আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > জ্ঞানকোষ > মার্কসবাদকোষ > গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতাবাদ হচ্ছে কমিউনিস্ট পার্টির একটি নীতি

গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতাবাদ হচ্ছে কমিউনিস্ট পার্টির একটি নীতি

গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা বা গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতাবাদ বা অন্তর্দলীয় গণতন্ত্র বা গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীকতাবাদ (ইংরেজি: Democratic centralism) হচ্ছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের কমিউনিস্ট পার্টির সর্ববিধ অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নীতিনির্ধারণ প্রণালী। ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস তাঁর কর্তৃত্ব প্রসঙ্গে লেখায় কর্তৃত্বকে কেন্দ্রিকতাবাদ অর্থে ব্যাখ্যা করেছিলেন। এঙ্গেলসের মতে জটিল যন্ত্রপাতির বিকাশের সাথে সাথে কেন্দ্রিকতাবাদের প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে। আমরাও দেখি যান্ত্রিক বিকাশের সাথে সাথে কারখানা বা গবেষণাগার বা সংগঠনে কেন্দ্রিকতাবাদের গুরুত্ব অপরিসীম।[১] 

বিভিন্ন সমাজতন্ত্রী দেশে পার্টির সঙ্গে যুক্ত সহযোগী সংগঠন, যুব, শ্রমিক এবং অন্যান্য সংস্থার ক্ষেত্রেও এই কর্মপ্রণালী প্রযােজ্য। এই কর্মপ্রণালীর প্রবর্তন করেছিলেন ভি. আই. লেনিন। পার্টির ভিতরে রাজনৈতিক বিষয়ে অবাধ আলােচনা, কর্মকতা নির্বাচনে স্বাধীন সুযােগ, ক্রমােচ্চ স্তর বিন্যস্ত দলীয় কাঠামােয় শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং একদলীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা এই কর্মপ্রণালীর মূল বৈশিষ্ট্য।

সাম্যবাদী আন্তর্জাতিক বা কমিন্টার্নের (১৯১৯-৪৩) সময়ে এটা স্পষ্টই ছিল যে কমিউনিস্ট পার্টির কার্যনিবাহ সার্থক ও সফল হতে পারে যদি তার সংগঠন যথাসম্ভব কেন্দ্রীকতা থাকে এবং যদি লৌহকঠোর শৃঙ্খলা সবাই মেনে চলে, দলের কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব সবাইকার আস্থাভাজন হয় এবং তার অধিকার ও ক্ষমতা অটুট থাকে। কেন্দ্রীকতার অর্থ হলো কেন্দ্রীয় পার্টির হাতে যাবতীয় ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকা এবং সর্বস্তরের যাবতীয় পরিবার, সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের গঠন ও বিকাশের জন্য সেই সংগঠন বা পার্টির দায়ী থাকা।

কেন্দ্রিকতার অর্থ হলো পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির হাতে যাবতীয় ক্ষমতা ন্যস্ত থাকা, যাতে বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠানে সুস্থ রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করা যায়; কলকারখানা, স্কুল-কলেজ, পরিবার থেকে পুলিশি সংগঠন পর্যন্ত; এই বিধিব্যবস্থায় স্বশাসিত প্রতিষ্ঠান গড়া ও পরিচালনার জন্য দক্ষতাসম্পন্ন গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব নির্বাচন সহজ হয়। কেন্দ্রীকতা এই হিসাবে কিছুটা গণতন্ত্রসম্মত যে তা জনহিতার্থে ক্রিয়াশীল থাকে, যথা ব্যক্তিগত মালিকানার অবসান ঘটায়, পার্টির মধ্যে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র বজায় রাখে, যার ফলে দলীয় কাঠামাের প্রতিটি স্তর নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত হয়। তবে যথার্থ কেন্দ্রীকতা ও যথার্থ গণতন্ত্রে দলের ক্ষমতাসীন নেতৃত্বের প্রয়ােজনে প্রথমটির আধিপত্য বেশি। তা হলেও মােটামুটি ভাবে অন্তর্দলীয় গণতন্ত্রে দলের কর্মপন্থা নির্ধারণ ও রূপায়ণে দলীয় সদস্যদের অংশগ্রহণের সুযােগ থাকে।

গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতাবাদী প্রণালীতে দলের অধীন সমস্ত ধরনের সংস্থা নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত হয়। সেগুলি দলের উচ্চতর সাংগঠনিক স্তরে নিয়মিত রিপাের্ট দাখিল করে। সদস্যদের সৃজনশীল কাজের উদ্যম, কঠোর শৃঙ্খলাপরায়ণতা এবং সংখ্যাগরিষ্ঠের কাছে সংখ্যালঘিষ্ঠের আনুগত্য প্রত্যাশা করা হয়। অর্থাৎ সংগঠনের উপরিস্থ কর্তৃত্বের সিদ্ধান্ত রূপায়িত করার দায়িত্ব থাকে নিম্নস্তরের সংগঠন ও দলীয় অন্যান্য সংস্থার উপর। এটাকেই বলা হয় গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীকতা বা অন্তর্দলীয় গণতন্ত্র; সমালােচনা ও আত্মসমালােচনার নীতি।

লেনিনের সুপারিশক্রমে সােভিয়েত ইউনিয়নে সরকারি কাজকর্মে নানা ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণকালে যে পদ্ধতির প্রচলন হয় সােভিয়েত ও অন্যান্য দেশের কমিউনিস্ট পার্টি ওই পদ্ধতি অনুসরণ করে। তাতে পার্টির মধ্যে সর্ববিধ বিষয়ে অবাধ আলােচনা এবং পার্টির কর্মকর্তা নির্বাচনে অবাধ সুযােগ, একদলীয় রাষ্ট্র ও ক্রমােচ্চ পদবিন্যাসের কঠোর নিয়মশৃঙ্খলা মেনে চলা বিধেয়। সাম্যবাদী আন্তর্জাতিক বা কমিন্টার্নের সময় থেকেই স্থির হয় যে পার্টি তার কর্তব্য পালনে সমর্থ হবে যদি তার সাংগঠনিক কাঠামাে যথাসাধ্য কেন্দ্রীভূত হয়, লৌহকঠোর শৃঙ্খলা বজায় থাকে, কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সর্বস্তরের সদস্যদের আস্থাভাজন এবং শক্তি ও কর্তৃত্বসহ সর্বাঙ্গীণ ক্ষমতাশালী হয়। উল্লেখ্য, কমিন্টার্নের সদস্যপদের জন্য একুশ দফা শর্ত ছিল।

কেন্দ্রিকতার বিধিব্যবস্থা গণতান্ত্রিক, তার আংশিক কারণ হলো যে সেসবের মূলে থাকে জনস্বার্থ, কারণ উৎপাদনে ব্যক্তিগত মালিকানা উচ্ছেদ করা হয়, অপর একটি কারণ হলো পার্টির মধ্যে অন্তর্দলীয় গণতন্ত্র, যেখানে তলা থেকে সমস্ত পদ নির্বাচনের মাধ্যমে পূরণ হয়। মাও সেতুং পার্টির অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার সঙ্গে জনগণের একটা সম্পর্ক স্থাপনে বিশ্বাস করতেন। তাঁর দৃষ্টিতে গণতন্ত্র ও কেন্দ্রিকতা পরস্পরবিরােধী নয়। বরং দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের অঙ্গ হিসাবে বিরােধী দুটি সত্তার মধ্যে ঐক্যের এটি এক নিদর্শন বিশেষ।[২]

দ্রষ্টব্য: গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতাবাদ

তথ্যসূত্র:

১. এই বিষয়ে বিস্তারিত পড়ুন, অনুপ সাদি, গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতাবাদ প্রসঙ্গে, সমাজতন্ত্র, ভাষাপ্রকাশ, ঢাকা ফেব্রুয়ারি ২০১৫, পৃষ্ঠা ৭৬-৮১।

২ গঙ্গোপাধ্যায়, সৌরেন্দ্রমোহন. রাজনীতির অভিধান, আনন্দ পাবলিশার্স প্রা. লি. কলকাতা, তৃতীয় মুদ্রণ, জুলাই ২০১৩, পৃষ্ঠা ১৮-১৯, ৯৫।

আরো পড়ুন

Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই “পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি” প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১০টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর “সমাজতন্ত্র” ও “মার্কসবাদ” গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন “বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা” নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top