Main Menu

নারী মুক্তি আন্দোলন প্রসঙ্গে

পুরুষতন্ত্রের বা  পিতৃশাসনের অবসান ঘটিয়ে এবং নারীদের পুরুষদের মতো সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাজে অংশ গ্রহণ ও সুবিধা ভোগ করার অধিকার নিয়ে যে আন্দোলন হয় তাই নারী-মুক্তি আন্দোলন। ফরাসি বিপ্লবের সময় থেকেই নারীরা অংশ গ্রহণ করে সমাজ পরিবর্তনের আন্দোলনে। সেই সময় থেকেই নিজেদের অধিকার সম্পর্কে তারা সচেতন হয় ও দানা বাঁধে অধিকার আদায়ের আন্দোলন। ইউরোপে শিল্প বিপ্লবের আগের মেয়েদের কোনো ব্যক্তিগত, কোনো সম্পত্তিগত অধিকার ছিল না।

যুক্তরাজ্যে ১৭৯২ খ্রি মেরি ওলস্টোনক্র্যাফটের রচনাদি থেকে নারী জাগরণের সূত্রপাত ঘটে। তিনি প্রধানত চেয়েছিলেন নারীরা যেনো লেখাপড়া শেখার সমান সুযোগ পায়। উনিশ শতকে এই সংগ্রামের ফলে নারীরা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিশেষ করে চিকিৎসা বিজ্ঞানে পুরুষদের কলেজে ভর্তির সুযোগ পায়। এরপরে নারী অধিকার আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন কিছু শিক্ষিত শ্রেণীর নারীরা যারা পুরুষ শাসন থেকে কিছুটা মুক্ত। তাঁরা দেখিয়েছিলেন যে নারীরা পুরুষদের তুলনায় অনেক অধিকার থেকে বঞ্চিত। সামাজিক মর্যাদায় সম-পর্যায়ভুক্ত নন যেসব অধিকার রাষ্ট্র থেকে মানুষ হিসাবে তার প্রাপ্য তাও সে পাচ্ছে না, উল্টো তাঁদের উপর পুরুষেরা সব কিছুতে আধিপত্য করে।

আন্দোলনের ফলে ইউরোপে কালক্রমে বিবাহিতা নারীরা আইনগত অনেক অধিকার পায়, বিশেষ করে স্বামীর সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার, আশ্রয়ের অধিকার, বিবাহ বিচ্ছেদ ও সম্পত্তি ক্রয় বিক্রয়ের অধিকার। নারীদের অধিকার আন্দোলনের বিভিন্ন ধারায় অন্যতম একটি দাবি ছিল ভোটাধিকার, যেটি যুক্তরাজ্যে ১৯১৮ খ্রি আংশিক এবং ১৯২৬ খ্রি পূর্ণ স্বীকৃতি পায়। আন্দোলন ধীরে ধীরে লেবার পার্টি ও কমিউনিস্ট পার্টির ছত্রছায়ে এসে সংসদীয় সংস্কার আন্দোলনের রূপ নেয়। উল্লেখ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৮৫৭ খ্রি থেকে বাঁচার উপযোগী বেতন এবং অনধিক ১০ ঘণ্টা কাজের সময় নির্ধারণের দাবিতে নারী শ্রমিক ও কর্মচারীরা প্রবল আন্দোলন সৃষ্টি করেন। ভোটাধিকারের রাজনৈতিক দাবির সঙ্গে অর্থনৈতিক অধিকারের দাবিও মিশ্রিত হয়। ১৯১০ খ্রি কোপেনহেগেনে ইন্টারন্যাশনাল সোসালিস্ট উইমেন্স কনফারেন্স ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বে ৮ মার্চ তারিখটিকে আন্তজাতিক নারী দিবস হিসাবে পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। যুক্তরাজ্যে সমান বেতনের দাবিতে নারী শ্রমিক ও কর্মচারীরা ধর্মঘট করেন।[১]

একটি সমাজতান্ত্রিক সমাজ গঠনে পুঁজিবাদ, সামন্তবাদসাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলনে পুরুষের পাশাপাশি নারীর অংশ গ্রহণ প্রযোজন। সমাজ পরিবর্তনে নারীদের অংশ নেওয়ার গুরুত্ব প্রসঙ্গে মাও সেতুং বলেছেন- 

‘একটা মহান সমাজতান্ত্রিক সমাজ গঠনের জন্য উৎপাদন কাজে যোগদান করতে ব্যাপক নারী-সাধারণকে জাগ্রত করার গুরুত্বটা খুবই বিরাট। উৎপাদনে পুরুষ ও নারীর সমান শ্রমের জন্য সমান বেতন দিতে হবে। কেবলমাত্র সমগ্র সমাজের সমাজতান্ত্রিক রূপান্তরের প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নারী পুরুষের মধ্যে সত্যিকারের সমানাধিকার হাসিল করা যায়’।[২]

বিশ শতকের ষাটের দশক থেকে ইউরোপে নারী শ্রমিকরা যখন যুক্ত হতে থাকে আন্দোলনে তখন নারী অধিকার আন্দোলন নারী মুক্তি (লিবারেশন) আন্দোলনে পরিণত হয়। এটিতে নানা গোষ্ঠী ও আদর্শের নারী সংগঠন মূল সাতটি দাবির ভিত্তিতে সমন্বিত হয়েছে। এদের মধ্যে প্রধান দুটি গোষ্ঠীর একটি হলো সমাজতন্ত্রী ও মার্কসবাদী এবং অপরটি হল আমূল পরিবর্তনবাদী।

মার্কসবাদীরা নারী আন্দোলনে বলা হয় যে ‘পুরুষতান্ত্রিক সমাজের সঙ্গে পুঁজিবাদের সম্পর্ক নিবিড়ভাবে জড়িত’। এই ধরণের চিন্তা আসে এঙ্গেলসের তত্ত্ব থেকে- ব্যক্তিগত মালিকানার সঙ্গে আদিম পিতৃশাসিত সমাজের উদ্ভব ঘটে। মার্কসীয় রাষ্ট্রচিন্তা  নারী আন্দোলনকে প্রভাবিত করে নতুন রূপ দেয়। লেনিন, ত্রৎস্কি প্রমুখের রচনায় নারী অধিকারের বিষয়টি বিশেষ স্থান পেয়েছে। নারী আন্দোলনকে সমাজতান্ত্রিক রূপ দেওয়ার জন্য ক্লারা জেটকিন গঠন করেন জার্মান কমিউনিস্ট পার্টিতে একটি স্বতন্ত্র নারী বিভাগ।

মার্কসীয় দৃষ্টিতে নারী নির্যাতন পুঁজিবাদী সমাজের লক্ষণ। এঙ্গেলস মনে করতেন যে ‘গৃহের বাইরে কর্মজীবন তথা সর্বহারা শ্রেণীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে সমাজতন্ত্রী আন্দোলনে যোগ দিলে নারী জাতির যথার্থ মুক্তি সম্ভব’। লেনিনের মতে- ‘গৃহে বদ্ধ জীবন থেকে যে গ্লানি দেখা দেয় সেটা কাটিয়ে ওঠার জন্য নারীদের কাজে নিযুক্ত হওয়া প্রয়োজন’।  তিনি আরো বলেন,

‘কেবলমাত্র মেয়েদের মামুলি সমান অধিকার নিয়ে নয়, মেয়েদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমান অধিকারের জন্য সংগ্রামই শ্রমিক নারী আন্দোলনের মুখ্য উদ্দেশ্য। প্রধান কর্তব্য হচ্ছে, মেয়েদের পারিবারিক গোলামি, রান্নাঘর ও শিশু রক্ষণাগারের চিরন্তনী বদ্ধ ও অবমাননাকর গা ঢেলে দেওয়া থেকে মুক্ত করে তাদের সামাজিক বড় বড় উৎপাদনের কাজে নিয়োগ করতে হবে। সমাজের গড়ন ও সামাজিক রীতিনীতির আমূল পরিবর্তন সাধনের জন্য দীর্ঘকাল ধরে সংগ্রাম পরিচালনার প্রয়োজন’।[৩]

নারী অধিকার আন্দোলনে আমূল পরিবর্তনবাদীরা মনে করেন নারী  পুরুষের বৈষম্যকে প্রাকৃতিক ও জৈবিক কারণে ঘটে। এই মনোভাব প্রকাশের ফলে পুঁজিবাদ তথা অর্থনৈতিক বৈষম্যের সূত্রপাত ঘটে। তাঁরা মনে করেন যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিধি ব্যবস্থায় নারীর হীনাবস্থার মূল কারণ হল জৈবিক অসমতা।

নারী মুক্তি আন্দোলনের সময় বিভিন্ন বক্তব্য বা মনোভাবের প্রকাশ ঘটতে থাকে সেই সময়। কিছু গোষ্ঠী মনে করে যে নারী-পুরুষের মধ্যে যে সম্পর্ক বিরাজ করছে আকস্মিকভাবে সেটা  আসে নি, বরং একটা প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় তা গড়ে ওঠে। নারী ও পুরুষ উভয়ে পরস্পরের উপর নির্ভরশীল, সেই সম্পর্কের ভিত্তিতেই তাদের জীবন পরিপূর্ণতা লাভ করে। মূলত একজনের সাথে অন্য জনের সম্পর্ক এটা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক দিকের উপর নির্ভর করে গড়ে ওঠে। এই কারণ ছাড়া যারা নারী-পুরুষের কাজের বা সম্পর্কের ভিত্তি প্রাকৃতিক কারণ মনে করে তারা বৈষম্য বাড়ানোর জন্য প্রচার করে থাকে।

তত্থসুত্র:

১. সৌরেন্দ্রমোহন গঙ্গোপাধ্যায় তৃতীয় মুদ্রন জুলাই, ২০১৩  রাজনৈতিক অভিধান, কলকাতা: আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড। পৃষ্ঠা ১৫৪-১৫৫।

২. মাও সেতুং “নারীরা শ্রমফ্রন্টের পথে যাত্রা করেছেন” এর ভূমিকালিপি (১৯৫৫) সভাপতি মাও সেতুংয়ের উদ্ধৃতি  “নারী” অধ্যায়।

৩. ভি. আই. লেনিন আন্তর্জাতিক নারী দিবস প্রসঙ্গে,  ৪ মার্চ, ১৯২০।

আরো পড়ুন






Related News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *