You cannot copy content of this page
আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > ইতিহাস > প্রথম বিশ্বযুদ্ধ হচ্ছে একটি বিশ্বযুদ্ধ যা ইউরোপে ১৯১৪ থেকে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত স্থায়ী ছিল

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ হচ্ছে একটি বিশ্বযুদ্ধ যা ইউরোপে ১৯১৪ থেকে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত স্থায়ী ছিল

প্রথম বিশ্ব যুদ্ধ চলাকালীন ব্যবহৃত অস্ত্র

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ বা বিশ্ব যুদ্ধ প্রথম বা মহাযুদ্ধ বা প্রথম সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বযুদ্ধ (প্রায়শই ইংরেজিতে: First World War বা সংক্ষিপ্তরূপে WWI বা WW1), হচ্ছে ইউরোপে সংঘটিত একটি বিশ্বযুদ্ধ যা ২৮ জুলাই ১৯১৪ থেকে ১১ নভেম্বর ১৯১৮ সাল পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। এই মহাযুদ্ধ ৬ কোটি ইউরোপীয়সহ ৭ কোটিরও বেশি সামরিক কর্মীকে একত্রিত করেছিল যা এটিকে তৎকালীন সময়ে ইতিহাসের বৃহত্তম যুদ্ধ হিসাবে পরিণত করেছিল।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পেছনে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কারণসমূহ জড়িত ছিল। ফলে ১৯১৪ সালের ২৮ জুন অস্ট্রিয়ার আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দের হত্যাকাণ্ডকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের এক এবং একমাত্র কারণ ভাবার কোনাে সুযােগ নেই। ইউরােপের বিভিন্ন দেশের রাজনীতি, অর্থনৈতিক স্বার্থ, সংস্কৃতিগত দৈন্য ও উৎকর্ষতার বিপরীতে আরাে কিছু গৌণ কারণ এ যুদ্ধকে প্রণােদিত করেছে তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। পেন্ডুলামের মত দুলতে থাকা রাজক্ষমতার দেশগুলােতে দৃষ্টি দিয়ে অনেক রাষ্ট্রচিন্তাবিদই তৎকালীন ইউরােপের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিলেন যার পর নাই হতাশ। বিশেষ করে ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতার পাশাপাশি একে অন্যের উপর অহেতুক চড়াও হওয়ার মানসিকতা নিয়ে চেষ্টা চলছিল একের পর এক জোট গঠনের প্রচেষ্টা। বিভিন্ন রাষ্ট্রের এই প্রবণতা তাদের কতটুকু লাভবান করেছিল তা নিয়ে হয়ত নিশ্চিত করে কিছু বলার সুযােগ নেই। তবে এতে করে পুরাে ইউরােপের রাজনৈতিক পরিবেশ যে অশান্ত হয়ে উঠেছিল তা নিশ্চিত করে বলা যায়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূচনাপর্ব

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরুর নানা কারণ রয়েছে। তবে যুদ্ধের একেবারে শুরুর গল্পটাকে সাজানাে যেতে পারে সরাসরি সারায়েভাে হত্যাকাণ্ড থেকেই। বসনিয়ার জাতীয়তাবাদী গ্রুপ ব্ল্যাক হ্যান্ড এক্ষেত্রে তাদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে উগ্রপন্থা অবলম্বনে বাধ্য হয়। তারা অস্ট্রো-হাঙ্গেরি সিংহাসনের উত্তরাধিকারী আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দ ও কাউন্টেস সােফিয়াকে হত্যা করে। সারায়েভাে হত্যাকাণ্ডের দায়টা তারপরেও পুরােপুরি জাতীয়তাবাদীদের উপর বর্তায় না। বিশেষ করে বসনিয়াহার্জেগােভিনা একটি দুর্বল রাষ্ট্র ছিল। তারা ইউরােপের রাজনৈতিক পরিসরে তেমন গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা কোনােদিনই রাখতে পারেনি। এই সুযােগ নিয়ে অস্ট্রো-হাঙ্গেরি সাম্রাজ্যের অহেতুক সাম্রাজ্য বিস্তারের নেশা পেয়ে বসে। তারা ১৮৭৪ সালে এসে দখল করে নেয় বসনিয়া-হার্জেগােভিনার ভূখণ্ড। এরপর ১৯০৮ সালে এই ভূখণ্ড একীভূত করা হয়। 

আরো পড়ুন:  চীনা গৃহযুদ্ধ চীনের কুওমিনতাং ও কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে ১৯২৭-১৯৪৯ সময়ে চলা গৃহযুদ্ধ

বসনিয়ায় বসবাসরত মুসলিম সম্প্রদায় থেকে শুরু করে সেখানকার সার্বরাও এ দখলদারিত্ব মেনে নিতে পারেনি। তারা অস্ট্রো-হাঙ্গেরির সাথে না থেকে সরাসরি সার্বিয়া কিংবা অন্য কোনাে স্লাভ ভূখণ্ডের সাথে যুক্ত হতেই বেশি আগ্রহী ছিল। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের পরিণতি ঘটায় তারা ১৯১৪ সালের ২৮ জুন অস্ট্রীয় যুবরাজ হত্যার মধ্যদিয়ে। সম্রাট ফ্রাঞ্জ জোসেফের অনুজ ফার্দিনান্দ ছিলেন আর্চ ডিউক কার্ল লুডিগের ছেলে। একটি ভােজসভায় ১৮৯৫ সালের দিকে কাউন্টেস সােফিয়ার সাথে সাক্ষাতের সূত্র ধরে শেষ পর্যন্ত প্রেম গড়িয়ে শুভ পরিণয়। তবে ফার্দিনান্দের প্রথম দিকের বৈবাহিক জীবন অতটা সুখের হয়নি। 

আর্চডিউক ফ্রেডরিখের স্ত্রী এলিজাবেথের লেডি ইন ওয়েটিং সােফিয়ার সাথে ফার্দিনান্দের এই সম্পর্ককে ফ্রেডরিখ প্রথম প্রথম আঁচ করতে পারেননি। তিনি যখন বুঝতে পারেন তখন একে যেকোনাে মূল্যে আটকাতে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। এতে করে আর্চডিউক কন্যা মারিয়া ক্রিস্টিনের পর্যন্ত কপাল পােড়ে। অন্যদিকে সােফিয়া রাজপরিবারের কেউ না হওয়াতে তাকে বিয়ে করার ব্যাপারে ঘাের আপত্তি জানান ফ্রাঞ্জ জোসেফ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রাশিয়ার জার দ্বিতীয় নিকোলাস, জার্মান সম্রাট দ্বিতীয় উইলহেম ও ১৩ তম পােপ লিও ফার্দিনান্দের পক্ষাবলম্বন করে রাজার কাছে সুপারিশ করেন। এতে বরফ গললেও শেষ রক্ষায় হয়নি ফার্দিনান্দের। শেষ পর্যন্ত মাত্র ৭ জন অনভিজ্ঞ বন্দুকধারী আততায়ীর সামনেই তাঁকে সস্ত্রীক জীবন দিতে হয়েছিল। 

অস্ট্রো-হাঙ্গেরির রাজ পরিবার অবৈধভাবে দখল করেছিল বসনিয়ার ভূখণ্ড। সেখানে বসবাসরত মুসলমানদের অনেককে গণহত্যার শিকার হতে হয় হাঙ্গেরীয় হানাদার বাহিনীর হাতে। পাশাপাশি সেখানে বসবাসরত সার্ব-ক্রোয়াটরাও রেহাই পায়নি এ নির্মম হত্যাযজ্ঞ থেকে। তারপর যারা হাঙ্গেরির বশ্যতা স্বীকার করতে বাধ্য হয় তাদের উপর সীমাহীন জুলুমনিপীড়ন চলতে থাকে। অনেকে শুধুমাত্র স্বাধীন বসনিয়া আন্দোলনের সাথে জড়িত অনেকের শিক্ষাজীবন শেষ হয়ে যায়। এমনি এক তরুণের নাম প্রিন্সিপ যে কৈশােরেই জীবনের স্বপ্ন মুছে যাওয়ায় বাধ্য হয় প্রতিশােধ নেয়ার সংকল্পে। আর তার হাতেই প্রাণ যায় ফার্দিনান্দ ও সােফিয়ার। এর পাশাপাশি নেদেলজাকো ক্যাবরিনােভিস কিংবা ড্যানিলাে আইলিচও জীবনের নানা ক্ষেত্রে হাঙ্গেরির দখলদারিত্বের যন্ত্রণা ভােগ করছিলেন। জীবনের নানা ক্ষেত্রে বলতে গেলে সর্বস্ব খুইয়ে তারা বাধ্য হয়েছিলেন সরাসরি ফার্দিনান্দকে নির্বংশ করে বসনিয়ার উপর থেকে হাঙ্গেরির অশুভ ছায়া দূর করতে। প্রথম কয়েকজন পরিকল্পনাকারী পরপর ব্যর্থ হলেও কিশাের প্রিন্সিপ তিনটি গুলিতে হত্যা করে ফার্দিনান্দ-সােফিয়াকে। 

আরো পড়ুন:  আমাদের বিপ্লবের কথা

নেহাত ক্রোধ ও প্রতিশােধস্পৃহা থেকে হত্যাযজ্ঞে অংশগ্রহণকারীরা মরতে গিয়েও পারেনি। তাদের কেউ কেউ গুলি চালাতে গিয়ে ব্যর্থ হয়, কেউবা সায়ানাইড পিল খেয়েও অদ্ভুতভাবে বেঁচে যায়। আর শেষ পর্যন্ত ধরা পড়তে হয় হাঙ্গেরিয়ান বাহিনীর হাতেই। কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে যক্ষ্মা আক্রান্ত হয়ে পচে মরার আগে তাদের কপালে রিমান্ডের যে নির্যাতন জোটে তাতেই ফাস হয় এ হত্যাকাণ্ডের। হাঙ্গেরি দাবি করে সার্বিয়া এই হত্যাকাণ্ডকে প্রণােদিত করেছে। আর এর সূত্র ধরেই তারা নানাবিধ চাপ প্রয়ােগ করতে থাকে সার্বিয়ার উপরে। বিভিন্ন ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরােপ করে কোণঠাসা করার চেষ্টা চলে সার্বিয়াকে। কিন্তু প্রথম থেকেই অবিচল সার্বিয়া এতে টলতে রাজি ছিল না। হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণকারীদের জবানবন্দি থেকে নিশ্চিত করা হয় যে এর নীলনকশা সাজানাে হয়েছিল বেলগ্রেডে। সার্বিও জাতীয়তাবাদী গ্রুপ নারােদনা ওব্রানার প্রণােদনাতেই বিচ্ছিন্নতাবাদীরা এত সহজে সংগঠিত হয়ে এ হত্যাকাণ্ড ঘটাতে সক্ষম হয়েছিল। এমন দাবি করে সার্বিয়ার উপর আক্রমণের চিন্তা করে হাঙ্গেরির বাহিনী।

তথ্যসূত্র:

১. সালিম মো. আদনান আরিফ, (Jan. 2019). আধুনিক বিশ্বের ইতিহাস [Pdf]. (মুস্তাফিজ সানজিদা, & কর্মকার সুমা. Ed.). পৃষ্ঠা ২৯-৩০; Retrieved from http://www.ebookbou.edu.bd/wp/OS/hsc4_2.php#hsc2855

Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই “পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি” প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১০টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর “সমাজতন্ত্র” ও “মার্কসবাদ” গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন “বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা” নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top