানুষের স্থান যাবতীয় বিষয়ের উর্ধ্বে । রাষ্ট্রের কাজ হলো ব্যক্তিমানুষকে হিংসা ও বঞ্চনা থেকে রক্ষা করা; তার জীবনকে কোনও ভাবে নিয়ন্ত্রণ না করা। মানুষের জীবনে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ অনুচিত। এই মতবাদের মূল উদ্দেশ্য হলো ব্যক্তিস্বাধীনতাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দান এবং তাতে রাষ্ট্রের ন্যূনতম হস্তক্ষেপ।

ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদীদের দৃষ্টিতে রাষ্ট্রের ভূমিকা হলো যাবতীয় বিপদ-আপদ, পারস্পরিক বিরোধ, সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি এবং চুক্তির লঙ্ঘন থেকে নাগরিকদের নিরাপত্তা বিধান। তার বাইরে মানুষের সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক কোনও ব্যাপারেই রাষ্ট্রের অনুপ্রবেশ বাঞ্ছিত নয়। বাক্তিস্বাতন্ত্রবাদীদের দৃষ্টিতে মানুষের সৃজনশীল শুভসত্তার স্বাধীন বিকাশের পক্ষে রাষ্ট্র এক অশুভ অন্তরায়।

ব্যক্তিস্বাতন্ত্রের উৎপত্তি ঘটে সামাজিক চুক্তি তত্ত্বগুলি থেকে। তবে সেটা ছিল অনেকাংশে বিমূর্ত। অষ্টাদশ শতকে স্বৈরতন্ত্রী ও পরমবাদী রাজতন্ত্রী সরকারের নিরন্তর নিপীড়ন-দৃষ্টে রাষ্ট্রদার্শনিকেরা ব্যক্তিমানুষের স্বাধীন সত্তার উপর গুরুত্ব দিতে শুরু করেন। ফ্রান্সে অবাধ বাণিজ্য নীতির প্রবক্তা ফিজিওক্রাট নামে অভিহিত অর্থনীতিবিদরা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদকে তার আদিপর্বে অর্থনৈতিক ব্যঞ্জনা প্রদান করেন। তাঁরা সমকালীন মার্কেন্টাইলিস্ট নামক অর্থনীতিবিদদের সরকারি নিয়ন্ত্রণমূলক আর্থিক বিধিব্যবস্থার মতবাদকে নাকচ করে দেন।

ফিজিওক্র্যাটদের বাক্তিস্বাতন্ত্রবাদী অবাধ বাণিজ্যের মতবাদ ক্রমে সারা ইউরোপে প্রভাব বিস্তার করে। অ্যাডাম স্মিথ (১৭২৩-৯০) প্রমুখ ইংরেজ অর্থনীতিবিদ মতবাদটিকে পরিপুষ্ট করেন। কিন্তু সামাজিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের তাত্ত্বিক ভিত্তি প্রস্তুত করেন জন স্টুয়ার্ট মিল, হাবার্ট স্পেনসার প্রমুখ রাষ্ট্রদার্শনিকেরা। আলোকিত শতাব্দীর (ইউরোপীয় এনলাইটেনমেন্ট) অনুষঙ্গী বাণী ছিল ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ। ব্যক্তিস্বাধীনতার উপাদানে গড়ে ওঠে উদারনৈতিক মতবাদ

গোড়ায় ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ যতই জনপ্রিয়তা লাভ করে থাকুক না কেন, কালক্রমে সেটা ক্ষুন্ন হতে শুরু করে। অর্থনৈতিক সংকট, বেকার সমস্যা, জনগণের ক্রমবর্ধিষ্ণু দুর্গতির ফলে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা থেকে গোষ্ঠীকেন্দ্রিকতার দিকে ঝোঁকে। সমষ্টিবাদী নানা মতবাদও বেড়ে ওঠে। একনায়কতন্ত্রী রাষ্ট্রের দাপটে ব্যক্তিস্বাধীনতা অস্তমিত হয়। ফলে ভারসাম্য সুরাহার পথ খোঁজার প্রয়াস দেখা দেয়।

ব্যক্তিমানুষের জীবন, ও মননের স্বাধীন বিকাশের প্রসঙ্গ রাষ্ট্রদর্শনে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের এক মস্ত অবদান। সেইসঙ্গে একথাও উল্লেখ্য যে চরম ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের ফলে মানুষ স্বার্থপর, আত্মকেন্দ্রিক, অসামাজিক ও সংকীর্ণচিত্ত হয়ে পড়ে। কাজেই মানুষের স্বাধীন বিকাশের প্রয়োজন যেমন থাকে, তেমনি সামাজিক জীব হিসেবে মানুষের সঙ্গে সমাজের পারস্পরিক দায়দায়িত্ব অপরিহার্য। সমাজই অধিকার সৃষ্টি করে এবং উপযোগী পরিবেশে তার বিকাশ ঘটায়। সামাজিক সম্পর্কেই মানুষকে জানা যায়। রাষ্ট্র সমাজের একটি কার্যনিবাহী অঙ্গ। ব্যক্তিমানুষের স্বার্থ, উদ্যম ও নিরঙ্কুশ বিকাশের স্বাধীনতা অব্যাহত রেখে সমষ্টিগত স্বার্থ, চাহিদা, প্রয়োজন ও সমস্যাদির ভারসাম্য বিধিবিধানের ও প্রশাসনিক কার্যনিবাহের সঙ্গে রাষ্ট্রের সুসমঞ্জস ভূমিকা থাকা বাঞ্ছনীয়।

তথ্যসূত্র:

১. গঙ্গোপাধ্যায়, সৌরেন্দ্রমোহন. রাজনীতির অভিধান, আনন্দ পাবলিশার্স প্রা. লি. কলকাতা, তৃতীয় মুদ্রণ, জুলাই ২০১৩, পৃষ্ঠা ২১৫-২১৬।

আরো পড়ুন

Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই “পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি” প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১০টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর “সমাজতন্ত্র” ও “মার্কসবাদ” গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন “বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা” নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top