Main Menu

বাংলায় মোগল-শাসনের বিশেষ বৈশিষ্ট্য

যদিও আকবরের রাজত্বকালে বাংলা মোগল-শাসনের অধীনে আসে তবু সাম্রাজ্যের এই প্রত্যন্ত প্রদেশটিতে মোগলদের শাসন যথেষ্ট নিশ্চিত ও নিরাপদ ছিল না। বাংলার ‘জমিদার’ ও ‘জায়গিরদার’রা তাঁদের ভূ-সম্পত্তিগুলিকে নিজেদের বাহুবলে স্বাধীন রাজ্যে পরিণত করতে সচেষ্ট ছিলেন সর্বদাই। বাংলার ‘জমিদার’দের বশ্যতাস্বীকার করাতে মোগলদের সময় লেগেছিল চার বছর — ১৬০৮ থেকে ১৬১২ খীস্টাব্দ পর্যন্ত। বাঙালি ‘জমিদার’দের দুই নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি মুসা খাঁ ও ঈশা (উসমান খাঁ এখনও পর্যন্ত ভারতে বাংলার স্বাধীনতার দুই অগ্রণী যোদ্ধা বলে সম্মানিত।

বঙ্গদেশে ব্যবসা-বাণিজ্য ও কারুশিল্প ছিল অত্যন্ত উন্নত স্তরের এবং সেখানে নদ-নদী-পরিবৃত অঞ্চল ও কিছু-কিছু পার্বত্য-অঞ্চল ছিলো যাতায়াতের পক্ষে অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। এ-কারণে সেখানে সামন্ত-রাজন্যদের অধীনেও ক্রমান্বয়ে সামন্ত-রাজন্য গড়ে ওঠার প্রথা মোগল-সাম্রাজ্যের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে আগে বিকশিত হয়ে উঠতে শুরু করে। বাংলার মোগল-শাসনকর্তা ও প্রভাবশালী সেনাধ্যক্ষরা এমনভাবে এই বিজিত ভূখণ্ডটিকে ব্যবহার করতে থাকেন যেন এই রাজ্যটি তাঁদের নিজস্ব। তাঁরা খুশি মাফিক ‘জায়গির বিলি করতে থাকেন, নিযুক্ত করতে থাকেন রাজ-আদায়ের কর্মচারি ও অন্যান্য স্থানীয় রাজকর্মচারি এবং ‘খালিসা’ জমিতে বসিয়ে দেন বহুতরো মধ্যস্বত্বভোগী। একজন লোকের একাধিক রাজকর্মচারির পদে বহাল হওয়া বাংলায় একটা সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায় । বাংলার মোগল-নিযুক্ত শাসক-প্রতিনিধিরা ছিলেন কার্যত স্বাধীন। যখন জাহাঙ্গীর বে-আইনী কাজকর্মের অপরাধে বাংলার জনেক শাসনকর্তাকে বরখাস্ত করলেন তখন সেই শাসনকর্তা ঢাকার কাছে এক দুর্গে বসলেন ঘাঁটি গেড়ে, আর তারপর তাঁকে দুর্গ থেকে বিতাড়িত করতে দরকার হলো সামরিক বাহিনীর সাহায্য নেয়ার।

মোগলদের অনবরত আক্রমণ ও যুদ্ধ-বিগ্রহ বাংলার কৃষকদের জীবনে নিরবচ্ছিন্ন বিপর্যয়ের সামিল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বাংলার রায়ত’দের জীবনে অপর এক অভিশাপস্বরূপে ছিল পত্তনদার, মধ্যস্বত্বভোগী ও খাজনা-আদায়কারীরা, এই পত্তনদার ও খাজনা আদায়কারীদের কার্যকলাপে কৃষকরা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন। কানপুরে একবার সনাতন নামে এক ব্যক্তির নেতৃত্বে কৃষকরা খাজনা-আদায়কারী ও পত্তনদারদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ পর্যন্ত করেন। রাঙামাটির দুর্গ দখল করার পর কৃষকরা দখল করে বসলেন এক বিস্তৃত ভূখণ্ড। পরিশেষে অবশ্য মোগল-সৈন্য তাঁদের রাঙামাটি থেকে বিতাড়িত করল বটে, তবে বিদ্রোহীরা অতঃপর ঘাঁটি গেড়ে বসে ধুন্ধুমা দুর্গে। দীর্ঘকাল অবরোধ করে রাখার পড়ে তবেই এই দুর্গ মোঘলদের হস্তগত হয়।

তথ্যসূত্র:

১. কোকা আন্তোনভা, গ্রিগরি বোনগার্দ-লেভিন, গ্রিগোরি কতোভস্কি; অনুবাদক মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায়; ভারতবর্ষের ইতিহাস, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, প্রথম সংস্করণ ১৯৮২, পৃষ্ঠা, ৩৩৬-৩৩৭।  

আরো পড়ুন






Related News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *