Main Menu

ভারতে ব্রিটিশ উপনিবেশবিরোধী প্রতিরোধ ও সংগ্রাম

ভারতে ব্রিটিশ প্রাধান্য দৃঢবদ্ধ হয়ে উঠেছে এই বিশ্বাসে ঔপনিবেশিক শাসকগণ সারা ভারতে প্রত্যক্ষ ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ধীরে ধীরে দেশীয় রাজাগুলি তুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এই লক্ষ্যার্জনের অন্যতম উপায় ছিল ‘রাজ্যগুলির স্বত্বলোপ নীতি’ প্রবর্তন। এতে নিঃসন্তান রাজার দত্তক পুত্রের উপর রাজ্যের মালিকানা অর্সাত না। এভাবে ১৮৪৮-১৮৫৮ খ্রীস্টাব্দের মধ্যে সাতারা, নাগপুর, ঝাঁসি, সম্বলপুর ও অন্যান্য বহু রাজ্যের বিলুপ্তি ঘটে। তাঞ্জোরের রাজা ও কর্ণাটকের (আর্কট) নবাবের মত্যুর পর এই উপাধিগুলি চিরকালের জন্য লুপ্ত হয়ে যায়। অনাদায়ী ঋণের জন্য হায়দরাবাদের নিজামের কাছ থেকে বেরারের সমৃদ্ধতম তুলাচাষ এলাকাটি কেড়ে নেওয়া হয়। ১৮৩১ খ্রীস্টাব্দ থেকে আগামী বছরগুলিতে মহীশুর প্রত্যক্ষ ব্রিটিশ শাসনাধীনে আসে। এক্ষেত্রে রাজা অবসরভাতা পেলেও পেশোয়া দ্বিতীয় বাজীরাওয়ের সন্তান-সন্ততিরা এই অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। কুশাসনের অভিযোগে ১৮৫৬ খ্রীস্টাব্দে ভারতের মানচিত্র থেকে অযোধ্যারও চিরলুপ্তি ঘটে।

ক্ষমতা ও স্বত্বলুপ্তির পর প্রাক্তন রাজারা তাঁদের দরবারও ভেঙ্গে দেন। ফলত, প্রাক্তন সভাসদরা তাঁদের জীবিকার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন, অভিজাত ও রাজন্যবর্গের সৈন্যবাহিনীর জন্য কোনো কাজের প্রয়োজন না থাকায় কারিগররা নিঃস্ব হয়ে পড়ে, খাজনা বৃদ্ধি পায় এবং ফসলহানির সময় ব্রিটিশ সরকারদত্ত কোনো সুবিধা বা ‘তাকাবি’র কোন সুযোগ না থাকায় আগের তুলনায় কৃষকদের অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। পরিশেষে, রাজন্যবর্গের পদমর্যাদাকে সাধারণ ব্রিটিশ নাগরিকের পর্যায়ে নামিয়ে আনায় ভারতীয়দের জাতীয় মর্যাদায় আঘাত লাগে। অর্থাৎ, এতে ভারতীয় জনগণের ব্যাপক স্তুরের মধ্যে অসন্তোষ পরিপক্ক হয়ে ওঠে ও প্রায়ই প্রাক্তন সামন্তদের নেতৃত্বে কৃষকবিদ্রোহ দেখা দিতে থাকে। ভারতীয় উপজাতিদের প্রতি ঔপনিবেশিক প্রশাসনের নীতিও এই অসন্তোষে ইন্ধন যুগিয়েছিল। এদের অধিকাংশই ইতিপূর্বে সামরিক দায়িত্ব বা পথে পাহারা দেয়ার শর্তে খাজনা মকুবের সুযোগ ভগ করত। উপজাতিদের এইসব দায়িত্ব অনাবশ্যক বিবেচনায় ব্রিটিশরা তাদের জায়গা-জমির উপর খাজনা বসায়। ফলত, সারা ভারতে উপজাতি বিদ্রোহ দেখা দেয়।

