আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > ইতিহাস > প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মধ্যপ্রাচ্য রণাঙ্গন চলে ২৯ অক্টোবর ১৯১৪ থেকে ৩০ অক্টোবর ১৯১৮ পর্যন্ত

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মধ্যপ্রাচ্য রণাঙ্গন চলে ২৯ অক্টোবর ১৯১৪ থেকে ৩০ অক্টোবর ১৯১৮ পর্যন্ত

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মধ্যপ্রাচ্য রণাঙ্গন বা মধ্য প্রাচ্যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের রঙ্গমঞ্চ (ইংরেজি: Middle Eastern theatre of First World War) চলে ২৯ অক্টোবর ১৯১৪ থেকে ৩০ অক্টোবর ১৯১৮ পর্যন্ত। যুযুধান পক্ষগুলো ছিল একদিকে অন্যান্য কেন্দ্রীয় শক্তিগুলির সহায়তায় অটোমান সাম্রাজ্য (কুর্দি এবং কিছু আরব গোষ্ঠীসহ); এবং অন্যদিকে, ব্রিটিশরা (ইহুদী, গ্রীক, আসিরিয়ান এবং আরবদের সংখ্যাগরিষ্ঠদের সাহায্যে আর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনে ভারতীয়দের সাথে), রাশিয়ানরা (আর্মেনিয়ানদের সহায়তায়) এবং মিত্রশক্তির মধ্য থেকে ফরাসিরা।

সিনাই ফিলিস্তিন সমর অভিযান

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পশ্চিম ও পূর্ব রণাঙ্গনের মত মধ্যপ্রাচ্য রণাঙ্গনেও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। ১৯১৫ সালের ২৮ জানুয়ারি থেকে ১৯১৮ সালের ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত সিনাই উপদ্বীপ, ফিলিস্তিন ও সিরিয়াতে তুমুল লড়াই চলে। যুদ্ধে ব্রিটিশ বাহিনী জয়লাভ করলেও অটোমান তুর্কিদের পাশাপাশি জার্মান বাহিনী ছেড়ে কথা বলেনি। স্যার জন ম্যাক্সওয়েল, আর্চিবল্ড মুরে, হেনরি, জর্জ চাউভেল, ফিলিপ চেটউট, চার্লস ডােবেল ও এডমন্ড অ্যালেনবাইয়ের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের বাহিনী আক্রমণ করে সিনাই উপত্যকা। তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন জামাল পাশা, ক্রেস ফন ক্রেসেনস্টেইন, জাদির বে, তালা বে, এরিক ফন ফাকেনহায়েন ও অটো লিমান ফন স্যান্ডার্সের নেতৃত্বাধীন তুরস্ক ও জার্মানির মিলিত বাহিনী। তুর্কি নৌমন্ত্রী জামাল পাশার নেতৃত্বে অটোমান বাহিনী সুয়েজ খালের প্রতিরক্ষায় নিযুক্ত ছিল। পানি ও রাস্তাঘাটবিহীন সিনাইয়ের ফাকা উপত্যকা পাড়ি দেয়া যেকোনাে সেনাবাহিনীর জন্য এককথায় অসম্ভব ছিল। কিন্তু ক্রেস ফন ক্রেসেনস্টেইন এই মরুভূমি পাড়ি দিয়ে তুর্কি বাহিনীর কাছে রসদ পৌছে দিতে সমর্থ হয়েছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত মিসরে নিযুক্ত ব্রিটিশ বাহিনীকে অটোমান তুর্কিদের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিন অভিযানে নির্দেশ দেয়া হয়। এদিকে পশ্চিম রণাঙ্গনে জার্মানদের স্প্রিং অফেন্সিভ শুরু হলে সিরিয়ায় হামলার পরিকল্পনা কয়েক মাস পিছিয়ে দেয় মিত্রবাহিনী।

গ্যালিপলির যুদ্ধ 

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের উত্তাল দিনগুলােতে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংঘাত শুরু হয় তুরস্কের গ্যালিপলি উপত্যকায়। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ব্রিটিশ, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও নিউ ফাউন্ডল্যান্ডের মিলিত বাহিনীর প্রায় ১৪টি ডিভিশন সৈন্য এসে জড়াে হয় স্যার আয়ান হ্যামিল্টনের নেতৃত্বে। এদিকে তাদের প্রতিরােধ করতে অটোমান সাম্রাজ্যের পক্ষ থেকে জমায়েত করা হয় ঠিক ১৪ ডিভিশন সৈন্য যার নেতৃত্বের পুরােভাগে লক্ষ করা যায় মােস্তফা কামাল ও অটো লিমান ফন স্যান্ডার্সের মত দক্ষ সেনানায়ককে। ১৯১৫ সালের ১৯ ফ্রেব্রুয়ারি শুরু হয়ে ১৯১৬ সালের ৯ জানুয়ারিতে শেষ হওয়ার এ দীর্ঘ সংঘাতে মিত্রবাহিনীর ২ লাখ ৫২ হাজার সৈন্য নিহত হয়। অন্যদিকে অটোমান তুর্কিরা জয়ী হলেও জীবন দিতে হয় ২ লাখ ৫৩ হাজার সৈন্যকে। বিশেষ করে ২৭ এপ্রিল তুর্কি সেনানায়ক কামাল অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের মিলিত বাহিনী তথা আনজাক সৈন্যদের উপকূলের দিকে তাড়িয়ে দিতে সমন্বিত হামলা চালান।

আরো পড়ুন:  প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় যুদ্ধ প্রযুক্তি শিল্পবাদ এবং অস্ত্রের জন্য ব্যাপক-উৎপাদন পদ্ধতির প্রয়োগ

কিংবদন্তী তুর্কি সেনানায়ক মােস্তফা কামালের নেতৃত্বে রাতভর যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত জয়লাভ করে তুর্কিরা। অন্যদিকে ১৯ মে তে ৪২ হাজার তুর্কি সৈন্য আনজাকের ১০ হাজার অস্ট্রেলীয় ও নিউজিল্যান্ডের বাহিনীর ওপর হামলা চালায়। টর্পেডাে হামলা চালিয়ে পর পর বেশ কয়েকটি ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দিয়ে তুর্কিরা যুদ্ধক্ষেত্রে সাফল্য দেখায়। তবে ক্রিমিয়ার দখল বুঝে নিতে মিত্রবাহিনী একের পর এক হামলা চালিয়ে যেতে থাকে। শেষ পর্যন্ত দু’পক্ষের অনেক সৈন্য হতাহত হলেও যুদ্ধের ফলাফল অপরিবর্তিত থাকে। এদিকে উপর্যুপরি ব্যর্থতার দায়ভার গিয়ে বর্তায় জেনারেল হ্যামিল্টনের ওপর। তাকে পরিকল্পনার ত্রুটির জন্য দোষারােপ করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে জেনারেল হ্যামিল্টনকে বরখাস্ত করে ব্রিটিশরা সেখান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে নেয়।

ককেশাসে সামরিক অভিযান

একেবারে শুরু থেকে শেষ অর্থাৎ ১৯১৪ সাল হতে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত ককেশাসের দখল নিয়ে লড়াই (ইংরেজি: Caucasus campaign) চলতে থাকে রুশ ও অটোমান সাম্রাজ্যের মধ্যে। পূর্বাঞ্চলীয় আনাতােলিয়ার এ স্থান কৌশলগতভাবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় রুশ ও তুর্কি বাহিনীর কেউই ছাড় দিতে চায়নি। ফলে তুরস্কের জেনারেল আনােয়ার পাশা, জেনারেল করিম পাশা, জেনারেল মােস্তফা কামাল ও জেনারেল কাজিম কারাবাকির নেতৃত্বে অটোমান বাহিনী তুমুল লড়াই জমিয়ে রাখে শেষ পর্যন্ত। এদিকে বেশ কয়েকজন সেনানায়ক যেমন জেনারেল আইভানােভিচ ভরন্তসভ দাসখব, জেনারেল নিকোলাই ইউদেনিস, জেনারেল আন্দ্রানিক ওজানিয়ান, জেনারেল দ্ৰাস্তামাত কানায়ান, জেনারেল নাজদেহ, জেনারেল মােভসেজ সিলিকায়েন, ক্রেস ফন কেসেনস্টোইন, জেনারেল লিওনেল দুনস্তারভিল প্রমুখের নেতৃত্বে রুশ সাম্রাজ্য আর্মেনিয়ার লড়াই চলতে থাকে। দীর্ঘ যুদ্ধে দু’পক্ষের প্রচুর হতাহত হলেও কোনাে পক্ষই বড় বিজয় অর্জন করতে পারেনি।

দার্দানেলিসের লড়াই 

গ্যালিপলির পর তুরস্কের দার্দানেলিস প্রণালির দখল নিয়ে শুরু হয় এক মরণপণ লড়াই। ১৯১৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৯১৬ সালেল ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত এ ভয়াবহ সংঘাত অব্যাহত থাকে। শেষ পর্যন্ত তুর্কি বাহিনী জয়লাভ করলেও শেষ পর্যন্ত দু’পক্ষেই হতাহত হয় অসংখ্য। ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মিত্রবাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন স্যাকভাইল কার্ডেন ও জন ডি রােবেক। প্রায় ৩১টি যুদ্ধজাহাজ, ৩টি ব্যাটল ক্রুজার, ২৪টি ক্রুজার, ২৫টি ডেস্ট্রয়ার, ৪টি মনিটর ও ২৫টি সাবমেরিন নিয়ে যুদ্ধ শুরু করে মিত্রবাহিনী। তবে প্রবল ক্ষমতাধর মিত্রবাহিনী তুর্কিদের কৌশলের কাছে শেষ পর্যন্ত হার মানে। বিশেষ করে সাবমেরিন হামলায় তুর্কিদের একের পর এক সাফল্য মিত্রবাহিনীকে কোণঠাসা করে দেয়।

আরো পড়ুন:  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ হচ্ছে একটি বিশ্বযুদ্ধ যা ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত স্থায়ী ছিল

মেসোপটেমিয়ায় সামরিক অভিযান

মেসোপটেমিয়ায় সামরিক অভিযানটি ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মধ্যপ্রাচ্য রণাঙ্গনের একটি প্রচারণা যা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রতিনিধিত্বকারী মিত্রদের মধ্যে, ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া থেকে সেনাবাহিনী এবং ব্রিটিশ ভারত থেকে আসা বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ সেনাবাহিনী দ্বারা চালিত কেন্দ্রীয় শক্তিসমূহের বিরুদ্ধে লড়েছিল যার অধিকাংশই ছিল অটোমান সাম্রাজ্যের।

কুত অবরােধ

মিত্রবাহিনীর বিরুদ্ধে অটোমান তুর্কিদের বিজয় অভিযান হিসেবে কুত অবরােধের কথা বলা যেতে পারে। ব্রিটিশ ভারতের সৈন্যসহ ব্রিটেনের সেনাবাহিনীর ৩০ হাজার সৈন্যের নেতৃত্বে ছিলেন জেনারেল টাউনশেল্ড যার ২৩ হাজার এ যুদ্ধে হতাহত হয়। অন্যদিকে তুর্কি বাহিনীর ৫০ হাজার সৈন্যের নেতৃত্বে ছিলেন ব্যারন ফন ডার গােলটাজ ও খলিল পাশা। শেষ পর্যন্ত তুর্কি বাহিনীর ১০ হাজার সৈন্য নিহত হলেও কুল আল-আমারা মেসােপটেমিয়া তথা বর্তমান ইরাকের কাছাকাছি সংঘটিত এ লড়াইয়ে জয়লাভ করে অটোমান তুর্কিরাই। ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ জেমস মরিস কুতের যুদ্ধে পরাজয়কে তাদের ইতিহাসে একটি ন্যক্কারজনক আত্মসমর্পণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

তথ্যসূত্র:

১. মো. আদনান আরিফ সালিম, আধুনিক বিশ্বের ইতিহাস, [Pdf]. বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, জানুয়ারি ২০১৯. সানজিদা মুস্তাফিজ ও সুমা কর্মকার. সম্পা. পৃষ্ঠা ৪৫-৪৬; Retrieved from http://www.ebookbou.edu.bd/wp/OS/hsc4_2.php#hsc2855

Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই “পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি” প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১০টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর “সমাজতন্ত্র” ও “মার্কসবাদ” গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন “বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা” নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top
You cannot copy content of this page