Main Menu

বাস্তুসংস্থানবিদ্যা– অরুণেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

বাস্তুসংস্থানবিদ্যা বা ইকোলজি (ইংরেজি: Ecology) শব্দটি আজ বহুল ব্যবহারে আমাদের জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চার নিকটপথে এসে মিলছে। এখানে ওখানে, শ্রবণে দর্শনে ইকোলজি আলোচনা, পরিবেশ চর্চায় ক্রমশই অপরিহার্য হয়ে চলেছে। হবারই কথা। কারণ এই শব্দটিই তো আমাদের ভবিষ্যৎ পরিবেশমুখী জীবন গঠনে অপরিহার্য আশার ধ্রুবতারা। শব্দব্রহ্মটির শক্তি অনেকখানি, তার থেকেও বেশি তার আশা আকাঙ্ক্ষার আকাশটি । আকাশই বটে, কারণ এই বসুন্ধরার যত অবয়বী জীবন্ত প্রাণ রয়েছে, তাদের স্বাভাবিক আবাস কথা-ই ইকোলজি’র মূলকথা। কত বিস্তৃত এবং প্রত্যক্ষ পরিসর, কী তার ব্যাপ্তি—শব্দটির মধ্যেই জড়িয়ে আছে যেন আমাদের সব হতে আপন জীবনবাণী ।

ইকোলজি শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দমালা থেকে। ‘ঐকোস’ অর্থাৎ গৃহ বা বাসা; আর ‘লোগাস’ অর্থাৎ বাণী-অনুয়ে ইকোলজি। গৃহবাণী আমাদের কাছে নিশ্চয়ই নতুন কথা, নতুন শব্দ নয়। বনবাণীতে বেড়ে উঠেছি আমরা—‘শুনি না বলা বাণীর’ সত্য সংগীতমালাকেও। এই বাণীকে জীবনচর্চায় যুক্ত করাই আজ জীবব্যবস্থা সংরক্ষণ কর্মের বড় কাজ। পৃথিবীর সম্পদ এই বিস্তীর্ণ প্রকৃতি, প্রাণ প্রাণী সমগ্র জীবমণ্ডল, মানুষ বাসা লাভ করেছে একই ছন্দে বসানো এমনই প্রকৃতি পরিবেশে।

বিভিন্ন জীবগোষ্ঠীগুলি পারস্পরিক নির্ভরতায় স্বাভাবিক বাস্তু শৃঙ্খলাকে ভিত্তি করেই বেঁচে থাকে। এমন অভিপ্রেত সমষ্টি জীবনকেই বলা হয় বাস্তুতন্ত্র বা ইকোসিস্টেম। জীবসমাজ এবং তার পরিবেশ—এই নিত্যসম্বন্ধতা থেকে গড়ে ওঠে একেকটি স্থানের কত না বৈচিত্র্যের বাস্তুতন্ত্র। প্রাণ, প্রাণী, সজীব উদ্ভিদ, গুল্ম, গাছ লতা আর মানুষে মিলেমিশে গড়ে তোলে সুন্দর বাস্তুব্যবস্থা। যেমন ধরা যাক, কাছের এক অরণ্যভূমি। বিস্তীর্ণ সেই সবুজ প্রান্তে সূক্ষ্মতম কীটপতঙ্গ থেকে বৃহৎ পশু, পাখি, প্রাণিকুল; আবার ঘাসফুল থেকে মহীরুহ প্রঙ্গাবান বৃক্ষসারি—তারই মাঝে স্থান পেয়েছে স্থানীয় আদিবাসী মানুষ। সকলেই অরণ্য ভূমিশ্রীর পুত্র-পুত্রী। সমান অধিকারে জীবপ্রাণ বৃহত্তর জীবসমাজ একে অপরের প্রতি ভারসাম্য বজায় রেখে, জীবননির্বাহ করে চলেছে। খাদ্য ব্যবস্থার নির্মাণও সৃষ্টি ছন্দে, নিত্য জীবনমালা যেন সংস্থাপিতও হয়ে চলেছে। জীবন ও জীবিকার ছন্দ অরণ্য পরিবেশকে সংরক্ষণ, সম্প্রসারণ এবং স্বাস্থ্যবানও করে চলে। এমনই প্রকৃতিনিহিত ধর্মকে মানিয়ে নিয়ে যে জীবন আচরণ গড়ে ওঠে, সেই বৃহত্তর সপ্রাণ জগৎকথায়—বাস্তুব্যবস্থা,বাস্তুতন্ত্রের পারস্পরিক ভারসাম্য বজায় রাখার দায়িত্বের ডাক আছে। এই দায়িত্ব পালন বুদ্ধিশ্রেষ্ঠ মানুষের ভূমিকা তো অনেকখানি। এই গৃহবাণী বিদ্যাচর্চা ও অধ্যায়কেই বলা হয়ে থাকে ইকোলজি, অনেকক্ষেত্রে বাস্তুবিদ্যা।

১৮৬৬ সাল নাগাদ ইকোলজি বিদ্যাচর্চাকে জনপ্রিয় করে তোলেন জার্মান দেয় বিশিষ্ট প্রাণীবিদ্যাবিদ আর্নস্ট হেইকেল। তিনি প্রাণীদের সঙ্গে জৈব-অজৈব পরিবেশ সম্পর্ক নিয়ে বিশিষ্ট কাজ করে, আধুনিক বিজ্ঞানে সাড়া ফেলেন। তাদের পারস্পরিক সহযোগিতা ও সংঘর্ষের নানান রূপরেখা তার গবেষণায় বিশিষ্ট স্থান পায়। বলা যেতেই পারে এর পর থেকেই ইকোলজি আধুনিক বিজ্ঞান চর্চায় বিস্তৃত হতে থাকে। এই শতকের ষাটের দশকের পর থেকে প্রথমে আমেরিকায় পরে পরেই পৃথিবীর দিকে দিতে পরিবেশ দূষণে আক্রান্ত বৃহত্তর সমাজ ক্রমশই ইকোলজি বিদ্যা ও প্রয়োগচর্চায় সচেষ্ট হয়ে ওঠে। পরিবেশ দূষণছায়ায় আক্রান্ত আজ এই পৃথিবীর জীবমণ্ডল সমগ্রতার ছন্দে আর সুরে সুর মেলাচ্ছে না। ছন্দোময় প্রকৃতি-ত্রাণ অভিমুখী মনুষ্যত্বের আদর্শ জীবনে আজ নানা বিঘ্নের মেলা। জীবনযাত্রার ভারসাম্যহীন আচরণ ও অসামাস্য অবস্থা থেকে দূষণে বিপর্যস্ত আজ বায়ুমণ্ডল, মৃত্তিকা, জলপ্রাণ—জীবমণ্ডল। এমন ঐতিহাসিক বেসামাল অবস্থার মুখোমুখি আমরা নিত্যজীবনযাত্রায়। জঞ্জালে, আবর্জনায়, ধুলো বালিতে, কি শহর নগর কিংবা গ্রাম নদী, জলাশয়, বনভূমি, পাহাড়, উপত্যকা, মরুভূমি কেউই বাদ যাচ্ছে না।

একদিকে যেমন প্রত্যক্ষ পরিবেশ দূষণ ছায়ায় জীবন অতিষ্ট, আর একদিকে পরোক্ষ প্রভাবে রোগ মহামারী, দুরারোগ্য ব্যাধিতে মানুষের জীবন ক্রমশই বিপর্যস্ত হয়ে চলেছে। আবাসস্থলে এমন ছন্দ বিপর্যয়ে, জীবপ্রাণ শৃংখলা যতই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, সামগ্রিক স্বাভাবিক বাস্তুব্যবস্থা এবং বাস্তুতন্ত্র ততই দিশাহারা হয়ে চলেছে। যারা মানুষের মতো কথা কইতে পারে না, অন্যান্য প্রাণ-প্রাণীজগৎ তাদের নীরব ভাষায় ও আচরণে বারে বারে জানিয়ে চলেছে ছায়াঘন অন্ধকারময় জীবসংকোচন-ভবিষ্যত। এমন ভয়ানক অবস্থায় গৃহবাণী-চর্চা, ইকোলজি সংক্রান্ত নিবিড় তথ্যভিত্তিক কিন্তু প্রাণময়তায় ভরা আন্তঃসম্পর্কযুক্ত বিদ্যা ও প্রয়োগ চর্চার কথাই উঠেছে বারে বারে, সংগত কারণেই দেশে দেশে এবং আমাদের দেশেও এই চর্চায় বিজ্ঞানী, প্রযুক্তিবিদ, মানবিক-ভূগোলবিদ, সমাজবিজ্ঞানী এমন প্রায় সকলে মিলে জীবন ও জীবন-অভিমুখী। চর্চা গড়ে তুলছেন। কাজগুলি নির্মিত হচ্ছে অনেকটাই জরুরি অবস্থা সামলাতে। আবাসভূমির প্রকৃত অবস্থা জানতে এবং একই সঙ্গে বিশ্বপ্রাণময় চেতনার উদ্বোধনে সকলকে মেলাতে।

এই বিদ্যাচর্চায়, মজার কথা হলো, যদিও বিষয়টি প্রধানত জীববিজ্ঞানসংক্রান্ত ধারায় পড়ে, কিন্তু কখনোই তা কোনো নির্দিষ্ট খোপবদ্ধতায় আটকা পড়ে না। আটকে রা যায়ও না। কারণ ইকোলজি তো শুধু প্রাণ প্রাণীর জৈবিক আবাসস্থলের কথাই বলে না; বিস্তৃত বহুমাত্রিক সাধনায় বায়ুমণ্ডল, জলধারা, আবহাওয়া, মত্তিকা, পাথুরে দেহ এমন নানান বাস্তু ব্যবস্থার নানা কথার মাঝে জীবপ্রাণের সামাজিক মানসিক আচরণ ও চোখের দেখা, মনের দেখার প্রয়োগ শিল্পদৃষ্টি দিয়ে আমাদের জ্ঞান বিজ্ঞান ঐতিহ্যকে জীবনযুক্ত করাই আধুনিক বাঙালিয় ইকোলজি চর্চার বিশিষ্ট সময় দিক।

প্রাচ্য-প্রতীচ্যের বৃহত্তম সমন্বয়ী গৃহবাণী—বিশ্বপ্রাণময়তার, যে অভিজ্ঞতা শিক্ষা রবীন্দ্রনাথ এনে দিয়েছিলেন, শতাব্দী উত্তীর্ণ সেই আলোকরেখায় মিলতে হবে:

… প্রকৃতির মধ্যে যে এমন একটা গূঢ় গভীর আনন্দ পাওয়া যায়, যে কেবল সঙ্গে আমাদের একটা সুবৃহৎ আত্মীয়তার সাদৃশ্য অনুভব করে—এই নিত্য সঞ্জীবীত সবুজ সরল তৃণলতা-তরুগুল্ম, এই জলধারা, এই বায়ুপ্রবাহ, এই সতত ছায়ালোকে আবর্তন, এই ঋতুচক্র, এই অনন্ত-আকাশ পূর্ণ জ্যোতিষ্কমণ্ডলীর প্রবহমান স্রোত পৃথিবীর অনন্ত প্রাণীপর্যায়, এই সমস্তের সঙ্গেই আমাদের নাড়ীর রক্তচলাচলের যোর রয়েছে সমস্ত বিশ্বচরাচরের সঙ্গে আমরা একই ছন্দে বসানো….।

আমার সঙ্গে এই বিশ্বের ক্ষুদ্রতম পরমাণুর বাস্তবিক কোনো জাতিভেদ নেই, সেই জন্যেই এই জগতে আমরা একত্রে স্থান পেয়েছি— নইলে আমাদের উভয়ের জন্যে দই ভিন্ন জগৎ সৃজিত হয়ে উঠত। আমি যখন মাটির সঙ্গে মাটি হয়ে যাব, তখনও আমার অনন্ত প্রাণময় বিশ্বাত্মীয়ের সঙ্গে বন্ধন বিচ্ছিন্ন হবে না— আমি আমার নিজের ভিতরকার সহজ আনন্দ থেকেই এইটে অনুভব করি… – ছিন্নপত্রাবলী

ইকোলজি চর্চায় এমন বিশ্বপ্রাণ ভাবনা ও অনুভূতি চিন্তাই নিবিড় জীবন-সাধন সংগীত। প্রযুক্তি, বিজ্ঞান, সাহিত্য একাকার হয়ে উঠে অনন্ত প্রাণময়তার কথকতা শোনায়। আমাদের নিজেদের ভিতরকার সহজ আনন্দকে সামনে এনে আত্মীয়তা অনুভবের শিক্ষাই তখন ভবিষ্যতের ‘ইকোলজি’।

তথ্যসূত্র:

১. সুধীর চক্রবর্তী; বুদ্ধিজীবীর নোটবই, নবযুগ প্রকাশনী, বাংলাবাজার, ঢাকা, প্রথম সংস্করণ ফেব্রুয়ারি ২০১০, পৃষ্ঠা, ৮১-৮৪।






Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *