Main Menu

নারীবাদ— যশোধরা বাগচী

নারীবাদের (ইংরেজি: Feminism) কোনো একক সংজ্ঞা আজকের দুনিয়ায় দেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু তার গোড়ার কথার মধ্যে যদি প্রবেশ করবার চেষ্টা করি, তাহলে হয়ত নারীবাদ সম্পর্কে আমাদের ধারণা একটু স্বচ্ছ হতে পারে। পশ্চিম ইউরোপে বুর্জোয়া শ্রেণির অভ্যুত্থানের মধ্যেই আজকের নারীবাদের বীজ নিহিত আছে। বুর্জোয়া শ্রেণি যে ধনতান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থার ওপরে দাঁড়িয়েছিল, তার শ্রমবিভাজনের রূপটি ছিল লিঙ্গভিত্তিক অর্থাৎ বুর্জোয়া মতাদর্শ অনুসারে পুরুষের জন্য বরাদ্দ হলো বাইরের জগতের উৎপাদনমুখী ভূমিকা। এই ভূমিকাকে মুখ্য ভূমিকা বলে স্বীকার করে নেওয়াটাকেও স্বাভাবিক মনে করা হয়েছিল। আর মেয়েরা তার পরিপূরক হিসাবে পেল অন্দরমহলে প্রজননমুখী ভূমিকা। সন্তানপালন, পরিচর্যা মারফত প্রতিদিন জীবনের নবীকরণ, এই হলো বুর্জোয়া সমাজে স্বীকৃত নারীর সামাজিক ভূমিকা। এখানে উৎপাদনের তুলনায় প্রজনন হয়ে রইল গৌণ। সেজন্যই এই সমাজব্যবস্থার উদ্ভবের প্রায় দেড়শ বছর পরে ১৯৪৯ সালে ফরাসি দার্শনিক সিমোন দ্য বোভোয়া নারীর সামাজিক অবস্থানকে Second Sex (দ্বিতীয় শ্রেণিভুক্ত) বলে অভিহিত করলেন প্রতিবাদী স্বরে।

এই প্রতিবাদ অবশ্য আগে থেকেই উচ্চারিত হচ্ছিল। বুর্জোয়া চিন্তাবিদদের মধ্য থেকে আঠার শতকের বুদ্ধিজীবী মেরি উলস্টোনক্রাফট এবং উনিশ শতকে জন স্টুয়ার্ট মিল মেয়েদের শিক্ষার ও জ্ঞানের আলো থেকে বঞ্চিত করে অন্দরমহলে আটকে রাখার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন। এঙ্গেলস ব্যক্তিগত মালিকানাতে পরিবার ও রাষ্ট্রের উৎস সন্ধানে নারীর বিশ্ব-ঐতিহাসিক পরাজয়ের কথা উল্লেখ করে সমাজতান্ত্রিক নারীবাদের গোড়াপত্তন করেন।

নারীর সমানাধিকারের জন্য ওয়াশিংটন ডিসিতে মিছিল, ১৯৭০

পশ্চিমে এইসব কণ্ঠস্বর আবার নতুন করে শোনার এবং শোনানোর প্রবণতা দেখা দিল উনিশ শতকের ষাটের এবং সত্তরের দশকে—যখন ইউরোপ ও আমেরিকাতে নারীবাদের ঢেউ আছড়ে পড়ল। এই সময় থেকেই নারীবাদ সম্পর্কে মানুষ সচেতন হতে শুরু করল ।

বিশ্বযুদ্ধোত্তর পৃথিবীতে ধনতন্ত্র যখন সামাজিক স্বাচ্ছন্দ্য ফিরিয়ে আনতে মরিয়া তখন দেখা গেল মেয়েরা রয়ে গেছে দারুণ বৈষম্যের শিকার। কাজের জগতে তাদের স্বীকৃতি কিছুই বাড়েনি, বরং কমেছে। সৃজনশীল শিল্পে তাদের জন্য ধরা থাকে এক ইচ্ছাকৃত এবং সম্মিলিত বিস্মৃতি।

ইতিহাসে নারীর ভূমিকা সম্পর্কে উল্লেখ থাকে না, সাহিত্যে নারীচিত্রণ প্রায়শই হয় পুরুষের যৌনতার শিকার। বাজারি সভ্যতার প্রধান বাহক যে গণমাধ্যম সেখানে মেয়েদের চিত্রায়ণ ক্রমশ অবদমিত হয়ে পুরুষের লালসার ইন্ধন জোগায়। মেয়েদের ওপরে হিংসাত্মক আচরণের স্বরূপটিও সুখকর নয়। পরিবারের মধ্যে স্বাভাবিকতার মুখোশ পরে অত্যাচার করা হয় নারী ও শিশুদের। নারী আন্দোলন এই নতুনভাবে দেখার রীতিগুলিকে আন্দোলনের কাজে লাগায় ।

সচেতনভাবে নারীবাদ যখন অতীতের দিকে ফিরে তাকায় তখন পিতৃতন্ত্রের স্বরূপ উন্মোচিত হয় ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে। মতাদর্শগত ভিত্তিকে আশ্রয় করে যেসব নারীবাদ গড়ে উঠেছিল, বিভিন্ন নামে তাদের অভিহিত করা হয়, যেমন, উদারনৈতিক নারীবাদ (Liberal Feminism), সমাজবাদী নারীবাদ (Socialist Feminist)। যে নারীবাদ পিতৃতন্ত্রকেই একটি স্বতন্ত্র শোষণ ব্যবস্থা বলে মনে করে তাকে র‍্যাডিকাল নারীবাদ নামে চিহ্নিত করা হয়েছে। র‍্যাডিকাল নারীবাদ অনেকাংশে পুরুষবিরোধী।

তবে নারীর স্বীকৃতির লড়াই নিয়ে এই বিভিন্ন মতাবলম্বী নারীবাদের মধ্যে সাযুজ্য রয়েছে যথেষ্ট, যতই এগুলিকে আপাতবিরোধী মনে হোক না কেন। যেমন ভিন্ন ভিন্ন দিক থেকে দেখলেও বেশিরভাগ নারীবাদী মনে করেন মেয়েদের শরীর বিশেষ করে তাদের প্রজননক্ষমতা ও যৌনতার ওপরে তাদের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ আরো অনেক বেশি বাড়ানো প্রয়োজন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি এবং কাজের অধিকার ও তার স্বীকৃতি এইসব ক্ষেত্রেই তার প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত হওয়াটা সমাজের ন্যায়বোধের পরিপন্থী। এরফলে উন্নয়ন লক্ষ্যচ্যুত।

নারীবাদের উৎপত্তি পশ্চিমি শ্বেতাঙ্গ সমাজের মধ্যে হওয়া সত্ত্বেও এর উপযোগিতা আজকে সমাজের শোষিত অংশের মধ্যে বহুলস্বীকৃত। দাসপ্রথা দিয়ে শ্বেতাঙ্গ আমেরিকানরা যে গরিব খেটে খাওয়া কৃষ্ণাঙ্গ সম্প্রদায়কে চরম অবহেলার জীবনের দিকে ঠেলে দিয়েছে, তার বিরুদ্ধে সবচেয়ে কঠিন প্রতিবাদ এসেছে কৃষ্ণাঙ্গ নারীবাদের মধ্য থেকে যাদের মধ্যে নোবেল জয়ী ট্যেনি মরিসন অন্যতম। তেমনি পশ্চিমি সাম্রাজ্যবাদী শোষণের ফলে যে তৃতীয় বিশ্বের উদ্ভব হয় সেখানেও সমাজ, পরিবার এবং সাম্প্রতিককালে বাজারের শোষণের বিচিত্র বীভৎস চেহারা বেরিয়ে এসেছে নারীবাদী বিশ্লেষণের মাধ্যমে। শিল্পী-সাহিত্যিক, সমাজবিজ্ঞানী, গণমাধ্যমের প্রতিবাদী কর্মী, সকলেই সামিল এই কর্মযজ্ঞে।

যে নারী পৃথিবীর দুই-তৃতীয়াংশ কাজ করে এক-তৃতীয়াংশ স্বাচ্ছন্দ্যভোগ করে (যার মধ্যে আবার শ্রেণি এবং ধর্মীয় অনুশাসনের জন্য বেশিরভাগ নারী বঞ্চিত) তার স্বীকৃতি এবং সমানাধিকারের লড়াইয়ের নাম নারীবাদ। মনে রাখতে হবে নারী এবং পুরুষ সমান মানে তারা এক নয় এবং পুরুষের অধিকার বেশি বলে কিন্তু তারা-ই মনুষ্যজাতির আদল নয়। অর্থাৎ নারীকে নারী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে নারীর অর্জিত – ক্ষমতার বিশেষ দিকগুলি নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে নারীবাদ অনেকাংশে সাহায্য করেছে।

বিভিন্ন মতাদর্শ থেকে গড়ে ওঠা নারীবাদ আজকের চিন্তাজগতে বিশেষ ফলপ্রসূ হয়েছে। কিন্তু ব্যক্তিজীবনের কষ্টিপাথরে এর শেষ যাচাই। নারীবাদের অন্যতম শ্লোগান। Personal is Political—নারীবাদী চেতনা ব্যক্তিকে বাদ দিয়ে সম্ভব নয়।

তথ্যসূত্র:

১. সুধীর চক্রবর্তী; বুদ্ধিজীবীর নোটবই, নবযুগ প্রকাশনী, বাংলাবাজার, ঢাকা, প্রথম সংস্করণ ফেব্রুয়ারি ২০১০, পৃষ্ঠা, ৩৩৪-৩৩৫।

আরো পড়ুন

জন্ম ৮ জানুয়ারি ১৯৮৯। বাংলাদেশের ময়মনসিংহে আনন্দমোহন কলেজ থেকে বিএ সম্মান ও এমএ পাশ করেছেন।

তাঁর প্রকাশিত প্রথম কবিতাগ্রন্থ স্বপ্নের পাখিরা ওড়ে যৌথ খামারে । বিভিন্ন সাময়িকীতে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া শিক্ষা জীবনের বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে রোদ্দুরে ডট কমের সম্পাদক।






Related News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *