আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > জ্ঞানকোষ > মার্কসবাদকোষ > উদারতাবাদ জনগণ গণতন্ত্র ও স্বাধীনতাবিরোধী এক জান্তব মতবাদ

উদারতাবাদ জনগণ গণতন্ত্র ও স্বাধীনতাবিরোধী এক জান্তব মতবাদ

উদারতাবাদ বা উদারনীতি (ইংরেজি: Liberalism) ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান এবং অবাধ ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বাধীনতা সমন্বিত মতাদর্শ।[১] উদারতাবাদ সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতকে ইউরোপে নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা পুঁজিবাদের উদ্ভবের সাথে আবির্ভূত হয়। পুঁজিবাদের অবাধ বিকাশের প্রয়োজনে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে ব্যক্তি স্বাধীনতা, আইনের শাসন এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অবাধ প্রতিযোগিতার যে তত্ত্ব বিভিন্ন চিন্তাবিদ ও দার্শনিকগণ প্রচার করেন তা উদারতাবাদ বলে পরিচিত। উদারতাবাদ মূলত ছিলো সামন্তবাদ ও রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে পুঁজির অবাধ বিকাশ এবং সম্পত্তির উপর ব্যক্তিগত মালিকানা প্রতিষ্ঠার মতবাদ।

এই কালের ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদের তত্ত্বও উদারতাবাদের আর এক নাম। ‘উদারতাবাদ’ ‘ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ’ পদগুলি আধুনিক জীবনেও ব্যবহৃত হয় বটে। কিন্তু এককালে উদারতাবাদ বলতে অর্থনীতির ক্ষেত্রে যে অবাধ প্রতিযোগিতাকে বুঝানো হতো বর্তমানে তার বদলে উদারতাবাদ বলতে সাধারণভাবে অরক্ষণশীল এবং পরমত সহিষ্ণু উদার চিন্তাকে প্রধানত বুঝানো হয়।

কার্যত উদারতাবাদ হলো জীবনযাত্রার একটি মনােভঙ্গি, শুধুই এক মতাদর্শ মাত্র নয়, তাতে মানুষের শুভসত্তা ও যুক্তিবােধের উপর গুরুত্ব আরােপিত হয়। ভবিষ্যৎকে উজ্জ্বল ও সুখবহ করার জন্য জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে বাঞ্ছিত সংস্কার সাধনের মাধ্যমে যেসব রীতিনীতি ও মূল্যবােধ প্রাধান্য পায় তা কালক্রমে গণতন্ত্রের সারবস্তু হয়ে দাঁড়ায়। জন ডিউই প্রমুখ দার্শনিকগণ উদারনীতির মধ্যে একটি মনােভঙ্গি এবং সেইসঙ্গে কার্যক্রমের কথা বলেন। মনােভঙ্গি হিসাবে যুক্তিবােধ ও বৈজ্ঞানিক প্রণালীতে গুরুত্ব আরােপ করা হয়।[২]

উদারতাবাদ পুঁজিবাদী- সাম্রাজ্যবাদী দেশসমূহের সুবিধাবাদীদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দেয়, কেননা পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী দেশসমূহ নিপীড়িত দেশের জনগণকে শোষণ করতে পারে। ফলে বড় বড় কথা বলা, অন্যের মতকে শ্রদ্ধা করার বড়াই করার কথা বলার সাথে জড়িত আছে উপনিবেশসমূহ শোষণ এবং উপনিবেশে গণহত্যার প্রক্রিয়া। এই উদারতবাদীরা সপ্তদশ শতক থেকে অদ্যাবধি এশিয়া, আফ্রিকা আর লাতিন আমেরিকায় ‘নির্মম যুদ্ধবিগ্রহ চালিয়েছিল’[৩]।

ইউরোপে সপ্তদশ অষ্টাদশ শতকে রাজার স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দেশে যে আন্দোলন এবং বিপ্লব সংঘটিত হয় তার মূল দাবি ছিল রাষ্ট্রের নাগরিকদের ব্যক্তিস্বাধীনতাকে প্রতিষ্ঠিত করা। রাষ্ট্রে সকল ব্যক্তি সমান, রাজায়-প্রজায় কোনো ভেদ নেই এবং ব্যক্তির দ্বারাই রাষ্ট্রের সৃষ্টি; ব্যক্তির কতকগুলি মৌলিক অধিকার বা স্বাধীনতা আছে, যেমন জীবন রক্ষার স্বাধীনতা, চিন্তার স্বাধীনতা, কথা বলার স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশগ্রহণ তথা শাসনের স্বাধীনতা। হবস, লক ও রুশো, সপ্তদশ অষ্টাদশ শতকের এই সকল প্রখ্যাত দার্শনিক ও চিন্তাবিদের রচনাতে ব্যক্তিস্বাধীনতার এরূপ তত্ত্ব প্রচারিত হতে দেখা যায়। এইসব স্বাধীনতা পুঁজিবাদের সমর্থক দার্শনিকদের এক খন্ডিত চিন্তাধারা যা মানুষকে ব্যক্তিগত মালিকানা থেকে স্বাধীন করে না, মুনাফা থেকে স্বাধীন করে না, পুঁজি থেকে স্বাধীন করে না, ব্যবসা থেকে স্বাধীন করে না, পণ্য থেকে স্বাধীন করে না, যুদ্ধ থেকে স্বাধীন করে না, নিপীড়ন থেকে স্বাধীন করে না, শোষণ থেকে স্বাধীন করে না, শ্রমদাসত্ব থেকে স্বাধীন করে না।

ইউরোপে পুঁজিবাদের বিকাশ ঘটে গোটা দুনিয়ায় উপনিবেশ স্থাপনের ফলে এবং পরিণতিতে এশিয়া, আফ্রিকা ও আমেরিকার মানুষ পরাধীন হয়ে যায়। এই স্বচ্ছ দৃষ্টিতে দেখলে উদারতাবাদ হয়েছে একটি গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও মানবতাবিরোধী এক মতবাদ। পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী দেশের বুদ্ধিজীবী, লেখক ও রাজনীতিবিদেরা উদারতাবাদের যে কথা বলেন তা হচ্ছে নিপীড়িত দেশের জনগণের জন্য পরাধীনতার নামান্তর। ফলে উদারতাবাদ হয়েছে একটি প্রতিক্রিয়াশীল স্বাধীনতাবিরোধী মানবতাবিরোধী একটি অসংগত অপূর্ণাঙ্গ চিন্তাধারা যা পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর লুটতরাজকে সমর্থন করার নামান্তর। এই মতবাদ বিশ শতকে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর অভ্যন্তরে যদিও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের কথা বলে কিন্তু নিপীড়িত দেশগুলোর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিপক্ষে দাঁড়ায়।

অণুবীক্ষণ যন্ত্রের মাধ্যমেও উদারনীতিকদের কথাতে সত্য খুঁজে পাওয়া যাবে না, উদারনীতি বিশ শতক থেকে বিশাল মিথ্যার মিথ্যার পিরামিড নির্মাণ করেছে। উদারনীতিকের সমর্থক লেখক বুদ্ধিজীবীরা সেই সব সুবিধা পেয়েছে যা দরিদ্র দেশসমূহকে শোষণের ফলেই আসে। সেইসব সুবিধার ফলেই তারা অন্যের মতপ্রকাশকে সহ্য করে।

জন স্টুয়ার্ট মিল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ব্যক্তির স্বাধীনতার সমস্যার বিশ্লেষণ করে ‘অন লিবার্টি’ বা ‘স্বাধীনতা প্রসঙ্গে’ শিরোনামে প্রবন্ধ রচনা করেন। রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে ব্যক্তিস্বাধীনতার উপর লিখিত মিলের সেই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনাটি একটি অসংগত অপূর্ণাঙ্গ আলোচনা যা পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী দেশসমূহে খ্যাতি লাভ করেছে। উদারতাবাদী দার্শনিকদের সেই স্বাধীনতার আলোচনায় স্বাধীনতা বা মুক্তি প্রসঙ্গে প্রধান কথাগুলো আলোচনা করেননি; ফলে উদারতাবাদিদের স্বাধীনতা হয়েছে প্রতিক্রিয়াশীল স্বাধীনতা। যেমন উদারতাবাদের তাত্ত্বিক গুরু সমর্থক জন স্টুয়ার্ট মিল ছিলেন ব্যক্তিস্বাধীনতার ঝাণ্ডাধারী। ব্যক্তি স্বাধীনতার অলঙ্ঘনীয়তার উপর জোর দিতে গিয়ে মিল বলেছিলেন,

“এমন যদি হয় যে, সমগ্র মানবজাতি একদিকে এবং একটিমাত্র ব্যক্তি বিপরীত দিকে, সমগ্র মানবজাতি একটি মতের পোষক এবং একটিমাত্র ব্যক্তি বিপরীত মতের পোষক, তা হলেও আমি বলব, ঐ একটিমাত্র ব্যক্তির বিরোধী মতকে দমন করার অধিকার সমগ্র মানবজাতির নেই, যেমন নেই একটিমাত্র ব্যক্তির (যদি তার সেরূপ ক্ষমতা থাকে) মানব জাতির মতকে দমন করার।”[৪]

অর্থাৎ ব্যক্তিমাত্রের চিন্তার স্বাধীনতা এবং তা প্রকাশের স্বাধীনতা পুঁজিবাদী গণতন্ত্রের একটি বিকলাঙ্গ শর্ত। সংখ্যা কিংবা শক্তির আধিক্য ব্যক্তির এই মৌলিক স্বাধীনতাকে বিনষ্ট করতে পারে না, সেরূপ করার কোনো অধিকার কারোর নেই বলে বিবেচনা করতেন মিল। মিলের এই ব্যক্তিস্বাধীনতার চিন্তা মানুষকে সম্পত্তির ব্যক্তিমালিকানার অধীন করে, মানুষকে পুঁজি ও সাম্রাজ্যের অধীন করে, মানুষকে একক নৃশংস লোভী ভয়ংকর জন্তুরূপে হাজির করে, তাদের সামাজিকতাকে লোপ করে, তাদের যৌথতাকে ধ্বংস করে।

উদারনীতিতে বিশ্বাসীদের পক্ষে শোষণমূলক পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী দলে যােগ দেওয়া এখন সুবিধাজনক। তাঁরা চান চিন্তা ও কাজের অবাধ স্বাধীনতা, শোষণের স্বাধীনতা। ফলে সেটা দলীয় আনুগত্য ও পুঁজিবাদী শ্রেণী শ্রমিককে তার ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত করে। শােষণ থেকে যে মুনাফা পাওয়া যায়, অর্থাৎ উদ্বৃত্ত মূল্য, সেটা পুঞ্জীকৃত মূলধনে (accumulation of capital) পরিণত হয়। তখন তার দুটি প্রবণতা দৃষ্ট হয়: প্রথমটিতে পুঁজিপতির হাতে যতই মুলধন জমতে থাকে, শ্রমিকেরা ততই সংগঠিত হয়ে ওঠে। দ্বিতীয়টিতে পুঁজিপতির মূলধন যতই নতুনভাবে বিনিয়ােগ করা হবে, কর্মহীন শ্রমিক বাহিনীর (reserve army of labour) ততই কর্মসংস্থান হবে। ক্রমান্বয়ে এই প্রক্রিয়ার ফলে বিনিয়ােগের অনুপাতে শ্রমিক পাওয়া যাবে না এবং মুনাফার পরিমাণও কমতে থাকবে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা পরিপূর্ণ হয়ে উঠলে পুঁজিপতির মুনাফা কমে আসে। তখনই দেখা দেয় পুঁজিবাদের অনিবার্য সংকট।[৫]

পুঁজিবাদের পথধারী উদারনীতি এইভাবে সংকটকে ঘিরে আবর্তিত হয় এবং জনগণের জীবনের সংকট বৃদ্ধি করে তাঁদেরকে যুদ্ধ-বিগ্রহে ঠেলে দেয়। উদারনীতিকেরা সাধারণ ভাবে কথা বলতে অভ্যস্ত, কিন্তু জনগণ চায় সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ও কর্মসূচি রূপায়ণের ইঙ্গিত। কাজেই বাস্তব পরিবেশের সঙ্গে উদারনীতিকদের খাপ খাইয়ে চলা মুশকিল। তাই উদারনীতিকেরা শোষণ ও লুণ্ঠনের পক্ষের পরজীবী।

তথ্যসূত্র:

১. গঙ্গোপাধ্যায়, সৌরেন্দ্রমোহন. রাজনীতির অভিধান, আনন্দ পাবলিশার্স প্রা. লি. কলকাতা, তৃতীয় মুদ্রণ, জুলাই ২০১৩, পৃষ্ঠা ৫০।

২. গঙ্গোপাধ্যায়, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ৫১।

৩. লেনিন, ভি আই, যুদ্ধ ও বিপ্লব, প্রথম প্রকাশ ২৩ এপ্রিল, ১৯২৯ প্রাভদা; দেখুন সাম্রাজ্যবাদ ও সাম্রাজ্যবাদীদের প্রসঙ্গে, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, তারিখহীন, পৃষ্ঠা ১৪৯।

৪. জন স্টুয়ার্ট মিল, On Liberty.

৫. গঙ্গোপাধ্যায়, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ৫২।

Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই “পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি” প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১০টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর “সমাজতন্ত্র” ও “মার্কসবাদ” গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন “বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা” নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top