উনিশ শতকের পুরো প্রথমার্ধ জুড়ে ভারতের নানা অংশে কৃষক, উপজাতি ও পদচ্যুত সামন্তদের কার্যকলাপের মধ্যে অব্যাহত ঔপনিবেশিকতাবিরোধী ঘটনাবলী প্রকটিত ছিল। উত্তর সরকারগুলির সামন্ত ‘পালায়াক্কাররা’ উনিশ শতকের শুরু থেকেই দৃঢ়ভাবে ব্রিটিশ আধিপত্যের বিরোধিতা করছিলেন এবং ১৮০১-১৮০৫ খ্রিস্টাব্দ অবধি ওই অঞ্চলে ক্রমাগত বহুবার ব্রিটিশদের পিটুনি অভিযান চালাতে হয়েছিল। পুনরায় ১৮৯৩-১৮১৪ খ্রীস্টাব্দে এবং ১৮৩১ খ্রীস্টাব্দে সেখানে অভ্যুত্থান ঘটে। শেষোক্ত অভ্যুত্থান দমনে কয়েক বছর সময় লেগেছিল।

১৮৫৭ খ্রীস্টাব্দে সমগ্র দিল্লী অঞ্চলে সশস্য অভ্যুত্থান দেখা দেয়। ১৮১৪ খ্রীস্টাব্দে বারাণসীর অদূরে সশস্ত্র রাজপুত কৃষকদের প্রতিরোধে জনৈক ‘বহিরাগতে’র কাছে একটি বড় গ্রামের অবাধ নিলাম-বিক্রি বন্ধ হয়ে যায় । নিষ্কর জমির উপর খাজনা ধার্যের প্রতিবাদে ১৮১৭-১৮১৮ খ্রীস্টাব্দে ওড়িষ্যার কৃষকরা জনৈক স্থানীয় সামন্তের নেতৃত্বে বিদ্রোহ করে। প্রাক্তন মারাঠা-সৈন্যদের সমর্থনপুষ্ট রামুসি-বিদ্রোহ ১৮২৬-১৮২৯ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত সারা পুনা জেলাকে আলোড়িত করেছিল৷ শেষ পর্যন্ত সরকার প্রজাস্বত্বভোগীদের কম খাজনার দাবি মানতে বাধ্য হয়। ১৮৩০-১৮৩১ খ্রীস্টাব্দে খাজনা বৃদ্ধির কারণে বেদনোর কৃষক বিদ্রোহ ঘটলে সেটি দমনের জন্য ব্রিটিশরা মহীশুরে সৈন্য পাঠায়। জনৈক স্থানীয় সামন্তের জমিদারি বাজেয়াপ্ত (বকেয়া খাজনার জন্য) এবং প্রত্যক্ষ ব্রিটিশ শাসন প্রবর্তনের প্রতিবাদে ১৮৩৫-১৮৩৭ খ্রীষ্টাব্দে গুমরে মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি) একটি বিদ্রোহ ঘটে। ১৮৪২ খ্রীস্টাব্দে একই কারণে সগরেও একটি অভ্যুত্থান দেখা দেয়। ১৮৪৬-১৮৪৭ খ্রীস্টাব্দে কর্ণালের কৃষকরা জনৈক স্থানীয় পালায়াক্কারের নেতৃত্বে বিদ্রোহ করে। ১৮৪৮ খ্রীস্টাব্দে নাগপুরের রোহিলাদের মধ্যে সশস্ত্র অভূত্থান ঘটে। ১৮৪৪ খ্রীস্টাব্দে বোম্বাই প্রেসিডেন্সির সীমান্তবর্তী কোলাপুর ও সান্তওয়াদী রাজ্য দুটিতে সেখানকার রাজাকে ভাড়া দেয়ার জন্য প্রজাদের ভূমিরাজশ বুদ্ধি করায় প্রবল ব্রিটিশবিরোধী বিদ্রোহ দেখা দেয়। ভূমিজরিপ ও ফলত খাজনা বৃদ্ধির প্রতিবাদে খোদ বোম্বাই প্রেসিডেন্সির খান্দেশ এলাকার কৃষকরা বিদ্রোহ করে।

উপজাতিদের মধ্যেও বিদ্রোহ দেখা দিচ্ছিল এবং ফলত ঔপনিবেশিক শাসকরা কঠিন ও ক্লান্তিকর ‘খুদে যুদ্ধ চালাতে বাধ্য হচ্ছিল। ১৮৩১-১৮৩২ খ্রীস্টাব্দে ছোটনাগপুরে (বাংলা প্রেসিডেন্সি) সংঘটিত হোস-উপজাতির বিদ্রোহ এর একটি উল্লেখ্য নজির। বোধই প্রেসিডেন্সিতেও রহু বিদ্রোহ ঘটে। এগুলি হলো: ১৮১৮-১৮৩১ খ্রীস্টাব্দের ভিল বিদ্রোহ, ১৮২৪ খ্রীস্টাব্দের কোল বিদ্রোহ, ১৮২৪ ও ১৮২৯ খ্রীস্টাব্দের কিটুরের কৃষক বিদ্রোহ এবং ১৮১৫-১৮৩২ খ্রীস্টাব্দের কচ্ছেরে অসংখ্য বিক্ষোভ। ১৮৩৯ খ্রীস্টাব্দে শাহীয়াদ্রিতে আবার কোল বিদ্রোহ ঘটে এবং ১৮৪৪-১৮৪৬ খ্রীস্টাব্দে তা পুনরাবৃত্ত হয়। দেশের অনান্য অংশেও অভিন্ন ধরনের অসন্তোষ দেখা দিয়েছিল:১৮২০ খ্রীস্টাব্দে রাজপুতানায় মের বিদ্রোহ, ১৮৪৬ খ্রীস্টাব্দে ওড়িষ্যার গোচ্ছ বিদ্রোহ ও ১৮৫৫ খ্রীস্টাব্দে বিহারের সাঁওতাল বিদ্রোহ।

সাধারণত নতুন কর প্রবর্তনের ফলে শহরগুলিতেও বিক্ষোভ দেখা দিয়েছিল। এটি যথানিয়মে হরতালের রূপলাভ করত। নতুন অবাসিক কর প্রবর্তনের জন্য বারাণসীতে এবং নতুন পুলিশী কর ঘোষণার পর ১৮১৬ খ্রীস্টাব্দে বেরিলীতে এরূপ হরতাল সংগঠিত হয়। যথেষ্ট পূর্ব প্রস্তুতি সহ কৃষক-সংগঠন দ্বারা পরিচালিত অভ্যুত্থানগুলিই অটলতর হতো। সাধারণত এইসব সংগঠন কোনো না কোনো ধরনের সাম্প্রদায়িক আদর্শ প্রচার করত এবং সহধর্মীদের ‘বিধর্মীদের’ (অর্থাৎ, ব্রিটিশ) বিরুদ্ধে সঙ্ঘবদ্ধ হবার আহ্বান জানাত। দৃষ্টান্ত হিসাবে ১৮১০ খ্রীস্টাব্দে বোম্বাই প্রেসিডেন্সির বোহরা ‘মাহদি’ বিদ্রোহীদের কথা উল্লেখ্য। জনৈক প্রাক্তন সেনাপতি আব্দুর রহমান এদের নেতৃত্ব দেন এবং সুরাট দুর্গ দখলের পর নিজেকে মাহদি (ত্রাণকর্তা) ঘোষণা করেন।

এক্ষেত্রে ওয়াহাবী আন্দোলন সদুরপ্রসারী ও দীর্ঘস্থায়ী হয়েছিল। এই সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন হোলকারদের অন্যতম প্রাক্তন সেনাপতি সৈয়দ আহমদ বারেবী (১৭৮৬-১৮৩১)। তিনি ভারত দখলকারী ‘বিধর্মী’দের বিরুদ্ধে ধর্মযুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। তাঁর আহ্বানে বাংলা ও বিহারের মুসলিম কৃষক এবং শহরের কারিগর ও ছোট দোকানদাররা সাড়া দিয়েছিল। ওয়াহাবীরা ব্রিটিশের বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রস্তুতির সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের ঘোষিত সামাজিক ন্যায়ের নীতিভিত্তিক সমাজ পুনর্গঠনের আহবানও জানাত। অবশ্য এই ন্যায়নীতির কাঠামো ছিল খুবই অস্পৃষ্ট। ১৮২০ খ্রীস্টাব্দে ঔপনিবেশিক শাসকরা ওয়াহাবীদের বিহার থেকে বিতাড়িত করলে তারা পশতু উপজাতিদের এলাকা সিতানায় অনুপ্রবেশ করে। সেখানে শিখদের সঙ্গে ওয়াহাবীদের সংঘাত বাধলে ৯৮৩১ খ্রীস্টাব্দে তাদের হাতে সৈয়দ আহমদ নিহত হন। তা সত্ত্বেও বাংলা ও বিহারে ওয়াহাবী আন্দোলন অব্যাহত থাকে। ১৮৩১ খ্রীস্টাব্দে তিন-চার হাজার সশস্ত্র ওয়াহাবী বারাসাত জেলার একটি ছোট শহর দখলের পর কলিকাতার দিকে অগ্রসর হয়। একটি ভয়ঙ্কর যুদ্ধের পর কামানের গুলিতে তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে।

হাজী শরিয়ত উল্লার নেতৃত্বাধীন ফারাজী আন্দোলন ছিলো ওয়াহাবীদেরই একটি উপশাখা। হিন্দু, মুসলিম জমিদার ও ব্রিটিশ নীলকর নির্বিশেষে সকল অত্যাচারীর বিরুদ্ধে এরা সহিংস প্রতিশোধ গ্রহণ করতো। বাংলায় এটি ছিল মূলত মধ্যযুগীয় ধরনের একটি কৃষক আন্দোলন। তাদের পুর্ববতী ওয়াহাবীদের মতো এরাও বিশুদ্ধ ইসলামের আদর্শকে ঊধ্বে তুলে ধরত এবং খোদার দুনিয়ায় সকল মানুষের সমানাধিকারের কথা বলত। তারা ঘোষণা করত যে, তাদের সম্প্রদায়ের সকল সভ্যই সমান, জমির মালিক খোদা ও নিজ স্বার্থে কৃষকের কাছ থেকে খাজন, আদায়ের অধিকার কারও নেই। ইতিমধ্যে ১৮৫২ খ্রীস্টাব্দে পাটনায় ওয়াহাবীর ব্রিটিশের বিরুদ্ধে ধর্মযুদ্ধ ঘোষণা করে। তারা কৃষক ও শহরে মানুষের বিশেষভাবে বাংলার সিপাহীদের সাদর সমর্থন পেয়েছিল।

কেবল উপনিবেশবিরোধী এইসব আন্দোলনের তালিকা থেকেই তখনকার মানুষের ব্রিটিশবিরোধী মনোভাবের গভীরতার যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। কিন্তু ব্রিটিশ প্রভুত্বের বিকল্প হিসাবে সামন্ততান্ত্রিক স্বাধীন ভারতবর্ষ ছাড়া এইসব আন্দোলন থেকে আর কোন ফলোদয়ের সম্ভাবনা ছিল না। ঔপনিবেশিক নির্যাতনের বিরুদ্ধাচারী এইসব নেতাদের অতীতের সামন্ততান্ত্রিক কাঠামোয় প্রত্যাবর্তনের আকাঙ্ক্ষার মধ্যেই এর ব্যাখ্যা মেলে।

তথ্যসূত্র:

১. কোকা আন্তোনভা, গ্রিগরি বোনগার্দ-লেভিন, গ্রিগোরি কতোভস্কি; অনুবাদক দ্বিজেন শর্মা; ভারতবর্ষের ইতিহাস, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, প্রথম সংস্করণ ১৯৮২, পৃষ্ঠা, ৪৩০-৪৩৩।

আরো পড়ুন






Related News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *