Main Menu

ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে ভারতীয় সংস্কৃতি

সর্বাঙ্গীন পরিচিতি

আকবরের রাজত্বকালে ভারতীয় সংস্কৃতি ক্ষেত্রে প্রাধান্য লাভ করেছিল মুসলমান ও হিন্দু, এই দুটি প্রধান সংস্কৃতি থেকে আহৃত উপাদানসমূহের এক সংশ্লেষণী প্রক্রিয়া। হিন্দু সংস্কৃতির উপাদানগুলি স্পষ্টতই প্রাধান্য পেয়েছিল ফতেপুর সিক্রির অট্টালিকাগুলির স্থাপত্যশৈলীতে : তাই আমরা দেখতে পাই সমতল ছাদের গঠন, ফুলের মালার বিজড়িত ছাঁদে হিন্দু অলঙ্করণ-শৈলীর ছাপ, ইত্যাদি। ফতেপুর সিক্রিতে কিছু-কিছু দালানের ছাদের কার্ণিশ অলঙ্কৃত করা হয়েছিল জীবজন্তুর মতি দিয়ে এবং রাজপ্রাসাদের একটি ঘরের দেয়ালে ছিল পশুপাখিদের মতিশোভিত একখানি ব্যাস-রিলিফের খোদাই-কাজ। এই মূর্তিগুলি পরে কুপিয়ে কেটে নষ্ট করে ফেলা হয় আওরঙ্গজেবের হুকুমে। কারণ আওরঙ্গজেব ছিলেন কোরানের কঠোর অনুসারী এবং কোরানে নির্দেশ আছে যে কোনো জীবন্ত প্রাণীর প্রতিমূর্তি ইত্যাদি গড়া চলবে না।

পারসি-ভাষায় লিখিত আকবরের দরবারের কাব্যগুলিতে ধর্মীয় সহিষ্ণুতার নানা লক্ষণ লক্ষ্য করা যায়—যেমন, কবির প্রিয়তমার সঙ্গে হিন্দু দেবীর তুলনা এবং কবির নিজেকে তুলনা করা ব্রাহ্মণের সঙ্গে, তাছাড়া সর্বজনীন মানবপ্রেমের কাব্যিক প্রশস্তি-রচনা। কিছু-কিছু কবি তখন হিন্দু পুরাণ থেকে উপাখ্যান সংগ্রহ করেও সে-বিষয়ে কাব্যরচনা করেছিলেন (যেমন, আবুল ফজলের ভাই ও আকবরের সময়ে ফারসি-ভাষার কবিদের মধ্যে অন্যতর প্রধান ফৈজী রচনা করেছিলেন ‘নল-দময়ন্তী’ কাব্য)। আবুল ফজল স্বয়ং তাঁর ‘আইন-ই-আকবরি’ (আকবর-প্রচলিত সংবিধি) গ্রন্মে (এটি তাঁর ইতিহাস-গ্রন্থ ‘আকবরনামা’র অংশ হিসেবে লিখিত হয়, তবে বর্তমানে এটি পৃথক গ্রন্থ হিসেবেই প্রকাশিত হয়ে আসছে) অনেকখানি স্থান ছেড়ে দেন প্রাচীন ভারতের দার্শনিক মতবাদগুলির, হিন্দুসমাজে স্বীকৃত অধিকারসমূহ ও হিন্দুরীতিনীতির এবং হিন্দপুরাণগুলির বর্ণনায় ও ব্যাখ্যায়। ‘আইন-ই-আকবরি’র ‘দশটি সুবার জরিপ’ শীর্ষক একটি অধ্যায়ে প্রতিটি ‘সুবা’ (বা অঞ্চল)-এর বিশদ বিবরণ দিতে গিয়ে আবুল ফজল ওই অঞ্চলের হিন্দু-জনসাধারণের রীতিনীতি, আচার-ব্যবহার, তাঁদের মন্দির ও তীর্থস্থান এবং অন্যান্য কীতি স্তম্ভ ইত্যাদি সম্পর্কিত বহু তথ্যের সন্নিবেশ ঘটিয়েছেন। পরবর্তী যুগে অবশ্য উপরোক্ত এই প্রবণতার প্রকাশ হ্রাস পায় এবং বিশেষ করে আওরঙ্গজেবের আমলে কেবল-যে চারু শিল্প ও কবিতা অবক্ষয়ের যুগে প্রবেশ করে তাই নয়, এমন কি ইতিবৃত্ত-রচনাও সম্রাটের সমর্থনলাভে বঞ্চিত হয়। এক কথায়, শিল্প-সাহিত্যের সবকিছুই ছিল এই ধর্মান্ধ সম্রাটের অপছন্দ।

সাহিত্য

ওই যুগের সাহিত্যসৃষ্টি কেবলমাত্র বাদশাহের দরবারেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বহু আঞ্চলিক ভাষায় ও বহুবিধ সাহিত্য-রীতিতে প্রকাশ ঘটেছিল তার। ওই যুগে সাহিত্যের সম্ভবত সবচেয়ে প্রভাবশালী ধরনটি ছিল ‘ভক্তিবাদী কাব্য’। আঞ্চলিক ভাষাগুলিতে লিখিত লোকগীতিগুলি মধুর সুরে গেয়ে শোনাতেন ‘ভক্ত’ কবিরা, আর সেগুলির বিষয় হতো রূপক-কাহিনী কিংবা তাঁদের ধ্যানলব্ধ উপলব্ধির কথা। এইসব গানের অনেকগুলিই এখনও পর্যন্ত লোকগীতি হিসেবে টিকে আছে। ‘ভক্ত’ কবিরা মানুষের কাছে আবেদন জানাতেন জাতি ভেদ-প্রথার বিরোধিতা করতে, তাঁরা ঘোষণা করতেন যে ঈশ্বরের চোখে সকল মানুষই সমান এবং ধনী, ভূস্বামী ও ধর্মীয় নেতাদের ক্ষমতা ও প্রতিপত্তিকে ব্যঙ্গবিদ্রুপে জর্জরিত করতেন। তবে এই সমস্ত মুলত মানসিক ধ্যানধারণা তারা প্রকাশ করতেন সাধারণ ধর্মকথার আবরণে। আকবরের শাসনকাল থেকে শুরু করে পরবর্তী মোগল-যুগের শ্রেষ্ঠ ‘ভক্তিবাদী’ কবিদেরই মধ্যে ছিলেন: তুলসিদাস (১৫৩২ থেকে ১৬২৩ খ্রীস্টাব্দ), যাঁর রচিত ‘রামচরিত-মানস’ নানাবিধ হিন্দি কথ্যবুলিতে রুপান্তরিত হয়ে গীত হতো হিন্দুদের উৎসবগুলিতে ও এইভাবে তা জনসাধারণ্যে ব্যাপক পরিচিত লাভ করে; এছাড়া ছিলেন ষোড়শ শতকের শেষার্ধের কবিকুল রাজপুতানার অধিবাসী সুরদাস, রাজপুতে মহিলা কবি মীরাবাই, মহারাষ্ট্রের একনাথ, আসামের শঙ্করদেব এবং শিখ-গুরুবন্দ। বাংলায় এই যুগের দু’খানি বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ হলো কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামীরচিত চৈতন্যজীবনীকাব্য ‘শ্রীচৈতন্যচরিতামত’ এবং মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর ‘চণ্ডীমঙ্গল’-কাব্য। মুকুন্দরামের ‘চণ্ডীমঙ্গল’এ আছে সে-যুগের বাংলার বাস্তববাদী জীবনচিত্র ও তার সঙ্গে মেশানো লোককথা ও অলৌকিক কল্পনা। পঞ্চদশ-ষোড়শ শতকে ‘ভুক্তিবাদ’ আরও বিকশিত হয়ে ওঠে বাংলার বৈষ্ণব ‘গীতিকাব্যে’  চণ্ডীদাস, জ্ঞানদাস, গেবিন্দদাস, ইত্যাদির পদরচনায় এবং সপ্তদশ শতকে জাতীয় সংগ্রামের আবেদনে পূর্ণ মারাঠা ও শিখদের গানে ও গাথাকাব্যে।

ভারতে দরবারী কবিতা লেখা হচ্ছিল রাষ্ট্রভাষায়, কিন্তু সে-ভাষা জনসাধারণের মুখের ভাষা ছিল না। মোগল-সাম্রাজ্যে এই রাষ্ট্রভাষা ছিল ফারসি, আর দাক্ষিণাত্যের সুলতানশাহীগুলিতে তা ছিল উত্তর-ভারতের ভাষা উর্দু। যদিও এই দুটি ভাষায় লিখিত কাব্যে ঐতিহাসিদ্ধ ভারতীয় বিষয়বস্তু ব্যবহার করা হচ্ছিল এবং এমন কি ভারতীয় ভূ-দৃশ্য, জীবনযাত্রা-পদ্ধতি, ইত্যাদির বর্ণনাও স্থান পাচ্ছিল ক্রমে-ক্রমে, তবু প্রায় সকল ক্ষেত্রেই এইসব কাব্যের রচনারীতি ও চিত্রকল্পের ব্যবহার ছিল তাজিক ও পারসি-কাব্যনির্ভর। এই পারসি ও উর্দু ভাষা দেশের ব্যাপক জনসাধারণের কাছে পরক হলেও এই দরবারী কবিদের মধ্যে কেউ-কেউ তৎসত্ত্বেও সত্যিকার শিল্পসিদ্ধ কাব্যরচনায় সমর্থ হয়েছিলেন। পরসি ভাষায় যাঁরা লিখতেন সেই ভারতীয় কবিদের মধ্যে সচেয়ে জনপ্রিয় ছিলেন ‘ফৈজী’ বিশেষ করে গীতিকবিতা রচনায় এবং বেদিল (১৬৬৪ থেকে ১৭২১ খীস্টাব্দ)। বেদিল যদিও ‘সুফী’রূপকবর্ণনাকে তাঁর প্রধান অবলম্বন হিসেবে নিয়েছিলেন, তবু তাঁর কাব্য গভীর আবেগ ও বিষাদে পূর্ণে। জনসাধারণের নিপীড়ক স্বৈরশাসকদের নিষ্ঠুরতার নিন্দা করেছেন তিনি। ফারসি-ভাষা যখন আর ভারতের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে রইল না দেশের মানুষের কাছে বেদিল তখন কার্যত বিস্মৃতই হলেন, কিন্তু তাঁর কাব্য তখন দ্বিতীয় আশ্রয় খুঁজে পেল মধ্য-এশিয়ায়। উর্দু-ভাষায় কাব্যরচয়িতা দাক্ষিণাত্যের কবি গাওয়াসির (ষোড়শ শতাব্দী) ভাগ্যেও এই একই ব্যাপার ঘটেছে, উত্তর ভারতে তিনি পরিচিত হলেও দাক্ষিণাত্যের মানুষ তাঁর কাব্যপাঠে অসমর্থ।

ইতিহাস

ভারতের ইতিহাসবেত্তারা তাঁদের রচনাবলীতে বহু-পরিমাণে আকর-উপাদানসমূহ ব্যবহার করেছেন এবং প্রায়ই তাঁদের বর্ণনায় অঙ্গীভূত করেছেন সত্যিকার আকর-দলিলপত্র কিংবা ওইসব দলিলের সার-সংক্ষেপ। ষোড়শ শতকের মুল্যবান আকর-উপাদান মেলে বাবরের স্মৃতিকথা ‘বাবরনামায় এবং আবুল ফজলের ইতিবৃত্ত ‘আকবর-নামা’ ও বদাউনির ‘মুস্তাখব-উত-তাওয়ারিখ’। সপ্তদশ শতকে এই ধারা অনুসরণে লিখিত হয় বাংলার তৎকালীন মোগলসেনাধ্যক্ষ মির্জা নাথানের স্মৃতিকথা ‘বাখারিস্তান-ই-গাইবি’ (বসন্তবজিত দেশ) এবং আব্দুল হামিদ লাহোরি-রচিত ইতিবৃত্ত ‘পাশাহনামা’ ও মুহম্মদ সালিহ, কাম্বুর ‘আমাল-ই সালিহ’ (সালিহের শ্রম’)। আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালে কাফি খাঁ-রচিত ‘মুন্তাখব-উল-লুবব’ (নির্বাচিত রচনাংশ) আমাদের কাল পর্যন্ত টিকে গেছে।

স্থাপত্য-শিল্প

কৃষক শোষণের প্রতীক তাজমহল, আলোকচিত্র: Prateek

অন্যান্য সকল শিল্পের চেয়ে স্থাপত্য-শিল্প তখন নির্ভরশীল ছিল ধনী পৃষ্ঠপোষকদের ওপর। মোগল-সাম্রাজ্যের শক্তি ও আধিপত্য প্রসারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্রমশ বেশি-বেশি সংখ্যায় জমকালো প্রাসাদ ইত্যাদির আবির্ভাব ঘটতে লাগল। এইসব দালানে মুসলিম স্থাপত্যশৈলীর পাশাপাশি স্থান পেতে লাগল স্থানীয় ভারতীয় শিল্পরীতির ঐতিহ্য। ফতেপুর সিক্রি শহরটি তার চারপাশের ভূ-দৃশ্যপটের পরিবেশে চমৎকার খাপ খেয়ে গিয়েছিল, স্থাপত্যশৈলীর বিচারে শহরটির দালানগুলি ছিল নিরাভরণ; সরল ছাঁদের। শাহ জাহানের রাজত্বকাল ছিল স্থাপত্যশৈলীতে সমৃদ্ধ জমকালো ভাব আমদানির বিচারে সবচেয়ে উল্লেখ্য। আকবরের আমলেও ফতেপুর সিক্রিতে একটিমাত্র শ্বেতপাথরের সমাধি নির্মিত হয়েছিল শেখ সেলিম চিস্তির স্মৃতিরক্ষার্থে। আর শাহ জাহানের রাজত্বে, বিশেষ করে আগ্রা ও দিল্লীতে, স্থাপত্য-শিল্পে অলঙ্করণের প্রধান বৈশিষ্ট্যই হয়ে দাঁড়িয়েছিল অর্ধ-মুল্যবান ও কখনও-কখনও এমন কি মহা মূল্যবান মনিরত্নে পর্যন্ত খচিত চমৎকার শ্বেতপাথরের ব্যবহার। আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালেও গোড়ার দিকে বর্তমানে লালকেল্লার অন্তর্বতী মোতি মসজিদের মতো মূল্যবান উপাদানে হর্ম্য-নির্মাণের রেওয়াজ প্রচলিত ছিলো, কিন্তু পরে রাজকোষে অর্থাভাব দেখা দেয়ায় বাদশাহ আরও সাধারণ ধরনের হর্ম্য-নির্মাণের আদেশ দিয়েছিলেন। ফলে আওরঙ্গজেবের প্রিয়তমা পত্নী রাবেয়া দৌরানির কবরের ওপর নির্মিত সমাধিসৌধ মোটের ওপর তাজমহলের ঢঙে তৈরি হলেও তাতে আদি তাজমহলের সুশোভন সামঞ্জস্যবোধের অভাব ঘটতে দেখা গেছে। আবার আওরঙ্গাবাদে নির্মিত সমাধির শুধুমাত্র প্রধান সৌধটিরই সামনের দিকের দেয়াল, তাও আবার এক-মানুষ-সমান উচু পর্যন্ত, শ্বেতপাথরের ফলক লাগানো হয়েছে, আর সৌধটির বাকি অংশ নির্মিত হয়েছে হালকারঙের ঝোলে-পাথর দিয়ে। তাছাড়া এই সৌধ-সমাহারের মিনারগুলি নির্মিত হয়েছে ইট গেথে ও তার ওপর চুনের প্রলেপ দিয়ে।

পারস্য, মধ্য-এশিয়া এবং দিল্লী ও আগ্রা থেকে আমদানি দাক্ষিণাত্যের হর্ম্যগুলির মুসলিম স্থাপত্যশৈলীর বৈশিষ্ট্য ছিলো রেখার শোভনতা, কারুকার্যের জটিলতা ও সুসমঞ্জস্য অনুপাত-বোধ। অপরপক্ষে বঙ্গদেশে প্রচলিত স্থাপত্যশৈলী ততখানি ভাবপ্রকাশক হয়ে ওঠে নি। যদিও কিছু-কিছু মন্দির ও বসত-বাড়ি সেখানে কারুকার্যখচিত ও ব্যাস-রিলিফশোভিত পোড়ামাটির টালির আস্তরণ দিয়ে নির্মিত হয়েছিল, তবু সাধারণভাবে তা ছিল ইটের গাঁথুনি দিয়ে তৈরি ও চুনকাম-করা এবং দেয়ালগুলিতে জানলা থাকত খুবই কম ও তাও আবার সংকীর্ণ।

চিত্রকলা

মিনিয়েচার (ক্ষুদ্রাবয়ব) চিত্ৰই ছিল ওই যুগের চিত্রশিল্পের প্রধান ধরন। ষোড়শ শতাব্দীতে মিনিয়েচার-চিত্রর রাজপুত ধারাটি গড়ে ওঠে রাজপুতানার ভিত্তিচিত্রের প্রভাবে। এটি জৈন মিনিয়েচার-চিত্র-ঐতিহ্যের প্রবহমান ধারা হিসেবেও পরিচিত। বাদশাহের দরবারে মোগল মিনিয়েচর-চিত্রেরও একটি ধারা গড়ে ওঠে, এটি ছিল পারসিক চিত্র-ঐতিহ্যের জের। বস্তুত চিত্রকলার এই বিশেষ ধরনটির সৃষ্টি হয়েছিল পারস্যেই, যদিও মোগল-দরবারের মিনিয়েচার-চিত্রগুলি পারস্যের মিনিয়েচর-চিত্রের চেয়ে বেশি বাস্তববাদী ও কম শিল্পকেতাদুরস্ত ছিল। বস্তুত, রাজপুত ও মোগল মিনিয়েচার চিত্রকলা প্রভাবিত করেছিল পরস্পরকে। মোগল-মিনিয়েচারগুলি ছিল একমাত্রিক, শুধুমাত্র তুলির আঁচড়ে বোঝানো হতো চিত্রিত বিষয়ের আয়তন বা ত্রিমাত্রিকতা এবং নিম্ন, মধ্য ও উচ্চতর এই তিনটি স্তরের সাহায্যে চিত্রানুপাত বোঝানো হতো। এই মধ্যস্তরবতী মানুষ বা অন্যান্য বস্তুর আকারগুলি অপর দুটি স্তরের চেয়ে হতো অপেক্ষাকৃত বড়। এইসব ছবি দেখলে মনে হয় শিল্পী যেন বাড়িগুলিকে ওপর থেকে দেখছেন। সপ্তদশ শতকে, বিশেষ করে শাহ জাহানের রাজত্বকালে, ইউরোপীয় বিষয়বস্তু ইত্যাদিকেও এই মিনিয়েচর-চিত্রে কখনও কখনও প্রবেশলাভ করতে দেখা যায় (যেমন, ম্যাডোনা ও শিশুর চিত্র। আর দেখা যায় কিছু-কিছু ইউরোপীয় অঙ্কনরীতিকে গ্রহণ করতে (যেমন, কিছু কিছু মতির চিত্রাঙ্কনে আলো-আঁধারির সাহায্যে ত্রিমাত্রিকতা প্রকাশ করা)। ছবিগুলিতে ব্যবহৃত রঙ ছিল প্রাকৃতিক বস্তুজাত, সাধারণত খনিজ পদার্থ জাত, আর এই রঙ আজও পর্যন্ত অক্ষর রয়ে গেছে। দাক্ষিণাত্যে আগ্রার মিনিয়েচর চিত্রধারার মতো অনেকটা একরকম একটি মিনিয়েচর-চিত্রাঙ্কনের ধারা গড়ে উঠেছিল, তবে মোগল-দরবারের চিত্রকলার চেয়ে তা ছিল অনেক বেশি খুটিনাটি বিশদে ভরা। অষ্টাদশ শতকে চিত্রাঙ্কনের ঐতিহ্যসিদ্ধ শৈলীগুলির ক্ষেত্রে অবক্ষয় দেখা দেয়, তবে তখন রাজপুতদের ছোট-ছোট রাজ্যে চিত্রাঙ্কনের নতুন-নতুন ধারার আবির্ভাব ঘটতে দেখা যায়। এগুলি পরে পরিচিত হয় ‘পাহাড়ি’ ধারা নামে।

জনপ্রিয় উৎসবসমূহ

মধ্যযুগীয় ভারতে অতীতের মহাকাব্যের নানা ঘটনা ও জনশ্রুত বীরকাহিনীর ওপর ভিত্তি করে সঙ্গীত ও নৃত্য-সহযোগে নানা ধরনের জনপ্রিয় উৎসব ও আমোদ-প্রমোদের অনুষ্ঠান হতো। বিশেষ করে বিষ্ণুর উপাসনা ও বৈষ্ণব ধর্মের সঙ্গে এগুলি ছিল সম্পর্কিত। তামিলনাড়ুতে এই জনপ্রিয় উৎসবগুলি পরিচিত ছিল ‘টেকুটু’ নামে, কর্ণাটকে ‘যক্ষগণ’ ও অন্ধদেশে ‘বিধিনাটকম’ নামে, আর উত্তর-ভারতে ‘রামলীলা’ ও বাংলায় ‘পাঁচালি’, ‘যাত্রা’, ‘কবিগান’, ‘আখড়াই’ ইত্যাদি নামে। (অতীতের মহাকাব্যগুলির ওপর ভিত্তি করে গড়ে-ওঠা) এইসবে অবশ্য প্রায়ই সমকালীন মোগল-উৎপীড়কদের বিরুদ্ধে (ও পরে ব্রিটিশ-শাসকদের বিরুদ্ধে) ব্যঙ্গবিদ্রুপের নানা দৃশ্য ও ঘটনাও যোগ করে দেয়া হতো। কখনও কখনও বিশেষ পুজা-অনুষ্ঠান ইত্যাদি উপলক্ষে এইসব উৎসব মঞ্চস্থ হতো সামন্ত-ভূস্বামীদের গৃহে ও মণ্ডপেও। তবে রাজা-জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতার ফলে অনেক সময় উৎসবগুলি তাদের স্বাভাবিক স্বতঃস্ফূর্ততা হারিয়ে ফেলত এবং পরিণত হতো কৃত্রিম ভণ্ডামিতে।

তথ্যসূত্র:

১. কোকা আন্তোনভা, গ্রিগরি বোনগার্দ-লেভিন, গ্রিগোরি কতোভস্কি; অনুবাদক মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায়; ভারতবর্ষের ইতিহাস, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, প্রথম সংস্করণ ১৯৮২, পৃষ্ঠা, ৩৬০-৩৬৫।

আরো পড়ুন

জন্ম ৮ জানুয়ারি ১৯৮৯। বাংলাদেশের ময়মনসিংহে আনন্দমোহন কলেজ থেকে বিএ সম্মান ও এমএ পাশ করেছেন।

তাঁর প্রকাশিত প্রথম কবিতাগ্রন্থ স্বপ্নের পাখিরা ওড়ে যৌথ খামারে । বিভিন্ন সাময়িকীতে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া শিক্ষা জীবনের বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে রোদ্দুরে ডট কমের সম্পাদক।






Related News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *