Main Menu

অক্টোবর বিপ্লব প্রসঙ্গে

অক্টোবর বিপ্লব (অন্য নাম: নভেম্বর বিপ্লব) ( ইংরেজি: October Revolution) পৃথিবীর ইতিহাসে ঘটে যাওয়া একটি মহান ঘটনা। পৃথিবীর ইতিহাসে কয়েকটি ঘটনা তাদের বিপুলতার কারণে এবং সমাজের রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক কাঠামোর মৌলিক পরিবর্তন সাধনের উৎস হিসাবে বিপ্লব বলে পরিচিত হয়ে আসছে। এদের মধ্যে ১৬৪৯ খ্রিষ্টাব্দে ইংল্যাণ্ডে গৃহযুদ্ধ, ১৬৮৮ খ্রিষ্টাব্দের ইংল্যাণ্ডের পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব ঘোষণা, ১৭৭৬ খ্রিষ্টাব্দে আমেরিকার স্বাধীনতা ঘোষণা ও যুদ্ধ, ১৭৮৯ খ্রিষ্টাব্দে ফরাসি বিপ্লব এবং ১৯১৭ সনে অক্টোবর বিপ্লব বিশেষভাবে পরিচিত। ১৯১৭ সালে ৭ নভেম্বর (রাশিয়ার পুরাতন বর্ষপঞ্জি অনুসারে ২৫ অক্টোবর) লেনিনের নেতৃত্বে বিপ্লবী বলশেভিক পার্টি রাশিয়ায় ক্ষমতা দখল করে এবং শ্রমিক কৃষক ও সৈনিকদের সোভিয়েত বা সমিতির শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে। রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক এই বিপ্লব অক্টোবর বা নভেম্বর বিপ্লব নামে পরিচিত।

বিশাল রুশদেশে সামন্তবাদী শাসনের প্রধান ছিল জার। একদিকে সামন্তবাদী জারের শাসন, অপরদিকে অর্থনীতিতে পুঁজিবাদী শিল্পোৎপাদনের বিকাশ ঘটতে শুরু করেছে। ফলে উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে ক্ষয়িষ্ণু প্রতিক্রিয়াশীল সামন্তবাদের সঙ্গে। বিকাশমান পুঁজিবাদী শক্তির সাধারণ দ্বন্দ্ব তীব্র হতে থাকে। এই বিরোধের প্রকাশ সামন্তবাদ এবং জারতন্ত্রের বিরুদ্ধে নানা বিপ্লববাদী নৈরাজ্যবাদী গুপ্ত সমিতির প্রতিষ্ঠা এবং ঘটনার মধ্যে ঘটতে দেখা যায়। কেবল নৈরাজ্যবাদী আন্দোলন নয়, মার্কসবাদী সমাজতান্ত্রিক আদর্শে দীক্ষিত বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক দলও সংগঠিত হয়। সামন্তবাদ এবং জার শাসনের বিরুদ্ধে ১৯০৫ সালে শ্রমিক, কৃষক জনসাধারণ এবং নৌবাহিনীর নাবিকদের মধ্যে বিপ্লবাত্মক বিক্ষোভ সংগঠিত হয়। যুদ্ধ জাহাজ পটেমকিন এর নাবিকগণ নিজেদের জীবনযাত্রা এবং খাদ্যের উন্নতির দাবিতে ধর্মঘট ঘোষণা করে। বিদ্রোহী নাবিকদের সঙ্গে বন্দরের শ্রমিকরাও যোগদান করে। কিন্তু জার সরকার সৈন্যবাহিনী নিয়োগ করে এই বিক্ষোভ দমন করে। পর্যদস্ত হলেও ১৯০৫-এর এই ঘটনা ১৯০৫-এর বিপ্লব নামে পরিচিত। লেনিন পরবর্তীকালে ১৯০৫-কে ১৯১৭ সালের বিপ্লবের ‘মঞ্চমহড়া’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন।

১৯১৪ সালে ইউরোপে প্রথম মহাযুদ্ধ শুরু হয়। রাশিয়াও এই যুদ্ধ জার্মানির প্রতিপক্ষ হিসাবে লড়াই করে। কিন্তু রুশ বাহিনী যুদ্ধে বিপর্যস্ত হতে থাকে। যুদ্ধে প্রথম আড়াই বছরের মধ্যে রাশিয়ার পঞ্চান্ন লক্ষ সৈন্য নিহত নয় । ক্রমান্বয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্যদের সমরাস্ত্র যোগান দেওয়াও সরকারের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে। দেশে দুর্ভিক্ষাবস্থা দেখা দেয়। যোগাযোগ ব্যবস্থাও ভেঙে পড়ে। সরকারের মধ্যে অনৈক্য বৃদ্ধি পেতে থাকে। জার তার মন্ত্রিসভাকে ঘন ঘন পরিবর্তন করে। কৃষকদের জমির দাবি এবং সৈন্যদের মধ্যে শান্তির দাবি তীব্র হয়ে ওঠে। এই পরিস্থিতিতে রাশিয়ার রাজধানী পেট্রোগ্রাডে ১৯১৭ সালের ৮ মার্চ (ফেব্রুয়ারি) ব্যাপক ধর্মঘট এবং হাঙ্গামা শুরু হয়। সরকার সৈন্য বাহিনীকে ধর্মঘট দমন করতে পাঠালে সৈনিকেরা ধর্মঘটিদের সঙ্গে যোগদান করে। এই সময়ে রুশ ডুমা বা পার্লামেন্টও সরকার বিরোধী ভূমিকা গ্রহণ করে। জার ডুমার অধিবেশন বন্ধ করে দেবার হুকুম দিলেও ডুমা সে হুকুম অমান্য করে এক অস্থায়ী সরকার ঘোষণা করে। অবস্থাদৃষ্টে জার দ্বিতীয় নিকোলাস সিংহাসন ত্যাগ করেন। পুরাতন রুশ বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী ফেব্রুয়ারি  মাসে সংঘটিত এই ঘটনা ইতিহাসে ‘ফ্রেব্রুয়ারি বিপ্লব’ নামে অভিহিত। চরিত্রগতভাবে এই বিপ্লব ছিল পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক বিপ্লব। 

অস্থায়ী সরকার জনসাধারণের শান্তি বা জমি এবং রুটির দাবি পূরণ করতে ব্যর্থ হয়। তারা তখনো যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার নীতি অনুসরণ করতে থাকে। কিন্তু সৈনিক, কৃষক এবং শ্রমিকদের মধ্যে বিপ্লবী মনােভাব বৃদ্ধি পেতে থাকে। অস্থায়ী সরকারের প্রায় প্রতিদ্বন্দ্বী সরকার হিসাবে দেশব্যাপী শ্রমিক, কৃষক ও সৈনিকদের নির্বাচিত সমিতি বা সোভিয়েত সংগঠিত হতে থাকে। আসলে ১৯০৫-এর বিপ্লবের মধ্যেই সংগ্রামী জনতার এইরূপ সোভিয়েত প্রথম গঠিত হয়েছিল। লেনিন এতদিন দেশের বাইরে নির্বাসিত জীবন-যাপন করছিলেন। বাইরে থেকে তিনি দেশের বলশেভিক দলের বিপ্লবী কাজ পরিচালনা করছিলেন। ১৬ এপ্রিল (১৯১৭) তিনি দেশে ফিরে এলে বলশেভিকদের নেতৃত্বে শ্রমিক, কৃষক ও সৈনিকদের সোভিয়েত কার্যত অস্থায়ী সরকারের বিরোধী সরকার হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। যুদ্ধ ও শান্তির ক্ষেত্রে সরকারের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া এবং অন্যান্য সকল প্রশ্নে সোভিয়েতগুলি অস্থায়ী সরকারের আদেশ অমান্য করতে থাকে। শক্তভাবে যুদ্ধ পরিচালনার অজুহাতে এবার অস্থায়ী সরকার সমস্ত বিক্ষোভ এবং দাবিকে দমন করার নীতি গ্রহণ করে। সৈন্য বাহিনীর মধ্যে যে সমস্ত রেজিমেন্ট বিপ্লবী ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ হয়েছিল তাদেরকে ভেঙে দেওয়া হলো। কৃষক আন্দোলন দমনেও কঠোরতর ব্যবস্থা গৃহীত হতে লাগল। এতদিন শ্রমিক-কৃষক- সৈনিকদের সোভিয়েতগুলিকে বরদাশত করা হলেও এখন থেকে সেগুলিকে সরকার ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করতে লাগল। এমন অবস্থায় ১৬ জুলাই তারিখে অস্থায়ী সরকারকে উচ্ছেদের এক চেষ্টা হয়। কিন্তু এ চেষ্টা সফল হয় না। এ চেষ্টা বলশেভিকদের দ্বারা পরিচালিত ছিল না। কেননা বলশেভিকদের মতে অস্থায়ী বুর্জোয়া সরকারকে উচ্ছেদের পরিস্থিতি তখনো পরিপক্কতা লাভ করে নি। এই ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পরে অস্থায়ী সরকারের দমননীতি তীব্রতর হয়ে ওঠে। সরকার লেনিনকে গ্রেপ্তার করার চেষ্টা করে। লেনিন আত্মগোপন করেন। কিন্তু অস্থায়ী সরকারের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী কেরেনুসকী এবং সামরিক বাহিনীর অধিনায়ক জেনারেল কর্নিলডের মধ্যে বিরোধ ঘটে। জেনারেল কর্নিলভও সেপ্টেম্বর মাসে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করে। জেনারেল কর্নিলভের উদ্দেশ্য ছিল অস্থায়ী সরকারের চরিত্র পুরোপুরি পালটে দিয়ে তাকে একেবারে প্রতিক্রিয়াশীল সরকারে পরিণত করা। পেট্রোগ্রাডের বিপ্লবী শ্রমিক ও সৈনিকদের প্রতিরোধে কর্নিলভের এই চেষ্টা অবশ্য ব্যর্থ হয়। কিন্তু অস্থায়ী সরকারের দুর্বলতা প্রকটতর হয়ে ওঠে।

খাদ্য সংকট ও শান্তির কামনা জনসাধারণকে সরকারের যুদ্ধচালনার নীতির তীব্র বিরোধী করে তোলে। যুদ্ধ প্রচেষ্টায় জনসাধারণের পক্ষ থেকে কোনো সাড়াই আর সরকার পায় না। এমন অবস্থায় ৬ নভেম্বর তারিখে লেনিন বলশেভিক নেতৃত্বে পরিচালিত লালবাহিনীকে অস্থায়ী সরকারের দপ্তর পেট্রোগ্রাডের শীতপ্রাসাদ দখলের নির্দেশ দেন। ৭ নভেম্বর (নতুন বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী) সোভিয়েতসমূহের নিখিল রুশ কংগ্রেস বলশেভিক পার্টিকে সরকার গঠনের ক্ষমতা প্রদান করে প্রস্তাব গ্রহণ করে। লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিক পার্টি সরকার হিসাবে জনতার কমিসার বা মন্ত্রিপরিষদ গঠন করে। রাজধানীর বাইরে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শহরেও বলশেভিকরা ক্ষমতা দখল করে। লেনিন দেশের জন্য শান্তি, জমি এবং রুটি বা রুজির নীতি ঘোষণা করলেন। ব্যক্তিগত মালিকানা নিষিদ্ধ করা হলো। প্রতিবিপ্লবী এবং যাজক প্রতিষ্ঠান গির্জার বিপুল সম্পত্তি সরকারের হাতে বাজেয়াপ্ত করা হলো। কৃষকদের জমির মালিক ঘোষণা করা হলো। শ্রমিকরা কারখানা দখল করতে শুরু করল। কৃষকদের মধ্যে জমি বিনামূল্যে বিলি করার নীতি গ্রহণ করা হলো। ৫ ডিসেম্বর লেনিন যুদ্ধ থেকে রাশিয়ার সম্পর্কহীনতা ঘোষণা করে যুদ্ধ বন্ধ কার্যকর করেন। ১৯১৮ সালের ৩ মার্চ তারিখে জার্মানির সঙ্গে ব্রেস্ট-লিটভস্ক শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ১৯১৮-এর জুলাই মাসে বিপ্লবের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত সোভিয়েত রাষ্ট্রের প্রথম সংবিধান ঘোষণা করা হয়।

তথ্যসূত্র:

১. সরদার ফজলুল করিম; দর্শনকোষ; প্যাপিরাস, ঢাকা; জুলাই, ২০০৬; পৃষ্ঠা ৩৩৬-৩৩৮।

আরো পড়ুন

জন্ম ৮ জানুয়ারি ১৯৮৯। বাংলাদেশের ময়মনসিংহে আনন্দমোহন কলেজ থেকে বিএ সম্মান ও এমএ পাশ করেছেন।

তাঁর প্রকাশিত প্রথম কবিতাগ্রন্থ স্বপ্নের পাখিরা ওড়ে যৌথ খামারে । বিভিন্ন সাময়িকীতে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া শিক্ষা জীবনের বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে রোদ্দুরে ডট কমের সম্পাদক।






Related News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *