Main Menu

আঠারো শতকের ষাটের দশকে শাসন সংস্কার

ঔপনিবেশিক শাসন প্রণালীর পরিবর্তন

১৮৫৭-১৮৫৯ খ্রীস্টাব্দের গণ-অভ্যুত্থান ভারতের ইতিহাসে একটি অতি গুরত্বপূর্ণ ঘটনা। এতে ব্রিটিশ শাসনের সামাজিক ভিত্তির আপেক্ষিক দুর্বলতা প্রকটিত হয়েছিল এবং শোষকদের বিরুদ্ধে জনগণের গভীর ঘৃণাও আত্মপ্রকাশ করেছিল। প্রসঙ্গত জওহরলাল নেহরুর ‘ভারত সন্ধানে’ বইটির একটি উদ্ধৃতি উল্লেখ্য: ‘বিপ্লর কেবল প্রত্যক্ষভাবে দেশের কোনো কোনো অংশে দেখা দিলেও এটি সারা ভারতকে, বিশেষত ব্রিটিশ শাসনকে কাঁপিয়ে তুলেছিল’।

ষাটের দশকের শাসন সংস্কার

প্রশাসন যন্ত্রের মজবুতি এবং নতুন ঐতিহাসিক পরিস্থিতির চাহিদা পূরণের জন্য ব্রিটিশ বুর্জোয়ারা ঔপনিবেশিক শাসন প্রণালীর উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন সাধনে বাধ্য হয়েছিল। এইসব শাসন সংস্কারের পথে রাষ্ট্রযন্ত্রের শেষ রূপটি, অর্থাৎ ব্রিটিশ কর্তৃক ভারতে ঔপনিবেশিক দাসত্ব কায়েমের মূল উপায়গুলি প্রধানত স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।

মার্কস দেখিয়েছেন যে, ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগেই ভেঙ্গে পড়েছিল[১], কারণ, এটি কেবল ভারতেই নয়, ব্রিটেনেও সুনাম খুইয়েছিল, অনেক আগেই ঐতিহাসিক কালসঙ্গতিও হারিয়ে ফেলেছিল।

১৮৫৮ খ্রীস্টাব্দের ২ আগস্ট ব্রিটিশ পার্লামেন্ট কর্তৃক ‘ভারতে সুশাসন’ প্রবর্তনের আইন প্রণয়নের মাধ্যমে ভারতের রাষ্ট্রক্ষমতা ব্রিটিশ রাজের উপর ন্যস্ত হয় এবং ঔপনিবেশিক শাসন অতঃপর ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ও সরকারের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে আসে। এভাবে দ্বৈতশাসন ব্যবস্থা অর্থাৎ নিয়ন্ত্রক বোর্ড ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পরিচালক মণ্ডলীর মাধ্যমে শাসন পরিচালনার অবসান ঘটে। ব্রিটিশ সরকার এই সংস্থাগুলি ভেঙ্গে দিয়ে নবগঠিত ভারত বিষয়ক মন্ত্রকের কাছে এগুলির কার্যাদি হস্তান্তর করে এবং এটির তত্ত্বাবধায়কের (রাষ্ট্রীয় সচিব) অধীনে ব্রিটিশ ও ভারতীয় সিভিল সার্ভিসের প্রধান প্রধান কর্মচারীদের নিয়ে ভারতীয় পরিষদ নামে একটি উপদেষ্টা-সংস্থা গঠিত হয়। ব্রিটিশ গভর্নর-জেনারেল ভাইসরয় উপাধি নিয়ে দেশে ব্রিটিশ রাজের প্রত্যক্ষ প্রতিনিধি হয়ে উঠেন। প্রশাসন কেন্দ্রীভূত করে ব্রিটিশ বুর্জোয়ারা ঔপনিবেশিক প্রশাসনের কার্যকলাপে তাদের নিয়ন্ত্রণ মজবুত করেছিল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সম্পত্তি ব্রিটিশ রাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তরিত করা হয়। কিন্তু কোম্পানির শেয়ার-মালিকরা এজন্য ভারতীয় বাজেটের অংশ থেকে (অর্থাৎ, ভারতীয় করদাতাদের খরচায়) মোট ৩০ লক্ষ পাউন্ডের খেসারত পেয়েছিল।

১৮৫৭-১৮৫৯ খ্রীস্টাব্দের বিদ্রোহে সিপাহী বাহিনীগুলির সক্রিয় অংশগ্রহণের প্রেক্ষিতে ১৮৬১-১৮৬৪ খ্রীস্টাব্দে সামরিক সংস্কার প্রবর্তিত হয়েছিল। ব্রিটিশ ইউনিট ও উপ-ইউনিটগুলির অধিকতর গুরত্বপূর্ণ ভূমিকার ব্যবস্থা রেখেই এই পুনর্গঠন সম্পূর্ণ করা হয়েছিল (সংস্কারের পূর্বেকার ব্রিটিশ ও সিপাহীদের ১:৬ অনুপাতটি পরে ১:২ ও আরও পরে ১:৩ অনুপাতে পৌঁছয়)। তারা বিভিন্ন জাতি, ধর্ম ও বর্ণের সিপাহীদের মিশ্রণ ঘটিয়েই ইউনিটগুলিকে পুনর্গঠিত ও সম্প্রসারিত করেছিল। এবার পাঞ্জাবী শিখ এবং হিমালয়ের পাদদেশের ও নেপালের পাহাড়ী জাতিগুলি থেকেই অধিকাংশ সিপাহী সংগহীত হচ্ছিল, যেসব জাতিগুলির সঙ্গে দেশের মুল ভূখণ্ডের জনগণের বিশেষ কোনো সংযোগ ছিল না। সিপাহী ও ব্রিটিশ সৈন্যরা পেত যথাক্রমে মসৃণ নলের আর পেচকাটা নলের রাইফেল। সিপাহীদের তুলনায় সামরিক কৃৎকৌশলের ক্ষেত্রে ব্রিটিশ সৈন্যদের উৎকর্ষতা টিকিয়ে রাখার জন্য গোলন্দাজ বাহিনীতে তাদের একক আধিপত্য রাখা হয়েছিল।

সামরিক সংস্কারের ক্ষেত্রে অধস্তন অফিসার নিয়োগের ব্যাপারে একটি নতুন পদ্ধতি প্রবর্তনের মাধ্যমে ব্রিটিশরা ভারতীয় সামন্ত অভিজাতদের সামরিক উচ্চপদে উন্নীত হওয়ার ব্যবস্থা পাকা করেছিল।

দেশের ঔপনিবেশিক শাসনের অন্যান্য রদবদলের মতো এই সামরিক সংস্কারেরও দুটি উদ্দেশ্য ছিল: একদিকে ভারতে ব্রিটিশ রাষ্ট্রযন্ত্রের কেন্দ্রীকরণ ও দৃঢ়ীকরণ, অন্যদিকে ঔপনিবেশিক শাসনের সপক্ষে ভারতীয় সমাজে সমর্থন লাভের একটি মজবুত ভিতপ্রতিষ্ঠা, অর্থাৎ সামন্ত ভূস্বামী শ্রেণীর সমর্থন নিশ্চিত করা।

এটিই ছিল এই কালপর্বে প্রবর্তিত শাসন সংস্কারের মর্মবস্তু। ভারতীয় পরিষদের আইনানুসারে (১৮৬১) ভাইসরয়, তিনটি প্রেসিডেন্সির গভর্নর হয়, উত্তর-পশ্চিম প্রদেশগুলি ও পাঞ্জাবের লেফটন্যান্ট গভর্নরগণের নেতৃত্বে উপদেষ্টামুলক ব্যবস্থাপক সভা গঠিত হয়। এই পরিষদ সদস্যের অন্তত অর্ধেক অবশ্যই সিভিল সার্ভিস বহিস্থ ব্যক্তিদের মধ্যে থেকে মনোনীত হবেন, এটিই নির্ধারিত ছিলো। ১৮৬১ খ্রীস্টাব্দে কমন্স সভায় প্রদত্ত তৎকালীন ভারত সচিব স্যার চার্লস উডের বক্তৃতায়ই এই সংস্কারের উদ্দেশ্য স্পৃষ্ট হয়ে উঠেছিল। এতে দেশীয় উচ্চশ্রেণীকে ব্রিটিশ শাসনের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন করে তোলার সেরা উপায় হিসাবে তাঁর নিশ্চিত বিশ্বাসের ভিত্তিতে তিনি ভারতীয় সামন্তদের ব্যবস্থাপক সভার কাজে শরিক করার প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করেছিলেন।

ব্যবস্থাপক সভা কিন্তু ভাইসরয় ও প্রাদেশিক গভর্নরদের প্রাধিকারী বৈশিষ্ট্যকে বিন্দুমাত্রও ক্ষয় করে নি। লক্ষণীয় যে, ১৮৬১ খ্রীস্টাব্দের ভারত পরিষদ বিধিতে ফিনান্স, কর, সামরিক বাহিনী, ধর্ম, ভারতীয় রাজ্যগুলির পারস্পরিক সম্পর্ক তথা বৈদেশিক সম্পর্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ব্যাপারগুলিকে বিশেষ উল্লেখক্রমে পরিষদের আলোচনার একতিয়ার বহিস্থ রাখা হয়েছিল। ঔপনিবেশিক প্রশাসনের বিভিন্ন বিভাগের প্রধানদের সমবায়ে গঠিত একটি নির্বাহী পরিষদ ভাইসরয়ের উপদেষ্টা হিসাবে কাজ করত। কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক ব্যবস্থাপক সভার যেকোনো সিদ্ধান্ত বাতিলের অধিকার ভাইসরয়ের ছিল।

তৎকালীন আইন সংস্কার ও রাষ্ট্রযন্ত্র অধিকতর কেন্দ্রীকরণ সহ এটি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক কর্মচারীদের আরও প্রভাববৃদ্ধির লক্ষ্যেই নিষ্পন্ন হয়েছিল। ফলত, সুপ্রিম কোর্ট ও কোম্পানি কোটগুলি (‘সদর দেওয়ানি’ ও ‘নিজাম আদালত’) উঠে যায় এবং ১৮৬১ খ্রীস্টাব্দে তিনটি প্রেসিডেন্সির প্রত্যেকটিতে ও ১৮৬৬ খ্রীস্টাব্দে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশগুলিতে হাই কোর্ট প্রতিষ্ঠিত হয়।

উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ঔপনিবেশিক ভারতের রাষ্ট্রযন্ত্র মোটামুটি নির্দিষ্ট আকার লাভ করেছিল। ব্রিটিশ শোষক শ্রেণীর স্বার্থরক্ষাই ছিল এটির প্রথম ও প্রধান কাজ। এজন্যই এটির উচ্চতর স্তরগুলি (ভারতের জন্য আইন প্রণয়নকারী পার্লামেন্ট এবং বিশেষ মন্ত্রকের সাহায্যে ঔপনিবেশিক প্রশাসনের কার্যাদি নিয়ন্ত্রক সরকার) ব্রিটেনে অবস্থিত ছিল।

তথ্যসূত্র ও টিকা:

১. K. Marx, Notes on Indian History, p. 186.

২. কোকা আন্তোনভা, গ্রিগরি বোনগার্দ-লেভিন, গ্রিগোরি কতোভস্কি; অনুবাদক দ্বিজেন শর্মা; ভারতবর্ষের ইতিহাস, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, প্রথম সংস্করণ ১৯৮২, পৃষ্ঠা, ৫৫২-৫৫৪।

আরো পড়ুন






Related News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *