Main Menu

গণতন্ত্র কাকে বলে

গণতন্ত্র হচ্ছে সরকার পরিচালনায় নাগরিকদের অংশগ্রহণ, আইনের সামনে তাদের সমতা, ব্যক্তির নির্দিষ্ট কতকগুলো অধিকার ও স্বাধীনতার বৈশিষ্ট্যচিহ্নিত রাজনৈতিকরাষ্ট্রীয় ক্ষমতার একটি রূপ। শ্রেণীবিভক্ত সমাজে গণতন্ত্র আসলে ক্ষমতাসীন শ্রেণীর প্রকাশ্য অথবা প্রচ্ছন্ন একনায়কত্ব এবং তার স্বার্থেই ব্যবহৃত। বুর্জোয়া গণতন্ত্র হলো বুর্জোয়া শ্রেণীর শ্রেণী-আধিপত্যের একটি রূপ এবং তার একনায়কত্ব হিসাবেই আত্মপ্রকাশ করে।[১]  

শব্দগতভাবেও জনগণের তন্ত্র বা ব্যবস্থা হচ্ছে গণতন্ত্র যা আধুনিক রাষ্ট্রমাত্রেরই শাসন বা পরিচালনব্যবস্থার আরাধ্য পদ্ধতি। যে শাসনব্যবস্থা রাষ্ট্রের অধিবাসীদের প্রাপ্তবয়স্ক এবং সুস্থ অংশের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা পরিচালিত হয় তাকে গণতন্ত্র বা প্রতিনিধিত্বমূলক বুর্জোয়া গণতন্ত্র বলে। প্রতিনিধিত্বমূলক আধুনিক গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার উদ্ভব ইউরোপে। ইংল্যাণ্ড এবং ফ্রান্সে প্রথমে সামন্তবাদ এবং রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন লড়াই এবং সংগ্রামের মাধ্যমে সপ্তদশ এবং অষ্টাদশ শতাব্দীতে এই ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়।[২]

আসলে প্রত্যেকটি শাসনব্যবস্থাই হচ্ছে সমাজ ও রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। বিদ্যমান প্রধান অর্থনৈতিক বা উৎপাদনব্যবস্থার স্বার্থসাধনকারী পরিচালন বা শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। ইংল্যাণ্ডের সপ্তদশ শতকের এবং ফ্রান্সের অষ্টাদশ শতকের বিপ্লবসমূহের মধ্যে সেকালের উদীয়মান নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তথা পণ্য উৎপাদনকারী পুঁজিবাদী ব্যবস্থার চাহিদারই প্রকাশ ঘটেছিল। এজন্য এই বিপ্লবসমূহকে পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক বিপ্লব বলে অভিহিত করা হয়। এই নতুন শাসনব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, প্রাপ্ত বয়স্কদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে আইনসভা বা পার্লামেন্টের গঠন এবং পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের পরিচালনায় দেশের শাসন। শাসনব্যবস্থার এই কাঠামোগত রূপ একদিনে প্রতিষ্ঠিত হয় নি। ব্যক্তি স্বাধীনতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা প্রভৃতি অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই-এর মাধ্যমে নাগরিকদের মৌলিক অধিকারসমূহের রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান হিসাবে পার্লামেন্টের প্রতিষ্ঠা ঘটে।[২]  

আধুনিককালের রাষ্ট্র পরিচালনার প্রধান পদ্ধতি নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে শাসন তথা গণতন্ত্র হলেও পৃথিবীর অনেক দেশে এখনও এরূপ পার্লামেন্টারী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় নি এবং অনেক উন্নয়নশীল দেশে, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা শাসন পরিচালনায় ব্যাপকতর জনসাধারণের চেতনা ও শক্তি ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পায় বলে কায়েমী স্বার্থ ও সংকীর্ণ চিন্তার বাহক এবং অর্থনৈতিক শ্রেণীর মুখপাত্র হিসাবে অনেক সময়ে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে নাকচ করে সামরিক-চক্র শাসন কায়েম করেছে। অবশ্য এমন সামরিক শাসকদের ক্ষমতা দখলের এই অজুহাতটি উল্লেখযোগ্য যে প্রায়শ এরা বলে থাকে গণতন্ত্র ব্যর্থ হয়েছে কিংবা দেশ গণতন্ত্রের উপযুক্ত হয় নি কিংবা দেশে আর্থিক ও আইন শৃঙ্খলার সংকট তীব্র হয়েছে, সে কারণে সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠায় এরা বাধ্য হয়েছে এবং পরিণামে গণতন্ত্র পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করা হবে। অর্থাৎ সামরিক শাসকরাও গণতন্ত্রকে চূড়ান্তরূপে নাকচ করে দিবার ক্ষমতা রাখে না।[২]

আধুনিক কালের রাজনৈতিক আলোচনায় ‘গণতন্ত্র’ শব্দটি আবার ব্যাখ্যামূলকভাবেও ব্যবহৃত হয়। পৃথিবীতে আধুনিককালে দুটি প্রধান অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিদ্যমান রূপ দেখা গেছে। এদের একটি ব্যক্তি মালিকানাভিত্তিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থা। অপরটি হচ্ছে যৌথ বা রাষ্ট্রীয় মালিকানাভিত্তিক সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। পুঁজিবাদী শাসনব্যবস্থায় চালিত বুর্জোয়া শ্রেণির গণতন্ত্র হচ্ছে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণকে শাসনের ও শোষণের অধিকার। তাই এই গণতন্ত্র যথার্থ গণতন্ত্র নয়, খুবই খণ্ডিত এবং সংকীর্ণ যাকে বলা হয় বুর্জোয়া শ্রেণির একনায়কত্ব; যদিও কখনো কখনো এটি বুর্জোয়া শ্রেণির দুটি দলের মাধ্যমে শোষণ শাসন ও গণহত্যা চালানোর প্রক্রিয়া। মার্কসবাদীগণ তাই পুঁজিবাদী শাসনব্যবস্থাকে রাষ্ট্রের প্রধান তথা পুঁজিবাদী শ্রেণীর শাসন বলে অভিহিত করে; সেটা সংখ্যাগুরু শ্রমজীবী জনগণের গণতান্ত্রিক শাসন নয়।

তথ্যসূত্র:

১. সোফিয়া খোলদ, অনু. ড. মুস্তাফা মাহমুদ, সমাজবিদ্যার সংক্ষিপ্ত শব্দকোষ, প্রগতি প্রকাশন মস্কো, ১৯৯০, পৃষ্ঠা ৪২।

২. সরদার ফজলুল করিম; দর্শনকোষ; প্যাপিরাস, ঢাকা; জুলাই, ২০০৬; পৃষ্ঠা ১২৯-১৩০।

আরো পড়ুন






Related News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *