You cannot copy content of this page
আপনি যা পড়ছেন
মূলপাতা > মতাদর্শ > লেনিনবাদ > সাহিত্য প্রসঙ্গে লেনিনবাদ

সাহিত্য প্রসঙ্গে লেনিনবাদ

সাহিত্য-বিচারের ক্ষমতা নিয়ে মানুষ জন্মগ্রহণ করে না। সাহিত্যের বিচার-ক্ষমতা অর্জনের জন্যে অনুশীলনের দরকার। একজন পাঠকের কাছে সাহিত্য কেবল একটি বিশেষ সময় বা পরিবেশের হাতে তুলে দেওয়া ইতিবৃত্ত মাত্র নয়। পাঠকের সঙ্গে সাহিত্যের সম্পর্ক মানবিক, তাই ‘শিল্পীসুলভ সংস্কার নিয়ে গড়ে ওঠা ’ বলতে কার্ল মার্কস খুব মূলত বলেছেন দীর্ঘদিনের অনুশীলন ও চিন্তন প্রক্রিয়ার বৃহৎ আঙ্গিকের কথা। সাহিত্যের বহুবিধ রস আস্বাদনের জন্যে মার্কস বুঝিয়েছেন সাহিত্য চর্চা, সাহিত্য বোঝা, সাহিত্যের সংস্কার গড়ে তোলাকে। ‘অর্থনৈতিক ও দার্শনিক পাণ্ডুলিপি’তে মার্কস-এর বক্তব্য হচ্ছে— ‘তুমি যদি সাহিত্য আস্বাদ করতে চাও, তাহলে তোমাকে অবশ্যই শিল্পীসুলভ সংস্কার নিয়ে গড়ে উঠতে হবে’।[১]

সুতরাং বিচারের সময় সাহিত্যজন্মের সমকালীন অর্থনৈতিক অবস্থার প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও এ বিষয়ে অতিমনস্কতা মার্কসবাদ নয়। সাহিত্যসৃষ্টি একটি জটিল প্রক্রিয়া এবং সাহিত্য বিচারও অনুশীলন সাপেক্ষ— সাহিত্য-বিচারে এই সত্য দুটি একাধিকবার নানাভাবে স্মরণ করেছেন কার্ল মার্কস ও ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস। সুতরাং মার্কসবাদী তত্ত্বে বলা হচ্ছে, সাহিত্যিকের মস্তিষ্ক বা হৃদয় এমন কোনো নির্মল আয়না নয়, যেখানে শুধু এক বিশেষ কালের অর্থনীতি এবং কতকগুলি চরিত্রের আবেগ প্রকাশিত হওয়ার জন্যে উন্মুখ। সাহিত্যিক ইতিহাসের এক বিশেষ লগ্নের মানুষ এবং তার নিকটবর্তী পাঠকেরা ঐ একই ইতিহাসের প্রেক্ষাপটের মানুষ।

বিশেষ সময়ের অর্থনীতির দ্বারা লেখক-পাঠক উভয়েরই জীবন-ভাবনার পুষ্টি ঘটে। মনে হতে পারে, তাহলে তো একমাত্র সমকালীন পাঠকেরাই শুধু লেখককে বুঝবেন এবং পরবর্তী পাঠকদের কাছে লেখক হবেন শুধুই কৌতূহলের সামগ্রী। অতএব পুরাকীর্তির দৃষ্টান্ত রূপেই এস্কাইলাস-শেকসপীয়র-কালিদাস-রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টি গণ্য হবে। কিন্তু কার্যত তা হচ্ছে না। এই লেখকেরা তাদের সমকালকে অতিক্রম করে গিয়েছেন। রসিকেরা এখনও এঁদের লেখা থেকে প্রেরণা লাভ করেন। স্বয়ং মার্কস মূল গ্রীক-ভাষায় এস্কাইলাস পড়তেন, শেকসপীয়রের সৃষ্টি ছিলো তাঁর এবং তাঁর পরিবারের নিত্যসঙ্গী। কিন্তু কেন? অতীতকে জানার জন্যেই কি অতীতের এই সব কাব্য-সাহিত্য পাঠের প্রয়োজন? বরং মার্কস দেখেছেন অন্যান্য শিল্পবস্তুর মতো সাহিত্যকেও ‘সৌন্দর্য-আস্বাদনক্ষম শিল্পরসিক জনগণের সৃষ্টি'[০] হিসেবে।

আরো পড়ুন:  গোর্কির বহিষ্কার সম্বন্ধে বুর্জোয়া পত্র-পত্রিকার গালগল্প

শ্রেণি-বিভক্ত সমাজে লেখক নিজে যেমন তার শ্রেণি-চরিত্রকে সৃষ্টির মধ্যে প্রতিফলিত করেন, তেমনি তিনি নিজেও বিভিন্ন শ্রেণির প্রভাব তার মস্তিষ্কে গ্রহণ করতে পারেন। সে ক্ষেত্রে লেখকের নিজের শ্রেণি এবং অন্য যে সব শ্রেণির প্রভাব তার ওপর পড়েছে সে সবই সমালোচকের অনুসন্ধানের বিষয় হতে পরে। লেনিনের সুহৃদ এবং প্রখ্যাত মার্কসবাদী-লেনিনবাদী সাহিত্য-বিচারক লুনাচারস্কি লিখছেন—লেখক নিজে যে শ্রেণির অন্তর্গত, সেই শ্রেণির মনস্তত্ত্ব কোনোভাবে সাহিত্যে সর্বদাই প্রতিফলিত হয়ে থাকে। অথবা, কোনো সাহিত্যে কোনো লেখকের উপর বিভিন্ন শ্রেণি থেকে আগত উপাদান সমূহের মিশ্রণও প্রকাশিত হয়।[২] 

লুনাচারস্কির মন্তব্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, তিনি যেমন লেখকের অর্থনৈতিক শ্রেণিচরিত্র সম্পর্কে সচেতন থাকাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন, তেমনি সমকালীন বিভিন্ন শ্রেণি থেকে আগত উপাদান তথা সমকালের নীতি, দর্শন, ধর্ম সম্পর্কেও সমালোচকের ঐতিহাসিক-শোভন সজাগ দৃষ্টি থাকা বাঞ্ছনীয় জ্ঞান করেছেন। যেহেতু সৃষ্টির পথ সরল নয়, সুতরাং সৃষ্টির মর্মোদ্ধারও অনায়াসসাধ্য সরল কর্ম নয়।[৩]

অন্যদিকে বিশ্ব সাম্যবাদী আন্দোলনের নেতা ও শিক্ষক ভ্লাদিমির লেনিন সাহিত্যকে দেখেছেন সমাজতন্ত্র অভিমুখী ভবিষ্যৎ সমাজের আন্দোলনের একটি উপাদান হিসেবে। লেনিন তাঁর ‘পার্টি সংগঠন ও পার্টি সাহিত্য’ প্রবন্ধে বাক-স্বাধীনতা, ছাপাখানার স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতার কথা জানিয়ে বললেন, কেবল প্রেস বা পুলিশের কবল থেকে নয়, পুঁজি ও বুর্জোয়া স্বৈরতান্ত্রিক ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদের গ্রাস থেকেও সাহিত্যকে রক্ষা করতে হবে। জন্ম নেবে স্বাধীন সাহিত্য যা মুষ্টিমেয় কিছু সুবিধাভোগীকে তৃপ্তি দেবে না, তৃপ্তি দেবে লক্ষ লক্ষ শ্রমজীবী সাধারণ মানুষদের। লেনিন ১৯০৫-এ বলেছেন-সাহিত্য হবে প্রোলেতারিয়েতদের সাধারণ চাহিদার অনুকূল এবং সংগঠিত ও অখণ্ড রূপ প্রাপ্ত ‘কমিউনিস্ট পার্টি’র কর্মের একটি অঙ্গ।

পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় সমাজের একজন সদস্য হিসেবে সচেতন শিল্পস্রষ্টা যদি স্বাধীনতা ভোগ করছেন বলে দাবি করেন, যা সাম্রাজ্যবাদী-পুঁজিবাদী দেশের লেখকগণ অহরহই দাবি করেন, তা কিন্তু কার্যত পুঁজিবাদের গোলামি। পুঁজিবাদী দেশে বাস করে যারা স্বাধীন আছেন বলে আয়েশে জীবন কাটান, আবার যারা সমাজের পীড়ন, মানুষের যন্ত্রণা, মুনাফার বন্ধনে বন্দি থেকে চিন্তায় মুমূর্ষু মানুষের মুক্তির কথা বলতে গিয়ে পুঁজিবাদের সমালোচনা করেন তারা অবক্ষয়ের মানসিকতা পাঠকের মধ্যে সঞ্চারিত করেন। ১৯৭০ সালে বুলগেরীয় লেখকদের দ্বিতীয় জাতীয় সমাবেশে দঝাগারোভ এই ধরনের অবক্ষয়ী লেখকদের কথা বলেন,

There are writers who criticize capitalism, the way worms criticize a decomposing corpse. Born of decay, they themselves become agents of decay.[৪]

গলিত মড়াদেহে বাস করে, সেখান থেকে খাদ্য সংগ্রহ করে, সেই মড়ার ভেতরে বেঁচে থেকেই সেই ক্রিমিকীট যদি মড়ার সমালোচনা করে তাহলে যে অবস্থা হয়, পুঁজিবাদপুষ্ট লেখকদের পুঁজিবাদের সমালোচনা হচ্ছে সেইরকম। লেনিন ১৯০৫ সালেই এরকমই এক সমালোচনা করেছিলেন ‘পার্টি সংগঠন ও পার্টি সাহিত্য’ প্রবন্ধে বুর্জোয়া লেখকদের।

বুর্জোয়া ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী মহোদয়েরা, আমরা বলতে বাধ্য যে, আপনাদের পরম স্বাধীনতা কথাটা একেবারেই ভণ্ডামি। যে সমাজ অর্থাধিপত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত, যেখানে মেহনতী জনগণ দারিদ্র্যে ভোগে আর পরজীবী হয়ে দিন কাটায় মুষ্টিমেয় ধনী, সেখানে বাস্তব ও সত্যকারের স্বাধীনতা থাকতে পারে না। লেখক মহাশয়, আপনার বুর্জোয়া প্রকাশকের কাছ থেকে কি আপনি স্বাধীন? আপনার বুর্জোয়া পাঠকদের কাছ থেকে, যারা উপন্যাসে ও চিত্রে আপনার কাছ থেকে চায় যৌনকুরুচি … …?[৫]

কোনো মানুষই যেহেতু এক বিশেষ সমাজে বাস করে সেই সমাজ থেকে বন্ধনমুক্ত হতে পারে না, সুতরাং পুঁজিবাদী সমাজের লেখক শিল্পী অভিনেতার স্বাধীনতা নিতান্তই মুখোশ বা ছলনার মুখোশ টাকার থলি, ভ্রষ্টাচার ও বেশ্যাবৃত্তির দ্বারা যা তৈরি। স্বাধীন শিল্পী সাহিত্যিকের প্রথম কাজ হবে মুখ বুজে যন্ত্রনার নির্বাক প্রতিবাদ করা নয় এবং দ্বিতীয় কাজ হবে লোভ ও নিজের ভবিষ্যৎ তৈরির চেষ্টা বর্জন করা এবং প্রাচুর্যভারপীড়িত মুষ্টিমেয়কে তুষ্ট না করে লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষকে তুষ্ট করা। এই উদ্দেশ্যে লেনিনের প্রতিশ্রুতি,

সাহিত্যকে হতে হবে পার্টি সাহিত্য। বুর্জোয়া রীতির বিপরীতে, বুর্জোয়া অর্থকরী, ব্যবসাদারী সংবাদপত্রের বিপরীতে, বুর্জোয়া সাহিত্যিক পদান্বেষণ ও অহমিকা, ‘নবাবী নৈরাজ্য’ ও মুনাফা শিকারের বিপরীতে সমাজতান্ত্রিক প্রলেতারিয়েতকে পেশ করতে হবে পার্টি সাহিত্যের নীতি, বিকশিত করতে হবে তাকে এবং বাস্তবে প্রয়োগ করতে হবে যথাসম্ভব পূর্ণতর ও সমগ্রতর রপে। … মুদ্রণের স্বাধীনতা আমরা প্রতিষ্ঠা করতে চাই ও প্রতিষ্ঠা করব শুধু, পলিসী অর্থে নয়, পুঁজির হাত থেকে স্বাধীনতা, পদলালসা থেকে স্বাধীনতার অর্থেও এবং আরও বড় কথা: বুর্জোয়া নৈরাজ্যবাদী অহমিকা থেকে স্বাধীনতার অর্থেও।[৬]

সুতরাং সমাজের সদস্য হিসেবে সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমিক ও কৃষকের সেবায় নিয়োজিত সাহিত্য হচ্ছে সাহিত্যের প্রধান ধারা। অন্যান্য সকল সাহিত্য হচ্ছে সমাজের সেই আবর্জনা যা ধ্বংস হবার অপেক্ষায় দিন গুজরান করছে। মানবজাতি তার জন্যে অপ্রয়োজনীয় কিছুই সংরক্ষণ করে না বিধায় সমাজ পরিবর্তনে যে সাহিত্য কাজে লাগে না, সেই সাহিত্যের মৃত্যু অনিবার্য।

আরো পড়ুন:  সোভিয়েত সরকারের সাফল্য ও বিঘ্ন

তথ্যসূত্র:

১. কার্ল মার্কস, অর্থনৈতিক ও দার্শনিক পাণ্ডুলিপি ১৮৪৪, অর্থের ক্ষমতা, শেষ অনুচ্ছেদ।

২. A. Lunacharosky, On Literature and art,

৩. ড. বিমলকুমার মুখোপাধ্যায়, মার্কসীয় সাহিত্যতত্ত্ব, দেজ পাবলিশিং, কলকাতা, তৃতীয় সংস্করণ জানুয়ারি ২০১৮, পৃষ্ঠা ৮৫।

৪. Yuri Barabash-এ উদ্ধৃত, D Jhagarov, Aesthetics and Poetics, Progress Publishers, Moscow 1977, P 70.

৫. লেনিন ভি আই, ১৩ নভেম্বর ১৯০৫, পার্টি সংগঠন ও পার্টি সাহিত্য, অনুবাদ প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, ১৯৭৬, পৃষ্ঠা ৯-১০।

৬. লেনিন ভি আই, ১৩ নভেম্বর ১৯০৫, পার্টি সংগঠন ও পার্টি সাহিত্য, অনুবাদ প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, ১৯৭৬, পৃষ্ঠা ৬-৮।   

Anup Sadi
অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই “পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি” প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১০টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর “সমাজতন্ত্র” ও “মার্কসবাদ” গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন “বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা” নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

Leave a Reply

Top