Main Menu

নয়া উপনিবেশবাদের প্রকৃতি ও উত্থান

নয়া উপনিবেশবাদ (ইংরেজি: Neo-colonialism) বা নয়া সাম্রাজ্যবাদ হচ্ছে সরাসরি সামরিক সাম্রাজ্যবাদী নিয়ন্ত্রণ বা পরোক্ষ হেজিমনিমূলক রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে একটি উন্নয়নশীল দেশকে প্রভাবিত করার জন্য পুঁজিবাদ, বিশ্বায়ন ও সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদের প্রয়োগ। ১৯৬০-এর দশকে আফ্রিকার দেশসমূহের বিউপনিবেশায়নের প্রেক্ষাপটে এই শব্দটি প্রথম কোয়ামে নক্রুমার দ্বারা উদ্ভূত হয়েছিল। পশ্চিমা চিন্তাবিদদের লেখায় যেমন জ্যাঁ-পল সার্ত্রের ১৯৬৪ সালে প্রকাশিত উপনিবেশবাদ ও নয়া-উপনিবেশবাদ গ্রন্থে এবং নোয়াম চোমস্কির ১৯৭৯ সালের ওয়াশিংটন কনফারেন্স এবং তৃতীয় বিশ্ব ফ্যাসিবাদ গ্রন্থে নয়া উপনিবেশবাদকে আলোচনা করা হয়েছে।[১]

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরে নানাবিধ কারণে পুরনো ধরনের সাম্রাজ্যবাদের প্রায় অবসান ঘটে। এশিয়া ও আফ্রিকার বহুদেশ সাম্রাজ্যবাদী শাসন থেকে মুক্তিলাভ করে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রে পরিণত হয়। কিন্তু রাজনৈতিক ভাবে তাদের স্বাধীনতা স্বীকার করে নেওয়ার পরেও পূর্বতন সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলি এই সব নতুন রাষ্ট্রের উপর অর্থনৈতিক কর্তৃত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করে এবং সেই উদ্দেশ্যে নানাভাবে তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করে।

সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত নতুন রাষ্ট্রগুলির অর্থনৈতিক দুর্বলতার জন্যই নয়া উপনিবেশবাদের সৃষ্টি হয়েছে। এই নতুন রাষ্ট্রগুলি তাদের অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য শিল্পোন্নত পুঁজিবাদী দেশ থেকে ঋণ গ্রহণ করতে, অর্থনৈতিক ও কারিগরী সাহায্য নিতে এবং পুঁজি আমদানী করতে বাধ্য হয়। সেই সব দেশের সাথে ব্যবসায় বাণিজ্যের সম্পর্কও ক্রমশঃ বাড়াতে হয়। পূর্বতন সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলি সাহায্য ও ঋণ দেওয়ার সময় এমন সব শর্ত আরোপ করে থাকে যার ফলে সেই সব দেশে নিজেদের অর্থনৈতিক কর্তৃত্ব বজায় রাখা যায়। যে দেশ অর্থনৈতিক সাহায্য বা ঋণ দেয় সেই দেশ থেকেই বিভিন্ন  ধরনের দ্রব্য সামগ্রী ক্রয় করতে তারা বাধ্য থাকে। ঋণের সুদ হিসেবেও প্রতি বৎসর বহু অর্থ প্রদান করতে হয়। অর্থনৈতিক সাহায্য দিয়ে সেই দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো, পরিকল্পনা, আমদানী ও রপ্তানী শুল্কের হার ইত্যাদি প্রভাবিত করার চেষ্টাও হয়।[২]

এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলি স্বাধীন হওয়ার পরেও তাদের অর্থনীতিতে বিদেশী পুঁজির বিনিয়োগ অব্যাহত থাকে এবং তার ফলে সেই সব দেশের জাতীয় সম্পদের এক বৃহৎ অংশ বিদেশের নিয়ন্ত্রাধীনেই থেকে যায়। জাতীয়করণের মাধ্যমে এই ব্যবস্থার পরিবর্তনের চেষ্টা করলে শক্তিশালী শিল্পোন্নত দেশগুলি নানাধরনের অসুবিধার সৃষ্টি করে। তখন তারা এত বেশি ক্ষতিপূরণ দাবী করে যে নতুন রাষ্ট্রগুলির পক্ষে তা দেওয়া সম্ভব হয় না। কোনো কোনো সময়ে বলপ্রয়োগ করে অথবা নাশকতামূলক কার্যে লিপ্ত হয়ে নতুন রাষ্ট্রগুলিতে তারা এমন ধরনের সরকার স্থাপন করতে চেষ্টা করে যারা তাদের অনুগত হয়ে থাকবে এবং তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থের বিরদ্ধে কোনো কাজই করবে না। অনেক ক্ষেত্রে তারা সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত নতুন রাষ্ট্রগুলিকে অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক ও সামরিক সাহায্য দিয়ে তাদের অর্থনৈতিক ও বৈদেশিক নীতিকে এমন ভাবে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে যে বাস্তবক্ষেত্রে তারা তাদের তাঁবেদারী রাষ্ট্রেই পরিণত হয়।

নয়া উপনিবেশবাদ বজায় রাখার জন্য শিল্পোন্নত পূর্বতন সাম্রাজ্যবাদী দেশসমুহ নতুন স্বাধীনতাপ্রাপ্ত এবং অনুন্নত রাষ্ট্রগুলির শাসকগোষ্ঠীকে প্রভাবিত করার জন্য বিশেষভাবে চেষ্টা করে। সে সব দেশের অর্থনীতি এবং প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলি যারা দখল করে থাকেন তাদেরকে নানাভাবে প্রভাবিত করার চেষ্টা হয়। সে সব দেশের প্রতিভাবান ভালো ভালো ছাত্রছাত্রীদের জন্য নিজেদের দেশে উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা করে দিয়ে শিল্পোন্নত দেশগুলি তাদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করে এবং তাদের দৃষ্টিভঙ্গী ও মানসিকতাকে প্রভাবিত করে তাদের মাধ্যমে সেই সব দেশের উপর কর্তৃত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করে।

এই ধরনের নানাবিধ পরোক্ষ ব্যবস্থা অবলম্বন করে সাম্রাজ্যভুক্ত বিভিন্ন দেশকে রাজনৈতিক স্বাধীনতা দেওয়ার পরেও তাদের উপর আধিপত্য, বিশেষ করে অর্থনৈতিক কর্তৃত্ব বজায় রাখার চেষ্টাকেই বর্তমানে নয়া উপনিবেশবাদ বা neo-colonialism নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে। সাম্রাজ্যবাদের ক্রিয়াকলাপ যতখানি স্পষ্টভাবে দেখা যায় নয়া উপনিবেশবাদের কার্যাবলী তত সহজে বোঝা যায় না। একটি দেশের রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব মেনে নিয়ে তার উপর অর্থনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা চলে অনেকটা গোপনে এবং লোকচক্ষুর অন্তরালে। ল্যাটিন আমেরিকাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এক শতাব্দীরও বেশি ধরে এই রকমের নয়া উপনিবেশবাদী নীতি অনুসরণ করে চলেছে। কিন্তু দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরে এশিয়া ও আফ্রিকার অনেক দেশ রাজনৈতিক স্বাধীনতা লাভ করার পরেও যখন সাম্রাজ্যবাদী অর্থনীতির বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে থাকে এবং তার ফলে তাদের রাজনৈতিক স্বাধীনতাও সঙ্কুচিত হয়ে পড়ে তখনই বিশেষ ভাবে এই সমস্যার দিকে আমাদের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়। সেই প্রেক্ষিতে কোয়ামে নক্রুমা বলেছিলেন, “নয়া-উপনিবেশবাদের থাবায় থাকা একটি রাষ্ট্র তার নিজস্ব ভাগ্যের মালিক নয়। এটা এমন এক ব্যাপার যা নয়া উপনিবেশবাদকে বিশ্ব শান্তির এক গুরুতর হুমকিরূপে তৈরি করে।”

বর্তমান যুগের পুঁজিবাদী বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামো ও পদ্ধতি শিল্পোন্নত দেশগুলির স্বার্থেই রচিত হয়েছে এবং তাদের উদ্যোগে ও তাদের স্বার্থেই এই অর্থনীতি পরিচালিত হয়ে থাকে। বিশ্বব্যাংক বা অন্য কোনো আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থা থেকে উন্নয়নশীল দেশগুলি সহজ শর্তে বেশী করে ঋণ নিতে পারে না। এই সব দেশ সাধারণত যে সব জিনিস রপ্তানী করে তার দাম কম করে রাখার জন্য নানা রকম চেষ্টা হয়। যে সব উন্নয়নশীল দেশ একই ধরনের জিনিস রপ্তানী করে তাদের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতার ফলেও সেই সব জিনিসের মূল্য হ্রাস পায়। এই ব্যাপারে উন্নয়নশীল দেশগুলির মধ্যে সহযোগিতা স্থাপনের কোনো ব্যবস্থা এতদিন ছিল না। বর্তমানে এ বিষয়ে চিন্তা ভাবনা শুরু হয়েছে। তৃতীয় বিশ্বের কোনো কোনো রাষ্ট্র পশ্চিমের উন্নত দেশগুলির বাজারেও তাদের শিল্পজাত নানাবিধ দ্রব্য বিক্রয়ের চেষ্টা আরম্ভ করেছে, কিন্তু সংরক্ষণ নীতি এবং অন্যান্য পদ্ধতি অবলম্বন করে উন্নত দেশগুলি তাদের বাজারে এ সব জিনিসপত্র যাতে প্রবেশ করতে না পারে সে চেষ্টাই করে চলেছে। ব্যবসায় বাণিজ্য এবং সমুদ্র পথে আমদানী রপ্তানীর জন্য উন্নয়নশীল দেশগুলিকে প্রধানত শিল্পোন্নত দেশগুলির জাহাজ, ব্যাংক, বীমা কোম্পানী ইত্যাদি ব্যবহার করতে হয় এবং তার জন্য প্রচুর মূল্যও দিতে হয়।

এই নয়া উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাতিন আমেরিকার উন্নয়নশীল দেশগুলি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে সংগ্রাম শুরু করেছিল। নিজেদের মধ্যে সহযোগিতা স্থাপন করে এবং তৎকালীন সমাজতান্ত্রিক শিবিরের অন্তর্ভুক্ত দেশগুলির সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে তারা নয়া উপনিবেশবাদের প্রভাব থেকে নিজেদের মুক্ত করতে চেষ্টা করেছিল। উন্নয়নশীল রাষ্ট্রসমূহ নতুন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা (New International Economic Order) স্থাপনের জন্য যে প্রচেষ্টা আরম্ভ করেছিল, তার উদ্দেশ্যও ছিল এই নয়া উপনিবেশবাদের ভিত্তি শিথিল করা, কিন্তু সেই আয়োজন সাম্রাজ্যবাদ ও নয়া উপনিবেশবাদী লুটেরা দেশসমূহের কারণে সফল করা যায়নি।

তথ্যসূত্র:

১. Chomsky, Noam; Herman, Edward S. (1979). The Washington Connection and Third World Fascism. Black Rose Books Ltd. p. 42ff.  

২. গৌরীপদ ভট্টাচার্য, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষদ, কলকাতা, ৫ম সংস্করণ ডিসেম্বর ১৯৯১, পৃষ্ঠা ৩৪২-৩৪৪।

আরো পড়ুন






Related News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *